মুয়াবিয়ার শঠতা ও বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে
আল্লাহর কসম, মুয়াবিয়া আমার চেয়ে বেশি চতুর নয়, কিন্তু সে প্রবঞ্চনা” করে ও কুকর্মে লিপ্ত হয়। যদি আমি প্রবঞ্চনাকে ঘূণা না করতাম। তবে সকল মানুষ থেকে চালাক হতাম। কিন্তু (প্রকৃত বিষয় হলো) প্রতিটি প্রবঞ্চনাই পাপ এবং প্রতিটি পাপই আল্লাহর অবাধ্যতা। প্রত্যেক প্রবঞ্চক ব্যক্তিই শেষ বিচারে একটা ঝান্ডা বহন করবে যাতে তাকে সহজে চেনা যাবে। আল্লাহর কসম, কোন কৌশল দ্বারা আমাকে ভুলিয়ে রাখতে পারবে না এবং দুঃখ-কষ্ট দ্বারা আমাকে পরাজিত করতে পারবে না।
১। যে সব লোক দ্বিনি ও নীতিজ্ঞান সম্বন্ধে অজ্ঞ, দ্বিনের বিধি-বিধানের ধার ধারে না এবং শাস্তি ও পুরস্কারের ধারণা যাদের নেই তারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য উপায় ও ওজরের কোন অভাব অনুভব করে না। তারা প্রতিক্ষেত্রেই কৃতকার্যতার পথ খুঁজে বের করে নেয়। কিন্তু যখন মানবতাবােধ অথবা ইসলাম অথবা নীতিজ্ঞানের আরোপিত সীমা বা দ্বিনের বিধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় তখন কৌশল ও উপায় অনুসন্ধানের পথ সংকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং তাদের কর্মকান্ডের সম্ভাব্যতাও সীমিত হয়ে পড়ে। মুয়াবিয়ার প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল এ ধরনের কৌশলেরই ফল যার জন্য সে যে কোন উপায় অবলম্বনে হালাল-হারাম ও ন্যায়-অন্যায়— কোন কিছুই চিন্তা করে দেখতো না; এমন কি বিচার দিনের ভযও তাকে এসব কর্মকান্ড থেকে নিবৃত্ত করতে পারে নি। ইসফাহানী”২ তার চরিত্র সম্বন্ধে লিখেছেন ঃ সর্বদা উদ্দেশ্য হাসিল করাই ছিল তার লক্ষ্য । উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সে হালাল হারামের ধার ধারতো না । সে দ্বিনের তোয়াক্কা করতো না এবং আল্লাহর শাস্তির কথা কখনো চিন্তা করতো না । তার ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার জন্য সে মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্য প্ৰদান করতো। এবং সকল প্রকার প্রতারণা-প্রবঞ্চনা ও ফন্দি-ফিকিরে লিপ্ত থাকতো / যখন সে দেখলো আমিরুল মোমেনিনকে যুদ্ধে জড়িয়ে না ফেললে তার স্বাৰ্থসিদ্ধি হবে না। তখন সে তালহা ও জুবায়রকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেছিল । এ উপায়ে সে কৃতকার্য হতে না পেরে সিরিয়দেরকে প্ররোচিত করে সিফাফনের গৃহযুদ্ধ সংঘটিত করেছিল । আম্মার শহিদ হবার কারণে রাসুলের (সঃ) ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যখন প্রমাণিত হলো যে, মুয়াবিয়া বিদ্রোহী ও বাতিল পথে রয়েছে তখনই সে লোক নিয়োজিত করে প্রচার করতে লাগলো যে, আম্মারের মৃত্যুর জন্য আলীই দায়ী; কারণ তিনি আম্মারকে যুদ্ধক্ষেত্রে এনেছেন। অন্য এক উপলক্ষে সে ব্যাখ্যা করেছিল, “বিদ্রোহী দল” বলতে রাসুল (সঃ) “প্ৰতিশোধ গ্ৰহণকারী দল।” এটাই ছিল রাসুলের (সঃ) কথার মর্ম। এসব ধূৰ্ততার পথ অবলম্বন করেও যখন সে জয়ের আশা হারিয়ে ফেললো তখন সে বর্শার মাথায় কুরআন তুলে ধরার ফন্দি আঁটলো । যদি সে সত্যিকার অর্থে কুরআন মানতো তাহলে যুদ্ধ আরম্ভ হবার আগেই সে কুরআন অনুযায়ী তার কা দাবি উত্থাপন করতো / আবু মুসা আল-আশরীর সঙ্গে চাতুরী করে আমর ইবনে আ স যে সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করেছিল তার সঙ্গে কুরআনের কোন সংশ্ৰব নেই। এহেন কুরআন বিরোধী প্রতারণার জন্য আমরকে শাস্তি দেয়া তো দূরের কথা একটা কটু কথাও মুয়াবিয়া বলে নি । বরং মুয়াবিয়া আমরের গহিত কাজের প্রশধ্বংসা করে পুরস্কার স্বরূপ তাকে মিশরের গভর্নর করেছিল । অপরপক্ষে আমিরুল মোমেনিনের আচরণ ছিল দ্বিনের বিধি-বিধান ও নীতিজ্ঞানবোধের সুউচ্চ নমুনা। বিরূপ অবস্থাতেও তিনি সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতেন এবং তাঁর পবিত্র জীবনকে ফন্দি-ফিকির ও
প্ৰবঞ্চনার মতো নোংরামি দ্বারা কলুষিত করেন নি। তিনি ইচ্ছা করলে ধূৰ্ততা দিয়ে ধূৰ্ততার মোকাবেলা করতে পারতেন এবং মুয়াবিয়ার নির্লজ্জ কর্মকান্ডের জবাব একইভাবে দিতে পারতেন। উদাহরণ স্বরূপ, মুয়াবিয়া পানির অভাবে দুর্বল হয়ে পরাজয় বরণ করে। আমিরুল মোমেনিন মুয়াবিয়ার সৈন্যদেরকে হটিয়ে দিয়ে ফোরাতকুল দখল করে নিয়েছিলেন। জালিম মুয়াবিয়ার সৈন্যদের প্রতি আমিরুল মোমেনিন। একই আচরণ করে পানি বন্ধ করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি এহেন অমানবিক ও নীতিশাস্ত্ৰ বিবর্জিত কাজ করে তার হাত কলুষিত করেন নি যদিও তিনি জানতেন যে, পানি বন্ধ করে দিলে শক্রকে সহজে পরাজিত করা যায়। মুয়াবিয়ার মতো লোকেরাই এমন অমানবিক কাজকে কূটনীতি বা যুদ্ধ-কৌশল বা প্রশাসনিক দক্ষতা বলে আখ্যায়িত করে থাকে। কিন্তু আমিরুল মোমেনিন কখনো কূট-কৌশল ও জালিয়াতি দ্বারা নিজের শক্তি বৃদ্ধির কথা চিন্তা করেন নি। তাই তার কিছু সসংখ্যক অনুচর। যখন তাকে উপদেশ দিল যে, উসমানের সময়কার অফিসারদের চাকরি বহাল রাখতে, তালহা ও জুবায়রকে কুফা ও বসরার গভর্নর নিয়োগ করে তাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতে এবং মুয়াবিয়াকে সিরিয়ার সরকার দিয়ে দিতে তখন তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি দ্বিনের বিধানকে জাগতিক সুবিধার উর্ধে স্থান দিয়ে মুয়াবিয়া সম্পর্কে প্রকাশ্যে নিম্নরূপ ভাষণ দিয়েছিলেনঃ মুয়াবিয়া যে অবস্থায় আছে যদি আমি তাকে সে অবস্থায় থাকতে দেই। তবে আমি তাদেরই একজন হবো “যারা মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।” (কুরআন- ১৮ ? ৫১) । যারা আপাত কৃতকার্যতার মূল্য দেয়। অথচ চিন্তা করে না যে, কী উপায়ে কৃতকার্যতা অর্জিত হয়েছে — আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হবো না । মানুষ সেসব লোককে সমৰ্থন দেয় যারা ধূৰ্ততা ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় গ্ৰহণ করে কৃতকার্য হয় এবং তাদেরকে ভালো প্রশাসক, বুদ্ধিমান রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিবৃত্তিক মেধাবি ইত্যাদিতে আখ্যায়িত করে । পক্ষান্তরে যারা ইসলামের প্রত্যাদেশ ও ঐশী নির্দেশের প্রতি সন্মান প্রদর্শন করে, ধূৰ্ততা ও জালিয়াতির তাদেরকে রাজনীতিতে অজ্ঞ ও দূরদর্শীতায় দুর্বল বলে আখ্যায়িত করে । তারা একবার ভেবেও দেখে না যে, যে ব্যক্তি ন্যায়নীতি মেনে চলে তার পথে কী বাধা রয়েছে যা তাকে কৃতকার্যতার কাছাকাছি পৌছা সত্ত্বেও অগ্রসর হতে বারিত করেছে।