কেউ একজন” বানোয়াট হাদিস ও মানুষের মধ্যে প্রচলিত রাসুলের (সঃ) পরস্পর বিরোধী বক্তব্য সম্পর্কে আমিরুল মোমেনিনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেনঃ
নিশ্চয়ই, আজ মানুষের মাঝে যা প্রচলিত আছে তাতে সত্য ও মিথ্যা এবং শুদ্ধ ও অশুদ্ধের সংমিশ্রণ
রয়েছে। এ সবের কিছু কিছু বাতিল যোগ্য এবং কিছু কিছু বাতিলকৃত; কিছু কিছু সাধারণ ও কিছু কিছু বিশেষ; কিছু কিছু নির্দিষ্ট ও কিছু কিছু অনির্দিষ্ট; কিছু কিছু অবিকল ও কিছু কিছু অনুমান আশ্রিত। এমনকি রাসুলের (সঃ) জীবৎকালেও তার নামে মিথ্যা বক্তব্য চালানো হয়েছিল। সে জন্য তিনি বলেছিলেন, “যে ব্যক্তি আমার নাম দিয়ে কোন মিথ্যা বিষয় চালিয়ে দেয় সে নিজের জন্য দোযখে স্থায়ী আবাস তৈরি করে।” যারা হাদিস বর্ণনা করে তারা চার শ্রেণির বেশি নয়।
প্ৰথমঃ মিথ্যাবাদী ও মোনাফিক
মোনাফিক সে ব্যক্তি যে ইমানের ভান করে এবং বাহ্যিক আবরণে ও অবয়বে মুসলিমের ভাব দেখায়। এরা পাপে লিপ্ত হতে কোন দ্বিধা করে না এবং পাপ থেকে দূরে সরে থাকার চেষ্টাও করে না। এরা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নবির নামে মিথ্যা কথা বানিয়ে বলে। মানুষ যদি জানতে পারতো যে, এরা মোনাফিক ও মিথ্যাবাদী তাহলে কখনো তাদের কথা গ্ৰহণ করতো না এবং এদের কথা বিশ্বাস করতো। না। বরং মানুষ মনে করে এরা আল্লাহর নবির সাহাবি, তাঁর দেখা পেয়েছে, তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী শুনেছে এবং তার কাছ থেক জ্ঞানার্জন করেছে। এ কারণে মানুষ তাদের কথা গ্ৰহণ করে। মহিমান্বিত আল্লাহ মোনাফিক সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন এবং তাদের সম্পর্কে তোমাদের কাছে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। রাসুলের (সঃ) পরে তারা তাদের মিথ্যার বেসাতি চালিয়ে যাচ্ছে। গোমরাহির নেতা ও মিথ্যার মাধ্যমে দোযখের দিকে আহবানকারীদের কাছে তারা উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। সুতরাং তারা এদের উচ্চপদে আসীন করেছে; অফিসার বানিয়ে জনগণের মাথার ওপর বসিয়েছে এবং এদের মাধ্যমে সম্পদ স্তুপীকৃত করেছে। আল্লাহ যাদের রক্ষা করেন তারা ছাড়া সকল মানুষ শাসকদের পিছনে ও দুনিয়ার পিছনে থাকে।
দ্বিতীয়ঃ যারা ভুল করে
কিছু কিছু লোক আছে যারা রাসুলের (সঃ) মুখনিঃসৃত বানী শুনেছে কিন্তু তা অবিকল মনে রাখতে পারে নি। এরা রাসুলের (সঃ) বাণীকে সংক্ষিপ্তাকারে নিজের থেকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনুমানভিত্তিক কথা বলে। এরা ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা বলে না। এরা যেভাবে হাদিস বর্ণনা করে সেভাবে আমলও করে এবং দাবি করে, “আমি আল্লাহর নবির মুখে একথা শুনেছি।” যদি মানুষ জানতে পারতো যে, এদের বর্ণনায় ভুল রয়েছে তাহলে কেউ তা গ্রহণ করতো না। এমনকি এরা নিজেরাও যদি বুঝতে পারতো যে,
এরা ভুল বর্ণনা করছে। তবে এরা নিজেরা তা পরিত্যাগ করতো।
তৃতীয়ঃ যারা অজ্ঞ এরা এমন লোক যারা হয়ত শুনেছে রাসুল (সঃ) কোন কিছু করতে বলেছেন। কিন্তু পরবতীতে হয়ত রাসুল (সঃ) সে কাজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন— এরা তা শোনে নি। আবার, হয়ত রাসুল (সঃ) কোন কিছু করতে বারণ করেছেন- এরা তা শুনেছে। কিন্তু পরবতীতে হয়ত তিনি তা করার অনুমতি দিয়েছেন-এরা তা শোনে নি। এরা যেটুকু আংশিক শুনেছে সেটুকু বৰ্ণনা করে। এতে প্রকৃত অবস্থার বিপরীত হয়ে যায়। আবার অনেক সময় এরা নিজেদের অজ্ঞতার কারণে রাসুলের বক্তব্যের অন্তর্নিহিত অর্থ বা ব্যাখ্যা বুঝতে পারে নি—এমনকি রাসুলকে (সঃ) জিজ্ঞেস করেও অন্তর্নিহিত ভাব জেনে নেয় নি। নিজেরা যেভাবে বুঝেছে সেভাবে বর্ণনা করছে। যদি মুসলিমগণ এদের অজ্ঞতার বিষয় জানতে পারতো।
তাহলে তারা এদের বর্ণনা গ্রহণ করতো না ।
চতুর্থঃ যারা সত্যিকারভাবে অবিকল মনে রাখতে পেরেছে
এ ধরনের লোক কখনো আল্লাহ ও রাসুলের বাণী সম্পর্কে কোন মিথ্যা কথা বলে না। আল্লাহর ভয়ে এরা মিথ্যাকে ঘূণা করে এবং আল্লাহর নবিকে সম্মান করে। এরা ভুল করে না এবং রাসুলের কাছে যা শুনেছে তা অবিকল মনে রাখে। এরা যা শুনেছে তাতে কোন কিছু সংযোজন ও বিয়োজন না করে অবিকল বর্ণনা করে। রাসুল (সঃ) যেভাবে বলেছেন। এরা সেভাবেই আমল করে। যখন কিছু করতে বলেছেন তখন সেভাবে করেছে। আবার যখন নিষেধ করেছেন আমনি তা পরিত্যাগ করেছে। এরা রাসুলের কথার সাধারণ ও বিশেষ অর্থ বুঝতে পেরেছে এবং যথোপযুক্ত গুরুত্বসহকারে রাসুলের কথার সুনির্দিষ্ট ও অনির্দিষ্ট ভাবে জানতে পেরেছে।
রাসুলের বাণীর দুভাবে অর্থ করা যায়—একটি হলো বিশেষ বা গুঢ়াৰ্থবােধক এবং অশারটি হলো সাধারণ বা ভাসাৰ্থবােধক। কখনো কখনো এমন হয়েছে যে, একজন লোক রাসুলের বাণী শুনেছে কিন্তু এতে মহিমান্বিত আল্লাহ ও তার রাসুল কী বুঝাতে চেয়েছেন সে শ্রোতা তা বুঝতে পারে নি। ফলে এ ধরনের শ্রোতা তাঁর বাণী মনে রেখেছে বটে, কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ কী বা একথা বলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও কারণ বুঝতে পারে নি। আল্লাহর নবির সাহাবাগণের মধ্যে অনেকেই তাকে প্রশ্ন করে বা জিজ্ঞেস করে তাঁর কাছ থেকে কোন কিছুর অর্থ জেনে নেয়ায় অভ্যস্ত ছিল না। কোন বেদুইন বা আগন্তুক এসে তাকে প্রশ্ন করবে এবং তাতে তারা মনে করতো তারাও শুনে অর্থ জেনে নিতে পারবে। আমি এরূপ বিষয় তাকে জিজ্ঞেস করে প্রকৃত অর্থ জেনে নিতাম এবং তা সংরক্ষণ করতাম। হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মতের কারণই এগুলো ।
১। এ লোকটির নাম হলো সুলায়েম ইবনে কায়েস আল-হিলালী। ইনি আমিরুল মোমেনিনের মাধ্যমে হাদিস বর্ণনা করতেন ।
২। এ খোৎবায় আমিরুল মোমেনিন হাদিসের রাবিগণকে চার শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেনঃ
প্রথম শ্রেণি হলো— যারা বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে রাসুলের নামে চালিয়ে দিয়েছে। একথা অস্বীকার করার কোন জো নেই যে, রাসুলের (সঃ) সহি হাদিস যখন প্রকাশ পেতে লাগলো তখন বিভিন্ন দল তাদের স্বার্থে মিথ্যা হাদিস রাসুলের নামে চালিয়ে দিয়েছিল। এ কথা কেউ অস্বীকার করলে সে তা জ্ঞানের ভিত্তিতে নয়- শুধু তর্কের খাতিরে অস্বীকার করবে। একবার আলামুল হুদা সাঈদ মুরতাজা কিছু সসংখ্যক সুন্নি উলামার সাথে তর্কে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। সাঈদ মুরতাজা ঐতিহাসিক ঘটনাবলী বৰ্ণনা করে প্রমাণ করলেন যে, সাহাবাগণের মর্যাদা সম্পর্কে প্রচলিত হাদিসগুলোর সব ক’টি বানোয়াট ও মিথ্যা। সুন্নি উলামাগণ যুক্তি দেখালেন যে, কেউ মিথ্যা হাদিস রচনা করে রাসুলের নামে চালিয়ে দেয়ার সাহস করবে একথা অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব। তখন সাঈদ মুরতাজা একটা সহি হাদিসের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ
আমার মৃত্যুর পর আমার নামে অসংখ্য মিথ্যা বিষয় প্রচলিত হবে এবং যে কেউ আমার নাম দিয়ে মিথ্যা প্রচার করবে। সে দোষাখে নিজ আবাস তৈরি করবে। (বুখারী***, ১ম খন্ড, পৃঃ 0% ఎ7 శిశ్యాం; ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২০৭, ৮ম খন্ড, পৃঃ ৫৪; নায়সাবুরী *, ৮ম খন্ড, পৃঃ ২২৯ আশাছ ***, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩১৯-৩২০ তিরমিয়ী *, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৫২৪, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩৫-৩৬, ৪০, ১৯৯, ৬৩৪; মাযাহ ***, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৩-১৫) /
যদি কেউ মনে করে এ হাদিসটি সত্য তা হলে সে অবশ্যই একমত হবে যে, রাসুলের (সঃ) নামে অনেক মিথ্যা বিষয় চালিয়ে দেয়া হয়েছে। আবার যদি কেউ মনে করে এ হাদিসটি মিথ্যা তাহলে রাসূলের (সঃ) নামে মিথ্যা বিষয় চালিয়ে দেয়ার প্রমাণ এ হাদিসটিই বহন করে। যাহোক, যাদের হৃদয় ছিল মুনাফেকিতে পরিপূর্ণ, যারা দ্বিনে ফেতনা ও বিভেদ সৃষ্টি করে দুর্বল ইমান সম্পন্ন মুসলিমদেরকে পথভ্রষ্ট করে স্বীয় স্বাৰ্থ হাসিলের জন্য দলে ভিড়িয়েছিল তারাই রাসুলের নামে মিথ্যা হাদিস রচনা করেছিল। এ ধরনের লোক রাসুলের জীবদ্দশায়ও ছিল যারা মোমিনগণের সাথেই মিশে থাকতো এবং সারাক্ষণ মুসলিমের অকল্যাণ ও ক্ষতির চিন্তায় ব্যস্ত থাকতো। রাসুলের ইনতিকালের পর এ ধরনের লোকের সসংখ্যা আরো বেড়ে গিয়েছিল এবং অসৎ কর্মতৎপরতায় তারা আরো মনোযোগী হয়ে পড়েছিল। এরা ইসলামের মহান শিক্ষা ও আদর্শে নানা প্রকার বিকৃতি ও পরিবর্তন করতে দ্বিধা করতো না। কারণ রাসুলের জীবদ্দশায় তারা কিছুটা ভয়ে থাকতো পাছে তিনি তাদের মোনাফেকি ফাঁস করে দিয়ে লজ্জায় ফেলে দেন ; কিন্তু রাসুলের পর তাদের সে ভয় কেটে গেছে। বিভিন্নভাবে এরা ক্ষমতাধর হয়ে স্বীয় স্বাৰ্থসিদ্ধির জন্য এ রকম মোনাফেকি করার পরও জনগণ তাদেরকে অবিশ্বাস করতো না। কারণ তারা দাবি করতো যে, তারা রাসুলের সাহাবা এবং যা বলে তা সত্য ও সঠিক। এরাই নিজেদের জন্য হাদিস বানিয়ে নিল— “রাসুলের সাহাবাগণ যে কোন প্রকার সমালোচনা ও প্রশ্নের উর্ধের্ব; তাদের কোন কাজের আলোচনা-পর্যালোচনা করা যাবে না এবং তাদের কাজের তিরস্কার করা যাবে না।” আমিরুল মোমেনিন। এহেন উক্তির মুখ থুবড়ে দিয়ে বলেনঃ এসব লোক গোমরাহির নেতার কাছে মর্যাদা লাভ করেছে এবং এরা মিথ্যা ও অপবাদের মাধ্যমে দোষখের দিকে আহ্বানকারী । সুতরাং এসব নেতারা মোনাফেকদেরকে উচ্চপদে আসীন করে জনগণের মাথার ওপর বসিয়ে দিয়েছিল । মোনাফিকগণ ইসলামের ক্ষতি সাধনের পাশাপাশি সম্পদ স্তুপীকৃত করেছিল। মুসলিমের মুখোশ পরে তারা যথেচ্ছভাবে বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলীতে বিভেদ সৃষ্টি করে তাদের স্বাৰ্থসিদ্ধি করেছিলো। ইবনে আবিল হাদীদ লেখেছেনঃ যখন তারা যথেচ্ছভাবে চলার সুযোগ পেল তখন তারা ইসলামের অনেক কিছু পরিত্যাগ করেছিলো । যখন মানুষ তাদের কর্মকান্ড সম্পর্কে নিচুপ থাকতো তখন তারাও ইসলাম সম্পর্কে নিচুপ থাকতো । কিন্তু তারা তলে তলে মিথ্যার জাল বুনায় তৎপর থাকতো যা আমিরুল মোমেনিন। পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেছেন । এ সব লোক রাসুলের হাদিসে অনেক মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে—যাদের লক্ষ্য ছিল মানুষের ইমানে ফাটল ধরিয়ে গোমরাহির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া / অপরপক্ষে এদের কারো কারো লক্ষ্য ছিল কোন বিশেষ দলের উচ্চ প্ৰশধ্বংসা করা- যাদের সঙ্গে এদের জাগতিক বিষয়াবলীর স্বাৰ্থ সংশ্লিষ্ট ছিল । এ সময় অতিবাহিত হবার পর যখন মুয়াবিয়া ধর্মের নেতৃত্ব ও ইহকালীন কর্তৃত্বের সিংহাসন দখল করেছিলো তখন সে মিথ্যা হাদিস রচনা করে তাতে জনমত গঠন করার জন্য একটা সরকারি বিভাগ খুলেছিলো। জনপ্রিয় করে তোলে। একই সাথে সে আদেশ দিয়েছিল যেন তারা (অফিসারগণ) উসমান ও উমাইয়াদের উচ্চকিত প্ৰশধ্বংসা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। এ কাজের জন্য সে পুরস্কার ঘোষণা করে এবং জমি বরাদ দেয়। ফলে হাদিস গ্রন্থগুলোতে অসংখ্য স্বঘোষিত বানোয়াট বক্তব্য স্থান লাভ করে । আবুল হাসান আল মাদায়নীর “কিতাবুল আহদাছ” হতে ইবনে আবিল হাদীদ উদ্ধৃত করেছেনঃ মুয়াবিয়া তার অফিসারদের কাছে লেখেছিল যে, তারা যেন সেসব লোকের প্রতি বিশেষ যত্নশীল থাকে যারা উসমানের কথা বলে, তার শুভাকাঙ্খী ও তাকে ভালোবাসে । যারা উসমানের উচ্চ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করে তাদেরকে যেন বিশেষ পদমর্যাদা ও সন্মান প্ৰদান করা হয় এবং রাবির নাম, পিতার নাম ও গোত্র পরিচয়সহ যেন হাদিসটি তার কাছে প্রেরণ করা হয় । মুয়াবিয়া কর্তৃক প্রদত্ত সরকারি মর্যাদা, জমি, পোষাক ও নানাবিধি পুরস্কারের ফলে উসমানের প্রশধ্বংসাসূচক হাদিস স্তুপীকৃত হয়ে গেল । উসমানের উচ্চ মর্যাদা সম্পকীয় এসব বানোয়াট হাদিস যখন রাজ্যময় ছড়িয়ে দেয়া হলো তখন পূর্ববতীর্ণ খলিফাদের মর্যাদা যাতে ক্ষুন্ন না হয় সে জন্য মুয়াবিয়া তার অফিসারদের লেখেছিল—
আমার এ আদেশ পাওয়া মাত্র তোমরা জনগণকে বলো যেন তারা সাহাবাগণ ও অন্য খলিফাদের প্রশধ্বংসাসূচক হাদিস তৈরি করে এবং সাবধান থেকে, যদি কোন লোক আবু তুরাব (আলী) সম্পর্কে কোন হাদিস বলে। তবে তোমরাও অন্য সাহাবাগণ সম্বন্ধে অনুরূপ হাদিস রচনা করো । মনে রেখো, এতে আমি আনন্দিত হবো এবং আমার চক্ষু শীতল হবে । এতে আবু তুরাব ও তার দলের মর্যাদা ক্ষীণ হয়ে পড়বে এবং উসমান বিশেষভাবে মর্যাদাশীল হবে / মুয়াবিয়ার এ পত্রের বিষয় জনগণকে জানানোর পর সাহাবাগণের উচ্চসিত প্রশধ্বংসাসূচক অসংখ্য বানোয়াট
হাদিস লোকেরা বর্ণনা করেছিল, সত্যের সাথে যেগুলোর কোন সংশ্ৰব্য ছিল না (হাদীদ***, ১১শ খন্ড, १६ 8७-8१) ।
এ বিষয়ে প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ আবু আবদুল্লাহ ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আরাফাহ (ডাক নাম নিফতাওয়াহ- হিঃ ২৪৪-৩২৩ সন)-এর উক্তি হাদীদ উদ্ধৃত করেছেন ঃ সাহাবাদের মর্যাদা সম্পর্কিত অধিকাংশ মিথ্যা হাদিস মুয়াবিয়ার সময় রচিত হয়েছিল । এসব বানোয়াট হাদিস দ্বারা সে জনগণের কাছে মর্যাদা লাভে কৃতকার্য হয়েছিল । তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বনি হাশিমকে অমর্যাদাকর ও হেয় করে দেখানো (প্রাগুপ্ত) এরপর মিথ্যা ও বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। দুনিয়াদারগণ রাজাবাদশাহদের কাছে মর্যাদা পাওয়া ও ঐশ্বৰ্য অর্জনের উপায় হিসাবে হাদিস বর্ণনাকে বেছে নিয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ— হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে আব্বাসিয় খলিফা আল-মাহদী ইবনে আল-মনসুরকে খুশি করে মর্যাদা লাভের আশায় গিয়াস ইবনে ইব্রাহীম আন-নাখাই কবুতর উড়িয়ে দেয়া সম্পর্কে একটা বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করেছিল। (বাগদাদী’, ১২শ খন্ড, পৃঃ ৩২৩-৩২৭; জাহাবি”, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৩৭-৩৩৮; আসকালানী**, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪২২)। আবু সাঈদ মাদায়নী ও অন্যান্যরা বানোয়াট হাদিস বর্ণনাকে জীবিকা উপার্জনের উপায় হিসাবে বেছে নিয়েছিল। এসময় সীমালঙ্ঘনের পর্যায়। এতদূর গিয়েছিল যে, কারুরামিয়াহ ও কতিপয় মুতাসাওয়াফাহ ফতোয়া জারি করে বলেছিল— পাপ থেকে বিরত রাখার জন্য অথবা আনুগত্যের প্রতি প্রলুব্ধ করার জন্য মিথ্যা ও বানোয়াট হাদিস বর্ণনা করা জায়েজ | এ ফতোয়ার ফলে প্রকাশ্যে যথেচ্ছভাবে হাদিস বর্ণনা শুরু হয়ে গেল এবং একে নৈতিক ও ধর্মীয় বিধানের পরিপন্থী মনে করা হতো না। বরং যাদেরকে বাহ্যিক আচার-আচরণে পরহেজগার বলে মনে করা হতো এবং যারা সারাদিন নামাজরত থাকতো তারা সারারাত বিভিন্ন বানোয়াট হাদিস লেখে তাদের খাতা-পত্ৰ ভরে ফেলতো। এধরনের বানোয়াট হাদিসের সসংখ্যা বিষয়ে কতিপয় ঘটনা থেকে অনুমান করা যাবে। ছয় লক্ষ হাদিস থেকে বুখারী মাত্র দুই হাজার সাত শত একষট্টিটি হাদিস গ্রহণ করেছিলেন (বাগদাদী’, ২য় খন্ড, পৃঃ ৮; কস্তালানী**, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৮; হাম্বলী***, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১৪৩)। মুসলিম তিন লক্ষ হাদিস থেকে মাত্র চার হাজার হাদিস গ্রহণ করেছিলেন (বাগদাদী**, ১৩শ খন্ড, পৃঃ ১০১; হাম্বলী***, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩২; জাহাবি*ী, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৫১, ১৫৭; খাল্লিকান’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ১৯৪)। আবু দাউদ পােচ লক্ষ হাদিস থেকে মাত্র চার হাজার আট শত হাদিস গ্রহণ করেছিলেন (বাগদাদী**, ৯ম খন্ড, পৃঃ ৫৭; জাহাবি’, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৫৪; হাম্বলী***, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৯৭; খাল্লিকান’, ২য় খন্ড, পৃঃ ৪০৪)। আহম্মদ ইবনে হাম্বল প্রায় দশ লক্ষ হাদিস থেকে মাত্র ত্ৰিশ হাজার হাদিস গ্রহণ করেছিলেন (বাগদাদী’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪১৯-৪২০; হাম্বলী***’, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৭; খাল্লিকান’**, ১ম খন্ড, পৃঃ ৬৪; আসকালানী’, ১ম খন্ড, পৃঃ ৭৪)। এসব বাছাইকৃত হাদিসগুলোর মধ্যে কিছু কিছু মিথ্যা ও বানোয়াট হাদিস যে এসে পড়ে নি। সে কথা নিশ্চত করে বলা যায় না। এ বিষয়ে আরো অধিক জানতে হলে আল-গাদির (আমিনী**) গ্রন্থের ৫ম খন্ডের ২০৮-৩৭৮ পৃষ্ঠা পড়ার সুপারিশ করা গেল । দ্বিতীয় প্রকার রাবি হলো— যারা বিষয় বা উপলক্ষ বিবেচনা না করে শুদ্ধ-অশুদ্ধ যা কিছু মনে ছিল তাই বর্ণনা করেছে। উদাহরণ স্বরূপ— খলিফা উমর যখন আহত হলেন তখন সুহায়েব তার কাছে এসে কাঁদতে লাগলো। এতে উমর বললেনঃ হে সুহায়েব, তুমি আমার জন্য কাঁদছে। অথচ রাসুল (সঃ) বলেছেন যে, মৃত ব্যক্তির লোকেরা । তার জন্য কান্নাকাটি করলে তার (মৃতব্যক্তির) শাস্তি হয় (বুখারী**’, ২য় খন্ড, পৃঃ ১০০১০২. নায়সাবুরী” ”, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৪১-৪৫ তিরমিয়ী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩২৭-৩২৯; নাসাঈ***, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১৮; মাযাহ’, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫০৮-৫০৯: আনাসা, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৩৪, শাকী’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ২৬৬ আশাছ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৯৪: হাম্বল”, ১ম খন্ড, পৃঃ 8 G 8.9; *iršầ**“, 8 gÍ RE, ? q-q8) | খলিফা উমরের মৃত্যুর পর আয়শা, কাঁদছিলেন। তখন তাকে উমরের বর্ণিত উক্ত হাদিস বলা হলে তিনি বললেনঃ
আল্লাহ উমরকে মাফ করুন | আত্নীয়-স্বজন কাঁদলে মৃতের শাস্তি হয় আল্লাহর নবি এমন কথা ՀI(67r| Թ | – এরপর তিনি বলেন যেখানে কুরআন বলেছে। একজনের বোঝা অন্যজন বহন করবে না। সেখানে কী করে জীবিতের কান্নার জন্য মৃত শাস্তি পেতে পারে! এরপর তিনি কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত করলেন ঃ কারো পাপের বোঝা অন্য কেউ বহন করবে না। (৬ ? ১৬৪, ১৭ ঃ ১৫, ৩৫ ? ১৮, ৩৯ ? ৭, Øම් ගී ගb) / তারপর আয়শা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বললেন যে, একদিন রাসুল (সঃ) এক ইহুদি মহিলার কবরের পাশ দিয়ে যেতে দেখেন তাঁর আত্মীয়-স্বজন তার জন্য কান্নাকাটি করছে। তখন রাসুল (সঃ) বলেছিলেন, “তার লোকেরা তার জন্য কাঁদছে। অথচ কবরে তার শাস্তি চলছে।” রাসুলের (সঃ) এ কথার অর্থ এ নয় যে, আত্মীয়স্বজনের কান্নার জন্য তার শাস্তি হচ্ছে। বরং তিনি বুঝাতে চেয়েছেন কৃতকর্মের শাস্তির জন্য আত্মীয়-স্বজনের কান্না কোন কাজে আসছে না। তৃতীয় প্রকার রাবি হলো— যারা রাসুলের (সঃ) কাছ থেকে এমন কিছু শুনেছে যা হয়ত পরবতীকালে রদ হয়ে গেছে। কিন্তু রাসুল (সঃ) কর্তৃক এহেন রদ করার বিষয়টি শোনার সৌভাগ্য এদের হয় নি বলে এরা সে বিষয়ে অনবহিত। উদাহরণ স্বরূপ-রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ কবর জেয়ারত করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু এখন তোমরা তা করতে পার (নায়সাবুরী), ৩য় খন্ড, পৃঃ ৬৫, তিরমিয়ী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৭০ আশাছ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ২১৮ ও ৩৩২: মাসাঈ’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৮৯; মাযাহ’, পৃঃ ৫০০-৫০১: আনাস, ২য় BDBS LO 00ES BBeS SD BBS e 000 LL LLDDDS DE BBSDJSgDgS DgS DDD D ৩৫০, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩৫০, ৩৫৫, ৩৫৬, ৩৫৭, ৩৫৯ ও ৩৬১; নায়াসাবুরী *, ১ম খন্ড, পৃঃ ७१8-७०१७) /
এ হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, রাসুল (সঃ) কোন এক সময়ে কবর জেয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন। এ হাদিস দ্বারা সেই নিষেধাজ্ঞা রদ করেছেন। কিন্তু যারা এ হাদিসটি শোনে নি তারা পূর্বের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী কাজ করেছে এবং সেটাই প্রচার করে বেড়াচ্ছে। চতুর্থ প্রকার রাবি হলো— যারা ন্যায়নীতি সম্পর্কে ওয়াকেফহাল এবং যাদের বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞা রয়েছে। তারা হাদিসের উপলক্ষ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবহিত এবং তারা বাতিলকৃত হাদিস ও তারস্থলে প্রতিস্থাপিত হাদিস সম্পর্কে অবহিত। তারা সাধারণ (আম) ও বিশেষ (খাস) ভাবধারা ও হাদিসের স্থান, কাল ও পাত্ৰ বিষয়ে সবিশেষ অবহিত। তারা কোন প্রকার বাড়াবাড়ি, মিথ্যা, অতিরঞ্জন ও বানোয়াট কথার ধার ধারে নি। তারা যাকিছু শুনেছে তাদের স্মৃতিতে তা অবিকল ধারণ করে রেখেছে এবং সামান্যতম পরিবর্তন ও পরিবর্ধন ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ অবিকলতা রক্ষা করে তা মানুষের কাছে বৰ্ণনা করেছে। এদের বর্ণিত হাদিসই ইসলামের অমূল্য সম্পদ এবং এ ধরনের হাদিস অনুযায়ী আমল করতেই হবে। এ ধরনের হাদিসগুলোর মধ্যে আমিরুল মোমেনিন কর্তৃক বৰ্ণিত হাদিসগুলো প্ৰধান। জ্ঞানমার্গে আমিরুল মোমেনিনের অবস্থান রাসুলের (সঃ) নিম্নের হাদিসগুলো থেকে সহজেই অনুমেয়। আমিরুল মোমেনিন, জাবির ইবনে আবদুল্লাহ, ইবনে আব্বাস ও আবদুল্লাহ ইবনে উমর থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ আমি জ্ঞানের মহানগরী এবং আলী তার দরজা । যে কেউ আমার জ্ঞান অর্জন করতে চায় তাকে অবশ্যই এ দরজার মধ্য দিয়ে আসতে হবে (নায়সাবুরী**, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১২৬-১২৭; বার’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১০২. আহীর’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২২: বাগদাদী’, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৭৭, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৩৪৮, ৭ম খন্ড, পৃঃ ১৭২; ১১শ খন্ড, পৃঃ ৪৮-৫০; জাহাবি”, ৪র্থ খন্ড, 23 Հb:
y
শাকী’, ৯ম খন্ড, পৃঃ ১১৪. আসকালানী’, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ৩২০, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৩৭;
আসকালানী, ২য় খন্ড, পৃঃ ১২২-১২৩ সুয়ুতী**’, পৃঃ ১৭০: হিন্দি৷**’. ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ১৫২, ১৫৬ ও ৪০১. হানাফী’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৬৩১: জুরাকানী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৪৩) | আমিরুল মোমেনিন ও ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেন ঃ আমি প্রজ্ঞার মহাভান্ডার এবং আলী তার দরজা । যদি কেউ প্রজ্ঞাবান হতে চায়। তবে তাকে এ দরজা দিয়েই আসতে হবে (ইসফাহানী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ৬৪. শাফী’, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৭৫; বাগদাদী’, ১১শ খন্ড, পৃঃ ২০৪: হিন্দি’, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ৪০১. শাফী’, ২য় খন্ড, უ8 აპატ)
এসব হাদিস থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় যে, রাসুলের (সঃ) জ্ঞান সাগরে পাড়ি দিয়ে তাঁর অনুকম্পা লাভ করার উপায় হচ্ছে আহলুল বাইতের মাধ্যমে প্রবাহিত ধারা অনুসরণ করা। আর মানুষ যদি তা করতো। তবে তা কতই না উত্তম হতো। কিন্তু ইতিহাসের এক বিষাদময় অধ্যায় হলো— আহলুল বাইতের শক্রগণের বর্ণিত হাদিস ক্ষমতাসীনগণ সাদরে গ্রহণ করেছে। অথচ রাবিদের নামের তালিকায় যখনই কোন আহলুল বাইতের সদস্যের নামোল্লেখ করা হয়েছে আমনি সে হাদিস বাতিল করে দেয়া হয়েছে।