মিশরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর* ক্ষমতাচ্যুৎ হয়ে নিহত হবার খবর পেয়ে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ – হাশিম ইবনে উতবাহকে মিশরে প্রেরণ করার জন্য আমি মনস্থ করেছিলাম। যদি আমি তাই করতাম। তবে সে বিরোধীদের জন্য যুদ্ধের ময়দান খালি করে দিত না এবং তাদেরকে কোন সুযোগ দিত
না। (তাকে ধরে ফেলার)। এ উক্তি আমি মুহাম্মদের মানহানি করার জন্য করি নি। যেহেতু আমি তাকে ভালোবাসি এবং আমি তাকে লালন-পালন করেছি।
১। মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের মাতা ছিলেন আসমা বিনতে উমায়েস। আবু বকরের মৃত্যুর পর আমিরুল মোমেনিন তাকে বিয়ে করেন। ফলে মুহাম্মদ আমিরুল মোমেনিনের সাথে বাস করতো এবং তাকে আমিরুল মোমেনিনই লালন-পালন করেন। সে কারণে মুহাম্মদ তাঁর আচার-আচরণ, মত ও পথ আত্মস্থ করতে পেরেছিল। আমিরুল মোমেনিন তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং নিজের পুত্র মনে করতেন। তিনি অনেক সময় বলতেন, “মুহাম্মদ আবু বকরের ঔরসজাত কিন্তু আমার পুত্র।” বিদায় হজের যাত্রাকালে সে জন্মগ্রহণ করে এবং আটাশ বছর বয়সে ৩৮ হিজরি সনে শহিদ হয় ।
আমিরুল মোমেনিন খেলাফত গ্রহণের পর কায়েস ইবনে সাদ ইবনে উবাদাহকে মিশরের গভর্নর মনোনীত করেন, কিন্তু অবস্থা এমন হয়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরকে গভর্নর করে প্রেরণ করতে হয়েছিল। কায়েস। উসমানি দলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পক্ষপাতী ছিল না, কিন্তু মুহাম্মদের অভিমত ছিল বিপরীত। ক্ষমতা গ্রহণের এক মাসের মধ্যেই মুহাম্মদ তাদের কাছে বার্তা প্রেরণ করলো যে, যদি তারা তাকে মান্য না করে তবে তাদের অস্তিত্ব মিশরে রাখা হবে না। ফলে এসব লোক তার বিরুদ্ধে একটা দল গঠন করে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সিফফিনের সালিসির পর তারা প্রকাশ্যভাবে প্রতিশোধের স্লোগান দিয়ে সমস্যার সৃষ্টি করে মিশরের পরিবেশ অশান্ত করে তুলেছিল। আমিরুল মোমেনিন এ সংবাদ পেয়ে মালিক ইবনে হারিছ। আলআশতারকে মিশরের গভর্নর নিয়োগ করে তথায় প্রেরণ করলেন যাতে ষড়যন্ত্র প্রদমিত হয়ে প্রশাসন ভালোভাবে চলে। কিন্তু মালিক উমাইয়াদের নীলনকশা থেকে নিস্কৃতি পায় নি। তারা মালিককে পথিমধ্যেই বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। ফলে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরই মিশরের শাসনকর্তা রয়ে গেল।
এ দিকে সালিসিতে আমর ইবনে আস এর কার্যক্রমের জন্য মুয়াবিয়া তাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা মুয়াবিয়াকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হলো। ফলে সে আমরের নেতৃত্বে ছয় হাজার সৈন্য ন্যস্ত করে মিশর আক্রমণের জন্য তাকে প্রেরণ করলো। শত্রুর অগ্রযাত্রা সম্পর্কে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর জানতে পেরে সাহায্যের জন্য আমিরুল মোমেনিনকে পত্র লেখালো। প্রত্যুত্তরে তিনি জানালেন যে, তিনি সহসাই তার সাহায্যের জন্য সৈন্য সংগ্রহ করে প্রেরণ করবেন; ইতোমধ্যে সে যেন তার নিজের বাহিনীকে সমবেত করে যুদ্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করে। মুহাম্মদ চার হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী গঠন করে দুভাগ করলেন। একভাগ নিজের অধীনে রেখে অপরভাগ কিনানাহ ইবনে বশির আত-তুযিবীর নেতৃত্বে ন্যস্ত করে শত্রুর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার জন্য আদেশ দিলেন। কিনানাহ তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে গেল। শত্রুর সম্মুখভাগে তারা যখন ক্যাম্প স্থাপন করলো তখন একের পর এক শত্রুদল তাদেরকে আক্রমণ করতে লাগলো। তারা অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে এসব আক্রমণ মোকাবেলা করেছিলো। অবশেষে মুয়াবিয়াহ ইবনে হুদায়েজ আল-কিন্দি তার সর্বশক্তি নিয়োগ করে এমনভাবে আক্রমণ করলো যে, কিনানাহর বাহিনী তা প্রতিহত করতে পারে নি। ফলে তারা যুদ্ধ করতে করতে শহিদ হয়ে পড়লো। কিনানাহর পরিণতির সংবাদ পেয়ে মুহাম্মদের বাহিনী ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তাকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে গেল। মুহাম্মদ নিরুপায় হয়ে আত্মগোপন করে একটা নির্জন স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। শত্রুপক্ষ যে কোন লোকের মাধ্যমে খবর পেয়ে তৃষ্ণাকাতর অবস্থায় মুহাম্মদকে ধরে ফেললো এবং তাকে দ্বিখন্ডিত করে তার লাশ জ্বলিয়ে দিয়েছিল। এদিকে মালিক ইবনে ক’ব আল-আরহাবীর নেতৃত্বে দুহাজার সৈন্যের একটি বাহিনী কুফা থেকে যাত্রা করে গিয়েছিল। কিন্তু তারা মিশরে পৌছার আগেই শত্রুপক্ষ মিশর দখল করে নিয়েছিলো।