মাসকালাহ ইবনে হুবায়রাহ, আশ-শায়াবানি আমিরুল মোমেনিনের একজন নির্বাহী অফিসারের নিকট থেকে বনি নাজিয়াহর কয়েকজন বন্দী ক্রিয় করেছিল। যখন ক্রয়মূল্য দাবি করা হয়েছে তখন সে মুয়াবিয়ার কাছে আল্লাহ মাসকালাহর মুখ মলিন (অমঙ্গল) করুন। সে উচ্চ মর্যাদাশীল ভদ্র লোকের মতো কাজ করে নেহায়েত ক্রীতদাসের মতে পালিয়ে গেল। তার প্রশংসাকারীকে সে কথা বলার পূর্বেই থামিয়ে দিল এবং তার প্রশংসাসূচক কবিতার ছন্দ বাঁধার আগেই সে কবির মুখ বন্ধ করে দিল। সে পালিয়ে না গিয়ে সাধ্যমত যা দিত। আমরা তাই গ্রহণ করতাম এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ততদিন অপেক্ষা করতাম যতদিন পর্যন্ত না তার আর্থিক অবস্থা ভাল হয়।
১। সিফফিনের সালিসির পর যখন খারিজিগণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো তখন নাযিয়াহ গোত্রের খিরুরীট ইবনে রশিদ আন-নাযি নামক এক ব্যক্তি মাদায়েনে হত্যা ও লুণ্ঠন শুরু করে দিয়েছিল। তাকে বাধা দেয়ার জন্য আমিরুল মোমেনিন জিয়াদ ইবনে খোসাফাহর নেতৃত্বে তিন শত লোকের একটা বাহিনী প্রেরণ করলেন। মাদায়েনে দুপক্ষ তরবারি নিয়ে মোকাবেলা করলো, কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে এলো। পরদিন ভোরে জিয়াদ দেখলেন যে, খারিজিদের পাঁচটি লাশ পড়ে আছে এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে জিয়াদ তার লোকজন নিয়ে বসরা অভিমুখে রওয়ানা করলো। বসরায় সে জানতে পারলো খারিজিরা আহওয়াজ নামক স্থানে চলে গেছে। সৈন্যের স্বল্পতাহেতু জিয়াদ আর অগ্রসর না হয়ে আমিরুল মোমেনিনকে এ বিষয় অবহিত করলো। আমিরুল মোমেনিন। জিয়াদকে ফিরে যেতে বললেন এবং সাকিল ইবনে কায়েস আররিয়াহীর নেতৃত্বে দুহাজার সৈন্যের একটা বাহিনী আহওয়াজ অভিমুখে প্রেরণ করলেন। তাছাড়া বসরার গভর্নর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে লেখে পাঠালেন যে, সাকিলকে সহায়তা করার জন্য তিনি যেন দুহাজার বসরি সৈন্য প্রেরণ করেন। বসরা থেকে প্রেরিত সৈন্যদল আহওয়াজে সাকিলের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। তারা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হলো। ততক্ষনে খিবৃরীট তার লোকজন নিয়ে রামহুরমুর্য নামক পাহাড়িয়া অঞ্চলে চলে গিয়েছিল। সাকিল৷ পিছু ধাওয়া করে সেই পাহাড়গুলোর নিকটবতী এলাকায় তাদের ধরে ফেললো। উভয়পক্ষ নিজেদের সৈন্য বিন্যস্ত করে একে অপরকে আক্রমণ করলো। এ যুদ্ধে তিন শত সত্তর জন খ্যারিজি নিহত হলো এবং অবশিষ্টরা পালিয়ে গেল । সাকিল। এ সংবাদ আমিরুল মোমেনিনকে জানালো । শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করে তাদের শক্তি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য তিনি সাকিলকে নির্দেশ দিলেন। আদেশ পাওয়ামাত্ৰ সাকিল খিারুরীটের পশ্চাদ্ধাবন করে পারস্য উপসাগরের উপকূলে তাকে ধরে ফেলে। এ এলাকার লোকজনকে প্রলুব্ধ করে খিররীটি তাদের সহযোগিতা লাভ করেছিল। সেখানে পৌঁছেই সাকিল শান্তির পতাকা তুলে ধরে ঘোষণা করলেন যে, যারা এদিক সেদিক থেকে এসেছে তারা বেরিয়ে যেতে পারে— তাদেরকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না। এ ঘোষণার ফলে খিররীটের নিজস্ব গোত্র ছাড়া অন্য সকলে তাকে ত্যাগ করে চলে গেল। খিররীটি অবশিষ্ট লোক নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তার দলের একশত সত্তর জন নিহত হলো। নুমান ইবনে সুহ্বান খিররীটের মোকাবেলা করে তাকে নিহত করে। খিররীট নিহত হবার পর শত্রুপক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। সাকিল শত্রুপক্ষের সকল নারী-পুরুষ ও শিশুকে ক্যাম্প থেকে এনে একস্থানে জড়ো করলো। তাদের মধ্যে যারা মুসলিম ছিল তাদেরকে বায়াতের শপথের পর মুক্ত করে দিয়েছিল। যারা মুসলিম ছিল না তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বলা হলো। ফলে একজন বৃদ্ধ খৃষ্টান ব্যতীত সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে মুক্তি পেল এবং বৃদ্ধ লোকটিকে হত্যা করা হলো। তারপর সাকিল বনি নাজিয়াহর যে সব খৃষ্টান এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের পরিবার-পরিজনসহ কুফা অভিমুখে ফিরে চললো। পথিমধ্যে আরদাশির খুররাহ (ইরানের একটা শহর) নামক স্থানে পৌছলে বন্দীরা সেখানকার গভর্নর মাসকালাহ ইবনে হুবায়রাহ, আশ-শায়বানির সম্মুখে চিৎকার করে রোদন করতে লাগলো যেন তিনি তাদের মুক্তির জন্য কিছু করেন। মাসকালাহ যুহল ইবনে হারিছকে সাকিলের কাছে প্রেরণ করে প্রস্তাব দিল যে, সে বন্দীদের ক্রয় করতে ইচ্ছুক। উভয়ের মধ্যে কথা হলো এবং বন্দীর মুক্তিপণ পাঁচ লক্ষ দিরহাম সাব্যস্ত হলো। পণের অর্থ আমিরুল মোমেনিনের নিকট প্রেরণ করতে বললে মাসকালাহ বললো যে, সে প্রথম কিস্তি তখনই পাঠিয়ে দেবে এবং সহসাই অবশিষ্ট অর্থ পাঠিয়ে দেবে। কুফায় পৌছে সাকিল আমিরুল মোমেনিনকে সবিস্তারে ঘটনাবলী অবহিত করলে তিনি সাকিলের কার্যক্রম অনুমোদন করলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও মাসকালাহর কোন সাড়া না পেয়ে তার কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করে খবর দেয়া হলো যে, সে যেন পণের অর্থ প্রেরণ করে, না হয় নিজে এসে দেখা করে। মাসকালাহ কুফায় এসে আমিরুল মোমেনিনকে দুলক্ষ দিরহাম দিয়ে গেল এবং অবশিষ্ট অর্থ না দেয়ার কৌশল হিসাবে মুয়াবিয়ার কাছে চলে গেল। মুয়াবিয়া তাকে তাবারাস্তানের শাসনকর্তা হিসাবে নিয়োগে করলো। এ ঘটনা জানতে পেরে আমিরুল মোমেনিন এ ভাষণ দিয়েছিলেন।