খারিজিদের ধ্বংস ও উমাইয়াদের ফেতনা সম্পর্কে” প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা ও সকল প্রশংসাত্মক উক্তি আল্লাহর। হে লোকসকল, আমি ফেতনা-ফ্যাসাদের চোখ উৎপাটন করে ফেলেছি। আমি ব্যতীত আর কেউ এ কাজের দিকে অগ্রসর হয় নি। অথচ ফেতনার অন্ধকারচ্ছন্নতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং এর উন্মাদনাও চরমে পৌছেছিল। আমাকেই হারাবার আগেই যা খুশি জিজ্ঞেস করা। যার হাতে আমার প্রাণ সেই আল্লাহর কসম, এখন থেকে শেষ বিচারের দিনের মধ্যবতীর্ণ সময়ের যা কিছু তোমরা জিজ্ঞেস করবে তা আমি বলে দিতে পারবো। আমি তোমাদেরকে বলে দিতে পারবো কোন দল শত শত লোককে হেদায়েতের পথ দেখাবে আর কোন দল শত শত লোককে বিপথে পরিচালিত করবে। আমি তোমাদেরকে আরো বলে দিতে পারবো যে, মানুষের বিপথগামিতার অগ্রযাত্রা কে ঘোষণা করছে, কে এর অগ্রভাগে রয়েছে, কে এর পিছন থেকে প্রেরণা যোগাচ্ছে, কোথায় এর বাহন পশুগুলো বিশ্রামের জন্য থামবে, কোথায় এর সর্বশেষ অবস্থান এবং তাদের মধ্যে কে নিহত হবে ও কে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবে। যখন আমি মরে যাব তখন তোমাদের ওপর খুব কঠিন অবস্থা ও দুঃখজনক ঘটনাবলী আপতিত হবে। তখন প্রশ্ন করার মত মর্যাদাসম্পন্ন অনেক ব্যক্তি নিচের দিকে চোখ রেখে চুপ করে থাকবে এবং উত্তর দেয়ার মত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সাহস হারিয়ে ফেলবে। এটা এমন এক সময়ে ঘটবে যখন সকল দুঃখ-দুর্দশা ও অভাব-অনটনের সাথে যুদ্ধ-বিগ্রহ তোমাদের ওপর নেমে আসবে। সেই সময় তোমাদের এত কঠিন অবস্থা হবে যে, দুঃখ-দুর্দশার কারণে তোমাদের মনে হবে যেন দিন ফুরায় না। তোমাদের মধ্যে যারা মোত্তাকি তাদেরকে আল্লাহ জয়ী না করা পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করবে। যখন ফেতনা শুরু হয় তখন ন্যায়ের সাথে অন্যায় এমনভাবে তালগোল পাকিয়ে ফেলে যে, মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে এবং যখন ফেতনা অপসৃত হয় তখন তা একটা সতর্কাদেশ রেখে যায়। অভিগমনের সময় ফেতনাকে চেনা যায় না। কিন্তু প্রত্যাবর্তনের সময় স্পষ্ট চেনা যায়। এটা এমনভাবে প্রবাহিত হয়। যেমন প্রবাহমান বাতাস কোন কোন শহরে আঘাত হানে আবার কোন কোন শহর বাদ পড়ে। সাবধান, আমার মতে তোমাদের জন্য সবচাইতে ভয়ঙ্কর ফেতনা হলো উমাইয়াদের ফেতনা, কারণ এটা অন্ধ এবং অন্ধকারাচ্ছন্নতাও সৃষ্টি করে। এর প্রভাব অতি সাধারণ হলেও এর কুফল বিশেষ বিশেষ লোকদের ওপর পড়বে। এ ফেতনার মধ্যে যারা স্বচ্ছ-দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তি তারা দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত হবে এবং যারা চোখ বুজে থাকবে তাদেরকে দুঃখ দুর্দশা পোহাতে হবে না। আল্লাহর কসম, আমার পরে তোমাদের জন্য বনি উমাইয়াকে নিকৃষ্টতম দেখতে পাবে। তারা হবে অবাধ্য উষ্ট্রর মতো যে সামনে গেলে কামড় দেয় ও সম্মুখের পা দিয়ে আঘাত করে এবং পিছনে গেলে লাথি মারে ও দুধ দোহন করতে দেয় না। তারা তোমাদের ওপর আপতিত হয়ে শুধু তাদেরকেই ছেড়ে দেবে যাদের দ্বারা উপকৃত হবে এবং যাদের দ্বারা তাদের ক্ষতি হবে না। তারা তোমাদেরকে ক্রীতদাসের মতো মনে করবে এবং তাদের অত্যাচার-অবিচার ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা তাদের আজ্ঞানুবতী হও এবং তাদের নেতৃত্ব মেনে নিয়ে তাদের সাহায্য-সহায়তার মুখাপেক্ষী হও। তাদের ফেতনা-ফ্যাসাদ তোমাদের কাছে এমনভাবে আসবে যা দেখতে কুদৃশ্য ও ভয়ানক এবং আইয়ামে জাহেলিয়ার লোকদের চাল-চলনের মতো, যাতে না আছে কোন হেদায়েতের চিহ্ন আর না। আছে (তা থেকে) মুক্তির কোন লক্ষণ। আমরা আহলুল বাইত-এর সদস্যগণ এসব ফেতনা থেকে মুক্ত এবং আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত নই। যারা ফেতনার জন্ম দেয়। এরপর আল্লাহ তোমাদের ওপর থেকে এসব ফেতনা-ফ্যাসাদ দূরীভূত করবেন। যেমন করে মাংশ থেকে চামড়া ছাড়ানো হয়। এ কাজ এমন ব্যক্তির মাধ্যমে করাবেন যে তাদেরকে হীন করে ছাড়বে, তাদের ঘাড় ধরে হেঁচড়ে নিয়ে যাবে, তাদেরকে পূর্ণ পেয়ালা (দুঃখ-দুর্দশার) পান করাবে, তরবারি ছাড়া অন্য কিছু তাদের প্রতি প্রসারিত হবে না এবং আতঙ্ক ছাড়া অন্য কোন পোশাক পরাবে না। সে সময় কুরাইশগণ পৃথিবীর সব কিছুর বিনিময়ে হলেও একটিবার উট জবাই করার মতো সময়টুকুর জন্য আমাকে পেতে চাইবে এ জন্য যে, আজ তারা আমাকে যা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে তা যেন আমি গ্রহণ করি ।
১। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর আমিরুল মোমেনিন এ খোৎবাটি প্রদান করেছিলেন। এখানে ফেতনা বলতে জামাল, সিফাফিন ও নাহরাওয়ানের যুদ্ধকে বুঝানো হয়েছে। কারণ রাসুলের সময়ের যুদ্ধের সাথে এ যুদ্ধগুলোর প্রভেদ রয়েছে। রাসুলের সময়ের যুদ্ধের বিরুদ্ধ পক্ষ ছিল কাফের কিন্তু আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে যারা যুদ্ধ করেছিল তাদের মুখে ইসলামের অবগুণ্ঠন ছিল এবং তারা মুসলিম বলে সমাজে পরিচিত ছিল। ফলে মানুষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইতস্তত করতো এবং বলতো কেন তারা এমন লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। যারা আজান দেয় ও নামাজ আদায় করে। এ যুক্তি দেখিয়ে খুজায়মাহ ইবনে ছাবিত আল-আনসারী সিফফিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে নি এবং আম্মার ইবনে ইয়াসির শহিদ হবার পূর্ব পর্যন্ত তাকে বুঝানো সম্ভব হয় নি যে, বিরুদ্ধ দল প্রকৃতপক্ষেই বিদ্রোহী। একইভাবে তালহা ও জুবায়রসহ অনেক সাহাবা জামালের যুদ্ধে আয়শার পক্ষে থাকায় এবং নাহরাওয়ানের যুদ্ধে খারিজিদের কপালে সেজদার কালো দাগ থাকায় আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের লোকদের মনে দ্বিধা-দ্বন্দু দেখা দিয়েছিল। এমতাবস্থায় যারা আমিরুল মোমেনিনের বিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে সাহস করেছিল তারা ওদের হৃদয়ের গুপ্ত বিষয় ও ইমানের বাস্তবতা সম্পর্কে অবহিত ছিল । আমিরুল মোমেনিনের উপলব্ধি ও আত্মিক সাহসের বৈশিষ্ট্য এটাই যে, তিনি তাদের মদমত্ত শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাতে রাসুলের বাণী সঠিক প্রমাণিত হলো। রাসুল বলেছিলেনঃ আমার পরে তোমাকে বায়াত ভঙ্গকারী (জামালের লোকেরা), অত্যাচারী (সিরিয়ার লোকেরা) ও
ধর্মত্যাগীদের (খারিাজগণ) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে । (নায়সাবুরী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৩৯-১৪০; শাফেয়ী’, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ১৮ বার’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১১৭: আহীর’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৩২-৩৩, বাগদাদী’, ৮ম খন্ড, পৃঃ ৩৪০; ১৩শ খন্ড, পৃঃ ১৮৬-১৮৭; আসাকীর’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৪১; কাহীর’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩০৪-৩০৬, শাকী’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ২৩৮, ৯ম খন্ড, পৃঃ ২৩৫; জুরাকানী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩১৬-৩১৭: হিন্দি’, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃঃ ৭২, ৮২, ৮৮, ১৫৫, ৩১৯, ৩৯১, ৩৯২, ৮ম খন্ড, পৃঃ ২১৫) (আমিরুল মোমেনিন খেলাফত গ্রহণের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে বনি উমাইয়া, রাসুলের কতিপয় সাহাবা (z) ও খারোজগণ আদাজল খেয়ে লেগেছিল । ঐতিহাসিকভাবে হাশেমী গোত্রের সাথে উমাইয়াদের পূর্ব শক্রিতা এর কারণ বলা হলেও আরো অনেক আধ্যাত্মিক কারণ রয়েছে । কেন আলী কারো দ্বারা আকর্ষিত ও কারো কাছে বিকর্ষিত হয়েছিল সে বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারীর ‘আলীর আকর্ষণ ও বিকর্ষণ” বইটি পড়ার জন্য সহৃদয় পাঠককে অনুরোধ করা হলো—বাংলা অনুবাদক) ২। রাসুলের (সঃ) পর আমিরুল মোমেনিন ব্যতীত সাহাবাদের মধ্যে আর কেউ এমন চ্যালেঞ্জ করে নি যে, তোমাদের যা কিছু জানতে ইচ্ছা হয় আমাকে জিজ্ঞেস করো। তবে সাহাবা নয় এমন কয়েক জনের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায় যারা এরূপ চ্যালেঞ্জ করেছিল। তারা হলো ইব্রাহীম ইবনে হিশাম, আল-মখযুমী, মুকাতিল ইবনে
সুলায়মান, কাতাদাহ ইবনে দিয়ামাহ, আবদার রহমান ইবনে জাওজী এবং মুহাম্মদ ইবনে ইদ্রিছ। আশ-শাফী। এরা সকলেই এহেন চ্যালেঞ্জ করে দারুণভাবে অপমানিত হয়েছিল এবং চ্যালেঞ্জ ফিরিয়ে নিতে তারা বাধ্য হয়েছিল। এ ধরনের চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র তিনিই করতে পারেন যিনি বিশ্বচরাচরের বাস্তবতা ও ভবিষ্যতের ঘটনা প্রবাহ অনুধাবন করতে পারেন। আমিরুল মোমেনিন ছিলেন রাসুলের (সঃ) জ্ঞান-নগরের দরজা এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি কোন দিন কারো কোন প্রশ্নের জবাব দিতে অসমর্থ হন নি। এমনকি খলিফা উমরও বলেছেন, “আলীকে যখন পাওয়া যেত না তখন কোন সমস্যা দেখা দিলে তার সমাধানের জন্য আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতাম।” একইভাবে আমিরুল মোমেনিনের ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছিল যা তার গভীর জ্ঞানের নির্দেশক। বনি উমাইয়ার ধ্বংস, খারিজদের উত্থান-পতন, তাতারদের যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞ, ইংরেজদের আক্রমণ, বসরার বন্যা এমনকি কুফার ধ্বংস প্রতিটি ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নিয়েছিল। (বার”, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫৮; বার”, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১০৩; আইট্র’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২২; হাদীদ’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৪৬; সুয়ুতী*’,
পৃঃ ১৭১; হায়তামী***, পৃঃ৭৬)