দৃঢ় ও দুর্বল ইমান সম্পর্কে
কারো কারো ইমান দৃঢ় এবং হৃদয়ে তা বদ্ধমূল ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। আবার কারো কারো ইমান ক্ষণস্থায়ী হৃদয়ে তা কিছুকাল মাত্র থাকে। যদি তুমি কারো কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা! পোষণ কর তবে তার মৃত্যু পর্যন্ত তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে। কারণ নির্দোষ প্রতিপন্ন হওয়ার জন্য এটাই সময়সীমা ।
অভিবাসন (হিজরত) তার মূল অবস্থানের মতো থেকে যায়। যারা গোপনে ইমান গ্রহণ করে অথবা প্রকাশ্যে ইমানের কাজ করে, এরূপ কারো কাছে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। এ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রমাণের স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত কারো জন্য অভিবাসন (হিজরত) প্রযোজ্য হয় না। কোন ব্যক্তি আল্লাহর প্রমাণকে সত্য ও বাস্তব বলে স্বীকৃতি দান করলে সে হবে মুহাজির (অভিবাসক)। ইস্তিদ’আফ (অভিবাসনের দায়িত্ব থেকে মুক্তি) তার জন্য প্রযোজ্য হবে না। যার কাছে আল্লাহর প্রমাণ পৌছে এবং সে তা শোনে ও তার হৃদয়ে তা সংরক্ষণ করে” ।
আমাকে হারাবার আগে যা জানার জেনে নাও এবং উমাইয়াদের সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী
নিশ্চয়ই, আমাদের বিষয় জটিল ও বিপদসঙ্কুল। যার হৃদয়কে আল্লাহ ইমান দ্বারা পরীক্ষা করেছেন এমন মোমিন ব্যতীত অন্য কেউ তা ধারণ করতে পারে না। বিশ্বস্ত হৃদয় ও স্বচ্ছ বোধগম্যতাবিহীন কেউ আমাদের হাদিস সংরক্ষণ করতে পারবে না। হে লোকসকল, আমাকে হারাবার আগে যা কিছু জানার আছে জিজ্ঞেস করে জেনে নাও। নিশ্চয়ই, আমি পৃথিবীর পথ অপেক্ষা আকাশের পথের সাথে অধিক
পরিচিত এবং তৎপূর্বেই ফেতনা-ফ্যাসাদ এর পায়ের ওপর ভর দিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠবে যা মানুষকে আতঙ্কিত করবে এবং মানুষ জ্ঞান-বুদ্ধি হারা হয়ে পড়বে।
১। আমিরুল মোমেনিনের এই উক্তিগুলো হলো ‘মুহাজির’ ও ‘মুসতাদ আফ’ শব্দদ্বয়ের ব্যাখ্যা। পবিত্ৰ কুরআনে বর্ণিত হয়েছেঃ নিশ্চয়ই যারা আপন নফসের ওপর জুলুম করে তাদের মৃত্যুদানকালে ফেরেশতাগণ বলে, “তোমরা কী অবস্থায় ছিলো?” তারা বলে, “আমরা পৃথিবীতে দুর্বল ও অসহায় ছিলাম।” তারা (ফেরেশতাগণ) বলে, “আল্লাহর পৃথিবী কি প্রশস্ত ছিল না, যাতে তোমরা হিজরত করতে পারতে?” সুতরাং এরূপ লোকের অবস্থানস্থল হলো জাহান্নাম এবং তা কত মন্দ আশ্রয়স্থল ৷ তবে যেসব দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশু কোন উপায় অবলম্বন করতে পারে না। এবং কোন হেদায়েত পায় না, আল্লাহ হয়ত তাদেরকে ক্ষমা করবেন, কারণ আল্লাহ ; পাপমোচনকারী ও ক্ষমাশীল (৪ : ৯৭-৯৯) / আমিরুল মোমেনিন। এখানে বুঝাতে চেয়েছেন যে, হিজরত শুধুমাত্র রাসুলের (সঃ) জীবৎকালেই বাধ্যতামূলক কাজ নয়—বরং এটা একটা স্থায়ী বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া। এ হিজরত বর্তমানে আল্লাহর প্রমাণ এবং সত্য দ্বিনের জন্যও বাধ্যতামূলক। সুতরাং যে ব্যক্তি মুশরিকদের মাঝে থেকেও আল্লাহর প্রমাণ অর্জন করতে পারে এবং তাতে ইমান রাখতে পারে তার জন্য হিজরত বাধ্যতামূলক নয়। মুসতাদ আফ (দুর্বল ও অসহায়) সেই ব্যক্তি যে অবিশ্বাসীদের মাঝে বসবাস করছে এবং আল্লাহর প্রমাণ সম্বন্ধে অবহিত হওয়ার কোন সুযোগ নেই, আবার আল্লাহর প্রমাণ লাভ করার জন্য হিজরত করতেও অসমর্থ।
২। কেউ কেউ ব্যাখ্যা করেছেন যে, আমিরুল মোমেনিন ‘আকাশের পথ’ বলতে দ্বিনের বিধান ও মিনহাজ
এবং ‘পৃথিবীর পথ’ বলতে দুনিয়ার কর্মকান্ড বুঝিয়েছেন। বাহারানী’ (৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২০০-২০১) লেখেছেন ঃ আল্লামা আল-ওয়াবারীর বর্ননায় জানা যায় ফে— আমিরুল মোমেনিনের উক্তির অর্থ হলো তার জ্ঞানের পরিধি দুনিয়ার বিষয় অপেক্ষা দ্বিনের বিষয়ে অধিক ।
মূল বিষয়টি বিবেচনা করলে বাহারানীর উপযুক্ত ব্যাখ্যা সঠিক বলে গ্রহণ করা যায় না। কারণ “আমাকে হারাবার আগেই যা জানতে চাও জিজ্ঞেস কর”—এ কথার কারণ হিসাবে ব্যাখ্যাধীন বাক্যটি লেখা হয়েছে। অথচ আমিরুল মোমেনিন তাঁর এ উক্তির পরেই ফেতনা ও বিদ্রোহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এ দুটি বাক্যের মধ্যে “আমি দুনিয়া অপেক্ষা দ্বিনের বিষয় বেশি জানি”- উক্তিটি গুরুত্বহীন। আবার কারো কারো মতে ভবিষ্যদ্বাণী বিষয়ে অধিক গুরুত্ব প্ৰদান করার জন্য এ উক্তিটি করা হয়েছে। কারণ সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করা সচরাচর মানুষের সাধ্যাতীত। তদুপরি, আমিরুল মোমেনিনের চ্যালেঞ্জে স্পষ্টত বলা হয়েছে যে, যা কিছু মানুষ জানতে চায় তা যেন জিজ্ঞেস করে। এ কথার অর্থ এমন হতে পারে না যে, তিনি শুধু দ্বিনের বিধি-বিধান জেনে নেয়ার আহবান করেছিলেন। তার চ্যালেঞ্জে মানুষের দুঃসাধ্য ভবিষ্যৎ বিষয়াবলী জিজ্ঞেস করতেও বারণ করেন নি। বরং সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে “আকাশের পথ” শব্দ দ্বারা। বিদ্রোহের উত্থান সম্পর্কে তার ভবিষ্যদ্বাণী দ্বিনের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। কাজেই একথা শুধু দ্বিনের জ্ঞানের প্রমাণ বহন করে না। শব্দের স্পষ্টভাবে উপেক্ষা করে মনগড়া ব্যাখ্যা দ্বারা সঠিক ভাবধারা তুলে ধরা যায় না। প্রকৃতপক্ষে আমিরুল মোমেনিন উমাইয়া-ফেতনার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, “তোমাদের যা ইচ্ছে হয় আমাকে জিজ্ঞেস কর; কারণ, আমি দুনিয়ার পথ অপেক্ষা ঐশী নিয়তির পথ অধিক জানি। সুতরাং যদি তোমরা আমাকে স্মৃতিফলকে নির্ধারিত নিয়তির বিষয়েও জিজ্ঞেস কর আমি তোমাদেরকে তা বলে দিতে পারি। এমনকি যেসব বিষয়ে আমার বিরুদ্ধে মারাত্মক ষড়যন্ত্র মাথাচাড়া দিতে যাচ্ছে, অথচ তোমরা সে বিষয়ে সন্দিহান, তাও আমি বলে দিতে পারি। কারণ আমার চোখ সেই স্বগীয় দিকের সাথে বেশি পরিচিত যা ঘটনা প্রবাহ ও ফেতনার প্রতি দৃষ্টি রাখে এবং পৃথিবীতে বিরাজমান জীবনসমূহের প্রতি তত বেশি দৃষ্টি রাখে না। এই ফেতনা এত নিশ্চিত যেন চোখের সামনে উপস্থিত কোন বস্তু। তোমরা আমাকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জিজ্ঞেস করতে পার এবং সময় হলে কী উপায়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা গড়ে তুলে ফেতনা হতে নিরাপদ থাকতে পারবে তাও জেনে নিতে পারে।” হাদীদ’ (খণ্ড-১৩, পৃঃ ১০৬) মন্তব্য করেছেন
আমিরুল মোমেনিনের এ দাবির সমর্থন মিলে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীগুলোতে যা তিনি একবার নন, শতবার নন, প্রতিনিয়ত একের পর এক বলে গেছেন । এতে কোন সন্দেহ থাকে না যে, তিনি যা বলেছিলেন তা জ্ঞানের ভিত্তিতে নিশ্চিত জেনেই বলেছেন—সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে বলেন নি ।
আমিরুল মোমেনিনের ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কে খোৎবা-৯২ এর টীকা-২ এ কিছুটা বৰ্ণনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আরো অধিক জানতে হলে হাদীদ’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪৭-৫১ এবং মারআশী’, ৮ম খন্ড, পৃঃ ৮৭-১৮২ দেখার
সুপারিশ করা গেল।