আল্লাহর গুণরাজী, তার সত্তা ও তাঁর বান্দা সম্পর্কে
(নাওয়াফ আল বিকালী বৰ্ণনা করেছেন যে, আমিরুল মোমেনিন আলী
কুফায় এ খোৎবা প্ৰদান করেছিলেন। জাদাহ ইবনে হুবায়রাহ আলমাখদুমী একটা পাথর এগিয়ে দিলে তার ওপর দাঁড়িয়ে এ খোৎবা দেয়া হয়েছিল। এ সময় আমিরুল মোমেনিনের গায়ে পশমি পোষাক ছিল। তার তরবারির বেল্ট পাতার তৈরি এবং তার পায়ের সেন্ডেল তাল পাতার তৈরি ছিল। তাঁর কপালে দীর্ঘ সেজদার কারণে একটা শক্ত কাল দাগ ছিল) প্রতিষ্ঠিত প্রশধ্বংসা আল্লাহর যার কাছে সকল সৃষ্টির প্রত্যাবর্তন এবং সকল বিষয়ের পরিসমাপ্তি। আমরা তার মহান ঔদার্যের জন্য প্রশধ্বংসা করি, তার প্রমাণের দয়ার জন্য প্রশধ্বংসা করি এবং তার নেয়ামত ও অনুকম্পার জন্য প্রশধ্বংসা করি। এমন প্রশধ্বংসা করি যা তাঁর অধিকার পূর্ণ করতে পারে (অর্থাৎ যা তাঁর প্রাপ্য), যা তাঁর আশীর্বাদের প্রতিদান হতে পারে, যা তাঁর পুরস্কারের কাছে আমাদেরকে নিয়ে যেতে পারে এবং যাতে আমাদের প্রতি তাঁর দয়া বৃদ্ধি পেতে পারে। আমরা সেসব লোকের মতো তার সাহায্য প্রার্থনা করি যারা তার নেয়ামতের জন্য আশান্বিত, তার উপকারের জন্য আকাঙ্খিত, তার দুর্যোগ প্রতিরোধের জন্য দৃঢ়ভাবে আশ্বস্ত; যারা তাঁর দানের স্বীকৃতি দেয় এবং কথায় ও কাজে তাঁর প্রতি অনুগত। আমরা সেব্যক্তির মতো তাঁকে বিশ্বাস করি যে সুদৃঢ় আস্থা সহকারে তাঁর আশা করে, মোমেনের মতো তার প্রতি ঝুকে থাকে, নিতান্ত দীনতার সাথে তাঁর আনুগত্য করে, তার একত্বকে নির্ভেজালভাবে বিশ্বাস করে, তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে, তার মহিমা স্বীকার করে এবং সর্বান্তিঃকরণে তার আশ্রয় প্রার্থনা করে। মহিমান্বিত আল্লাহ জন্ম গ্রহণ করেন নি যাতে কেউ মর্যাদায় তার অংশীদার হতে পারে। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি। যাতে তার কোন উত্তরাধিকারী থাকতে পারে। সময় ও কাল তাকে অতিক্রম করতে পারে না (অর্থাৎ তাঁর কাছে সময় ও কাল বলতে কিছু নেই)। তাঁর কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। কিন্তু তিনি তার কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও সুদৃঢ় রায় প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে আমাদের অনুভূতিতে নিজকে প্রকাশ করেছেন। তাঁর সৃষ্টির বিস্ময়কর প্রমাণ হলো আকাশসমূহ যা তিনি কোন স্তম্ভ ছাড়াই বুলিয়ে রেখেছেন। তিনি তাদের আহবান করেছিলেন এবং তারা কোন প্রকার অলসতা বা বিরক্তি ছাড়াই বিনীত ও অনুগত হয়ে তাঁর আহবানে সাড়া দিয়েছিল। যদি তারা তার প্রভুত্ব স্বীকার না করতো এবং তাকে মান্য না করতো। তবে তিনি তাতে তার আরশ স্থাপন করতেন না, তার ফেরেশতাদের বসতি স্থাপন করতেন না এবং তার বান্দাদের সকল পবিত্ৰ কথা ও ন্যায় কাজেরও গন্তব্যস্থল হিসাবে তাদের নির্দিষ্ট করতেন না। তিনি আকাশের নক্ষত্ররাজীকে নিদর্শন করেছেন যাতে পৃথিবীর বিভিন্ন পথে ভ্ৰমণকারীগণ পথের দিশা পায়। রাতের নিকশা কালো অন্ধকারের পর্দা তাদের আলোক শিখা প্ৰতিহত করতে পারে না। আকাশে ছড়িয়ে পড়া চাঁদের কিরণকেও রাতের কালো-ঘোমটা ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। সকল মহিমা আল্লাহর যার কাছে অন্ধকারের কৃষ্ণতা, পৃথিবীর নিচু অংশে ও পর্বতের চূড়ায় পতিত নিকশ বর্ষণ— কোন কিছুই গোপন নয়। তিনি জানেন কোথায় ফোঁটা পড়ে, কোথায় তা অবস্থান করে, কোথায় শুককীট তাদের পথ পরিত্যাগ করে বা কোথায় নিজকে টেনে নিয়ে যায়, কী জীবিকা মশার জন্য যথেষ্ট এবং নারী তার গর্ভাশয়ে কী বহন করে।
প্রতিষ্ঠিত প্রশধ্বংসা আল্লাহর যিনি কুরাসি, আরাশ, আকাশ, পৃথিবী, জিন ও ইনসান অস্তিত্বমান হওয়ার পূর্বেই বিদ্যমান ছিলেন। কল্পনা দ্বারা তাকে অনুভব করা যায় না এবং বোধগম্যতা দ্বারা তাকে পরিমাপ করা যায় না। কেউ তাঁর কাছে যোচুনা করলে অন্যদের দিক থেকে তাঁর দৃষ্টি সরে যায় না এবং দান করলে তাঁর ভান্ডে কখনো ঘাটতি দেখা দেয় না। চোখের দৃষ্টি দ্বারা তিনি দেখেন না এবং তিনি কোন নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নন। তাঁর কোন সাথি-সঙ্গী নেই। অঙ্গ-প্রতঙ্গের সাহায্যে তিনি সৃষ্টি করেন না। ইন্দ্ৰিয়ের সাহায্যে তাকে উপলব্ধি করা যায় না। কোন মানুষ বা কোন কিছুর মতো তাঁকে চিন্তা করা যায় की ।
তিনি আলজিহ্বা বা অন্য কোন শব্দ-ইন্দ্ৰিয় ছাড়াই মুসার সাথে সুস্পষ্টভাবে কথা বলেছিলেন এবং কোন প্রকার শারীরিক প্রকাশ ছাড়াই মুসাকে তাঁর মহান নিদর্শন দেখিয়েছিলেন। ওহে, তোমরা যারা আল্লাহর বর্ণনা করতে নিজেদেরকে নিয়োজিত করতে চাও এবং যদি তোমরা এ বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হও তবে প্রথমে জিব্রাইল, মিকাইল বা অন্য ফেরেশতাদের বর্ণনা করতে চেষ্টা করো। এসব ফেরেশতাগণ আল্লাহর মহিমার আধারের নিকটবতী; কিন্তু তাদের মস্তক সর্বদা অবনত এবং মহান স্রষ্টার পরিসীমা নির্ণয় করতে তাদের বুদ্ধিমত্তা স্থবির হয়ে পড়ে। এর কারণ হলো, সেসব বস্তু গুণের মাধ্যমে অনুভব করা যায় যার আকৃতি আছে, অংশ আছে এবং যা সময় অতিক্রান্ত হলে মৃত্যুর অধীন। তিনি ব্যতীত আর কোন মান্বুদ নেই। তিনি তাঁর দু্যতি দ্বারা সকল অন্ধকারকে আলোকিত করেছেন এবং মৃত্যু দ্বারা সকল আলোকে অন্ধকার করেছেন।
অতীত লোকদের থেকে শিক্ষা গ্ৰহণ সম্পর্কে
হে আল্লাহর বান্দাগণ, আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি যে, আল্লাহকে ভয় করা তোমাদের অভ্যাসে পরিণত কর। তিনি তোমাদেরকে জীবনধারণের প্রচুর উপকরণ দান করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম পরিধেয় দিয়েছেন। যদি কারো পক্ষে অনন্ত জীবন লাভ করা সম্ভব হতো এবং মৃত্যুকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হতো। তবে তিনি ছিলেন সুলায়মান ইবনে দাউদ । আল্লাহ তাকে নবুওয়াত দান করেছিলেন এবং তার সাথে জিন ও ইনসানের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বাদশাহি দান করেছিলেন। কিন্তু যখন তার জন্য নির্ধারিত জীবনোপকরণ নিঃশেষ হয়ে গেল এবং তাঁর সময় ফুরিয়ে গেল তখন ধ্বংসের ধনুক তার প্রতি মৃত্যুতীর নিক্ষেপ করলো। তাঁর ঘর শূন্য হয়ে গেল এবং তাঁর বসতি খালি হয়ে গেল। অন্য একদল লোক তার উত্তরাধিকারী হয়ে গেল। নিশ্চয়ই, অতীত হয়ে যাওয়া শতাব্দীগুলোতে তোমাদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
কোথায় আজ আমালে কিটগণ’ ও তাদের পুত্ৰগণ? কোথায় আজ ফেরাউনগণ’? কোথায় আজ আর-রাশ’ নগরীর জনগণ? যারা তাদের নবিকে হত্যা করেছিল এবং নবির সুন্নাত ধ্বংস করে স্বৈরশাসকের বিধান পুনরুজুজীবিত করেছিল? কোথায় আজ সেইসব লোক যারা সসৈন্যে অগ্রসর হয়ে হাজার হাজার লোককে পরাজিত করে দেশ জয় করে নিয়েছিল এবং নগরীর পর নগরী জয় করে বসতি স্থাপন করেছিল?
ইমাম মাহদী সম্পর্কে
তিনি জ্ঞানের বর্ম পরিধান করবেন যা তাকে সকল অবস্থায় নিরাপদ রাখবে। তার জ্ঞানবর্মের প্রতি সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে এবং সকলেই তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়বে। তাঁর জন্য এটা এমন জিনিসের মতো হবে যা হারিয়ে গিয়েছিল এবং খোজা-খুজি করা হচ্ছিলো। অথবা এটা এমন প্রয়োজনের মতো হবে যা মিটানোর জন্য চেষ্টা করা হচ্ছিলো। যদি ইসলাম কোন বিপদের সম্মুখীন হয় তবে তিনি ভ্ৰমণকারী পথিকের মতো বিচলিত হয়ে পড়বেন এবং মাটিতে শুয়ে থাকা পরিশ্রান্ত উটের লেজের অগ্রভাগে আঘাত করলে যেভাবে লাফিয়ে ওঠে সে ভাবে লাফিয়ে ওঠবেন। তিনি আল্লাহর সর্বশেষ প্রমাণ এবং রাসুলের (সঃ) মনোনীত প্রতিনিধিদের অন্যতম।
নিজের শাসন পদ্ধতি ও অনুচরদের শাহাদত বরণে শোক
হে জনমন্ডলী, পয়গম্বরগণ যেভাবে তাদের লোকদের উপদেশ দিতেন আমিও সেভাবেই তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছি। এবং পয়গম্বরগণের তিরোধানের পর তাদের মনোনীত প্রতিনিধিগণ মানুষকে যা বলতেন। আমিও তাই বলেছি। আমি তোমাদেরকে প্রশিক্ষণ দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি, কিন্তু তোমরা সোজা হলে না। আমি তোমাদেরকে সতর্কাদেশসহ পরিচালিত করেছিলাম, কিন্তু তোমরা যথাযথ আচরণ অর্জন করতে পার নি। আল্লাহ তোমাদের বিচার করুন!! তোমাদেরকে সত্যপথে নেয়ার
জন্য সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য তোমরা কি আমি ছাড়া অন্য কোন ইমাম চাও? সাবধান, এ পৃথিবীতে যা অগ্রণী ছিল তা আজ অতীত হয়ে গেছে এবং যা পিছনে পড়েছিলো তা
আজ অগ্রণী হয়ে পড়েছে। আল্লাহর দ্বিনে প্রতিষ্ঠিত লোকগণ এ পৃথিবী ত্যাগ করে চলে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেলেছে এবং তারা নশ্বর দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের বিনিময়ে আখেরাতের প্রচুর পুরস্কার ক্রয় করে নিয়েছে যা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। আমাদের যেসব ভাই সিফফিনে তাদের রক্ত দিয়ে শহিদ হয়েছে, আজ বেঁচে নেই বলে তাদের কী ক্ষতি হয়েছে? শুধু এটুকু হয়েছে যে, তারা আজ শ্বাসরুদ্ধকর খাদ্য ও ঘোলাটে পানির কষ্ট পোহাচ্ছে না। আল্লাহর কসম, তারা আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেছে এবং তিনি তাদেরকে তাদের পুরস্কার প্রদান করেছেন। নিশ্চয়ই, তিনি তাদেরকে নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছেন। কোথায় আমার সেসব ভ্রাতৃবৃন্দ যারা সত্যপথ অবলম্বন করেছিল এবং ন্যায়ের পথে পদচারণা করেছিল? কোথায় আম্মার? কোথায় ইবনে তাইহান’? কোথায় যুশ শাহাদাতাইন? কোথায় তাদের মতো অন্যান্য ভ্রাতৃবৃন্দ যারা শাহাদতকে আলিঙ্গন করেছিল এবং যাদের দ্বিখন্ডিত মস্তক দুরাচার শত্ৰুগণ নিয়ে গিয়েছিল। এরপর আমিরুল মোমেনিন তার পবিত্র দাড়িতে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে অনেকক্ষণ কান্দলেন এবং তারপর বলতে লাগলেন ? হে আমার ভ্রাতৃবৃন্দ, তোমরা আজ কোথায় যারা কুরআন তেলওয়াত করেছিলে ও কুরআনকে শক্তিশালী করেছিলে, নিজেদের দায়িত্ব সম্বন্ধে চিন্তা করেছিলে এবং তা পরিপূর্ণ করেছিলে। সুন্নাহ পুনরুজীবিত করেছিলে এবং বিদা’ত ধ্বংস করেছিলে। যখন তাদেরকে জিহাদে আহবান করা হয়েছিল তখন তারা সাড়া দিয়েছিল এবং তাদের নেতার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে তাকে অনুসরণ করেছিল। এরপর আমিরুল মোমেনিন তার স্বরে চিৎকার করে বললেন ? জিহাদ, জিহাদ, হে আল্লাহর বান্দাগণ, আল্লাহর কসম, আমি আজই সৈন্যবাহিনী সমবেত করে প্রস্তুত করবো। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে অগ্রসর হতে চায় সে এগিয়ে আসতে পারে। (বর্ণনাকারী নাওয়াফ আল-বিকালী বলেনঃ এরপর আমিরুল মোমেনিন। তাঁর পুত্ৰ হুসাইনকে দশ হাজার, কায়েস ইবনে সা’দকে দশ হাজার এবং আবু আইউব আলআনসারীকে দশ হাজার সৈন্যের অধিনায়ক নিয়োগ করেছিলেন এবং অন্য কয়েকজনকেও বিভিন্ন সসংখ্যক সৈন্যবাহিনীর অধিনায়ক নিয়োগ করেছিলেন । পরবর্তী শুক্রবার সিফাফিন অভিমুখে যাত্রা করার জন্য অধিনায়কদের নির্দেশ দিলেন । কিন্তু সেই শুক্রবার আর ফিরে এলো না / অভিশপ্ত ইবনে মুলজান (তার ওপর আল্লাহর এবং রাখাল বিহীন ভেড়ার পালের মতো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো এবং তাদেরকে নেকড়ের দল ধরে নিয়ে যেতে লাগলো) /
১। আমালে কিটুসঃ এরা হলো প্রাচীন যাযাবর গোত্রসমষ্টি যাদের কথা তৌরাতে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এরা ছিল ইসরাইলদের ঘোরতর শত্রু। কিন্তু এরা ছিল বারটি ইসরাইল গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এফ্রাইম গোত্রের নিকট আত্মীয়। আমালেক নামক আরবিয় সধ্বংস্কৃতির একজন লোকের নামানুসারে এদের নামকরণ করা হয়, কিন্তু এখন আর সুনির্দিষ্টভাবে তার পরিচয় পাওয়া যায় না। যে এলাকায় এদের বসবাস ছিল বলে ধরা হয় তা হলো যুদাহ পর্বতের দক্ষিণ থেকে উত্তর-আরব পর্যন্ত। হিব্ৰুগণ যখন সদলে মিশর পরিত্যাগ করে যাচ্ছিলো তখন এরা সিনাই পর্বতের নিকটবর্তী রেফিডিম নামক স্থানে তাদেরকে আক্রমণ করেছিল। সেখানে এরা যোসুয়ার নিকট পরাজয় বরণ করে। এরা যাযাবর লুটেরা দলে পরিণত হলে গিভিয়ন কর্তৃক পরাজিত হয় এবং স্যামুয়েল এদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। হেজেকিয়ার সময়ে একটা অনন্ত অভিশাপের কারণে এরা বিলুপ্ত হয়ে যায় (এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, ১ম খন্ড; ১৯৭৩-৭৪, পৃঃ ২৮৮ এবং এনসাইক্লেপেডিয়া আমেরিকানা, ১ম খন্ড, ১৯৭৫, পৃঃ ৬৫১) ২। ফেরাউনঃ মিশরিয়া হিব্রু ভাষায় ‘পারিও’ (মহৎ ঘর বা রাজপ্রাসাদ) হতে ফেরাউন শব্দটি আসে। মিশরের রাজকীয় উপাধি হিসাবে পরবতীতে তা গৃহীত হয়। বাইশতম বংশ থেকে রাজার ব্যক্তিগত উপাধি হিসাবে শব্দটি গৃহীত হয়। সরকারি দলিল-পত্রে মিশরের রাজার পাঁচটি উপাধি দেখা যায়। প্রথম, ‘হােরাস’ যা বাজপাখীর তমূর্তি এবং প্রাসাদে অঙ্কিত থাকতো। দ্বিতীয়, ‘দুই নারী” যা নেকবেত ও বুন্টু দেবীর আশ্রয়ে রাজাকে রাখা হয় বলে মনে করা হতো। তৃতীয়, গোল্ডেন হোরাস’ যা সম্ভবত শত্রুর ওপর জয়ী বোঝাতো। চতুর্থ ‘প্রেয়েনওমেন’ যা সূর্য দেব ‘রি’ এর সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে করা হতো। পঞ্চম, নোমেন’ যা ‘রি-এর পুত্ৰ’ বা দুদেশের রাজা বুঝাতো। দুদেশ বলতে মিশরের উচ্চভূমি ও নিম্নভূমি বুঝানো হয়েছে (এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা, ৭ম খন্ড, ১৯৭৩-৭৪, পৃঃ ৯২৭; এনসাইক্লোপেডিয়া আমেরিকানা, ২১তম খন্ড, ১৯৭৫, পৃঃ ৭০৭)। ফেরাউনদের মধ্যে মুসার (আঃ) সময়কার ফেরাউনের অহংকার, গর্ব ও ঔদ্ধত্য এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সে নিজেকে খোদা বলে দাবি করেছিল। সে মনে করতো পৃথিবীর অন্য সকল শক্তি তার নিয়ন্ত্রণে এবং তার হাত থেকে কোন শক্তিই তার রাজত্ব কেড়ে নিতে পারবে না। ক্ষমতায় মদমত্ত হয়ে সে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছিল। তার দাবি সম্বন্ধে আল্লাহ বলেনঃ আমার নয়? এ নদীগুলো আমার পায়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত; তোমরা কি তা দেখা না?” (<:୪ ଏin-8ଏ୬୫୪୬) কিন্তু তার রাজ্য কয়েক মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল। তার কোন মর্যাদা বা রাজ্যের বিশালত্ব এ ধ্বংস ঠেকিয়ে রাখতে পারে নি। বরং যে নদীকে সে পদতলগত বলে দাবি করেছিল সে নদীর ঢেউ তাকে ডুবিয়ে তার রূহকে জাহান্নামে প্রেরণ করে দেহকে কূলে নিক্ষেপ করেছিল যাতে সমগ্র সৃষ্টি শিক্ষা গ্ৰহণ করতে পারে।
৩। আর-রাশ নগরীঃ একইভাবে রাশ নগরীর জনগণ তাদের নবির উপদেশ অমান্য করে আল্লাহর অবাধ্য হওয়ায় তাদেরকে হত্যা করে ধ্বংস করা হয়েছিল। আল্লাহ বলেনঃ আমি ধ্বংস করেছিলাম আদি, ছামুদ ও রাশবাসীগণকে এবং তাদের অন্তর্বর্তীকালে বহু সম্প্রদায়কেও । আমি তাদের প্রত্যেকের জন্য দৃষ্টান্ত হিসাবে বর্ণনা করেছিলাম এবং তাদের সকলকেই আমি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছিলাম (কুরআন-২৫ ° ৩৮-৩৯) । তাদের পূর্বেও সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল নূহের সম্প্রদায়, রাশ ও ছামুদ সম্প্রদায়; আদ, ফেরাউন ও লুত সম্প্রদায় এবং আইকার অধিবাসী ও তুব্বা সম্প্রদায়; ওরা সকলেই রাসুলগণকে মিথ্যাবাদী বলেছিল । ফলে তাদের ওপর আমার শাস্তি আপতিত হয়েছে (কুরআন-৫০ ও ১২-১৪) / ৪ । আম্মার ইবনে ইয়াসির ইবনে আমির আল-মাখিযুমি ছিলেন বনি মাখিযুমের মুখপাত্র। ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় যে কজন ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। তিনিই প্রথম মুসলিম যিনি নিজের ঘরে মসজিদ নির্মাণ করে আল্লাহর ইবাদত করতেন (সা’দ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৭৮; আইট্র’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪৬: কাহীর’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ৩১১) { আম্মার তাঁর পিতা ইয়াসির ও মাতা সুমাইয়ার সাথে ইসলাম গ্ৰহণ করেছিলেন। ইসলাম গ্রহণের কারণে তারা কুরাইশদের হাতে অনেক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন। এমনকি নির্যাতনের চোটে আম্মার তার বাবা ও মাকে হারিয়েছিলেন এবং তারা উভয়ে ইসলামের প্রথম শহিদ। যারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিল তাদের মধ্যে আম্মারও ছিলেন এবং তিনি আবিসিনিয়া থেকে প্রথম দিকেই মন্দিনায় হিজরত করেছিলেন। তিনি বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং রাসুলের (সঃ) সময়ের সকল যুদ্ধ ও মুসলিম সমাবেশে, অংশগ্রহণ করেছিলেন। ইসলামের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। তার ধাৰ্মিকতা, বিশিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও সৎকর্মের জন্য রাসুলের (সঃ) অনেক হাদিস রয়েছে। আয়শা ও অন্যান্য বেশ কয়েকজনের বর্ননায় আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেন, “আম্মারের আপাদমস্তক ইমানে ভরপুর” (মাজাহ***’, ১ম খন্ড, পৃঃ ৬৫; ইসফাহানী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৩৯; শ্যাফেয়ী***, ৯ম খন্ড, পৃঃ ২৯৫; বার”, ৩ খন্ড, পৃঃ ১১৩৭; হাজর***, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫১২) । আম্মার সম্পর্কে অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ আন্মর সত্যের সাথে এবং সত্য আম্মারের সাথে । সত্য যেদিকে আম্মার সেদিকে । চক্ষু নাকের যেরূপ নিকটবতী আম্মার আমার ততটা নিকটবর্তী / হায়, হায়! একটা বিদ্রোহী দল তাকে হত্যা করবে (সা’দ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৮৭; নায়সাবুরী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৯২: হিশাম**’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৪৩, কাহীর”, १ श्ङ, १? २७b ७ २१०) | পঁচিশজন সাহাবার সূত্রে প্রায় সকল হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ হয়, হায়! সত্যত্যাগী একদল বিদ্রোহী আম্মারকে হত্যা করবে। আমার তাদেরকে জানাতের দিকে আহ্বান করবে এবং ওরা আম্মারকে জাহান্নামের দিকে ডাকবে । তার হত্যকারী এবং যারা তার অস্ত্র ও পরিচ্ছদ খুলে ফেলবে তারা জাহান্নামের অধিবাসী। (বুখারী***, ৮ম খন্ড, পৃঃ ১৮৫-১৮৬; তিরমিয়ী’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৬৬৯, হাম্বল”, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৬১, ১৬:৪, ২০৬: ৩য় খন্ড, পৃঃ ৫, ২২, ২৮, ৯১, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১৯৭, ১৯৯, ৫ম খন্ড, পৃঃ ২১৫, ৩০৬, ৩০৭: もあマー、?ミヶs ooo ○、○のりs এই হাদিসটির সত্যতা ও সঠিকতা সম্পর্কে প্রায় সকল হাদিসবেত্তা ও ঐতিহাসিক একমত পোষণ করেন।
আসকালানী’ (৭ম খন্ড, পৃঃ ৪০৯), হাজর***’ (২য় খন্ড, পৃঃ ৫১২) ও সুয়ুতি’** (২য় খন্ড, পৃঃ ১৪০)
লেখেছেন যে, এই হাদিসটির বর্ণনা অত্যন্ত মুতাওয়াছির (অর্থাৎ এত বেশি লোক দ্বারা বর্ণিত যে, এতে কোন প্রকার সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই)। বার” (৩য় খন্ড, পৃঃ ১১৪০) লেখেছেন যে, রাসুলের (সঃ) সময় থেকে এ হাদিসটির “একটা বিদ্রোহী দল আম্মারকে হত্যা করবে” অংশ অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে এবং এটা রাসুলের (সঃ) গুপ্ত জ্ঞান দ্বারা একটা ভবিষ্যদ্বাণী । রাসুলের (সঃ) তিরোধানের পর প্রথম খলিফার রাজত্বকালে আম্মার আমিরুল মোমেনিনের বিশেষ সমর্থক ও অনুচর ছিলেন। উসমানের খেলাফতকালে বায়তুল মাল বণ্টনে দুর্নীতিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যখন জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠলো তখন এক জনসমাবেশে উসমান বলেছিলেন, “বায়তুল মাল পবিত্র এবং তা আল্লাহর সম্পদ। রাসুলের উত্তরসূরী হিসাবে আমার ইচ্ছামতো তা বন্টন করার অধিকার আমার আছে। যারা আমার কথা ও কাজের সমালোচনা করে তারা অভিশপ্ত এবং তাদেরকে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে।” তখন আম্মার জোর গলায় বলেছিলেন যে, উসমান জনসাধারণের স্বাৰ্থ উপেক্ষা করে রাসুল (সঃ) কর্তৃক নিষিদ্ধ গোত্র-স্বর্থ ও স্বজনপ্ৰীতির প্রবর্তন করেছে। এতে উসমান রাগান্বিত হয়ে আম্মারকে পিটিয়ে চেপ্টা করে দেয়ার জন্য তার লোকজনকে আদেশ দিলেন। ফলে কয়েকজন উমাইয়া আম্মারের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তাকে বেদম প্রহার করেছিল। এমনকি খলিফা নিজেই জুতা পরিহিত পায়ে তার মুখে পদাঘাত করেছিলেন। এতে আম্মার অজ্ঞান হয়ে
পড়েন এবং উন্মুল মোমেনিন উন্মে সালমার পরিচর্যায় তিন দিন পর জ্ঞান ফিরে পান (বালাজুরী’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ৪৮, ৫৪, ৮৮; হাদীদ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৪৭-৫২; কুতায়বাহ’, ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৫-৩৬; রাব্বিহ্”, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ
৩০৭; সা’দ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৮৫; বাকরী’, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৭১)। আমিরুল মোমেনিন খলিফা হবার পর আম্মার তার একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। এসময় তিনি সকল প্রকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষামূলক কাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ করে জামালের যুদ্ধে ও সিফফিনের যুদ্ধে তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যা হোক, ৩৭ হিজরি সনের ৯ সফর সিফফিনের যুদ্ধে তিনি নব্বই বছরের কিছু অধিক বয়সে শহিদ হয়েছিলেন। শহিদ হবার দিন আম্মার আকাশের দিকে মুখ তুলে বললেন
হে আমার আল্লাহ, নিশ্চয়ই তুমি অবগত আছে যে, যদি আমি জানতে পারি ফোরাত নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আমার ডুবে যাওয়াই তোমার ইচ্ছ। তবে আমি তাই করবো | হে আমার আল্লাহ, নিশ্চয়ই তুমি অবগত আছে যে, যদি আমি জানতে পারি। আমার এই শমশের বুকের গভীরে চুকিয়ে পিঠি দিয়ে বের করে নিলে তুমি খুশি হবে। তবে আমি তাই করবো ! হে আমার আল্লাহ, আমি মনে করি এই পাপাচারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেয়ে সন্তোষজনক তোমার কাছে আর কিছু নেই এবং যদি আমি জানতে পারি তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোন ব্যবস্থা গ্ৰহণ তোমার কাছে অধিক প্রিয় তবে আমি তাই করবো / আবু আবদার রহমান আস-সুলামী বৰ্ণনা করেছেনঃ
আমিরুল মোমেনিনের সাথে আমরাও সিফুফিনে উপস্থিত ছিলাম / আমি দেখেছি আম্মার ইবনে ইয়াসির কোনদিকে দ্রুক্ষেপ না করে শত্রুর বৃহ ভেদ করে চলেছে এবং রাসুলের । সাহাবাগণ এমনভাবে তাকে অনুসরণ করে চলেছিল যেন সে তাদের জন্য একটা নিদর্শন | বৃহের মধ্যে দ্রুত ঢুকে পড়ো । মনে রেখো, জগন্নাত তরবারির নিচে । আজ আমি আমার সন্ম চাইতে প্রিয় ব্যক্তি মুহাম্মদ ও তাঁর দলের সাক্ষাত পেয়েছি । আল্লাহর কসম, তারা যদি হাজরের (বাহরাইনের একটা শহর), খেজুর বিখী অঞ্চল পর্যন্তও আমাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়। তবুও আমি বলবো নিশ্চয়ই আমরা ন্যায় ও সত্যের পথে রয়েছি এবং তারা বিপথগামী ও বিভ্রান্ত ৷ ” এরপর শত্রুকে সম্বোধন করে আন্মারকে বলতে শুনলাম, ‘পবিত্র কুরআনের প্রত্যাদেশ বিশ্বাস করার জন্য আমরা তোমাদেরকে আঘাত করেছিলাম; এবং আজ তার ব্যাখ্যা বিশ্বাস করার জন্য আঘাত করছি; এমন আঘাত হানবো যাতে মস্তক দ্বিখন্ডিত হয়ে তোমরা চির বিশ্রাম স্থলে চলে যাও, এবং যাতে তোমরা এক বন্ধু অপর বন্ধুর নাম ভুলে যাও, এ আঘাত ততক্ষণ পর্যন্ত চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা সত্যের দিকে ফিরে না আসি আমি অন্য কোন যুদ্ধে রাসুলের (সাঃ) এত বেশি সসংখ্যক সাহাবাকে শহিদ হতে দেখি নি যত হয়েছিল আন্মারের নেতৃত্বে সে দিন । আম্মার শত্রু সৈন্যবৃত্যুহের মধ্যে প্রবেশ করে একের পর এক আক্রমণ রচনা করে তাদের নাস্তানাবুদ করে দিচ্ছিলো। এ সময় একদল নিচ প্রকৃতির সিরিয়ান তাঁকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলেছিল এবং আবু ঘাদিয়া আলযুহরী নামক এক পিশাচ তাকে এমন আঘাত করেছিল যা সহ্য করতে না পেরে তিনি ক্যাম্পে ফিরে গেলেন। ক্যাম্পে ফিরেই তিনি পানি চাইলেন। লোকেরা তার জন্য এক বাটি দুধ নিয়ে এলো। দুধ দেখেই আম্মার বললেন, “আল্লাহর রাসুল ঠিক কথাই বলেছেন।” লোকেরা এক কথার অর্থ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আল্লাহর রাসুল আমাকে একদিন বলেছিলেন এ পৃথিবীতে আমার শেষ খাদ্য হবে দুধ।” এরপর তিনি দুধ পান করলেন এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রাণ সমৰ্পণ করলেন। তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে আমিরুল মোমেনিন তাঁর ক্যাম্পে এলেন এবং তাঁর মাথা নিজের কোলে তুলে নিয়ে বললেন, “নিশ্চয়ই, যদি কোন মুসলিম আম্মারের মৃত্যুতে মানসিকভাবে আহত না হয়ে থাকে এবং শোকাহত না হয়ে থাকে। তবে তার ইমান যথার্থ নয়।” তারপর আমিরুল মোমেনিন ছন্দাকারে বললেনঃ আম্মারের ইসলাম গ্রহণের দিন আল্লাহ তাকে রহমত বর্ষণ করুন, আম্মারের শাহাদতের দিন আল্লাহ তাকে রহমত বর্ষণ করুন, আন্মারের পুনরুত্থানের দিন আল্লাহ তাকে রহমত বর্ষণ করুন। আমিরুল মোমেনিন অশ্রুসিক্ত নয়নে বললেন, “নিশ্চয়ই, আমার কাছে আম্মারের মর্যাদা এত উচু মাপের যে, রাসুলের তিনজন সাহাবার নাম করা যাবে না। যদি তাকে চতুৰ্থজন ধরা না হয়; চারজনের নাম করা যাবে না। যদি তাকে পঞ্চম ধরা না হয়। নিশ্চয়ই, রাসুল (সঃ) বলেছিলেন, “আম্মার সত্যের সাথে এবং সত্য আম্মারের সাথে। সত্য যেদিকে আম্মার সেদিকে। তার হত্যাকারী জাহান্নামবাসী হবে।” তারপর আমিরুল মোমেনিন নিজেই তার জানাজা পড়লেন এবং তার রক্তাক্ত পোশাকসহ তাকে নিজ হাতে কবরে শুইয়ে দিলেন। এদিকে আম্মারের মৃত্যু মুয়াবিয়ার সৈন্যদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাদের মনে একটা ধারণা দেয়া হয়েছিল যে, তারা ন্যায়ের জন্যই আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেছিলো। কিন্তু তাদের অনেকই আম্মার সম্পর্কে রাসুলের (সঃ) উক্ত বাণীর বিষয় অবগত ছিল। আম্মারের মৃত্যুতে তাদের ভুল ভেঙ্গে গেল। তারা বুঝতে পারলো যে, তারা অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত এবং আমিরুল মোমেনিন ন্যায় পথে রয়েছেন। এ চিন্তা অফিসার হতে সাধারণ সৈনিক পর্যন্ত সকলের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। অবস্থা বেগতিক দেখে মুয়াবিয়া তার চিরাচরিত মিথ্যা, ছলনা ও কুট চালের আশ্রয় গ্রহণ করে বললো, “আম্মারের মৃত্যুর জন্য আমরা দায়ী নই।
আলীই তো তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে। কাজেই তার মৃত্যুর জন্য আলী দায়ী।” মুয়াবিয়ার এহেন ছলনাপূর্ণ উক্তি যখন আমিরুল মোমেনিকে অবহিত করা হলো তখন তিনি মুয়াবিয়ার মূখ্যতা ও মিথ্যা উক্তির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বললেন, “মুয়াবিয়া বুঝাতে চায় হামজার মৃত্যুর জন্য রাসুল দায়ী, কারণ তিনিই তাকে ওহুদের যুদ্ধে এনেছিলেন।” (তাবারী *, ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৩১৬-৩৩২২; ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২৩১৪-২৩১৯; সা’দ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৭৬-১৮৯; আহীর, ৩য় খন্ড, পৃ. ৩০৮-৩১২ কাহীর’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ২৬৭-২৭২; মিনকারী***, পৃঃ ৩২০-৩৪৫; বার”, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১১৩৫-১১৪০; ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১৭২৫; আইট্র’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৪৩-৪৭; ৫ম খন্ড, পৃঃ ২৬৭; হাদীদ’, ৫ম খন্ড, পৃঃ ২৫২-২৫৮, ৮ম খন্ড, পৃঃ ১০-২৮, ১০ম খন্ড, পৃঃ ১০২-১০৭; নায়সাবুরী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৮৪-৩৯৪; রাব্বিহ”, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ৩৪০-৩৪৩; মাসুদী”, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৮১-৩৮২; শ্যাফেয়ী***, ৭ম খন্ড, পৃঃ ২৩৮২৪৪; ৯ম খন্ড, পৃঃ ২৯১-২৯৮; বালাজুরী” “, পৃঃ ৩০১-৩১৯)
৫। ইবনে তাইহানের পূর্ণ নাম হলো আবুল হায়ছাম (মালিক) ইবনে তাইহান আল-আনসারী। তিনি ছিলেন। আনসারদের বারজন নাকিবের (প্রধান) অন্যতম যারা প্রথমে আকাবােহর মেলায় রাসুলের সাথে আলোচনা করেছিলেন এবং দ্বিতীয় আকাবায় যারা রাসুলকে ইসলাম গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তিনি তাদেরও অন্যতম ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন বদরি (অর্থাৎ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহনকারী) এবং রাসুলের সময়কার সকল যুদ্ধ ও মুসলিম সমাবেশে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি আমিরুল মোমেনিনের একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি জামালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং সিফফিনের যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। (বার”, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১৭৭৩; মিনকারী***, পৃঃ ৩৬৫; আইট্র’, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ২৭৪; ৫ম খন্ড, পৃঃ ৩১৮; হাজর***, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৪১; ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৩১২-৩১৩; হাদীদ’, ১০ম খন্ড, পৃঃ ১০৭-১০৮; বালাজুরী’, পৃঃ ৩১৯)। ৬। যুশ-শাহাদাতাইনের আসল নাম হলো খুজায়মাহ ইবনে ছাবিত আল-আনসারী। রাসুল (সঃ) তার সাক্ষ্যকে দুজন লোকের সাক্ষ্যের সমতুল্য সত্য বলে মনে করতেন। সেই কারণে তিনি যুশ-শাহাদাতাইন বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন বদরি এবং রাসুলের জীবৎকালে তিনি সকল যুদ্ধে ও মুসলিম সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যারা প্রথমেই আমিরুল মোমেনিনের বায়াত গ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। আবদার রহমান ইবনে আবি লায়লা বর্ণনা করেছেন যে, সিফফিনের যুদ্ধে একজন লোককে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে তিনি দেখছেন এবং তিনি তার কাছাকাছি হলে সে চিৎকার করে বলেছিলো, “আমি খুজায়মাহ ইবনে ছাবিত আলআনসারী। আমি রাসুলকে (সঃ) বলতে শুনেছি, যুদ্ধ করা, যুদ্ধ কর, আলীর পক্ষে যুদ্ধ কর।” আম্মার ইবনে ইয়াসিরের অল্প কিছুক্ষণ পরেই খুজায়মাহ শাহাদত বরণ করেন। (বাগদাদী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৭৭; আসকারী’, ২য় খন্ড, পৃঃ১৭৫-১৮৯; হাদীদ’, ১০ম খন্ড, পৃঃ ১০৯-১১০; সাদ’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১৮৫-১৮৮; নায়সাবুরী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ৩৮৫-৩৯৭; আইট্র’, ২য় খন্ড, পৃঃ ১১৪; ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৪৭; বার”, ২য় খন্ড, পৃঃ ৪৪৮; তাবারী’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ২৩১৬-২৩১৯, ২৪০১; আছীর, ৩য় খন্ড, পৃঃ ২৩৫; মিনকারী***, পৃঃ ৩৬৩, ৩৯৮; বালাজুরী’, পৃঃ ৩১৩-৩১৪)। ৭। জামালের যুদ্ধে যারা আমিরুল মোমেনিনের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে একশত ত্ৰিশ জন ছিলেন বদরি (বন্দরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী) এবং সাতশত জন ছিলেন বায়াতুর রিদওয়ানি (গাছের নিচে রাসুলের হাত ধরে যারা বায়াত গ্ৰহণ করেছিল)। জামালের যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের পাঁচশত জন শহিদ হয়েছিল (মতান্তরে সাতশত জন শহিদ হয়েছিল)। আমিরুল মোমেনিনের বিপক্ষ দলের বিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়েছিল (জাহাবি?”, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৭১; খায়াত’, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৬৪; রাব্বিহ”, ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ৩২৬)। সিফফিনের যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের পক্ষে আশিজন বদরি ও আটশতজন বায়াতুর রিদওয়ানি অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের পচিশ হাজার জন শহিদ হয়েছিলেন। তন্মধ্যে ছাব্বিশ জন বদরি ও তিনশত তিনজন বায়াতুর রিদওয়ানি ছিলেন। আম্মার, যুশ-শাহাজা।তাইন ও ইবনে তাইহান ছাড়াও দুজন বিশিষ্ট ব্যক্তি শহিদ হয়েছিলেন। তারা হলেন হাশিম ইবনে উতবাহ ইবনে আবি ওয়াক্কাস আল-মিরাকল ও আবদুল্লাহ ইবনে বুদায়েল ইবনে ওয়ারুকা আল-খুজাই। আম্মার শহিদ হবার কিছুক্ষণ পরেই হাশিম শাহাদত বরণ করেন। সেইদিন আমিরুল মোমেনিনের ঝান্ডা বাহক ছিলেন হাশিম এবং পদাতিক বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে বুদায়েল। সিফফিনের যুদ্ধে মুয়াবিয়ার পক্ষে নিহত হয়েছিল পায়তাল্লিশ হাজার জন
(নায়সাবুরী**’, ৩য় খন্ড, পৃঃ ১০৪; বার”, ৩য় খন্ড, * ゞor; হাজর***, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৮৯; ইয়াকুবী’, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৮৮৫ মিনকারী***, পৃঃ ৫৫৮; বার”, ২য় খন্ড, পৃঃ ৩৮৯; বালাজুরী”, পৃঃ ৩২২; হাদীদ”**, ১০ম খন্ড, পৃঃ ১০৪; ফিন্দা”, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৭৫; ওয়ার্দী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ২৪০; কাহীর’, ৭ম খন্ড, পৃঃ ২৭৫; বাকরী”, ২য় খন্ড, পৃঃ ২৭৭)।