আয়শার বিদ্বেষ ও বসরার জনগণের প্রতি সতর্কবাণী বর্তমান সময়ে যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি দৃঢ়ভাবে আসক্ত থাকতে পারে তার তা করা উচিত। যদি তোমরা আমাকে অনুসরণ কর তবে, ইনশাল্লাহ, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করবো যদিও সে পথ দুঃখ-কষ্ট ও তিক্ততায় পরিপূর্ণ। একজন বিশেষ মহিলা” সম্পর্কে বলছি, সে তার নারীসুলভ অভিমতের আওতাধীন এবং কামারের চুল্লির মতো তার বুকে বিদ্বেষের আগুন জুলছে। সে আমার প্রতি যেরূপ ব্যবহার করছে, অন্যদের প্রতি সেরাপ ব্যবহার করতে বলা হলে কখনো তা করবে না । আমার দিক থেকে। এরপরও সে যথার্থ সম্মান এ পথ আলোক বিশিষ্ট এবং উজ্জ্বলতম বাতি। আমলে সালেহার দিকে হেদায়েত ইমানের মাধ্যমে অনুসন্ধান করতে হয়; অপরপক্ষে ইমানের দিকে হেদায়েত আমলে সালেহার মাধ্যমে লাভ করতে হয়। ইমানের মাধ্যমে জ্ঞানের উন্নতি সাধন হয় এবং জ্ঞানের কারণেই মৃত্যুকে ভয় করা হয়। মৃত্যুর সাথে এ দুনিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে, অপরপক্ষে এ দুনিয়ায় আমলে সালেহার দ্বারা পরকাল নিরাপদ হয়। কেয়ামত থেকে মানুষের কোন নিস্কৃতি নেই। তারা এই শেষ পরিণতির দিকে নির্ধারিত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা তাদের কবরের বিশ্রামস্থল থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে এবং চূড়ান্ত পরিণতির দিকে যাত্রা করেছে। প্ৰত্যেক ঘরেরই নিজস্ব লোক আছে। সেখানে তাদের কোন পরিবর্তন হয় না এবং সেখান থেকে তারা স্থানান্তরিত হয় না। ন্যায়ের প্রতিপালন ও অন্যায়ের প্রতিরোধ করার জন্য আদেশ দান মহিমান্বিত আল্লাহর দুটি বৈশিষ্ট্য। তারা মৃত্যুকে নিকটবতী করে আনতে পারে না এবং জীবনােপকরণও কমাতে পারে না । আল্লাহর কিতাবকে মান্য করা তোমাদের উচিত কারণ এটা একটা অতি শক্ত রশি, সুস্পষ্ট আলো, উপকারী চিকিৎসা, তৃষ্ণা নিবারক, মান্যকারীদের জন্য রক্ষাবর্ম এবং আসক্তদের জন্য মুক্তি। এটা কাউকে বক্র করে না যাকে সোজা করার প্রয়োজন হতে পারে এবং কাউকে দূষিত করে না যাকে পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজন হতে পারে। এর পুনরাবৃত্তি ও কানে প্রবেশ করার পৌনঃপুনিকতা একে পুরাতন করে না। যে কেউ কিতাব অনুযায়ী কথা বলে সে সত্য বলে এবং যে কেউ কিতাব অনুযায়ী আমল করে সো (আমলে) অগ্রণী। একজন লোক দাঁড়িয়ে বললো, “হে আমিরুল মোমেনিন, এ গোলযোগ সম্পর্কে আমাদের বলুন এবং আপনি এ বিষয়ে রাসুলকে (সঃ) কিছু জিজ্ঞেস করেছিলেন। কিনা।” আমিরুল মোমেনিন বললেন, যখন মহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াত নাজেল করলেনঃ আলিফ-লাম-মীম মানুষ কি মনে করে যে, “আমরা বিশ্বাস স্থাপন করলাম” এ কথা বলার ওপরে (তাদেরকে) ছেড়ে দেয়া হবে এবং তারা পরীক্ষিত হবে না? (কুরআন-) তখন আমি জানতে পেরেছিলাম যে, যতদিন রাসুল (সঃ) আমাদের মাঝে থাকবেন ততদিন আমাদের ওপর কোন ফেতনা, আপতিত হবে না ।
সুতরাং আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসুল, সেই ফেতনাটা কী যা মহামহিম আল্লাহ আপনাকে জানিয়েছেন?” উত্তরে তিনি বললেন, “ওহে আলী, আমার লোকেরা আমার পরে ফেতনা সৃষ্টি করবে” । আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, ওহুদের দিনে অনেক লোক শহিদ হয়েছিল। আমি শহিদ হই নি বলে বড় অস্বস্তি অনুভূত হয়েছিল। তখন কি আপনি আমাকে বলেন নি “খুশি হও, এরপর তুমিও শাহাদত বরণ করবে?” রাসুল (সঃ) প্রত্যুত্তরে বললেন, “হাঁ, বলেছি, কিন্তু বর্তমানে তোমার সহ্য শক্তির কী হয়েছে।” আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, এটা ধৈর্যের উপলক্ষ নয়, এখন আনন্দ করা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উপলক্ষ।”
তখন তিনি বললেন, “ওহে আলী, মানুষ তাদের সম্পদের মাধ্যমে ফেতনায় পতিত হবে, বিশ্বাসের কারণে আল্লাহর প্রতি দায়িত্ব প্রদর্শন করবে, তার দয়া প্রত্যাশা করবে, তার রোষ থেকে নিরাপদ মনে করবে এবং মিথ্যা সংশয় উত্থাপন করে ও গোমরাহ কামনা-বাসনা দ্বারা হারাম বিষয়কে হালাল মনে করবে। তারা মদকে যবের পানি বলে হালাল করে নেবে, ঘুষকে দান বলে হালাল করে নেবে, সুন্দকে বিক্রয় বলে হালাল করে নেবে।” আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসুল, সে সময়ে তাদের সাথে আমার কেমন ব্যবহার করা উচিত হবে।— আমি তাদের উৎপথগামিতার দিকে ফিরে যেতে দেব- নাকি রুখে
দাঁড়াবো?” তিনি বললেন, “রুখে দাড়াবে।”
১ । একথা অস্বীকার করার কোন জো নেই যে, আমিরুল মোমেনিনের প্রতি আয়শার আচরণ সর্বদা শত্রুভাবাপন্ন ছিল। প্রায়শই তার মনের এ কালিমা তার মুখে প্রকাশ হয়ে পড়তো এবং তার ঘূণা ও বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে ওঠতো। কোন কারণে তার সামনে কেউ আমিরুল মোমেনিনের নাম নিলে তিনি কপাল কুঞ্চিত করতেন এবং আমিরুল মোমেনিনের নাম নেয়ার স্বাদ তার জিহবা কখনো গ্রহণ করে নি। উদাহরণ স্বরূপ, উবায়দুল্লাহ ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে উতবাহ আয়শার বরাত সূত্র উল্লেখপূর্বক আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে বলেছেন, “রাসুল (সঃ) মৃত্যুশয্যায় থাকাকালে আল-ফজল ইবনে আব্বাস ও অন্য এক ব্যক্তির কাধে ভর দিয়ে তার (আয়শার) ঘরে গিয়েছিলেন।” আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বললেন, “অন্য লোকটি কে তা কি আপনি জানেন?” জবাবে বিরোধিতা করে।” (হাম্বল”, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ৩৪ ও ২২৮; সাদ^৩৭, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৯; তাবারী৭৫, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৮০০-১৮০১; বালাজুরী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৪৪-৫৪৫; শ্যাফেয়ী***, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৯৬) আমিরুল মোমেনিনের প্রতি আয়শার এমন ঘৃণা ও বিদ্বেষের একটা কারণ হলো হজরত ফাতিমার মর্যাদা ও
সুনাম আয়শার হৃদয়ে কাটার মতো বিধতো। রাসুলের (সঃ) অন্যান্য স্ত্রীদের প্রতি চরম ঈর্ষার ফলে অন্য একজন স্ত্রীর কন্যাকে রাসুল (সঃ) ভালোবাসেন এটা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। তদুপরি ফাতিমার প্রতি রাসুলের (সঃ) ভালোবাসা এত অধিক মাত্রায় ছিল যে, তার আগমনের জন্য রাসুল (সঃ) দাঁড়িয়ে থাকতেন, নিজের বসার স্থানে তাকে বসাতেন। নারী জাতির মধ্যে তাকে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাশালিনী ঘোষণা করেছেন এবং তার সন্তানদের সর্বাপেক্ষা বেশি ভালোবাসতেন। এসব কিছু আয়শার মর্মপীড়ার কারণ ছিল এবং স্বভাবতই তার মনে হতো যদি তার সন্তান থাকতো তবে তারা রাসুলের (সঃ) পুত্র হতো এবং ইমাম হাসান ও হুসাইনের পরিবর্তে তারা রাসুলের (সঃ) ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হতো। কিন্তু তার কোন সন্তান ছিল না এবং তাই তিনি তার মা হবার বাসনা চরিতাৰ্থ করার জন্য তার বোনের ছেলের নামানুসারে উন্মে আবদিল্লাহ ডাকনাম গ্ৰহণ করেছিলেন। মোট কথা এ সবকিছু মিলিয়ে তার হৃদয়ে একটা ঈর্ষাগ্নি প্ৰজ্বলিত ছিল যার ফলশ্রুতিতে তিনি যখন তখন ফাতিমার বিরুদ্ধে রাসুলের (সঃ) কাছে অভিযোগ করতেন। কিন্তু ফাতিমার প্রতি রাসুলের (সঃ) সুনজর এতটুকুও কমাতে পারেন নি। তার এ মর্মাঘাত ও বিচ্ছেদের খবর আবু বকরের কানেও পৌছেছিল। এতে কন্যার প্রতি মৌখিক সান্তুনা ছাড়া আবু বকরের করণীয় কিছু ছিল না বলে তিনি এ বিষয়ে নিজেই উত্তেজিত ছিলেন। অবশেষে রাসুলের (সঃ) ওফাতের পর সরকারের ক্ষমতা তার হাতে গেল। ফলে তার মনের ঝাল মিটিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ হয়ে গেল। প্রথমেই তিনি ফাতিমাকে উত্তরাধিকারিত্ব থেকে বঞ্চিত করার জন্য ঘোষণা করলেন যে, নবিদের কোন ওয়ারিশ থাকে না এবং তারাও কারো ওয়ারিশ নন। এই ঘোষণা বলে তিনি রাসুলের (সঃ) পরিত্যক্ত সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ব করলেন। এতে ফাতিমা নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হলেন। এ দুঃখে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কোনদিন আবু বকরের সাথে কথা বলেন নি। ফাতিমার মর্মান্তিক মৃত্যুতে আয়শা কোনদিন একটুখানি দুঃখও প্রকাশ করেন নি। এমন কি তিনি কোনদিন একটু দেখতেও যান নি। হাদীদ(৯ম খন্ড, পৃঃ ১৯৮) লিখেছে ?
যখন ফাতিমার মৃত্যু হলো তখন আয়শা ব্যতীত রাসুলের (সঃ) সকল স্ত্রী বানি হাশিমকে সাত্ত্বিনা দেয়ার জন্য এসেছিল । তিনি নিজেকে অসুস্থ বলে দেখিয়েছিলেন । কিন্তু তার কথাবার্তা আলীর কানো পৌছেছিল যাতে বুঝা গিয়েছিল যে তিনি আনন্দ প্ৰকাশ করেছিলেন । যেখানে ফাতিমার প্রতি আয়শা এহেন বিদ্বেষ পোষণ করতেন, সেখানে তিনি ফাতিমার স্বামীর প্রতি একই বিদ্বেষ ও শক্রতা পোষণ করবেন। এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে “ইফক”*-এর ঘটনায় আমিরুল মোমেনিন নাকি রাসুলকে (সঃ) বলেছিলেন, “সে আপনার জুতার ফিতা অপেক্ষা অধিক কিছু নয়, তাকে তালাক দিয়ে বিদায় করুন।” একথা শুনার পর থেকে আমিরুল মোমেনিনের প্রতি আয়শার ঘূণা ও বিদ্বেষ চরম রূপ লাভ করেছিলো। এ ছাড়াও অনেক সময় আবু বকরের উর্ধের্ব আমিরুল মোমেনিনকে মযাদা দেয়া হয়েছিল এবং আবু বকরের উপস্থিতিতেই আমিরুল মোমেনিনের প্রসংশাসূচক উক্তি করা হয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ, সুরা বারা আহ (তওবা)** নাজিল হওয়ার পর আবু বকরকে হজযাত্রীদের নেতৃত্ব থেকে ফিরিয়ে এনে তার স্থলে আমিরুল মোমেনিনকে প্রেরণ করা হয়েছিল। আবু বকরকে বলে দিয়েছেন যে, হয় রাসুল (সঃ) নিজে না হয় তার পরিবারের কাউকে দিয়ে তা প্রেরণ করার জন্য রাসুল (সঃ) আল্লাহ্ কর্তৃক আদিষ্ট হয়েছেন। নেতৃত্ব থেকে বাদ দেয়ার কারণে তিনি আলীর প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। একইভাবে আবু বকরসহ সকলের ঘরের যে দরজা মসজিদের দিকে ছিল তা রাসুল (সঃ) বন্ধ করিয়ে ছিলেন। কিন্তু আলীর সেই দরজা খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আয়শা তার পিতার ওপরে আলীকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করা সহ্য করতে পারতেন না। তাই কখনো এমন বিশেষ উপলক্ষ হলেই তিনি তা পন্ড করার জন্য আপ্ৰাণ চেষ্টা করতেন। জীবন সায়াহ্নে রাসুল (সঃ) উসামাহ ইবনে জায়েদের নেতৃত্বে (সিরিয়া অঞ্চলের উপদ্রব প্রশমনের জন্য) সৈন্য বাহিনীকে অগ্রবতী হতে আদেশ দিয়েছিলেন এবং আবু বকর ও উমরকে উসামাহর নেতৃত্বাধীনে অভিযানে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তারা রাসুলের (সঃ) স্ত্রীদের কাছ থেকে খবর পেয়েছিল যে, তাঁর অবস্থা বিশেষ ভালো নয়- আর অগ্রবর্তী না হয়ে তারা যেন ফিরে আসে। উসামাহর অধিনস্থ বাহিনী এ সংবাদ পাওয়া মাত্র ফেরত এসেছিল। রাসুল (সঃ) এ কথা জানতে পেরে পুনরায় যাত্রা করার জন্য উসামাহকে নির্দেশ দিলেন এবং একথাও বললেন, “যে ব্যক্তি বাহিনী থেকে সরে যাবে তার ওপর আল্লাহর ল্যানত।” ফলে তারা আবার যাত্রা করলো কিন্তু রাসুলের অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে খবর দিয়ে আবার তাদেরকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। উসামাহর বাহিনী মদিনার বাইরে যায় নি। কারণ তারা যেতে চায় নি। তাদের দূরদর্শিতায় তারা মনে করেছিল যে, আনসার ও মুহাজিরগণকে মদিনার বাইরে এ কারণে প্রেরণ করা হচ্ছে যাতে রাসুলের পরে আলীর খেলাফত লাভে কোন প্রকার বেগ পেতে না হয়। এরপর বিলালের মাধ্যমে সালাতে ইমামতি করার জন্য আবু বকরকে বলা হয়েছিল। তিনি ইমামতিকে খেলাফত পাওয়ার দাবি হিসাবে দাঁড় করেছিলেন। এরপর বিষয়গুলো এমন ঘুরপাক খেয়েছিলো যে, আমিরুল মোমেনিন খেলাফত থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তৃতীয় খলিফার রাজত্বের পর অবস্থা এমনভাবে মােড় নিয়েছিল যে, মানুষ আমিরুল মোমেনিনের হাতে বায়াত গ্রহণের জন্য পাগল হয়ে পড়লো। এ সময় আয়শা মক্কায় ছিলেন। যখন তিনি আলীর খেলাফতের কথা জানতে পারলেন তখন তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে পড়তে লাগলো। ঈর্ষা ও ক্ৰোধ তাকে এমনভাবে অস্থির করে তুললো যে, উসমানের রক্তের বদলার ছুতায় তিনি আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে সশরীরে যুদ্ধ ক্ষেত্রে পর্যন্ত সৈন্য পরিচালনা করেছিলেন। অথচ উসমান নিহত হবার কিছু দিন আগেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন। যে, উসমান কতল হবার উপযুক্ত। যা হোক, আয়শার বিদ্রোহের ফলে এত রক্তপাত হয়েছিল যে, সমগ্র বসরা রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল এবং অনৈক্য ও ফেতনার দরজা চিরতরে খুলে গেল। * ইফাকের ঘটনা আলীর বিরুদ্ধবাদীরা আয়শাকে যেভাবে শুনিয়েছিল। এখানে সেভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম থেকেই যারা আলীর বিরোধিতা করতো তারা আয়শাকে অসত্য ও বিভ্রান্তকর কথা শুনিয়ে তার মন বিষিয়ে তুলেছিল এবং আলীর প্রতি তার ঘূণা ও বিদ্বেষের মূল কারণ এসব মিথ্যা প্রচারণা। এ কথার অর্থ এ নয় যে, এসব মিথ্যা প্রচারণা না করলে তিনি আলীকে ভালোবাসতেন বা তার বায়াত গ্ৰহণ করতেন। আলীকে অপছন্দ করার শত কারণ রয়েছে—কিছু নারীসুলভ, কিছু পৈতৃক ও কিছু গোত্রীয়। তবু একুটু বলা যায় আলীবিরোধীদের মিথ্যা প্রচারণা ও প্ররোচনা না থাকলে আয়শা জঙ্গে জামালের মতো অন্যায়কাজে অবতীর্ণ হতেন না;
আলীর প্রতি তার ঘূণা ও বিদ্বেষ ব্যক্তি পর্যায়ে থাকতো। যা হোক, ইফাকের প্রকৃত ঘটনা হলো— রাসুলের (সঃ) নিকট যখন সংবাদ পৌছে যে, মক্কার নিকটবতী বনি-মুস্তালিক গোত্র কুরাইশদের সহায়তায় হারেস ইবনে সিরাবের নেতৃত্বে মদিনা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তখন রাসুল (সঃ) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করলেন। এ যুদ্ধে রাসুলের (সঃ) স্ত্রী আয়শা তাঁর সফরসঙ্গিনী ছিলেন। আয়শা একটা পৃথক উটে চড়ে গিয়েছিলেন। পঞ্চম হিজরি সনের ২ শাবান (মতান্তরে ৬ষ্ঠ হিজরি সনের শাবান মাস মোতাবেক ৬২৭ খৃষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাস) বনি-মুস্তালিকে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এ যুদ্ধে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে। যুদ্ধ শেষে রাসুল (সঃ) মদীনা অভিমুখে যাত্রা করেন। পথিমধ্যে এক স্থানে সৈন্যবাহিনীসহ রাত্রি যাপন করেন। ভোরবেলায় কাফেলা তাড়াহুড়া করে পুনঃযাত্রার ব্যবস্থা করে। এদিকে আয়শা তার শিবিকা থেকে বের হয়ে প্রাকৃতিক ডাকে একটু দূরে গিয়েছিলেন। কাজ শেষ করে শিবিকার কাছাকাছি এসেই দেখতে পেলেন যে, তার গলার হারটি খোয়া গেছে। তিনি পুনরায় হার খুঁজতে চলে যান। কাফেলার লোকজন মনে করেছে যে, তিনি শিবিকার মধ্যেই বসে আছেন এবং তারা শিবিকা উটের পিঠে বসিয়ে দিল। কাফেলা যাত্রা শুরু করে সে স্থান থেকে চলে গেল। হার খুঁজতে গিয়ে আয়শা তা পেয়ে গেলেন। তিনি তাড়াতাড়ি ফিরে এসে দেখেন যে, কাফেলা সে স্থান ত্যাগ করে চলে গেছে। ভয়ে তিনি জড়সড় হয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন পথিমধ্যে কোথাও শিবিকা শূন্য ধরা পড়লে তাকে খুঁজতে লোকেরা সেখানেই আসবে। তাই তিনি চাদরাবৃত হয়ে সেখানে শুয়ে রইলেন। রাসুলের (সঃ) নিয়ম ছিল যে, কোথাও কাফেলা অবস্থান করলে সেই স্থান ত্যাগের পর একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত লোক তল্লাশি করে দেখতো কেউ কোন কিছু ফেলে গেল। কিনা এবং তল্লাশি শেষ করে সে কাফেলাকে অনুসরণ করতো। এই কাফেলার তল্লাশি কাজে নিয়োজিত ছিল সাহাবি সাফওয়ান ইবনে মুআত্তাল আসূসুলামী। তিনি তার দায়িত্ব অনুযায়ী তল্লাশি করতে গিয়ে আয়শাকে দেখে চমকে উঠলেন এবং ঘটনা অবগত হয়ে তার উটে আয়শাকে বসিয়ে নিজে উটের দড়ি ধরে হেঁটে যাত্রা করলেন। রাসুলের (সঃ) কাফেলা মদিনা পৌছার চার দিন পর আয়শাকে নিয়ে সাফওয়ান মদিনা পৌছেন। এ দুর্ঘটনার পর মদিনার মােনাফেকগণ সাফওয়ানকে কেন্দ্র করে আয়শার চরিত্রে কালিমা লেপন করে নানা কুকথা প্রচার করতে থাকে। এদের মধ্যে মূখ্য ভূমিকায় ছিল মোনাফেক। সর্দার আবদুল্লাহ্ ইবনে উবাই, আবু বকরের অনুগ্রহে লালিত ভাগিনা মেসন্তাহ ইবনে উছাছাহ, রাসুলের (সঃ) স্ত্রী জয়নবের ভগিনী হাসনা বিনতে জাহাশ ও রাসুলের (সঃ) কবি হাসান বিন সাবেত। এদের কানাকানি ও কুৎসা-রটনা রাসুলের (সঃ) কানে গেলে। তিনি খুবই মর্মাহত হলেন। এক পর্যায়ে আয়শাও বিষয়টি জেনেছেন। তিনি লজ্জায় ও ক্ষোভে-দুঃখে মিীয়মান হয়ে একেবারে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এমনকি একদিন কুপে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেছিলেন। অবশেষে পিতা আবু বকরের বাড়িতে চলে গেলেন। রাসুল (সঃ) আয়শাকে যেমন বিশ্বাস করতেন সাফওয়ানের প্রতিও তাঁর তেমনি আস্থা ছিল। কিন্তু কোন কিছুতেই মোনাফেকগণের কানাঘুষা বন্ধ হচ্ছিলো না দেখে রাসুল (সঃ) উমর, উসমান ও আলীকে ডেকে এ বিষয়ে তাদের মতামত চাইলেন। উমর ও উসমান একবাক্যে বলে দিলেন “ইহা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা।” আলীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি শুধু “মিথ্যা” বলেন নি। তিনি তাঁর স্বাভাবিক প্রজ্ঞা ও বিচারবুদ্ধি দ্বারা বিষয়টির ব্যাখ্যা ও যুক্তিসহ তার মতামত প্ৰদান করেন। এ বিষয়ে তার মতামত বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিভিন্নভাবে লেখেছেন। সেগুলো মোটামুটি নিম্নরূপ ঃ (ক) আলী বললেন, “এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা রটনা। হে আল্লাহর রাসুল (সঃ), আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে একদিন সালাত আদায়কালে আপনি এক পায়ের জুতা খুলে ফেলেছিলেন। সালাত শেষে এ বিষয়ে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হলে আপনি বলেছিলেন ওই জুতায় কিছু নোংরা জিনিস লেগেছিল বলে তা খুলে ফেলার জন্য জিব্রাইল মারফত খবর দেয়া হয়েছিল। সামান্য একটু নোংরা বস্তু থেকে আপনাকে পবিত্র রাখার ব্যাপারে। যেখানে আল্লাহ এতটা সজাগ সেখানে এতবড় একটা বিষয় সত্য হলে আল্লাহ চুপ করে থাকবেন এটা কিছুতেই হতে পারে না।”
(খ) আলী বললেন, “হে আল্লাহর রাসুল, ব্যাপারটা আমার বিশ্বাস হয় না। তবুও আপনি আয়শার বাদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখতে পারেন। সে হয়ত সঠিক তথ্য বলে দেবে ।” (গ) আলী মন্তব্য করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল, আয়শা ব্যতীত কি আর কোন নারী নেই? আপনি এত উদ্বিগ্ন হয়েছেন কেন? আয়শাকে পরিবর্তন করতে তো আপনি সক্ষম।” আমিরুল মোমেনিন সম্পর্কে যাদের সামান্যতম জ্ঞান আছে তারা কখনো তৃতীয় মন্তব্যটি মেনে নেবেন না। আলীর মতো মহান চরিত্রের অধিকারী একজন প্রাজ্ঞ মোনাফেকগণের কুৎসা-রটনার বিষয়ে এমন কুৎসিত মন্তব্য করতে পারেন না। অথচ আলী-বিদ্বেষীগণ আয়শাকে এই কুৎসিত মন্ত্যব্যটি শুনিয়েছিলেন যা তিনি যাচাই-বাছাই না করে বিশ্বাস করেছিলেন এবং আলীর বিরুদ্ধে সারাজীবন বিদ্বেষ পোষণ করেছিলেন। উসমানের রক্তের বদলার ছদ্মাবরণে জঙ্গে জামালে আয়শার অবতীর্ণ হবার এটা অন্যতম কারণও বটে। যাহোক, একমাস পর্যন্ত আয়শা এহেন কুৎসা রটনার জন্য নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণায় কাতর হবার পর আল্লাহ সুরা নূরে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিলে রাসুল (সঃ) আয়শাকে তার পিতৃগৃহ থেকে নিয়ে আসেন এবং তিনি মানসিক শান্তি লাভ করেন। এই বিষয়ে আরো অধিক জানার জন্য গোলাম মোস্তফার বিশ্ব নবী (পৃঃ ২৪৭-২৫৯), আবদুল হামীদ আল খতিবের মহানবী (পৃঃ ১৬৯-১৭৫), সাদেক শিবলী জামানের হজরত আলী (পৃঃ ১০৪১১১) এবং যে কোন তফসির গ্রন্থের সুরা নূরের শানে নাজুল দ্রষ্টব্য—বাংলা অনুবাদক ** সুরা বারাআহ (সুরা তওবা) নাজিলের ফলে আবু বকরকে আমিরে হজ থেকে বাদ দেয়ার ঘটনাটি হলো— অষ্টম হিজরির রমজান মাসে মক্কা বিজয়ের পর জেলহজ মাসে মোশরেকদের তত্ত্বাবধানে পূর্বে প্রচলিত তাদের নিয়মানুযায়ী হজের আরকান সমাধা করা হয়েছিল। মুসলিমগণ মক্কার আমীর আত্তাব ইবনে উমাদের সাথে হজ। সম্পন্ন করে। নবম হিজরির দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই এ বছরের হাজ সম্পর্কে রাসুল (সঃ) চিন্তিত হয়ে পড়েন। পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে তিনি সারাজীবন সংগ্রাম করে গেলেন। এখন হজের সময় তার সামনেই পৌত্তলিকতার অস্তিত্ব তিনি কিভাবে বরাদাশত করবেন। অপরপক্ষে, তাদেরকে নিষেধ করাও একটা জটিল সমস্যা । কারণ(ক) ইতিপূর্বে কাবা জিয়ারতে আগত কাউকে নিষেধ না করার সাধারণ নীতি তাঁর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল; (খ) বেশ ক’টি আরব গোত্রের সাথে তার চুক্তি বলবৎ ছিল যে, আশাহুরে হারামে (নিষিদ্ধ মাসে) কাউকে ভীতি প্ৰদৰ্শন করা হবে না; (গ) রাসুলের (সঃ) পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের বাক স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করে শরিয়তের নীতিমালা প্রচার করা হয়েছিল। এসব চিন্তা করে নবম হিজরির হাজ সম্পাদন করা রাসুলের (সঃ) পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই তিনি জিলকদ মাসের শেষ দিকে আবু বকরকে আমিরুল হজ নিয়োগ করে তিনশত মুসলিমকে হাজ সম্পাদনের জন্য প্রেরণ করেন যাতে তারা রাসুল কর্তৃক মনোনীত হজের নিয়ম-কানুন বিবৃত করে। আবু বকর মুসলিমদের নিয়ে মদিনা ত্যাগের পর সুরা বারাআহ (তওবা) এর ১-৪০ আয়াত নাজিল হয় এবং এতে কাবাগৃহে পৌত্তলিকদের প্রবেশ দিলে তিনি হজের সময় তা জনগণকে জানিয়ে দিতে পারবেন। এতে রাসুল (সঃ) বললেন, “না, তা হতে পারে না। এটা আমার পক্ষ থেকে এমন একজন ঘোষণা করতে পারে যার যোগ্যতা ও অধিকার আছে—আর সে হলো আলী”। তারপর রাসুল (সঃ) একটা নির্দেশনামা লেখিয়ে তাঁর নিজের দ্রুতগামী উগ্ৰী ‘আজবা” (মতান্তরে কুসওয়া) তে আরোহণ করিয়ে আলীকে মক্কা অভিমুখে প্রেরণ করলেন। আলী মদিনা থেকে মক্কার পথে আজু নামক স্থানে আবু বকরের সাথে মিলিত হলেন। ঠিক প্রত্যুষে আলীকে হঠাৎ সেখানে উপস্থিত দেখে আবু বকর জিজ্ঞেস করলেন, “কী হে আলী, তোমার এ আগমন কি আমীর হিসাবে নাকি মামুর (অনুসারী) হিসাবে?” প্রত্যুত্তরে আলী বললেন, “আমির হিসাবে। রাসুলের (সঃ) আপনজনদের মধ্য থেকে যোগ্য ও অধিকার প্রাপ্তকে আমিরের দায়িত্ব অৰ্পন করতে তিনি আদিষ্ট হয়েছেন।” এরপর আবু বকর আলীর নেতৃত্বাধীনে হাজ সমাপন করেন। (কারো কারো মতে আবু বকর আজু থেকে মদিনায় ফিরে আসেন। আবার কারো কারে মতে উভয়ের যুগ নেতৃত্বে হজ সমাপন হয়েছিল)। যাহোক, হজ শেষে সমবেত জনমান্ডলীর সামনে দাঁড়িয়ে আলী সুললিত কণ্ঠে সুরা বারা আহর (তওবার) ১ থেকে ৪০ আয়াত আবৃত্তি করে শুনালেন এবং তারপর বজকণ্ঠে রাসুলের (সঃ) নির্দেশনামা ঘোষণা করলেন। নির্দেশগুলো হলো(১) মুমিন ছাড়া কেউ জান্নাতে যাবে না; (২) এখন থেকে কোন পৌত্তলিক কাবাগৃহে হজ করতে পারবে না এবং কাবাগৃহে প্রবেশ তাদের জন্য নিষিদ্ধ করা হলো: (৩) উলঙ্গাবস্থায় কাবা তাওয়াফ করা চলবে না; (৪) মোশরিকগণ চার মাসের মধ্যে আপন আপনি স্থানে গমন করবে। এরপর তাদের সাথে মুসলিমদের কোন সম্পর্ক থাকবে না; (৫) আল্লাহর রাসুলের (সঃ) সাথে যার যে চুক্তি হয়েছে তা নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এ সময় সমবেত মোশরিকগণ ঘোষণা শ্রবণ করলো কিন্তু বাধা দেয়ার সাহস হয় নি। তারপর মুসলিমগণ মদিনা প্রত্যাবর্তন করলেন— বাংলা অনুবাদক