উসমানের হত্যার পর যখন জনগণ আমিরুল মোমেনিনের হাতে বায়াত’ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন তিনি বলেনঃ আমাকে ছাড়ো, অন্য কারো অনুসন্ধান করো। আমরা একটা বিষয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। যার বিবিধ দিক ও রঙ রয়েছে, যা হৃদয় সহ্য করতে পারে না এবং বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ করতে পারে না। আকাশে মেঘ ভাসছে এবং সঠিক পথ নির্ণয় করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। তোমাদের জানা দরকার যে, যদি আমি তোমাদের কথায় সাড়া দেই। তবে আমি যা জানি সেভাবেই তোমাদের পরিচালনা করবো এবং অন্যে কী বলবে বা দোষারোপকারীর নিন্দার পরোয়া আমি করবো না। যদি তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও। তবে আমি তোমাদের একজনের মতোই হব। তোমাদের কর্মকান্ডের ভার অন্য কাউকে দিলে আমিও তাকে মেনে চলবো এবং তার কথা শ্রবণ করবো। আমি তোমাদের প্রধান হওয়া অপেক্ষা উপদেষ্টা হওয়াকে অধিকতর ভালো মনে করি ।
১। উসমান নিহত হলে খলিফার পদ শূন্য হয়ে পড়ে। তখন মুসলিমগণ আলীর শান্তিপূর্ণ আচরণ, নীতির প্রতি দৃঢ়তা ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার কথা চিন্তা করে তার হাতে বায়াত গ্রহণ করার জন্য এমনভাবে ছুটে আসতে লাগলো যেন পথ-হারা পথিক দূরে কোন নিশানা দেখে সে দিকে ছুটে যায়। তাবারী’ (১ম খন্ড, পৃঃ ৩০৬৬, ৩০৬৭, ৩০৭৬) লেখেছেনঃ জনতা আমিরুল মোমেনিনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে বললো, “আমরা আপনার হাতে বয়াত গ্রহণ করতে চাই এবং আপনি দেখুন ইসলাম আজি কত বিপদের সম্মুখীন এ অবস্থায় আমরা কিভাবে রাসুলের নিকট আত্নীয় সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকতে পারি ” কিন্তু আমিরুল মোমেনিন কিছুতেই জনতার অনুরোধে রাজি হচ্ছিলেন না। এতে জনতা হৈ চৈ আরম্ভ করে দিল এবং চিৎকার করে বলতে লাগলো, “হে আবুল হাসান, ইসলাম ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে তা কি আপনি দেখছেন না? বলগাহীনতা আর ফেতনার বন্যা কিভাবে এগিয়ে আসছে তা কি আপনি দেখছেন না? আপনার কি আল্লাহর ভয় নেই?” তা সত্ত্বেও আমিরুল মোমেনিন তাদের প্রস্তাবে রাজি হন নি, কারণ তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, রাসুলের ইনতিকালের পর থেকে যে হাল-চাল মানুষের হৃদয়-মন ঘিরে ফেলেছে তা ঠিক করা দুরূহ ব্যাপার। স্বার্থপরতা ও ক্ষমতার লোভ তাদের মধ্যে শিকড় গেড়ে বসেছিল। তাদের সকল ধ্যান-ধারণা বস্তুবাদে জড়িয়ে পড়েছিল এবং সরকারকে ব্যক্তিস্বর্থ চরিতার্থ করার উপায় বলে মনে করতো। এ সব লোক এখন আবার ঐশী খেলাফত বাস্তবায়ন করতে চায় এবং খেলাফত নিয়ে খেলা করতে চায়। বিদ্যমান অবস্থায় তাদের মানসিকতা ও প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটানো অসম্ভব ছিল। এ ছাড়াও তিনি তাদেরকে বিষয়টির ওপর আরো অধিক চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ দিয়েছেন যাতে ভবিষ্যতে তাদের বস্তু-স্বার্থে আঘাত লাগলে তারা বলতে না পারে যে, খেলাফত বিষয়ে তারা যথাযথ চিন্তা করার সুযোগ পায় নি। প্রথম খেলাফত সম্বন্ধে উমরের ধারণা তার নিম্নের বিবৃতিতেই প্রকাশ পেয়েছেঃ
আবু বকরের খেলাফত চিন্তা-ভাবনা না করেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ এর ফেতনা থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেছেন । যদি কেউ এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি করে, তোমরা তাকে হত্যা করো । (বুখারী***, ৮ম খন্ড, পৃঃ ২১০-২২১; হাম্বল***, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৫;
তাবারী’, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৮২২; কাহীর’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ২৪৬: আহ্বর, ২য় খন্ড, পৃঃ
৩২৭; fچ/ix5طادہ. ৪র্থ খন্ড, ?coケ-cos)
যখন জনগণের চাপ সীমাতিরিক্ত হয়ে পড়েছিল তখন আমিরুল মোমেনিন এ খোৎবা প্রদান করেন। এতে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “যদি তোমরা তোমাদের দুনিয়াদারির স্বার্থসিদ্ধির জন্য আমাকে চাও তবে জেনে রাখো, আমি তোমাদের যন্ত্রের মতো কাজ করতে প্রস্তুত নই। তোমরা আমাকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে মনোনীত কর, যে তোমাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। যদি তোমরা অন্য কাউকে মনোনীত করো। তবে আমি শান্তিপ্রিয় নাগরিকের মতো রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধান মেনে চলবো। তোমরা আমার অতীত জীবন দেখেছো। আমি কুরআন ও সুন্নাহ ছাড়া আর কিছু অনুসরণ করতে প্রস্তুত নই। ক্ষমতার লোভে আমার সে নীতি পরিত্যাগ করতে পারবো না। তোমরা অন্য কাউকে মনোনীত করলে আমি কখনো বিদ্রোহের প্রেরণা দিয়ে মুসলিমদের অস্তিত্ব বিনষ্ট করবো না। কিন্তু আমাকে মনোনীত করলে তা ঘটবে। তোমাদের সার্বিক মঙ্গল বিবেচনা করেই আমি তোমাদেরকে সঠিক উপদেশ দিচ্ছি—আমার অনিচ্ছার কারণে নয়। যদি তোমরা আমাকে মনোনীত না কর। তবে তোমাদের দুনিয়াদারির জন্য তা ভালো হবে। কারণ আমার হাতে ক্ষমতা না থাকলে আমি তোমাদের দুনিয়ামুখি কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবো না। যা হোক, যদি তোমরা আমার হাতে বায়াত গ্রহণ করতে দৃঢ় সংকল্প হয়ে থাক তাহলে মনে রেখো, তোমরা আমার প্রতি বিরাগ দেখাও আর আমার বিরুদ্ধে সমালোচনা কর আমি তার তোয়াক্কা না করে তোমাদেরকে ন্যায়াপথে পরিচালিত করতে প্রয়োজনে বল প্রয়োগ করবো। ন্যায়ের ব্যাপারে কোন কিছুর সাথে আমার আপোষ নেই। এরপরও যদি তোমরা বায়াত গ্রহণ করতে চাও তবে তোমাদের ইচ্ছা পূরণ করতে পার।” এসব লোক সম্পর্কে আমিরুল মোমেনিনের ধারণা পরবতী ঘটনা প্রবাহ থেকে সঠিক বলেই প্রমাণিত
হয়েছিল। প্রকৃত পক্ষে যারা দুনিয়াদারির উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বায়াত গ্রহণ করেছিল, পরবতীতে তারা যখন দেখলো যে, তাদের লক্ষ্য অর্জিত হচ্ছে না। তখন তারা ভিত্তিহীন ও ছুতা-নাত কারণ দেখিয়ে তার সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।