মদিনা থেকে আবু যরের বহিষ্কারের সময় প্রদত্ত ভাষণ
হে আবু যর! তুমি আল্লাহর নামে ক্ৰোধ দেখিয়েছিলে। সুতরাং যার ওপরে রাগান্বিত হয়েছিলে তার বিষয়ে আল্লাহতে আশা রেখো। মানুষ তাদের জাগতিক বিষয়ের জন্য তোমাকে ভয় করতো, আর তুমি তোমার ইমানের জন্য তাদেরকে ভয় করতে। কাজেই তারা যেজন্য তোমাকে ভয় করে তা তাদের কাছে রেখে দাও এবং তুমি যে জন্য তাদেরকে ভয় কর তা নিয়ে বেরিয়ে পড়। যে বিষয় থেকে তুমি তাদেরকে বিরত করতে চেয়েছিলে তাতে তারা কতই না। আসক্ত এবং যে বিষয়ে তারা তোমাকে অস্বীকার করেছে। তার প্রতি তুমি কতই না নির্লিপ্ত। অল্পকাল পরেই তুমি জানতে পারবে। আগামীকাল (পরকালে) কে বেশি লাভবান এবং কে বেশি ঈর্ষনীয়। এমনকি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী যদি কারো জন্য রুদ্ধ হয়ে যায় এবং সে যদি আল্লাহকে ভয় করে, তবে আল্লাহ তার জন্য তা খুলে দিতে পারেন। শুধু ন্যায়পরায়ণতা তোমাকে আকর্ষণ করে এবং অন্যায় তোমাকে বিকর্ষণ করে। যদি তুমি তাদের জাগতিক বিষয়ের গ্ৰীতি গ্রহণ করতে তাহলে তারা তোমাকে ভালোবাসতো এবং যদি তুমি তাদের সাথে এর অংশ গ্রহণ করতে তবে তারা তোমাকে আশ্রয় দিত।
১। আবু যর আল-গিফারীর নাম ছিল জুনদাব ইবনে জুনাদাহ। তিনি মদিনার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত রাবাযিাহ্ নামক একটা ছোট গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। রাসুলের (সঃ) ইসলাম প্রচারের কথা শুনামাত্রই তিনি মক্কা এসেছিলেন এবং রাসুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতে কাফের কুরাইশগণ তাকে নানাভাবে অত্যাচার-উৎপীড়ন করেছিল। কিন্তু তার দৃঢ় সংকল্প থেকে তাকে টলাতে পারে নি। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি চতুর্থ অথবা পঞ্চম ছিলেন। ইসলামে অগ্রণী হবার সাথে তার আত্মত্যাগ ও তাকওয়া এত উচুস্তরের ছিল যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ
আমার লোকদের মধ্যে আবু যরের আত্মত্যাগ ও তাকওয়া মরিয়াম তনয় ঈসার মত |
খলিফা উমরের রাজত্বকালে আবু যর সিরিয়া চলে গিয়েছিলেন এবং উসমানের সময়েও সেখানে ছিলেন। তিনি উপদেশ প্রদান, ধর্ম প্রচার, সৎপথ প্রদর্শন ও আহলুল বাইতের মহত্ত্ব সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করে দিন অতিবাহিত করেছিলেন। বর্তমানে সিরিয়া ও জাবাল আমিলে (উত্তর লেবানন) শিয়া সম্প্রদায়ের যে চিহ্ন পাওয়া যায় তা তার প্রচার ও কার্যক্রমের ফল। সিরিয়ার শাসনকর্তা মুয়াবিয়া তাকে ভালো চোখে দেখতো না। উসমানের অন্যায় কর্মকান্ড ও তহবিল তসরুফের প্রকাশ্য সমালোচনা করতেন বলে মুয়াবিয়া তার উপর খুব বিরক্ত ছিল। কিন্তু সে তাকে কিছু করতে না পেরে উসমানের কাছে পত্র লেখলে যে, আবু যর যদি আরো কিছু দিন এখানে থাকে। তবে সে জনগণকে খলিফার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। প্রত্যুত্তরে উসমান লেখালো যে, আবু যারকে যেন জিনবিহীন উটের পিঠে চড়িয়ে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। উসমানের আদেশ পালিত হয়েছিলো। মদিনায় পৌঁছেই তিনি ন্যায় ও সত্যের প্রচার শুরু করলেন। তিনি মানুষকে রাসুলের (সঃ) সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন এবং রাজকীয় আড়ম্বর প্রদর্শনের বিষয়ে সতর্ক করতে লাগলেন। এতে উসমান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তার কথা বলা বন্ধ করতে চেষ্টা করলেন। একদিন উসমান তাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, “আমি জানতে পেরেছি। তুমি নাকি প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ যখন বনি উমাইয়া ত্রিশজন সসংখ্যায় হবে তখন তারা আল্লাহর নগরীসমূহকে তাদের নিজের সম্পদ মনে করবে, তাঁর বান্দাগণকে তাদের গোলাম মনে করবে এবং তাঁর দ্বিনকে তাদের প্রতারণার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করবে । আবু যর বললেন তিনি রাসুলকে (সঃ) এরূপ বলতে শুনেছেন। উসমান বললেন যে, আবু যর মিথ্যা কথা বলেছে এবং তিনি তার পার্শ্বে উপবিষ্ট সকলকে জিজ্ঞেস করলেন যে, তারা এমন কথা শুনেছে কিনা। উপস্থিত। সকলেই না বোধক উত্তর দিয়েছিল। আবু যর তখন বললেন যে, এ বিষয়ে আলী ইবনে আবি তালিবকে জিজ্ঞেস করা হোক। তখন আলীকে ডেকে পাঠানো হলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আবু যরের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করেন। তখন উসমান আলীর কাছে জানতে চাইলেন কিসের ভিত্তিতে তিনি এ হাদিসের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমিরুল মোমেনিন বললেন তিনি রাসুলকে বলতে শুনেছেনঃ আকাশের নিচে ও মাটির ওপরে আবু যর অপেক্ষা অধিক সত্য বক্তা আর কেউ নেই । এতে উসমান আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলেন। কারণ আবু যর কে এরপরও মিথ্যাবাদী বলা মানে রাসুলের (সঃ) ওপর মিথ্যারোপ করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে উসমান আবু যরের ওপর ভীষণ রাগান্বিত হয়ে রইলেন। কারণ তিনি তাকে মিথ্যা প্ৰতিপন্ন করতে পারেন নি। অপরদিকে মুসলিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার জন্য আবু যর প্রকাশ্যভাবে উসমানের সমালোচনা অব্যাহত রাখলেন। যেখানেই তিনি উসমানকে দেখতেন সেখানে নিম্নের আয়াত আবৃত্তি করতেন ঃ আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মমর্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও । সে দিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে । সেদিন বলা হবে, এটাই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে (কুরআন-৯ ? ৩৪-৩৫) / উসমান অর্থ দিয়ে আবু যরের মুখ বন্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু এ স্বাধীনচেতা লোকটিকে তার সোনার ফাঁদে আটকাতে পারেন নি। এ লোকটি কোন কিছুতেই ভীত অথবা প্ৰলুব্ধও হলেন না, আবার তার মুখও বন্ধ হলো না; অবশেষে মদিনা ত্যাগ করে রাবাযাহ চলে যাবার জন্য উসমান তাকে নির্দেশ দিলেন এবং ম্যাব ওয়ান ইবনে হাকামকে (এই হাকামকে তার কুকর্মের জন্য রাসুল মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন; সে তার পুত্রসহ নির্বাসনে ছিল এবং উসমান তাদেরকে ফেরত এনেছিল) নিয়োগ করেছিল আবু যরকে বের করে দেয়ার জন্য। একই সাথে উসমান একটা অমানবিক আদেশ জারি করেছিলেন যে, আবু যরকে কেউ যেন বিদা
য় সম্বর্ধনা না জানায়। কিন্তু ইবনে ইয়াসির খলিফার অমানবিক আদেশ অমান্য করে আবু যরকে বিদায় সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন। সেই বিদায় সম্বর্ধনায় আমিরুল মোমেনিন এ খোৎবা প্রদান করেন। রাবাযিাহতে যাবার পর থেকে আবু যর অতি দুঃখ-কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। এ স্থানে তার পুত্র যার ও তার স্ত্রী মারা গিয়েছিলো এবং তার জীবিকা নির্বাহের জন্য যে ভেড়া ও ছাগল পালন করতেন সেগুলোও মরে গিয়েছিল। তার সন্তানদের মধ্যে একটা কন্যা জীবিত ছিল, যে পিতার দুঃখ-কষ্ট ও উপোসের অঅংশীদার ছিল। যখন তাদের জীবিকার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেল তখন দিনের পর দিন উপোস করে সে পিতাকে বললো, “বাবা, আর তো ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারি না। আর কতদিন এভাবে কাটাবো। জীবিকার সন্ধানে চল অন্য কোথাও যাই।” আবু যর কন্যাকে সাথে নিয়ে এক নির্জন স্থানের মধ্য দিয়ে যাত্রা করলেন। কোথাও বৃক্ষপত্র পর্যন্ত তাঁর চোখে পড়লো না। অবশেষে এক স্থানে তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন। তিনি কিছু বালি একত্রিত করে তার ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার চোখে-মুখে মৃত্যুর লক্ষণ দেখা দিল। পিতার এ অবস্থা দেখে কন্যা বিচলিত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং বললো, “পিতা, এ নির্জন স্থানে তোমার মৃত্যু হলে আমি-কিভাবে তোমার দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করবো।” প্রত্যুত্তরে পিতা বললেন, “বিচলিত হয়ো না। রাসুল (সঃ) আমাকে বলেছেন অসহায় অবস্থায় আমার মৃত্যু হবে এবং কয়েকজন ইরাকি আমার দাফন-কাফন করবে। আমার মৃত্যুর পর আমাকে চাদরে ঢেকে রাস্তার পাশে বসে থেকে এবং কোন যাত্ৰিদল যেতে থাকলে তাদরকে বলে রাসুলের প্রিয় সাহাবা আবু যর মারা গেছে।” ফলে তার মৃত্যুর পর তার কন্যা রাস্তার পাশে বসেছিল। কিছুক্ষণ পরে একটা যাত্ৰিদল সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। এ যাত্ৰিদলে ছিল মালিক ইবনে হারিছ ইবনে ইয়াজিদসহ মোট চৌদ্দজন। আবু যরের এহেন অসহায় মৃত্যুর কথা শুনে তারা অত্যন্ত শোক বিহ্বল হলো। তারা তাদের যাত্রা স্থগিত করে আবু যরের দাফনের ব্যবস্থা করলেন। মালিক আশতার কাফনের জন্য একটা চাদর দিলেন। এ কাপড়টির দাম ছিল চার হাজার দিরহাম। তার জানাজার পর তাকে দাফন করে তারা প্রস্থান করলো। ৩২ হিজরি সনের জিলহজ মাসে এ ঘটনা ঘটেছিল।