মাসা’দাহ ইবনে সাদাকাহ বলেছেনঃ “আমিরুল মোমেনিন কুফার মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে এ খোৎবা প্রদান করেছিলেন । যখন একজন লোক বলেছিল, হে আমিরুল মোমেনিন, আমাদের জন্য আল্লাহর বর্ণনা এমনভাবে ব্যক্তি করুন যেন আমরা কল্পনা করতে পারি যে, আমরা তাঁকে চোখে দেখি এবং তাতে তাঁর প্রতি আমাদের জ্ঞান ও প্রেম বৃদ্ধি পায় ।” প্রশ্নকারীর এ অনুরোধে আমিরুল মোমেনিন রাগান্বিত হয়ে গেলেন এবং সকল মুসলিমকে মসজিদে সমবেত হতে আদেশ দিলেন । বহুসংখ্যক মুসলিম মসজিদে জমায়েত হয়েছিল এবং সে স্থান জনাকীর্ণ হয়ে পড়েছিল । আমিরুল মোমেনিন মিম্বারে উঠলেন। কিন্তু তখনো তিনি রাগান্বিত অবস্থায় ছিলেন এবং রাগে তাঁর মুখের বর্ণ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল । আল্লাহর উচ্চ প্রশংসা ও রাসুলের ওপর তাঁর রহমত প্রার্থনা করে তিনি বলেনঃ
আল্লাহর বর্ণনা প্রতিষ্ঠিত প্ৰশংসা আল্লাহর যাকে দানের অসম্মতি ও কার্পণ্য ধনী করে না এবং যাকে মহাদানশীলতা ও দয়াদ্রতা দরিদ্র করে না। তিনি ব্যতীত প্রত্যেকেই যে পরিমাণ দান করে সে পরিমাণ কমে যায় এবং প্রত্যেক কৃপণকে তার দানকুষ্ঠার জন্য দোষারোপ করা হয়। তাঁর অগণিত নেয়ামত ও দান-অনুদানের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে অনুগ্রহ করেন। সমগ্র সৃষ্টি তাঁর পোষ্য
২। তিনি তাদের জীবিকার নিশ্চয়তা ও রেজেক নির্ধারিত করে দিয়েছেন। যারা তার দিকে মুখ ফেরায় এবং তার কাছে যা চুনা করে তিনি তাদের জন্য পথ প্রস্তুত করেছেন। তাঁর কাছে যা যাচুনা করা হয় তার জন্য তিনি যতটুকু উদার, যা যাচুনা করা হয় না তার জন্যও ততটুকু উদার। তিনিই প্রথম যার কোন আদি নেই; তাতে তাঁর পূর্বে কোন কিছুই থাকতে পারে না। তিনিই শেষ যার কোন অন্ত নেই; তাতে তাঁর পরে কোন কিছুই থাকতে পারে না। তিনি তাকে দেখা বা প্রত্যক্ষ করা থেকে মানুষের চোখকে বারিত করেছেন। কাল (সময়) তার কোন পরিবর্তন করে না; তাতে তাঁর অবস্থার কোন পরিবর্তন নেই। তিনি কোন নির্দিষ্ট স্থানে নেই, ফলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাঁর কোন চলাচল নেই। পর্বতে, ভূগর্ভের খনিতে ও সমুদ্র বক্ষে স্বর্ণ, রৌপ্য, মুক্তা, মানিক্য ও প্রবাল—যা কিছু আছে তার সবকিছু দান করলেও তাঁর দানশীলতা ক্ষুন্ন হবে না বা তাঁর যা আছে তাতে কোন কমতি দেখা দেবে না। তাঁর নেয়ামতের ভান্ডার এমন যে, সমগ্র সৃষ্টির চাহিদা পূরণের ফলে তাতে কোন কমতি দেখা দেয় না। তিনি এমন দয়ালু সত্তা র্যাকে ভিক্ষুকের যাচুনা দরিদ্র করতে পারে না এবং নাছোড়বান্দা যাচুনাকারী কৃপণ করতে পারে না। কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর গুণাবলী
এরপর প্রশ্নকারীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলেন যে, আল্লাহর সেসব গুণাবলীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাক যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এবং সেসব গুণাবলীর হেদায়েতের নূর থেকে আলোর অনুসন্ধান করো। যে জ্ঞান অনুসন্ধান করতে শয়তান তোমাকে প্ররোচিত করেছে এবং যে জ্ঞান অনুসন্ধান করার কোন নির্দেশ কুরআনে নেই অথবা রাসুল (সঃ) বা অন্য কোন হাদির কথায় ও কর্মে যে জ্ঞানের কোন ইঙ্গিত পর্যন্ত নেই, তা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দাও । তোমাদের ওপর এটাই আল্লাহর দাবির চরম সীমা । জেনে রাখো, তারাই জ্ঞানে দৃঢ় যারা অপরিজ্ঞাতের পর্দা উন্মোচন করা থেকে বিরত থাকে এবং গুপ্ত ও অপরিজ্ঞাত বিষয়ের বিস্তারিত সম্বন্ধে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে অধিকতর অনুসন্ধান থেকে বিরত থাকে। যে জ্ঞান তাদের দেয়া হয় নি তা পেতে তারা অক্ষম— এ কথা স্বীকার করার জন্য আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেন। আল্লাহকে জানার জন্য এমন কোন গভীর আলোচনায় তারা লিপ্ত হয় না। যা আদেশ করা হয় নি এবং এটাকেই তারা দৃঢ়তা বলে। এটুকুতেই পরিতৃপ্ত হও এবং
তোমার নিজের বুদ্ধিমত্তার পরিমাপের মধ্যে আল্লাহর মহত্ত্বকে সীমাবদ্ধ করো না। অন্যথায় তুমি ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।
তিনি সর্বশক্তিমান। যদি তার ক্ষমতার পর্যাপ্ততা ও সীমা নির্ণয়ের জন্য কল্পনার তীর ছোড়া হয়, মনকে পাপ-চিন্তা মুক্ত করে তার রাজ্যের গভীরে তাকে দেখার চেষ্টা করা হয়, তার গুণাবলীর বাস্তবতাকে উপলব্ধি করার জন্য হৃদয়ে প্রবল আশা পোষণ করা হয় এবং তার সত্তা সম্বন্ধে জ্ঞানার্জনের জন্য অপরিজ্ঞাতের অন্ধকার গর্ত অতিক্রম করে তাঁর প্রতি মনোনিবেশ পূর্বক বুদ্ধিমত্তা ও চিন্তাশক্তির বর্ণনাতীত মহাকাশে প্রবেশ করা হয়; তবুও তিনি তাদেরকে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন—তাঁর গায়েব অবস্থা সম্পর্কে এতটুকুও জানতে পারবে না। তারা পরাজিত হয়ে ফিরে আসবে এবং স্বীকার করবে যে, তার গায়েব এহেন ছড়ানো-ছিটানো প্রচেষ্টা দ্বারা আয়ত্ব করা সম্ভব নয় এবং তার সম্মানিত মহত্ত্বের একটা বিন্দুও চিন্তাবিদদের বোধগম্যতায় আসবে না।
আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে
তিনি কোন প্রকার অনুকরণীয় কিছু ছাড়াই সৃষ্টির উদ্ভাবন করেছেন এবং তাঁর সম্মুখে অন্য স্রষ্টার কোন প্রকার নমুনা ছিল না। তার কুদরতের রাজত্ব তিনি আমাদের দেখিয়েছেন এবং এমন সব অত্যাশ্চার্য বিষয় দেখিয়েছেন যা তার হেকমত প্রকাশ করে। সৃষ্টবস্তু এ কথা স্বীকার করে যে, আল্লাহর কুদরত ও শক্তি তাদেরকে অস্তিত্বে টিকিয়ে রেখেছে। আল্লাহর মারেফাতের অকাট্য প্রমাণাদি তাঁর পরিচয় সম্পর্কে আমাদের অনুধাবন করিয়ে দেয় (অর্থাৎ সৃষ্টি দ্বারাই আল্লাহ স্ব-প্রকাশ; এতে কেউ বলতে পারে না যে, তাঁর পরিচয় পাওয়া যায় নি)। তাঁর সৃষ্ট আশ্চর্যজনক বস্তুনিচয়ে তাঁর সৃষ্টি-ক্ষমতার ও জ্ঞানের ষ্ট্যান্ডার্ড পরিদৃশ্যমান। তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতিটিই তাঁর অনুকূলে এক একটি দলিল ও তাঁকে চিনিয়ে দেয়ার গাইড। এমন কি একটা নিশ্চল জড়বস্তুও এমনভাবে তাকে চিনিয়ে দেয় যেন এটা কথা বলে এবং যেন সে বস্তুর স্রষ্টার পরিচয় সুস্পষ্ট। হে আল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, যে ব্যক্তি তোমার সম্পকীয় জ্ঞানের সাথে নিজের বা তেনকে পরিচিত না করিয়ে তোমাকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিভক্ততা বা হাত-পায়ের জোড়ার সাথে তুলনা করে এবং হৃদয়ে এ মর্মে একিন (দৃঢ়-প্রত্যয়) করে না যে, তোমার কোন অংশীদার নেই, সে ব্যক্তি শিরক করলো। সে যেন শোনেনি, বিভ্রান্ত অনুসারীগণ তাদের মিথ্যা দেবতাকে পরিত্যাগ করে বলেছিল, “আল্লাহর কসম, আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই ছিলাম; যখন আমরা তোমাদেরকে রাব্ববুল আলামীনের সমকক্ষ গণ্য করতাম।” (কুরআন-২৬৪৯৭-৯৮)। তারা ভ্রান্ত যারা তোমাকে তাদের বিগ্রহের অনুরূপ মনে করে এবং তাদের কল্পনার পোষাকে তোমাকে আবৃত করে, তাদের নিজস্ব চিন্তায় শরীরের অংশসমূহ তোমাতে আরোপ করে ও তাদের বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বিভিন্ন প্রকার সৃষ্টির মতো
তোমাকে মনে করে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, যারা তোমার সৃষ্ট কোন কিছুর সমান তোমাকে মনে করে এবং যারা তোমার সদৃশ বলে কোন কিছুকে গ্রহণ করে, তারা তোমার সুস্পষ্ট বাণী ও প্রমাণাদি অনুযায়ী কাফের। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি। যে, তুমিই আল্লাহ যাকে বুদ্ধির শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা যায় না, যাতে কল্পনা দ্বারা তোমার অবস্থার পরিবর্তন স্বীকার করা যায় এবং মনের বেড়ি দিয়েও যাকে আবদ্ধ করা যায় না, যাতে তোমাকে সীমাবদ্ধ করা যায় ।
আল্লাহর সৃষ্টির পরিপূর্ণতা সম্পর্কে
তিনি তাঁর সৃষ্ট প্রত্যেক বস্তুর সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং সেই সীমাকে সুদৃঢ় করেছেন। তিনি তাঁর সৃষ্ট প্রত্যেক বস্তুর কর্মধারা নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং সেই কর্মধারাকে সহজসাধ্য করে দিয়েছেন। তিনি সকল বস্তুর গতিপথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন এবং কোন বস্তু তার অবস্থানের সীমালঙ্ঘন করে না এবং তার লক্ষ্যের শেষ সীমায় পৌছাতে ব্যর্থ হয় না। তার ইচ্ছায় চলার জন্য যখন আদেশ করা হয়েছিল তখন তারা আদেশ অমান্য করে নাই। যেখানে সব কিছু তার ইচ্ছা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সেখানে কিভাবে তারা আদেশ অমান্য করবে? তিনিই বিবিধ প্রকার জিনিস উৎপাদনকারী। এ বস্তুনিচয় সৃষ্টিতে তিনি কোন কল্পনা প্রয়োগ করেন নি, কোন প্রকার গুপ্ত আবেগের বশবর্তী হন নি, সময়ের উত্থান-পতন থেকে কোন প্রকার অভিজ্ঞতা লাভ করেন নি এবং কোন অংশীদারের সহায়তা গ্রহণ করার প্রয়োজন হয় নি।
এভাবে তার হুকুমে সৃষ্টি সম্পন্ন হয়েছিল এবং সৃষ্টি তাঁর প্রতি আনুগত্যের নিদর্শন স্বরূপ সেজদা করেছিল ও তার আহবানে সাড়া দিয়েছিল। কোন কুঁড়ের অলসতা বা কোন ওজর উত্থাপনকারীর সহজাত নিস্ক্রিয়তা আনত হওয়া থেকে বিরত করতে পারে নি। সুতরাং তিনি বস্তুর বক্রতা সোজা করলেন এবং তাদের সীমা নির্ধারণ করে দিলেন। তিনি নিজের ক্ষমতা বলে বস্তুর বিপরীতধর্ম অংশসমূহের মধ্যে সংহতির সৃষ্টি করলেন এবং একইমুখি উপাদানগুলো একত্রিত করলেন। এরপর তিনি তাদেরকে বিবিধভাবে পৃথক করলেন যা সীমায়, পরিমাণে, বৈশিষ্ট্যে ও আকারে ভিন্ন ভিন্ন। এসকল হলো নতুন সৃষ্টি। তিনি তাদের দৃঢ় করলেন এবং তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী আকৃতি দান করলেন ও আবিষ্কার করলেন।
আকাশের বর্ণনা
তিনি আকাশের উন্মুক্ততার অবতল ও সমুন্নতি বিধান করেছেন। তিনি এর ফাটলসমূহের প্রশস্ততা সংযোগ করেছেন এবং একটার সাথে অপরটার জোড়া লাগিয়েছেন। আকাশের উচ্চতা তাদের আসাযাওয়ার জন্য সহজ করে দিয়েছেন যারা তার আদেশ নিয়ে নিচে নেমে আসে এবং বান্দার কর্মকান্ডের সংবাদ নিয়ে ওপরে যায় । তিনি বাষ্প আকারে থাকাকালে এটাকে আহবান করেছিলেন। তৎক্ষনাৎ এর জোড়াসমূহ সংযুক্ত হলো। এরপর আল্লাহ্ এর বন্ধ দরজা খুলে দিলেন এবং উল্কার প্রহরীকে এর ছিদ্রপথে রাখলেন এবং তাঁর কুদরতের হাতে উল্কাকে ধরে রাখলেন যেন এগুলো অনন্ত শূন্যে বিক্ষিপ্ত না হয়। সৃষ্টি করলেন দিনের ঔজ্জ্বল্যের নির্দেশক এবং চন্দ্রকে রাতের অন্ধকারের নির্দেশক হিসাবে। এরপর তিনি তাদেরকে কক্ষপথে স্থাপন করে গতি প্ৰদান করলেন এবং তাদের চলার পথের বিভিন্ন পর্যায়ে গতিধারা নির্ধারিত করে দিলেন যাতে এর সাহায্যে দিবা ও রাত্রি আলাদা করা যায় এবং বছরের গণনা তাদের নির্ধারিত গতিধারা থেকে জানা যায়। তারপর তিনি আকাশের অনন্ত বিস্তারের মধ্যে উজ্জ্বল, মুক্ত ও প্রদীপ সদৃশ তারকারাজী স্থাপন করলেন। যারা আড়িপাতে তাদের প্রতি উজ্জ্বল উল্কাপিন্ডের তীর নিক্ষেপ করলেন। তিনি তারকারাজীকে অনুগত করে রুটিন মাফিক গতিমান করলেন এবং তাদেরকে স্থির নক্ষত্র, চলমান নক্ষত্র, নিম্নগামী নক্ষত্র, উর্ধগামী নক্ষত্র, শুভাশুভ নির্ণয়ক নক্ষত্র ও সৌভাগ্য নির্ণয়ক নক্ষত্রে বিভক্ত করলেন ।
ফেরেশতার বর্ণনা
এরপর মহিমান্বিত আল্লাহ্ তাঁর আকাশে বসবাসের জন্য এবং তাঁর রাজ্যের উধ্বস্তরকে বসতিপূর্ণ করার জন্য মালাইকা নামক নতুন মাখলুক সৃষ্টি করলেন। এদের দ্বারা তিনি মহাশূন্যের প্রশস্ত রাস্তা পরিপূর্ণ করলেন এবং মহাশূন্যের বিশাল পরিধি তাদের দ্বারা বসতিপূর্ণ করলেন। এসব প্রশস্ত রাস্তার মধ্যবতী শূন্যস্থানে তার তসবিহু পাঠরত মালাইকাগণের কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ তসবিহ তাঁর পবিত্রতার বেড়ার মধ্যে, গুপ্ত পর্দার অন্তরালে এবং তার শ্রেষ্ঠত্বের ঘোমটার মধ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এ কান-ফাটা প্রতিধ্বনির অন্তরালে রয়েছে। নূরের তাজাল্লি যাতে দৃষ্টি পৌছার পূর্বেই প্রতিহত হয়ে যায়। ফলে দৃষ্টিশক্তি এর সীমাবদ্ধতায় হতভম্ব হয়ে থেমে থাকে।
তিনি তাদেরকে বিবিধ আকৃতি ও বৈশিষ্ট্যে সৃষ্টি করেছেন। তাদের পাখা আছে। তারা আল্লাহর ইজ্জতের মহিমার তসবিহ করে। এ বিশ্ব-চরাচর সৃষ্টিতে আল্লাহ যে নৈপুণ্য দেখিয়েছেন এর কোন কিছু তাদের নিজেদের বলে তারা দাবি করে না। কোন কিছু সৃষ্টি করেছে বলেও তারা দাবি করে না। “তারা তো তার সম্মানিত বান্দা যারা তার আগ-বাড়িয়ে কথা বলে না এবং তারা তার আদেশ অনুসারেই কাজ করে” (কুরআন-২১৪২৩-২৭)। তিনি তাদেরকে তাঁর অহির আমানতদার করেছেন এবং তাঁর আদেশনিষেধের ধারক ও বাহক স্বরূপ নবিগণের কাছে প্রেরণ করেছেন। তিনি তাদেরকে সংশয়ের বিরুদ্ধে অনাক্রমণ্য করেছেন। ফলে তাদের কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির পথ থেকে বিপথে যায় না। তিনি তাদেরকে সকল প্রকার বিপদাপদ থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন এবং তাদের হৃদয়কে বিনম্রতা ও প্রশান্তিতে ভরপুর করে দিয়েছেন। তাঁর মহত্বের কাছে বিনয়াবনত হওয়ার সকল দরজা তিনি তাদের জন্য খুলে দিয়েছেন। তাঁর একত্রে নিদর্শন স্বরূপ তিনি তাদের জন্য উজ্জ্বল মিনার নির্ধারণ করেছেন। পাপের ভারে কখনো তারা ভারাক্রান্ত হয় না এবং রাত ও দিনের পরিবর্তন তাদেরকে নড়-চড় করায় না। সংশয়ের তীর কখনো তাদের ইমানের দৃঢ়তাকে আক্রমণ করতে পারে না। আশঙ্কা কখনো তাদের একিনের ভিত্তিকে আক্রমণ করতে পারে না। তাদের মধ্যে ঈর্ষার আগুন জুলে না। আল্লাহর মারেফাত সম্বন্ধে যে জ্ঞান তাদের হৃদয়ে রয়েছে এবং তাদের বক্ষে আল্লাহর যে মহত্ত্ব ও আজমত স্থান পেয়েছে প্রচন্ড বিস্ময়ও তা স্নান করে না। শয়তানের ওয়াস-ওয়াসা (পাপ-চিন্তা) তাদেরকে স্পর্শ করে না এবং তাদের চিন্তায় কোন সন্দেহ প্ৰবেশ করতে পারে না। তাদের মধ্যে এমন অনেক আছে যারা গভীর মেঘপুঞ্জে, উত্ত্বঙ্গ পর্বত শিখরে অথবা অপরিসীম অন্ধকারে অবস্থান করে এবং এমন অনেক আছে যাদের পা মাটির সর্বনিম্ন স্তর ভেদ করে পৌছেছে। এ পাগুলো শ্বেত-প্রতীক স্বরূপ যা বায়ুমন্ডল পার হয়ে গেছে। তার নিচে হালকা বাতাস প্রবাহিত হয় এবং শেষ সীমার প্রতি তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ।
তার ইবাদতে মশগুল থাকায় তারা সকল বিষয়-মুক্ত এবং ইমানের বাস্তবতা তাদের ও আল্লাহর মারেফাতের মধ্যে সংযোগ হিসাবে কাজ করে। তার প্রতি তাদের একিন তাদেরকে ধ্যানে নিমগ্ন রেখেছে। তারা শুধু তার কাছেই প্রত্যাশা করে, অন্য কারো কাছে নয়। তারা তার মারেফাতের স্বাদ পেয়েছে এবং তাঁর মহব্বতের তৃপ্তিকর পেয়ালা থেকে তারা পান করেছে। তাদের হৃদয়ের গভীরে তাঁর ভয় শিকড় গেড়ে আছে। ফলত তার ইবাদত করতে করতে তারা তাদের সোজা পিঠ বঁকা করে ফেলেছে। সুদীর্ঘ বিনম্রতা ও অতি নৈকট্য তাদের ভয়কে দূরীভূত করে নি।
তাদের অত্যধিক আমল সত্ত্বেও তারা কখনো মদমত্ত হয় না। আল্লাহর মহত্ত্বের সামনে তাদের বিনমতা কখনো তাদেরকে নিজের গুণের কথা ভাববার সময় দেয় না। অনন্তকাল ধরে ধ্যানমগ্ন থাকা সত্ত্বেও কোন অবসন্নতা তাদের স্পর্শ করে না। আল্লাহর কাছে তাদের আকাঙ্খা (তাকে পাবার) কখনো এহাস পায় না, যাতে তারা তাদের প্রতিপালকের প্রতি নিরাশ হতে পারে। অবিরত জেকেরেও তাদের জিহবা শুকিয়ে যায় না। অন্য কোন দায়-দায়িত্বে তারা বিজড়িত হয় না, যাতে তার তসবিহ পাঠের উচ্চস্বর ক্ষীণ হতে পারে। ইবাদতের ভঙ্গির কারণে তাদের স্কন্দ কখনো স্থানচ্যুত হয় না। তারা কখনো তাঁর আদেশ অমান্য করে আরামের জন্য (এদিক সেদিক) ঘাড় নাড়ায় না। অবহেলার মূর্খতাবশত তারা সংকল্প বিরোধী কাজ করে না এবং আকাঙখার প্রবঞ্চনা তাদের সাহসকে অতিক্রম করতে পারে না।
তারা আরুশের অধিপতিকে তাদের প্রয়োজনের দিনের মজুদ মনে করে। তার প্রতি তাদের মহব্বতের কারণে তারা শুধু তারই দিকে মুখ করে আছে। তারা তার ইবাদতের শেষ সীমায় পৌছায় নি। তার ইবাদতের জন্য তাদের আবেগপ্রবণ অনুরাগ তাদেরকে নিজেদের হৃদয়ের প্রস্রবন ছাড়া অন্য দিকে ফেরায় না। এ প্রস্রবন কখনো তার আশা ও ভয়হীন হয় না। আল্লাহর ভয় কখনো তাদেরকে ত্যাগ করে না, যাতে তারা তাদের প্রচেষ্টায় শিথিল হতে পারে। লোভ-লালসা কখনো তাদেরকে জড়াতে পারে না, যাতে তারা স্বল্প অনুসন্ধানকে ইবাদতের ওপর অগ্রাধিকার দেবে।
তারা তাদের অতীত, কর্মকান্ডকে বড় করে দেখে না, কারণ তা করলে তাদের আশা হাদয় থেকে ভয়কে মুছে ফেলতো। তাদের ওপর শয়তানের নিয়ন্ত্রণের ফলে তারা তাদের প্রতিপালক সম্বন্ধে পরস্পর মতবিরোধ করে না। একে অপর থেকে বিচ্ছিন্নতার পাপ তাদের বিচ্ছিন্ন করে না। অন্তরে সঞ্চিত বিদ্বেষ ও পারস্পরিক ঘূণা তাদের পরাভূত করে না। দোদুল্যমানতার পথ তাদেরকে বিভক্ত করে না। সাহসের মাত্রার ব্যবধান তাদেরকে অনৈক্যের মধ্যে নিপতিত করে না। এভাবে তারা ইমানের অনুরাগী। কোন প্রকার মনের বক্রতা বা বাড়াবাড়ি বা শৈথিল্য বা জড়তা তাদেরকে ইমানের রাশিচু্যত করে না। আকাশে সূচাগ্র স্থান নেই যেখানে কোন না কোন ফেরেশতা সেজদাবনত নেই বা আল্লাহর আদেশ দ্রুত পালনে ব্যস্ত নেই। তাদের প্রতিপালকের দীর্ঘ ইবাদত দ্বারা তারা তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি করে এবং তাদের হৃদয়ে তাদের প্রতিপালকের সম্মান বৃদ্ধি পায়।
পৃথিবীর বর্ণনা
আল্লাহ পৃথিবীকে ঝঞা-বিক্ষুব্ধ ও উত্তাল উৰ্মিমালা এবং ফেপে উঠা সমুদ্রের ওপর বিস্তৃত করলেন। সমুদ্রের মধ্যে সুউচ্চ তরঙ্গমালা একে অপরের সাথে সংঘাত করতো এবং টগবগিয়ে একে অপরের ওপর গড়িয়ে পড়তো। যৌন উত্তেজনার সময় উটের মুখ দিয়ে যেভাবে ফেনা বের হয়। উর্মিমালা থেকেও তেমন ফেনপুঞ্জ নির্গত হয়েছিল। সুতরাং পৃথিবীর ভারে ঝঞাপূর্ণ পানির আলোড়ন প্রদমিত হলো। যখন পৃথিবী তার বুক দিয়ে চাপ দিল তখন শী শাঁ করা আন্দোলন বন্ধ হলো। যখন পৃথিবী তার চড়াই উৎরাইসহ গড়িয়ে গেল, পানি তখন শান্ত হয়ে গেল। এভাবে উত্তাল তরঙ্গের পর পানি পরাভূত ও অনুগত হলো এবং পরাজিত বন্দীর মত অসম্মানের শিকলে বাধা পড়লো। অপরপক্ষে পৃথিবী নিজেকে বিস্তৃত করে বিক্ষুব্ধ পানির মধ্যে শক্ত হতে লাগলো। (এভাবে) পৃথিবী পানির দর্প, আত্মগর্ব, উচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব চূর্ণ করে দিল এবং তার প্রবাহের নিভীকতাকে নিচুপ করিয়ে দিল। ফলে পানি ঝঞা-বিক্ষুব্ধ প্রবাহের পর চুপ হয়ে গেল এবং প্রবল আলোড়নের পর স্থির হয়ে গেল।
যখন পৃথিবী ও তার স্কন্ধে স্থাপিত সুউচ্চ পর্বতমালার চাপে পানির উত্তেজনা প্রদমিত হলো আল্লাহ তখন পর্বতের চূড়া থেকে ঝরনাধারা প্রবাহিত করলেন। এ ঝরনাধারা সমতল প্রান্তর ও নিচু ভূমির মধ্য দিয়ে বণ্টন করলেন এবং প্রোথিত পাথর ও উচু পর্বত দ্বারা প্রবাহকে পরিমিত করলেন। এরপর পৃথিবীর উপরিভাগের বিভিন্ন স্থানে পর্বতমালা গেড়ে দেয়ার ফলে পৃথিবীর কম্পন থেমে গেল। তারপর আল্লাহ পৃথিবী ও নভোমন্ডলের মধ্যে অসীমতা সৃষ্টি করলেন এবং পৃথিবীর অধিবাসীর জন্য প্রবাহিত বাতাস সৃষ্টি করলেন। তারপর পৃথিবীর বাসিন্দাদেরকে সুবিধাজনক স্থানসমূহে ছড়িয়ে পড়তে নির্দেশ দিলেন। এরপর পৃথিবীর যে সকল অঞ্চলে ঝরনাধারা ও নদী প্রবাহিত হতে পারে নি, সেসব অঞ্চলকে তিনি অনুর্বর ফেলে রাখেন নি। সে সব অঞ্চলের জন্য তিনি ভাসমান মেঘ সৃষ্টি করলেন, যা অনুৎপাদনশীল অঞ্চলকে জীবিত করে সজীবতা আনয়ন করেছে।
তিনি খন্ড খন্ড ছোট মেঘকে জড়ো করে প্রকান্ড মেঘ তৈরি করলেন এবং মেঘের মধ্যে জলকণা জমে মেঘ থেকে যখন বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করলো তখন তিনি তাকে প্রবল বৃষ্টিপাত রূপে প্রেরণ করলেন। মেঘ পৃথিবীর দিকে বুলিছিল এবং দক্ষিণা বাতাস মেঘকে চারদিক থেকে পেষণ করে তার পানি ঝরিয়েছিল। যেমন করে উস্ত্রী দুধ দোহনের জন্য পিছনের দিক বঁকা করে দেয়। যখন মেঘ নিজেকে আনত করে বাহিত সমুদয় পানি বর্ষণ করলো তখন আল্লাহ সমতল ভূমিতে উদ্ভিদ ও পর্বতে লতাপাতা জন্মলেন। ফলে পৃথিবী উদ্যান সুশোভিত হয়ে আনন্দদায়ক হলো এবং নরম উদ্ভিদের সজীব পোষাক ও ফুলের অলঙ্কারে চমক লাগিয়ে দিল। আল্লাহ এসব কিছু মানুষ ও পশুর খাদ্য হিসাবে তৈরি করলেন। আল্লাহ পৃথিবীর বিত্তীর্ণ স্থানে রাজপথ খুলে দিয়েছেন এবং যারা রাজপথে চলে তাদের জন্য হেদায়েতের মিনার প্রতিষ্ঠা করেছেন।
মানুষ সৃষ্টি ও নবি প্রেরণ সম্পর্কে
যখন তিনি পৃথিবীকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাঁর আদেশ কার্যকরী করেছেন তখন তিনি আদমকে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম হিসাবে পছন্দ করেছেন এবং তাকে সকল সৃষ্টির প্রথম হবার গৌরব দান করেছেন। তিনি তাকে বেহেশতে বসবাস করতে দিলেন এবং সেখানে তার খাবার ব্যবস্থা করলেন এবং যা তার জন্য নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি তাও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তিনি তাকে বললেন যে, এর প্রতি অগ্রসর হওয়া অবাধ্যতার সামিল এবং তাতে তার নিজের মর্যাদা বিপজ্জনক হবে। কিন্তু আদমকে যা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল তিনি তা করে বসলেন, যা আল্লাহর জ্ঞানে ধরা ছিল। ফলে তার তাওবা কবুল করার পর আল্লাহ্ তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করলেন এবং তার বংশধর দ্বারা আল্লাহর পৃথিবী জনবসতিপূর্ণ হলো যারা সৃষ্টির মধ্যে তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ ও ওজর হিসাবে বিরাজিত।
এমনকি আল্লাহ যখন আদমের মৃত্যু ঘটালেন তখনো তিনি তাদের মাঝে তাঁর খোদাত্রে প্রমাণ ও ওজর পরিবেশনকারী না দিয়ে ছাড়েন নি যারা মানুষ ও আল্লাহর জ্ঞানের মধ্যে সংযোগ হিসাবে কাজ করেছে। কিন্তু তিনি তার মনোনীত নবির মাধ্যমে তাদের কাছে প্রমাণাদি প্রেরণ করেছেন যারা ছিলেন তাঁর বাণীর বিশ্বস্ত বাহক এবং যুগের পর যুগ এ ধারা চলে আসছিলো। নবি মোহাম্মদের (সঃ) আগমনে এ ধারা শেষ হলো এবং আল্লাহর ওজর ও সতর্কাদেশ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে গেল।
তিনি জীবিকার প্রতুলতা ও অপ্রতুলতা নির্ধারণ করে দিলেন। তিনি তাদের কাউকে অল্প, আবার কাউকে অপরিমিত জীবিকা বণ্টন করে দিলেন। তিনি ন্যায় বিচারের সাথে এরূপ করলেন মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। কাউকে প্রাচুর্য দিয়ে আবার কাউকে নিঃস্ব করার মাধ্যমে তিনি ধনী ও দরিদ্রের কৃতজ্ঞতা ও সহিষ্ণুতা পরীক্ষা করলেন। তারপর তিনি প্রাচুর্যের সাথে দুর্ভাগ্য, নিরাপত্তার সাথে দুর্যোগের ঘনঘটা ও ভোগের আনন্দের সাথে শোকের বেদনা একত্রে জুড়ে দিলেন। তিনি বয়ঃসীমা নির্ধারণ করে দিলেন এবং এটা কারো জন্য দীর্ঘ, কারো জন্য স্বল্প, কারো জন্য আগে ও কারো জন্য পরে করলেন এবং
মৃত্যুর সাথে তাদের পরিসমাপ্তি ঘটালেন। বয়সের দড়ি টেনে ছিড়ে ফেলার ক্ষমতা তিনি মৃত্যুকে কিনলেন।
যারা গোপন করে তাদের গুপ্ত বিষয়, যারা গোপন আলাপে লিপ্ত তাদের গুপ্ত আলোচনা, যারা অনুমানের ওপর নির্ভর করে তাদের বাতেন অনুভূতি, সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ ঘটনাবলী, চোখের ইঙ্গিত-ইশারা, হৃদয়ের গভীরে যা কিছু এবং অজানা বিষয়ের গভীরে যা নিহিত আছে— এ সব কিছু তিনি জানেন। যা কানের ছিদ্র বঁকা করে শুনতে হয়, পিপীলিকার গ্রীষ্মকালীন আশ্রয়, কীট-পতঙ্গের শীতকালীন আবাস, শোকাহত নারীর কান্নার প্রতিধ্বনি ও পদক্ষেপের শব্দ—এসবও তিনি জানেন। পাতার অভ্যন্তরের শীষ, যেখানে ফল জন্মে; পশুর লুকাবার স্থান যেমন পর্বত ও উপত্যকার গুহা, বৃক্ষের কান্ডের গর্ত ও তৃণ-গুল্ম যেখানে মশা লুক্কায়িত থাকে, বৃক্ষের শাখার যে স্থানে পাতা গজায়, কটি দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত বীর্যের ফোটার পতন স্থান, ক্ষুদ্র মেঘ খন্ড ও বিশাল মেঘমালা, ঘন মেঘে বৃষ্টির ফোটা, দমকা বাতাসে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণা, বৃষ্টি-বন্যায় মুছে যাওয়া রেখাসমূহ, বালিরাশির ওপর কীট-পতঙ্গের চলাফেরা, পর্বতের গহবরে পাখা-ওয়ালা প্রাণীর বাসা এবং ডিম পাড়ার স্থানে পাখীর কৃজন—এসব কিছুই তিনি জানেন।
মুক্তার মাতা যা কিছু সঞ্চিত রেখেছে, মহাসমুদ্রের তরঙ্গমালার নিচে যা কিছু আছে, রাত্রির অন্ধকারে যা লুক্কায়িত আছে, দিনের আলোয় যা প্রতিভাত হয়, যাতে কখনো রাতের অন্ধকার আবার কখনো দিনের আলো বিরাজ করে, প্রতিটি পদক্ষেপের চিহ্ন, প্রতিটি নড়চড়ের অনুভূতি, প্রতিটি ধ্বনির প্রতিধ্বনি, প্রতিটি ঠোঁটের নড়াচড়, প্রতিটি জীবের আবাস স্থল, প্রতিটি অণুর ওজন, হৃদযন্ত্রের প্রতিটি স্পন্দন এবং পৃথিবীর উপরিভাগে যা কিছু আছে যেমন গাছের ফল অথবা ঝরে-পড়া পাতা অথবা বীর্য জমা হবার স্থান অথবা রক্তের জমাট বাঁধন অথবা মাংশপিন্ড এবং জীবন ও ভ্রণে উন্নীত হওয়া—এসব কিছু তিনি জানেন।
এত কিছু সত্ত্বেও তাঁকে কোন অসুবিধা ভোগ করতে হয় না এবং তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা
সংরক্ষণে কোন প্রতিবন্ধকতা তাকে প্রতিহত করতে পারে না। তাঁর আদেশ বলবৎকরণে ও সমগ্র সৃষ্টির
ব্যবস্থাপনায় কোন প্রকার অবসন্নতা বা শোক বাধার সৃষ্টি করতে পারে না। তাঁর জ্ঞান সমগ্র সৃষ্টিকে ঘিরে আছে এবং সব কিছুই তাঁর গণনার মধ্যে রয়েছে। সব কিছুই তাঁর বিচারাধীন এবং তিনি যা প্রাপ্য তা প্রদানে ব্যর্থতা সত্ত্বেও তাঁর রহমত তাদের ঘিরে আছে। হে আমার আল্লাহ! সকল সুন্দর বর্ণনা ও সর্বোচ্চ গুণগান তোমারই প্রাপ্য। যদি কিছু কাম্য থাকে তবে তুমিই সর্বোত্তম কাম্য। যদি কিছু আশা করার থাকে। তবে তুমিই সর্বোত্তম সম্মানিত সত্তা যার কাছে আশা করা যায়। হে আমার আল্লাহ! তুমি আমাকে এমন ক্ষমতা দান করেছো। যার ফলে তুমি ব্যতীত অন্য কারো প্রশংসা আমি করি না এবং তুমি ব্যতীত অন্য কারো জন্য আমার কোন প্রশংসাত্মক উক্তি নেই। আমার প্রশংসাকে কখনো তাদের দিকে পরিচালিত করি না যারা হতাশার উৎস ও সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দু। মানুষকে প্রশংসা করা ও সৃষ্টির গুণকীর্তন করা থেকে তুমি আমার জিহবাকে বিরত রেখেছো। হে আমার আল্লাহ! প্রত্যেক প্রশংসাকারীর (যাকে সে প্রশংসা করে তার কাছ থেকে) পুরস্কার ও বিনিময় পাওয়ার অধিকার আছে। নিশ্চয়ই, আমি তোমার দিকে মুখ ফিরায়েছি। এবং আমার চোখ তোমার দয়া ও ক্ষমার ভান্ডারের দিকে তাকিয়ে আছে।
হে আমার আল্লাহ! সে ব্যক্তি এখানে দাঁড়িয়ে আছে (অর্থাৎ আমি) যে তোমাকে এক ও একক মনে করেছে এবং তুমি ব্যতীত অন্য কাউকে প্রশংসা ও গুণকীর্তন পাওয়ার যোগ্য মনে করে না। তোমার কাছে আমার চাহিদা তোমার দয়া ছাড়া অন্য কিছু নয়; তোমার দয়ার চরম দারিদ্র তুমি ঘুচিয়ে দাও। সুতরাং এ স্থানে তোমার ইচ্ছাকে আমাদের জন্য মঞ্জর কর এবং তুমি ছাড়া অন্য কারো কাছে হাত পাতা থেকে তুমি আমাদের রক্ষা করো। “নিশ্চয়ই, তুমি সকল বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান” (কুরআন-৬৬ ঃ ৮)।
১। এ খোৎবাটির নামকরণ করা হয়েছে “খোৎবাতুল আশবাহ”। আশবাহ শব্দটি শাবাহ শব্দের বহুবচন এবং শাবাহ শব্দের অর্থ হলো কঙ্কাল। যেহেতু এ খোৎবায় আল্লাহর গুণাবলী, কুদরত ও সৃষ্টি বর্ণিত হয়েছে, যা কারো পক্ষে বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়, সেহেতু একে কঙ্কাল বলা হয়েছে। কুরআন সাক্ষ্য দেয় পৃথিবীর সমুদয় জলরাশি কালি হলে এবং সকল বৃক্ষ-গাছ-পালা কলম হলেও আল্লাহর গুণরাজী লিখে শেষ করা যাবে না। কাজেই এ খোৎবাকে ‘কঙ্কাল’ বলা যুক্তিযুক্ত।
প্রশ্নকারীর ওপর আমিরুল মোমেনিন রাগান্বিত হবার কারণ হলো, তার অনুরোধ। শরিয়তের গন্ডির বাইরে এবং এহেন বর্ণনা মানুষের ক্ষমতার সীমা বহির্ভূত।
২। আল্লাহ জীবিকার নিশ্চয়তাদানকারী ও ব্যবস্থাপক। তিনি বলেছেনঃ
ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী সকলের জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই (কুরআন-১১ ঃ ৬)। কিন্তু তিনি জীবিকার নিশ্চয়তাদানকারী অর্থ হলো যে, তিনি প্রত্যেকের জন্য জীবিকা উপার্জনের পথ করে দিয়েছেন এবং প্রত্যেককে বনে, পর্বতে, খনিতে, নদীতে ও বিশাল পৃথিবীতে জীবিকা মঞ্জর করেছেন। তিনি প্রত্যেককে তাঁর নেয়ামত ভোগ করার অধিকার দিয়েছেন। না তার নেয়ামত কোন ব্যক্তি বিশেষের জন্য নির্ধারিত; না তার খাদ্য উপাদানের দরজা কারো জন্য বন্ধ। আল্লাহ বলেনঃ
তোমার প্রতিপালক তাঁর নেয়ামত দ্বারা এদেরকে ও ওদেরকে সাহায্য করেন এবং তোমার প্রতিপালকের নেয়ামত অবারিত (কুরআন-১৭ ? ২০)
যদি কোন ব্যক্তি অলসতা ও আরাম-আয়েশের কারণে নিঃচেষ্ট হয়ে বসে থাকে। তবে জীবিকা কখনো তার দরজায় পৌছবে না। আল্লাহ বিবিধ খাদ্য সামগ্রী ছড়িয়ে রেখেছেন। কিন্তু এগুলো পেতে হলে হস্ত-পদ সঞ্চালন করা প্রয়োজন। তিনি সমুদ্রের তলদেশে মুক্তা সঞ্চিত রেখেছেন। কিন্তু এগুলো পেতে হলে ডুব দিতে হবে। তিনি পর্বতকে চুনি ও মূল্যবান পাথর দ্বারা পরিপূর্ণ করেছেন। কিন্তু খনন করা ছাড়া এগুলো পাওয়া যায় না। তিনি ফসল ফলানোর সকল প্রকার উপাদন মাটিতে দান করেছেন। কিন্তু বীজ বপন না করলে এসব উপাদানের সুফল ভোগ করা যায় না। খাদ্যদ্রব্য পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়িয়ে আছে কিন্তু ভ্রমণের কষ্ট স্বীকার না করলে এসব খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করা যায় না। আল্লাহ বলেনঃ অতএব তোমরা দিক-দিগন্তে বিচরণ করা এবং তাঁর প্রদত্ত জীবনোপকরণ থেকে আহার্যগ্রহণ কর (কুরআন-৬৭ ° ১৫) | আল্লাহ জীবিকা দানকারী। এর অর্থ এ নয় যে, জীবিকা অন্বেষণের জন্য কোন চেষ্টার প্রয়োজন নেই বা ঘরের বের হবার প্রয়োজন নেই; জীবিকা নিজের থেকেই অনুসন্ধানকারীর কাছে হাজির হবে। তিনি জীবিকা দানকারী, একথার অর্থ হলো, তিনি মাটিকে উৎপাদনের সকল গুণাগুণ দান করেছেন, অঙ্কুরিত হবার জন্য বৃষ্টি দিয়েছেন, শস্য-কণা, ফল-ফলাদি ও শাক-সবজি সৃষ্টি করেছেন। এসব কিছুই আল্লাহ প্রদত্ত কিন্তু এগুলো সংগ্রহ করা মানুষের চেষ্টার সাথে সম্পৃক্ত। যে কেউ সংগ্রহে চেষ্টা করবে। সে তার চেষ্টার ফল পাবে, আর যে চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকবে সে তার অলসতার ফল ভোগ করবে। আল্লাহ বলেনঃ মানুষ চেষ্টা ছাড়া কিছুই পায় না (কুরআন-৫৩ ? ৩৯) বিশ্বের সকল মানুষ একটা প্রবাদের শৃঙ্খলে বাঁধা; প্রবাদটি হলো, “যেমন কর্ম তেমন ফল।” বপন না করে অঙ্কুরের আশা বা চেষ্টা ছাড়া ফলাফলের আশা করা একটা ভ্ৰম। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেয়া হয়েছে কর্মঠ রাখার জন্য। আল্লাহ মরিয়মকে সম্বোধন করে বলেনঃ
তুমি তোমার দিকে খেজুর গাছের কান্ডে নাড়া দাও, এটা তোমার ওপর সুপক্ক তাজা খেজুর ফেলবে । তখন আহার কর, পান কর ও চক্ষু শীতল কর (কুরআন, ১৯ ? ২৫-২৬)
আল্লাহ মরিয়মের জীবিকার সংস্থান করেছিলেন। কিন্তু তিনি খেজুর পেড়ে তার হাতে তুলে দেন নি। তিনি গাছকে সবুজ রেখে খেজুর উৎপাদন করার ব্যবস্থা করেছেন এবং সেই খেজুর সুপক্ক হবার ব্যবস্থাও করেছেন। কিন্তু যখন খেজুর পাড়ার প্রয়োজন হলো তখন আর হস্তক্ষেপ না করে মরিয়মকে তার কাজ মনে করিয়ে দিলেন অর্থাৎ তার হস্তদ্বয় সঞ্চালন করে খাদ্যের ব্যবস্থা করা।
আবার, আল্লাহ জীবিকার সংস্থান করেন বলতে যদি এটা বুঝায় যে, যা কিছু দেয়া হয়েছে ও গৃহীত হয়েছে এবং মানুষ যা কিছু উপার্জন ও আহার করে উহা আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত তা হলে হালাল ও হারামের প্রশ্ন থাকে না। চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, নিপীড়ন, লুট— যেভাবে পাওয়া যাক না কেন তা আল্লাহর কাজ এবং অন্যায়ভাবে প্রাপ্ত বস্তু আল্লাহর সংস্থান বলে বুঝা যাবে। এতে মানুষের ইচ্ছার কোন স্বাধীনতা নেই বলেই মনে করা হবে। আসলে তা নয়। যেহেতু প্রতিটি কাজে হালাল ও হারামের প্রশ্ন জড়িত সেহেতু কর্মে মানুষের ইচ্ছার স্বাধীনতা রয়েছে। সকল সম্ভাবনা আল্লাহ্ কর্তৃক চালিত কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করা মানুষের দায়িত্ব ও ইচ্ছাধীন। এ বাস্তবায়নে হালাল ও হারামের প্রশ্ন জড়িত। হালাল উপায়ে বাস্তবায়ন অনুমোদিত এবং হারাম উপায়ে বাস্তবায়ন পাপে জড়িত যার জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ভ্ৰাণ যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন তার প্রয়োজন মতো খাদ্য আল্লাহ তাকে পৌছে দিচ্ছেন। কিন্তু এ ভ্রণ যখন পৃথিবীর আলোতে আসে তখন তার ঠোঁট দিয়ে না চুষলে খাদ্য পায় না। আবার বয়স হলে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার না করলে খাদ্য যোগাড় করতে পারে না। কাজেই খাদ্যের সংস্থান আল্লাহ করে রেখেছেন। মানুষকে নিজের চেষ্টা দ্বারা হালাল কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সংস্থানকে কাজে লাগিয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হয়। খাদ্য আপনা। আপনি মানুষের হাতে এসে পৌছায় না।
৩। এ বিশ্বের কর্মকান্ড ব্যবস্থাপনার সাথে আল্লাহ কর্মের কারণকে সম্পৃক্ত করেছেন যার ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে না। একইভাবে তিনি মানুষের কর্মকে তাঁর মহান ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল করেছেন যাতে করে মানুষ স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে নিজের কর্মক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে। মানুষের ইচ্ছা স্বাধীন, না কি আল্লাহর ইচ্ছাধীন—এ বিতর্কের মূল ইসু এটাই। সমগ্র বিশ্বচরাচরে প্রকৃতির বিধান যেভাবে কাজ করছে, ঠিক সেভাবেই খাদ্য উৎপাদন ও বন্টন মানুষের তকন্দির ও চেষ্টা এ দ্বৈত শক্তি দ্বারা পরিচালিত এবং মানুষের চেষ্টা ও ভাগ্যলিপি অনুপাতেই এটা কোথাও বেশি কোথাও কম হয়ে থাকে। যেহেতু তিনি জীবিকার উপায়-উপকরণ সমূহের স্রষ্টা এবং তিনিই জীবিকা অন্বেষণের ক্ষমতা দান করেছেন সেহেতু জীবিকার স্বল্পতা বা প্রাচুর্য উভয়ই তাঁর দ্বারা হচ্ছে বলে গণ্য করা হয়। কারণ মানুষের চেষ্টা ও কর্মের পরিমাণ এবং মঙ্গল বিবেচনা করে তিনি প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে জীবিকার পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলে কোথাও দুর্ভিক্ষ, কোথাও সমৃদ্ধি আবার কোথাও দুঃখ-দুর্দশা, কোথাও আরাম-আয়েশ এবং কেউ মহানন্দে উপভোগরত আবার কেউ অভাব অনটনে জর্জরিত। আল্লাহ বলেনঃ তিনি যার প্রতি ইচ্ছা রিযক বর্ধিত করেন অথবা সঙ্কুচিত করেন । তিনি সর্ব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত (কুরআন-৪২ ? ১২) । এ বিষয়টি আমিরুল মোমেনিন। ২৩ নং খোৎবায় উল্লেখ করে বলেছেন, “প্রত্যেকের ভাগে যা লিপিবদ্ধ আছে তা আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে। এটা বৃষ্টির ফোটার মত বেশি বা কম হয়ে থাকে।” বৃষ্টি দানের একটা নির্দিষ্ট নিয়ম ও পদ্ধতি রয়েছে, যেমন—সমুদ্রের বাষ্প জলকণাসহ উঠে এসে ঘনকালো মেঘরূপে ছড়িয়ে পড়ে এবং তারপর তা থেকে পানি ফোটা হয়ে চুইয়ে পড়ে। এ বৃষ্টি সমতল ভূমি ও উচু এলাকাকে ভিজিয়ে চাষোপযোগী করে এবং নিচু এলাকার দিকে এগিয়ে গিয়ে জমে থাকে যাতে তৃষ্ণার্তা পান করতে পারে, প্রাণীকুল ব্যবহার করতে পারে এবং শুষ্ক ভূমিতে দেয়া যায়। একইভাবে আল্লাহ জীবিকার সকল উপায়-উপকৰণ দান করেছেন। কিন্তু তাঁর দান একটা বিশেষ পদ্ধতি অনুসরণ করে যা বিন্দুমাত্রও ব্যতিক্রম হয় না। আল্লাহ বলেনঃ আমাদেরই হাতে রয়েছে প্রত্যেক বস্তুর ভান্ডার এবং আমরা তা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই দিয়ে। থাকি (কুরআন-১৫ : ২১) । ধন-সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে মানুষের লোভ-লালসা যখন সীমালজান করে তখন মানুষ আল্লাহকে ভুলে যায় এবং আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে ধ্বংসের পথে চলে যায়। যেমন করে অতি-বৃষ্টি ফসল উৎপাদনের পরিবর্তে বিনষ্ট করে ফেলে। ফলে আল্লাহ বলেনঃ আল্লাহ তাঁর সকল বান্দাকে জীবনোপকরণের প্রাচুর্য দিলে তারা পৃথিবীতে অবশ্যই বিপর্যয় সৃষ্টি করতো, কিন্তু তিনি তাঁর ইচ্ছামত পরিমাণেই তা দিয়ে থাকেন। তিনি তাঁর বান্দাগণকে সম্যক জানেন ও দেখেন (কুরআন- ৪২,৫২৭) বৃষ্টি না হলে যেভাবে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে এবং প্রাণীকুল বিরান হয়ে যায় তদ্রুপ জীবিকার উপায়উপকরণ প্রদান বন্ধ করে দিলে মানব সমাজ বিলীন হয়ে যাবে। আল্লাহ বলেনঃ এমন কে আছে, যে তোমাদেরকে জীবনোপকরণ দান করবে, তিনি যদি জীবনোপকরণ বন্ধ করে দেন” (কুরআন-৬৭ ? ২১) (এই খোৎবার টাকা ২ ও ৩-এ জীবনোপকরণ বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অদৃষ্টবাদ ও ইচ্ছার স্বাধীনতাবাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হয়েছে। এ বিষয় দুটি ধর্ম-দর্শনে খুবই বিতর্কিত। ইসলামের অনেক পূর্ব হতেই দার্শনিকগণ এ বিতর্কের অবতারণা করেছেন। মুসলিম দার্শনিকগণ এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিষয়টি এত বিতর্কিত যে, কোন দুজন দার্শনিক একই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন নি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে মোঃ সোলায়মান আলী সরকারের “ইবনুল আরাবী ও জালালুদ্দীন রুমী” এবং আমিনুল ইসলামের “জগৎ জীবন দর্শন’ গ্রন্থদ্বয়ের যথাক্রমে পৃষ্ঠা ৩০৪-৩৩৬ ও পৃষ্ঠা ২৮০-২৯০ দেখার জন্য সৃহৃদয় পাঠককে অনুরোধ করা হলো—বাংলা অনুবাদক)। ৪ । আমিরুল মোমেনিন যে বাগীতার সাথে আল্লাহর জ্ঞানের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন এবং যে সব মহত্ত্বপূর্ণ শব্দ দ্বারা আল্লাহর জ্ঞান চিত্রায়িত করেছেন তাতে যে কোন মৃত-হৃদয় সম্পন্ন বিরোধী ব্যক্তিও মোহিত হয়ে যায়।
হাদীদ”** (৭ম খন্ড, পৃঃ ২৩-২৫) লেখেছেনঃ এরিষ্টটল বিশ্বাস করতো আল্লাহ বিশ্বচরাচর সম্বন্ধে অবহিত কিন্তু তা বিশদভাবে নয়। যদি সে আমিরুল মোমেনিনের এ খোৎবা শুনতো। তবে তার হৃদয়ও অনুরক্ত হতো, তার চুল দাঁড়িয়ে যেতো এবং তার চিন্তায় নাটকীয় পরিবর্তন আসতো । তোমরা কি খোংবাটির ঔজ্জ্বল্য, শক্তিমান গতি, প্রচন্ডতা, মহিমা, মহত্ত্ব, ঐকান্তিকতা ও পূর্ণতা দেখতে পাও না? এসব বৈশিষ্ট্য ছাড়াও এতে রয়েছে মাধুর্য, স্পষ্টতা, কোমলতা ও সুসমতা । আমি এর সমকক্ষ
কোন বক্তব্য আর কোন দিন শুনি নি। অবশ্য এর সমতুল্য কোন বক্তব্য যদি থাকে। তবে তা
শুধু আল্লাহর। আমিরুল মোমনিনের এহেন বক্তব্যে বিস্ময়ের কিছু নেই। কারণ তিনি
ইব্রাহীমের (আঃ) প্রশাখা, একই নদীর প্রবাহ এবং একই নূরের প্রতিবিম্ব ।
যারা মনে করে আল্লাহ শুধু সার্বিক জ্ঞান রাখেন তাদের যুক্তি হলো কোন কিছু বিশদ জানতে হলে
পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়। যদি এ কথা বিশ্বাস করা হয় যে, বিশদ পরিবর্তনীয় জ্ঞান তাঁর আছে তা হলে শর্ত হয়ে দাড়ায়, তাঁর জ্ঞানে পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয়। কিন্তু তাঁর জ্ঞান তাঁর সত্তাসারের অনুরূপ। কাজেই জ্ঞানে পরিবর্তন হলে তাঁর সত্তাসারও পরিবর্তনের বিষয়। এতে তাঁর চিরন্তনতার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যায়। এটা অত্যন্ত ভ্ৰান্তিমূলক যুক্তি কারণ জ্ঞানের বিষয়বস্তুর পরিবর্তন তখনই জ্ঞাতার পরিবর্তন আনতে পারে যখন মনে করা হয় যে, জ্ঞাতা পরিবর্তনের বিষয়ে পূর্বাহ্নে অবহিত নয়। কিন্তু সকল প্রকার পরিবর্তন আল্লাহ সম্যক অবহিত এবং তাঁর সামনে সকল পরিবর্তন স্ফটিকের মত স্বচ্ছ সেহেতু জ্ঞানের বিষয়ের পরিবর্তনে তিনিও পরিবর্তনীয় হতে পারেন না। প্রকৃতপক্ষে এ পরিবর্তন জ্ঞানের বিষয়ে সীমাবদ্ধ এবং এ পরিবর্তন জ্ঞানকে প্রভাবিত করে না।