তোমার পত্র” আমার কাছে পৌছেছে। পত্রে তুমি আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আল্লাহ মুহাম্মদকে (সঃ) তাঁর দ্বিনের জন্য মনোনীত করেছিলেন এবং সাহাবা দ্বারা তাকে সাহায্য করেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তুমি তোমার সম্বন্ধে সব কিছু গোপন করে আমাদের জন্য আল্লাহর বিচারের কথা বলতে শুরু করেছে এবং রাসুল সম্পর্কে আমাদেরকে বুঝাতে চেষ্টা করছে। তোমার এ হাস্যম্পদ কথা ওই লোকটার মতো যে হাযারে খেজুর বহন করে আনে অথবা সে লোকটার মতো যে ধনুর্বিদ্যায় তার ওস্তাদকে চ্যালেঞ্জ করে ।
তুমি মনে কর অমুক অমুক ইসলামে খুবই বিশিষ্ট ব্যক্তি। তুমি এমন বিষয়ে কথা বলছে যা সত্য হলে তাতে তোমার কিছু করণীয় নেই। আর মিথ্যা হলে সে ক্রটিতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না। কে ভালো, কে মন্দ অথবা কে শাসক, কে শাসিত এসব প্রশ্নে তোমার প্রয়োজন কী? প্রথম মুহাজিরগণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা এবং তাদের অবস্থান বা পদবি নির্ধারণে সাধারণ ক্ষমার অন্তভুক্ত লোক ও তাদের পুত্ৰগণের কাজ কী? কী আফসোস, একটা নকল তীর আসল তীরের শব্দ সৃষ্টি করছে এবং যার বিচার হবার কথা সে আজ বিচারকের আসনে বসে আছে। হে লোক, তুমি কেন নিজের পঙ্গুত্ব দেখ না। এবং নিজের গণ্ডির মধ্যে থাক না। তুমি কেন নিজের হীনতা ও ত্রুটি অনুধাবন কর না এবং নিয়তি তোমাকে যেখানে রেখেছে সেখানে থাক না। পরাজিতের পরাজয়ে বা বিজয়ীর বিজয়ে তুমি ধর্তব্য নও।
তুমি বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ন্যায় পথ ছেড়ে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হয়েছো। তুমি কি এটা অনুধান করতে পার না? আমি তোমাকে কোন খবর দিচ্ছি না; আমি শুধু আল্লাহর রহমত তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি যে, আনসার ও মুহাজেরদের অনেকেই মহিমান্বিত আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়েছে এবং তাদের প্রত্যেকেই বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কিন্তু আমাদের একজন যখন শাহাদত বরণ করেছিল তখন তাকে শহিদদের প্রধান বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাসুল তার দাফনের সময় সত্তর বার তকবির (আল্লাহু আকবার) ধ্বনি করে তাকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করেছিলেন। তুমি জানো না যে, আল্লাহর রাস্তার অনেকেই তাদের হাত হারিয়েছিল এবং তারা সকলেই বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। কিন্তু আমাদের একজন যখন তার হাত হারিয়েছিল তখন তার নাম রাখা হয়েছিল, “বেহেশতের উড়ন্ত ব্যক্তি” এবং “দুই পাখা বিশিষ্ট ব্যক্তি ৷” আত্ম-প্ৰশংসা যদি আল্লাহ নিষিদ্ধ না করতেন। তবে আমি আমাদের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে অনেক কিছু লেখতাম যা মুমিনগণের ভালোভাবে জানা আছে এবং যা মুমিন শ্রোতাগণ কখনো ভুলে যাবে না। যাদের তীর লক্ষ্যভ্ৰষ্ট তাদের সঙ্গে কথা না বলাই ভালো। আমরা হলাম সরাসরি। আল্লাহর নেয়ামত ও রহমতের গ্রহীতা । অপরপক্ষে অন্যরা আমাদের কাছে থেকে তা পেয়ে থাকে। তোমাদের চেয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের সুপ্রতিষ্ঠিত সম্মান ও সুপরিজ্ঞাত প্রাধান্য সত্ত্বেও আমরা তোমাদের সাথে মেলামেশা ও বিবাহ বন্ধন করা থেকে বিরত থাকি নি। আমরা তোমাদেরকে সমান মনে করতাম। যদিও বাস্তবে তোমরা তা ছিলে না। আর কী করেই বা তোমরা আমাদের সমান হবে যেখানে আমাদের মাঝে রয়েছে আল্লাহর রাসুল আর তোমাদের মাঝে তার বিরোধীরা; আমাদের মাঝে আল্লাহর সিংহ আর তোমাদের মাঝে আল্লাহ-বিরোধী দলের সিংহ, আমাদের মাঝে বেহেশতের যুবকদের দুজন মনিব” আর তোমাদের মাঝে দোযখের সন্তান; আমাদের মাঝে জগতের সেরা নারী”। আর তোমাদের মাঝে জ্বালানী কাঠ বহনকারিনী; এভাবে আমাদের রয়েছে হাজারো বৈশিষ্ট্য আর তোমাদের রয়েছে অসংখ্য দোষ-ত্রুটি ও হীনতা । আমাদের ইসলাম সুপরিজ্ঞাত এবং আমাদেরকে প্ৰাক-ইসলামি কালেও কেউ অস্বীকার করতে পারে
নি। যা অবশিষ্ট রয়েছে তা মহিমান্বিত আল্লাহর কথায় উল্লেখ করা যায়ঃ “আল্লাহর কিতাব অনুসারে রক্ত-সম্পৰ্কীয় আত্নীয়গণ একে অপরের জন্য অধিকতর
ঘনিষ্ট” (কুরআন- ৩৩.৬) || মহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেছেনঃ “নিশ্চয়ই, মানুষের মধ্যে তারাই ইব্রাহীম ও এ নবির (মুহাম্মদ) সব চাইতে নিকটবর্তী যারা তাঁকে অনুসরণ করে ও বিশ্বাস করে; এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ । মুমিনগণের অভিভাবক” (কুরআন-৩ ও ৬৮) এভাবে আমরা জ্ঞাতিত্ব ও আনুগত্য উভয় দিকেই তোমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সকিফায় (বনু সায়দার) যখন মুহাজিরগণ আল্লাহর রাসুলের জ্ঞাতিত্বের কথা বলে আনসারদের সাথে প্রতিযোগিতা করে কৃতকার্য হয়েছিল তখন সে অধিকার আমাদের তোমাদের নয়। একথা স্বীকার না করলে আনসারদের বক্তব্য সঠিক বলে প্রতিষ্ঠিত হবে। তুমি মনে কর যে, আমি প্রত্যেক খলিফার প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ ছিলাম এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। তোমার এ ধারণা সঠিক হলেও এটা তোমার বিরুদ্ধে কোন অপরাধ নয় এবং সেহেতু এতে তোমাকে ব্যাখ্যা দেয়ার মতো কিছু নেই। তুমি বলেছে যে, আমাকে উটের মতো নাকে দড়ি দিয়ে আবু বকরের কাছে আনুগত্যের শপথ গ্রহণের জন্য টেনে-হেচড়ে নিয়ে গেছে। চিরন্তন আল্লাহর কসম, তুমি এ কথা দ্বারা আমাকে তীব্রভাবে গালাগালি করার ইচ্ছা পোষণ করেছো। প্রকৃতপক্ষে তোমার একথা দ্বারা আমার প্রশংসা ব্যক্ত করেছো। আমাকে অপদস্থ করতে গিয়ে তুমি নিজেই অপদস্ত হয়েছে। একজন মুসলিম অত্যাচারের শিকার হলে তাতে তার কি কোন অবমাননা হয়? একজন মুসলিমের পক্ষে দ্বিনে সন্দেহ পোষণ করা বা তার দৃঢ় ইমানে ফাটল ধরা প্রকৃতপক্ষে অবমাননাকর। আমার এ যুক্তি অন্যদের জন্য হলেও তোমার বেলায় প্ৰযোজ্য বলে ব্যক্ত করলাম । তারপর তুমি উসমান ও আমার মর্যাদা সম্পর্কে লেখেছাে। এ বিষয়ে তুমি একটা উত্তর পেতে পার; কারণ উসমান তোমার জ্ঞাতি। সুতরাং এখন তুমি আমাকে বল, তোমাদের মধ্যে কে উসমানের প্রতি বেশি শক্ৰ ভাবাপন্ন ছিল এবং উসমানের হত্যা সংঘটিত করায় কার ভূমিকা বেশি ছিল। অথবা তুমি আমাকে বল, কে তাকে সমর্থন দিতে গেলে অন্যজন তা থামিয়ে দিয়েছে; অথবা কে সে ব্যক্তি যাকে সে সাহায্যের জন্য আহবান করেছিল; কিন্তু সে মুখ ফিরিয়ে চলে গেল এবং তার মৃত্যুকে এগিয়ে নিয়ে এসেছিল? না, না; আল্লাহর কসমঃ আল্লাহ অবশ্যই জানেন তোমাদের মধ্যে কারা বাধা দেয় এবং তাদের ভ্রাতৃগণকে বলে, “আমাদের সঙ্গে আসো /* এরা অল্পই যুদ্ধে অংশ নেয় (কুরআন – ৩৩ ৪ ১৮) । তার বিদা’তের জন্য আমার ওজর দেখিয়ে আমি তাকে তিরস্কার করতে যাচ্ছি না। কারণ তার প্রতি আমার উত্তম পরামর্শ ও হেদায়েত যদি পাপ হয়ে থাকে। তবে প্রায়শই যে ব্যক্তিকে দোষারোপ করা হয় তার কোন পাপ নেই। প্রবাদে আছে কখনো কখনো উপদেষ্টার একমাত্র পুরস্কার হলো মন্দের সন্দেহ। আমি সংস্কার ছাড়া কোন কিছুই আশা করি নি। যা আমি করতে সমর্থ এবং আমার হেদায়েত আল্লাহর প্রতি আহবান ছাড়া অন্য কিছু নয়; আমি তাঁর ওপর নির্ভর করি এবং তাঁর প্রতি আমার প্রত্যাবর্তন (কুরআন-১১ ? ৮৮) তুমি লেখেছে। আমি ও আমার অনুসারীদের জন্য তোমার তরবারি রয়েছে। তোমার এ কথায় ক্ৰন্দনরত লোকও হাসবে। তুমি কি কখনো দেখেছো আবদাল মুত্তালিবের বংশ যুদ্ধ থেকে পালিয়ে গেছে? অথবা তরবারিকে ভয় পেয়েছে? “হামাল’ যুদ্ধে যোগদান করা পর্যন্ত অপেক্ষা কর” । সহসাই তুমি যাকে খুঁজছো। (যুদ্ধ) সে তোমাকে খুঁজবে, তুমি যাকে দূরে ভাবছাে সে তোমার কাছে পৌছবে। সহসাই আমি মুহাজির ও আনসার বাহিনী নিয়ে তোমার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাব এবং যারা তাদের অনুসরণ করবে তারা সকলেই ধাৰ্মিক। তাদের সংখ্যা হবে বিশাল এবং তাদের পায়ের আঘাতের ধুলি চতুর্দিক অন্ধকার করে দেবে। তারা তাদের কাফন পরিহিত থাকবে এবং তাদের ঐকান্তিক আকাঙ্খা আল্লাহর সাথে সাক্ষাত।। তাদের সাথে থাকবে বদরিদের বংশধর এবং তাদের হাতে থাকবে হাশিমিদের তরবারি, যে তরবারির কাটা তোমার ভাই, মামা, দাদা ও জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর বেলায় তুমি নিজেই প্রত্যক্ষ করেছো । তারা অন্যায়কারীদের থেকে বেশি দূরে নয় (কুরআন
-১১ ? ৮৩)
১। আবু উমামাহ আল বাহিলী ও আবু মুসলিম আল খাওলানীর মাধ্যমে মুয়াবিয়া কুফায় দুখানা পত্র প্রেরণ করেছিল। সে পত্র দুটির প্রত্যুত্তরে আমিরুল মোমেনিন উক্ত পত্র লেখেছিলেন। আবু উমামার মাধ্যমে প্রেরিত পত্রে মুয়াবিয়া রাসুলের প্রেরণ ও ধর্ম প্রচার সম্বন্ধে এমনভাবে লেখেছিলো যেন আমিরুল মোমেনিন তা জানতেন না বা বুঝতে পারেন নি। সে জন্য তিনি মুয়াবিয়ার কথাকে হাযারে খেজুর আনার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এটা একটা আরবি প্ৰবাদ। হাযার বাহরাইনের নিকটবর্তী একটা শহর। এখানে প্রচুর খেজুর ফলে। সত্যুরাং এ স্থলে খেজুর নিয়ে আসা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। রাসুল সম্বন্ধে লেখার পর মুয়াবিয়া তিনজন খলিফার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য সাহাবাগণের মধ্যে সব চাইতে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ও উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ছিলেন প্রথম খলিফা বিনি মুসলিমগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং যারা ইসলাম পরিত্যাগ করে যাচ্ছিল তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন । তার পরে দ্বিতীয় খলিফা বিজয়ী হয়ে শহরসমূহের গোড়া পত্তন করেছিলেন। এবং কাফেরদের অবমানিত করেছিলেন । তারপর তৃতীয় খলিফা এলেন যিনি অত্যাচারের শিকার হলেন । তিনি ধর্মের প্রসার ঘটিয়েছিলেন এবং দূর-দূরান্তরে আল্লাহর বাণী বিস্তার করেছিলেন (মিনকারী***, পৃঃ ৮৬- ৮৭ ; রাব্বিহী***, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৩৩৪- ৩৩৫;)
আমিরুল মোমেনিনকে এসব লেখার পিছনে মুয়াবিয়ার একটা সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র ছিল। সে ভেবেছিল তার কথায় আমিরুল মোমেনিন মানসিক আঘাত প্রাপ্ত হয়ে পূর্বের খলিফা সমন্ধে কটুক্তি ও অবজ্ঞাকর উক্তি করলে তা সিরিয়া ও ইরাকের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে তাদের ক্ষেপিয়ে তুলবে। বস্তৃত সে অনেক আগ থেকেই সিরিয়ার মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়াচ্ছিল যে, আমিরুল মোমেনিন মানুষকে উসমানের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিল, তালহা ও জুবায়রকে হত্যা করিয়েছিল, আয়শাকে তার ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল এবং হাজার হাজার মুসলিমের রক্তপাত ঘটিয়েছিল। আমিরুল মোমেনিন। তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে এমন জবাব দিয়েছিলেন যাতে তার হীনতা, ইসলামের প্রতি শক্রিতা, পরাজিত হয়ে সাধারণ ক্ষমায় ইসলাম গ্রহণ করা, মুহাজিরগণ সর্বতোভাবে তার চেয়ে উন্নত ইত্যাদি ব্যক্ত করেছিলেন। তাতে সে আমিরুল মোমেনিনের লেখা কাউকে দেখাতেও সাহস করে নি । এরপর আমিরুল মোমেনিন হাশিম বংশের বিশেষ মৰ্যদার কথা উল্লেখ করে লেখেছিলেন যে, অনেক লোক রাসুলের সঙ্গে জিহাদে অংশ গ্রহণ করে শাহাদত বরণ করেছিল। কিন্তু হামজার শাহাদত বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ছিল। রাসুল নিজেই হামজার জন্য শোক প্রকাশ করেছিলেন। এ বিষয়ে অনেক হাদিস বর্ণিত আছে। রাসুল (সঃ) চৌদবার হামজার জানাযা করেছিলেন। তাতে সত্তরবার তকবির (আল্লাহু আকবর) দিয়েছিলেন। রাসুল তাকে শহিদগণের প্রধান বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। একইভাবে বিভিন্ন জিহাদে অনেকেরই হাত কাটা গিয়েছিল। উদাহরণ স্বরূপ বদর যুদ্ধে, কুবায়েব ইবনে ইসাফ আল আনসারী ও মু’আজ ইবনে জাবাল এবং অহুদ যুদ্ধে আমর ইবনে আল জামুহ আস-সালামী ও উবায়েদ (আতিক) ইবনে তাঈহান তাদের হাত হারিয়েছিল। কিন্তু মুতাহ যুদ্ধে জাফর ইবনে আবি তালিব যখন তার হাত হারালো রাসুল তাকে “বেহেশতের উড়ন্ত মানুষ” ও “দুপাখা বিশিষ্ট” বলে নামকরণ করলেন। এরপর আমিরুল মোমেনিন তাঁর নিজের বৈশিষ্ট্যের কথা ব্যক্ত করলেন। এ বিষয়ে অসংখ্য হাদিস রয়েছে। হাদিসবেত্তা আহমদ ইবনে হাম্বল (হিঃ ১৬৪ – ২৪১), আহম্মদ ইবনে আলী নাসাঈ (হিঃ ২১৫ – ৩০৩) এবং অন্যানারা বলেনঃ আলী ইবনে আবি তালিবের বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে বিশ্বস্ত সূত্র থেকে যত হাদিস বর্ণিত আছে তার সংখ্যা সকল সাহাবা অপেক্ষা অধিক (নায়সাকুরী’, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১০৭: বার’, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১১১৫ হাম্বলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩১৯, আহীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৯৯; আসকালানী *, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৫৭. আসকালানী’, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩৯) । আহলুল বাইতের একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমিরুল মোমেনিন বলেন, “আমরা সরাসরি আল্লাহর আনুকূল্যের গ্রহীতা আর অন্যরা আমাদের কাছ থেকে আনুকূল্য পেয়ে থাকে।” এর চেয়ে বেশি মযর্দাপূর্ণ অবস্থা আর কিছু হতে পারে না। হাদীদ লেখেছেনঃ আমিরুল মোমেনিন মূলত যা বুঝাতে চেয়েছেন তা হলো—তাঁরা কোন মানুষের দায়িত্বাধীন নন, কারণ আল্লাহ সরাসরি তাঁদের ওপর তাঁর রহমত প্ৰদান করে থাকেন । অৰ্থাৎ আল্লাহ ও তাঁদের মধ্যে বেসান মধ্যস্থতাকারী নেই । অপরপক্ষে অন্য সকল লোক তাঁদের দায়িত্বাধীন এবং তাঁরা হলেন মহিমান্বিত আল্লাহ ও মানুষের মধ্যস্থতাকারী। আমিরুল মোমেনিনের উক্তি বাহ্যিকভাবে শাব্দিক অর্থে যা আছে তাই । কিন্তু নিগুঢ় তত্ত্বপূর্ণ অর্থ হলো— আহলুল বাইত আল্লাহর অনুগত বান্দা এবং অন্য সকলকে অবশ্যই তাঁদের অনুগত অনুসারী হতে হবে। কাজেই যারা আল্লাহর নেয়ামতের প্রথম গ্রহীতা এবং অন্যদের জন্য সে নেয়ামতের উৎস তাদের সঙ্গে অন্য কারো তুলনা হতে পারে না। সামাজিক সংশ্রবের কারণে অন্য কেউ তাদের সমকক্ষ হতে পারে না। সে ক্ষেত্রে যারা সত্য ও ন্যায়ের বিরোধিতা করে তাদের সঙ্গে সমকক্ষতার কোন প্রশ্নই উঠে না। সে কারণে আমিরুল মোমেনিন উভয় দিকের চিত্র মুয়াবিয়ার সামনে তুলে ধরেছেনঃ
রাসুল আমাদের মধ্য থেকে এসেছিলেন আর তোমার পিতা আবু সুফিয়ান ছিল তাঁর বিরুদ্ধবাদীদের নেতা হামজা ছিলেন। আমাদের মধ্য থেকে এবং রাসুল তাকে ‘আল্লাহর সিংহ” উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন; আর তোমার নানা উৎবা ইবনে রাবিয়াহ ‘আসাদুল আহিলাফ” (রাসুলের বিরুদ্ধে মিত্ৰ শক্তির সিংহ) বলে গর্ব করতো । বদর যুদ্ধে উৎবা যখন হামজার মুখোমুখি হলো তখন হামজা বললেন, “আমি আবদাল মুত্তালিবের পুত্রহামজা। আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের সিংহ।” এতে উৎবা বললো, “আমি আসাদুল আহলাফ (তোমাদের বিরুদ্ধে মিত্র শক্তির সিংহ)” । কোন কোন টীকাকার লেখেছেন “আসাদুল আহলাফ”- এ কুখ্যাত উপাধি খন্দকের যুদ্ধে আবু সুফিয়ানের ছিল। ২ । তারপর আমিরুল মোমেনিন তাদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে বললেন যে, বেহেশতের যুবকদের সর্দার তাদের মধ্যেই রয়েছে। অপরপক্ষে দোযখের যুবকরা মুয়াবিয়াদের বংশোদ্ভূত। এ বিষয়ে রাসুল (সঃ) বলেছেন, “হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা।” অপরপক্ষে উকবাহ ইবনে আবি মুইয়াত সম্পর্কে রাসুল (সঃ) বলেছিলেন, “তুমি ও তোমার সন্তানগণের জন্য দোযখ নির্ধারিত।” ৩ । এরপর আমিরুল মোমেনিন তাদের বৈশিষ্ট্য হিসাবে বললেন যে জগতের সকল নারীর নেত্রী (ফাতিমাতুজ জোহরা) তাদের মধ্যেই রয়েছে। অপরপক্ষে মুয়াবিয়াদের মাঝে রয়েছে জ্বালানী কাষ্ঠ কুড়ানি মহিলা। আমিরুল মোমেনিন, উমর ইবনে খাত্তাব, আবু হুজায়ফা ইবনে ইয়েমেন, সা’দ, খুদরী, আবু হুরায়রাহ প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছিলেনঃ নিশ্চয়ই, ফাতিমা বেহেশতের সকল নারীর নেত্রী এবং হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা। কিন্তু তাদের পিতা (আলী) তাদেরও নেতা।(তিরমিয়ী” ৭, ৬৭ ; হ্যাম্বল” ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৯১ – ৩৯২ ; মাজাহ’, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫৬ নায়াসবুরী’, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৬৭: শাকী’, ৯ম খণ্ড, পৃঃ ১৮৩,১৮৪, ২০১: হিন্দি’, ১৩শ খণ্ড, পৃঃ ১২৭, ১২৮ বার*’, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৮৯৫: আহীর’, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৫৭৪ ; বাগদাদী।” ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৪০, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃ ? ৩৭২, ১০ খণ্ড, পৃঃ ২৩০: আসাকীরা, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৩৬৫) রান ইবনে হুসাইন ও আবু ছালাবাহ আল-খুশনী থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) ফাতিমাকে বলেছিলেনঃ হে আমার প্রাণপ্রিয় কন্যা, তুমি কি এ সংবাদ শুনে খুশি হবে না যে, তুমি রমণীকুলের সম্রাজ্ঞী? ফাতিমা বললেন, পিতা, তাহলে ইমরানের কন্যা মরিয়ামের কী হবে? রাসুল (সঃ) বললেন, সে তার যুগে শ্রেষ্ঠ রমণী আর তুমি তোমার যুগ থেকে অনাদিকাল পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ । নিশ্চয়ই, আল্লাহর কসম, আমি ইহজগত ও পরজগতের নেতার সাথে তোমার বিয়ে দিয়েছি । মোনাফিক ছাড়া আর কেউ তার প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করবে না | (ইসফাহানী”, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩২: বার’, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৮৯৫) | আয়শা থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সাঃ) বলেছেন ? হে ফাতিমা, তুমি কি শুনে খুশি হবে। না যে, তুমি আমার উম্মতের সকল নারীর শ্রেষ্ঠ, মুমিন নারীগণের নেত্রী এবং জগতের সকল
নারীর শ্রেষ্ঠ (বুখারী, ৮ম খণ্ড, পৃ ? ৭৯: নায়সাবুরী, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ১৪২-১৪৪, মাজাহ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৫১৮ হাম্বল, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ২৮-২, নায়সাবুরী**, ৩য় খণ্ড,) অপরপক্ষে মুয়াবিয়ার বংশে ছিল হীনা ও দুশ্চরিত্রা রমণী। এমনকি জ্বালানী কাঠ কুড়ানি রমণীও ছিল যেমন, উন্মে জামিলা যার কথা কুরআনেও অভিসম্পাত হিসাবে এসেছে (কুরআন—১১১ ঃ ৪; নায়সাবুরী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১০৭; বার”, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১১৫; হাম্বলী, ১ম খন্ড, পৃঃ ৩১৯; আছীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৯৯;
আসকালানী’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩৩৯; আসকালানী’, ৭ খন্ড, পৃঃ ৫৭)। ৪ । এটা একটা আরবি প্ৰবাদ বাক্য। এর কাহিনী হলো— মালিক ইবনে জুহায়েরকে হামাল ইবনে বদর যুদ্ধক্ষেত্রে একথা বলে ধমকিয়ে আক্রমণ করে হত্যা করেছিল। মূল ছন্দটা ছিল, ‘হামাল যুদ্ধক্ষেত্রে পৌছা পর্যন্ত একটু অপেক্ষা কর, তবেই দেখতে পাবে মৃত্যু কত সহজ।”