মালিক আশ্তারকে মিশরের গভর্নর নিয়োগ করে তার মাধ্যমে মিশরের জনগণকে লেখেছিলেন। মহিমান্বিত আল্লাহ মুহাম্মদকে (সঃ) জগতসমূহের জন্য সতর্ককারী এবং সকল নবির সাক্ষী হিসাবে প্রেরণ করেছিলেন। যখন তিনি মহামিলন প্রাপ্ত হলেন তখন মুসলিমগণ তাঁর পরবর্তী ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হলো। আল্লাহর কসম, আমি কখনো এ নিয়ে চিন্তা করি নি। আমি কল্পনাও করতে পারি নি যে, রাসুলের (সঃ) পরে আরবগণ তাঁর আহলুল বাইত থেকে খেলাফত কেড়ে নিয়ে যাবে অথবা তাঁর অবর্তমানে তারা আমার কাছ থেকে খেলাফত ছিনিয়ে নেবে। আমি হঠাৎ দেখলাম মানুষ একজন লোকের আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করার জন্য তার চারপাশে ভিড় জমিয়েছে।” আমি সে পর্যন্ত হাত গুটিয়ে রাখলাম যে পর্যন্ত আমি দেখলাম যে, অনেক মানুষ ইসলাম থেকে সরে পড়ছে এবং মুহাম্মদের (সঃ) দ্বিনি ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। তখন আমি ভয় পেলাম যে, যদি আমি ইসলামকে ও এর মানুষকে রক্ষা না করি এবং যদি ইসলামে কোন ব্যত্যয় বা ধ্বংস সংঘটিত হয়। তাহলে এটা আমার জন্য একটা বজাঘাত হবে যা তোমাদের ওপর ক্ষমতা না পাওয়ার চেয়েও হৃদয় বিদারক। ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী—আসবে—যাবে- মেঘের মতো। কিন্তু ইসলামের ব্যত্যয় স্থায়ী হয়ে যাবে। সুতরাং এ অবস্থায় অন্যায় ও ভ্রান্তি ধ্বংস হওয়া পর্যন্ত আমি যুদ্ধ করলাম এবং দ্বিনি শান্তি ও নিরাপত্তা পেলো ।
আল্লাহর কসম, যদি আমাকে একা তাদের মোকাবেলা করতে হতো এবং তারা সংখ্যায়৷ অগণন হতো। তবুও আমি পিছপা হতাম না অথবা হতবুদ্ধি হয়ে পড়তাম না। আমি নিজের মধ্যে স্বচ্ছ এবং তাদের বিপদগামীতা সম্পর্কে ও আমার পথ সম্পর্কে আল্লাহর কাছ থেকে দৃঢ় প্রত্যয় পেয়েছি। আমি আশাবাদী যে, আল্লাহর কাছ থেকে তার উত্তম পুরস্কার পাব। কিন্তু নির্বোিধ আর দুষ্ট লোক সমগ্র উম্মার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে— এটা আমার চিন্তার কারণ। তারা আল্লাহর তহবিলকে নিজের তহবিলের মতো আঁকড়ে ধরে এবং তার মানুষকে ক্রীতদাস’ বানায়। তারা ধাৰ্মিকদের সাথে যুদ্ধ করে এবং পাপীদের সাথে মিত্ৰতা করে। বস্তৃত তাদের মধ্যে এমন লোক রয়েছে যে অবৈধ পানীয় পান করে এবং ইসলামের বিধান অনুযায়ী বেত্ৰাঘাতের শাস্তি পেয়েছে। তাদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছে যে ইসলাম দ্বারা আর্থিক লাভবানী’ না হওয়া পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করে নি। যদি অবস্থা এমন না হতো তাহলে আমি তোমাদের একত্রিত করতে চাপ দিতাম না— তোমাদের জন্য কোন আশঙ্কা করতাম না— তোমাদেরকে জিহাদের জন্য আহবান করতাম না। যদি তোমরা অস্বীকার কর এবং দুর্বলতা দেখাও তাহলে আমি তোমাদের পরিত্যাগ করবো ।
তোমরা কি দেখ না যে, তোমাদের নগরীর সীমানা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, তোমাদের জনবসতিপূর্ণ এলাকা জয় করে নিয়ে যাচ্ছে, তোমাদের দখল কেড়ে নেয়া হচ্ছে এবং তোমাদের নগরী ও দেশ আক্রান্ত হচ্ছে? আল্লাহ তোমাদের প্রতি সদয় হউন— তোমাদের শত্রুর সঙ্গে লড়বার জন্য উঠে দাড়াও, নিচুপভাবে মাটিতে বসে থেকে না। তাহলে তোমরা অত্যাচারের শিকার হবে এবং গ্রানিময় অবস্থায় পড়বে—তোমাদের ভাগ্য নিকৃষ্টতম হবে। যোদ্ধাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হয়। কারণ সে যখন ঘুমাবে শত্রু তখন নাও ঘুমাতে পারে। এখানেই শেষ করলাম।
১। আমিরুল মোমেনিন সম্পর্কে রাসুলের (সঃ) ঘোষণা, “আলী আমার ভাই, আমার স্থলাভিষিক্ত ও তোমাদের মাঝে আমার খলিফা” এবং বিদায় হজ থেকে ফেরার পথে গাদিরে খুমের ঘোষণা, ”আমি যার মাওলা আলী তার মাওলা”— রাসুলের পরবর্তী উত্তরাধিকার বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য এটাই যথেষ্ট। এরপর আর কোন নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে না অথবা মদিনার জনগণ আর কোন নির্বাচনের কথা অনুভবও করতে পারে না। রাসুলের (সঃ) এ সুস্পষ্ট নির্দেশ কিছু সংখ্যক ক্ষমতালোভী লোক এমনভাবে অবেহলা করেছে যেন তারা এসব কথা কোন দিন শোনেও নি। তারা রাসুলের (সঃ) দাফন-কাফনের বিষয় ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনকে এতটা অত্যাবশ্যক মনে করলো যে, তারা বনি সাইদার সকিফায় গিয়ে জড়ো হলো এবং গণতন্ত্রের ভান করে আবু বকরকে খলিফা মনোনীত করলো। এ সময়টা আমিরুল মোমেনিনের খুবই সন্ধিক্ষণ ছিল। এক দিকে কতিপয় স্বার্থন্বেষী বলতে লাগল। তিনি যেন অস্ত্র ধারণ করেন; অপরদিকে তিনি দেখলেন সামরিক শক্তি প্রয়োগে যারা ইসলাম গ্ৰহণ করেছে তারা ইসলাম ত্যাগ করছে এবং মুসায়লিমাহ ইবনে ছুমাসাহে আল-হানাফী ও তুলায়হা ইবনে খুওয়ালিদ আল-আসাদীর মতো মিথ্যাবাদীগণ গোত্রের পর গোত্রকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় যদি গৃহযুদ্ধ বাধে তবে মুসলিমগণ একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করবে। তখন ধর্মত্যাগী ও মোনেফকগণ একত্রিত হয়ে পৃথিবীর বুক থেকে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলবে। সুতরাং আমিরুল মোমেনিন। যুদ্ধ না করে নিচুপ থাকার পথ বেছে নিলেন এবং ইসলামের স্বার্থে অস্ত্র না ধরে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে তাঁর আপত্তি উত্থাপন করে যাচ্ছিলেন। উম্মাহর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি ক্ষমতার চেয়ে তাঁর কাছে অনেক বড় ছিল বলেই তিনি কোন প্রকার উগ্র ও অশান্তির পথ গ্ৰহণ করেন নি। মোনাফেকদের অপকৌশল ঠেকাতে এবং ফেতনাবাজাদের পরাজিত করার মতো আর কোন পথ তার খোলা ছিল না, একমাত্র তাঁর ন্যায়সঙ্গত দাবি পরিত্যাগ করা ছাড়া। তার এ মহৎ অবদান ইসলামে দলমত নির্বিশেষ সকলেই স্বীকার করে। ২। উমাইয়া ও আবি আল-আস ইবনে উমাইয়ার (উসমানের দাদা) সন্তানদের প্রতি রাসুল (সঃ) যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এখানে সে বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। আবুজর গিফারী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেন, বনি উমাইয়াগণ যখন সংখ্যায় চল্লিশ জন হবে তখন তারা আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণকে তাদের দাসে পরিণত করবে, আল্লাহর অর্থ-সম্পদকে নিজের সম্পদের মতো আত্মসাৎ করবে এবং আল্লাহর কুরআনকে দুনীতির হাতিয়ার হিসাবে দাঁড় করাবে (নায়সাবুরী**, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ 843; f&fr“, sy? V8, ?: S85)|| আবুজর গিফারী, আবু সায়েদ খুদরী, ইবনে আব্বাস, আবু হােরায়রা ও অন্যান্য থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেন, বনি আবি আল-আসের গোত্ৰ সংখ্যা যখন ত্ৰিশ জন হবে তখন তারা নিজের সম্পদের মতো আল্লাহর সম্পদ আত্মসাৎ করবে: আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণকে দাসে পরিণত করবে এবং আল্লাহর দ্বিনকে দুনীতির হাতিয়ার করবে (হাম্বল***, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৮৯: নায়সাবুরী’, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৮০; আসকালানী’, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৩৩২. শাফকী***, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ২৪১-২৪৩; হিন্দি’ »* २७, १४ 988,988, ७ंy, 748) | রাসুলের (সঃ) মহামিলনোত্তরকালীন ইসলামের ইতিহাস থেকে যথেষ্টভাবে তাঁর এ ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণিত হয়েছে এবং এ কারণেই আমিরুল মোমেনিন মুসলিম উম্মার জন্য ভীত ছিলেন।
৩। যে লোকটি মন্দ পান করেছিল সে ছিল ওয়ালিদ ইবনে আবি মুয়াত। সে উসমানের মায়ের দিক থেকে ভাই, এবং কুফার গভর্নর ছিল। ওয়ালিদ একদিন মন্দাসক্ত হয়ে কুফার কেন্দ্রীয় মসজিদে ফজরের নামাজে ইমামতি করছিলো। সে দুরাকাতের পরিবর্তে চার রাকাত ফরজ নামাজ পড়লো। এতে বিশিষ্ট ধাৰ্মিকগণ স্তম্ভিত হলেন। কারণ ফজরের ফরজ দুরাকাত নামাজ রাসুল (সঃ) কর্তৃক নির্ধারিত। ইবনে মাসুদের মতো ধাৰ্মিকগণ আরো বেশি ক্ষেপে গেলেন যখন ওয়ালিদ বললোঃ
আহা! কী সন্দুর সকাল, যদি তোমরা রাজি হও তবে আমি আরো কয়েক রাকাত নামাজ বাড়িয়ে পড়তে পারি।
ওয়ালিদের নীতিভ্ৰষ্টতা ও লাম্পট্যের জন্য কয়েকবার খলিফার কাছে নালিশ করা হয়েছিল। কিন্তু খলিফা মানুষের নালিশের প্রতি কৰ্ণপাত করেন নি। এতে কুফাবাসী বলাবলি করতে শুরু করলো যে, খলিফা তাদের দুঃখ-দুৰ্দশার প্রতি অমনোযোগী এবং ওয়ালিদের মতো দুৰ্বত্তকে প্রশ্ৰয় দিচ্ছেন। একদিন ঘটনাক্রমে তার গৰ্হিত কাজের সময় যখন ওয়ালিদ, অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল তখন কয়েকজন লোক মোহরাঙ্কিত আংটি তাব হাত থেকে খুলে মদিনায় নিয়ে গেল। কিন্তু তবুও খলিফা তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে ইতস্তত করছিলেন। অবশ্য শেষ পর্যন্ত জনগণের চাপের মুখে তিনি ওয়ালিদকে চল্লিশ বেত্ৰাঘাত করেছিলেন এবং তাকে গভর্নরের পদ থেকে সরিয়ে তার স্থলে উসমানের চাচাত ভাই সায়েদ ইবনে আল-আসকে গভর্নর নিয়োগ করেছিলেন। উসমানের বিরুদ্ধে উত্থানের এটাও একটা কারণ ছিল (বালাজুরী’, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩-৩৫; ইসফাহানী*, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৭৪-১৮৭৫; বার”, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৫৫৪-১৫৫৭; আইট্র’ ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৯১-৯২; তাবার”, পৃঃ ২৮৪৩২৮৫০; আছীর, ৩য় খণ্ড, ১০৫-১০৭; হাদীদ’, ১৭শ খণ্ড, পৃঃ ২২৭-২৫৪)।
৪ । যে লোকটি আর্থিক সুবিধা অর্জনের জন্য ইসলাম গ্ৰহণ করেছিল সে হলো মুয়াবিয়া। এ লোকটি দুনিয়ার স্বাৰ্থ সিদ্ধির জন্য ইসলামকে ব্যবহার করতো।