আল গাদীর ও ইসলামি ঐক্য

আল গাদীর বইটি ইসলামি বিশ্বে এক বিরাট ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। ইসলামি চিন্তাবিদগণ সাহিত্য, ঐতিহাসিক, কালাম, হাদীস, তফসির, সমাজ ও অন্যান্য দিক দিয়ে এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করেছেন। সামাজিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে দৃষ্টিপাত করলে যা দেখা দেয়, তা হচ্ছে ইসলামি ঐক্য

এ যুগের উদারদৃষ্টি সম্পন্ন শান্তি স্থাপনকারী ইসলামি চিন্তাবিদ ও মনীষীরা, বিভিন্ন জাতি, ইসলামি

ফের্কা ও সম্প্রদায়ের ঐক্যকে -বিশেষ করে বর্তমান অবস্থা ও পরিস্থিতিতে যেখানে চারদিক থেকে শত্রু আক্রমণ করছে, আর একের পর এক বিভিন্ন উপায় ও উপকরণের মাধ্যমে পুরাতন মতবিরোধের সম্প্রসারণ ও নতুন নতুন মতপার্থেক্যর উদ্ভাবনে লেগে আছে- ইসলামের প্রয়োজনীয় চাহীদার একটি মনে করেন। মূলত যেমন আমরা জানি যে ইসলামি ঐক্য ও ইসলামি ভ্রাতৃত্বর প্রতি নবী করিম (সা.) এর বিশেষ আগ্রহ, প্রচেষ্টা ও গুরুত্বের বিষয় ছিল এবং ইসলামের অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যর মধ্যে একটি। কোরান, সুন্নাত ও ইসলামের ইতিহাস হচ্ছে তার সাক্ষী।এদিক থেকে অনেকের এ প্রশ্ন থাকতে পারে যে, আল্ গাদীর এর মত একটি বইয়ের সংকলন ও প্রচার -যাতে মুসলমানদের একটি পুরোন ও মতপার্থক্যের বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে- কি ইসলামি ঐক্যের পবিত্র লক্ষ্য ও আদর্শের পথে বাধার সৃষ্টি করবেনা? আমরা মনে করি প্রবন্ধের ভূমিকাতে মূল বিষয়বস্তু অর্থাৎ ইসলামি ঐক্যের অর্থ ও তার সীমানা- কে পরিস্কার করব। তারপর আল গাদীর বই ও তার সম্মানিত লেখক আল্লামা আমিনি (র:) সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেব।

ইসলামি ঐক্য

ইসলামি ঐক্যের উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য কি এটাই যে, ইসলামি মাযহাবগুলোর মধ্য থেকে একটিকে নির্বাচন করে নিয়ে আর বাকি মাযহাবগুলো ছেড়ে দেওয়া হোক এবং এভাবে একটি নতুন মাযহাবের সৃষ্টি হবে যার তুলনা বর্তমান মাযহাবগুলোর কোনটির সাথে হবেনা? নাকি কোনভাবেই ইসলামি ঐক্যের সম্পর্ক, মাযহাবগুলোর ঐক্যের সাথে নেই, আর মুসলিম ঐক্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে মাযহাবগত মতপার্থক্য থাকা সত্বেও শত্রুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাযহাবের অনুসারিদের ঐক্য? মুসিলম ঐক্য বিরোধীরা ইসলামি ঐক্যের অর্থকে যুক্তিহীন ও জ্ঞান বিরোধী বানানোর জন্য, সেটাকে মাযহাবি ঐক্য নামে ব্যাখ্যা – বিশ্লেষণ করেছেন যাতে প্রথম পদক্ষেপেই, পরাজয়ের সম্মুখীন হতে হয়। এটা নিশ্চিত যে ইসলামি ঐক্য বলতে ইসলামি উদার মনের ওলামাদের উদ্দেশ্য এই নয় যে, সব মাযহাবগুলোকে এক মাযহাবে সীমাবদ্ধ করা বা অন্যান্য মাযহাবগুলোর যৌথ বা অভিন্ন মতকে গ্রহণ করে অগ্রহণযোগ্য আর ভিন্নমতগুলোকে যা যুক্তিসম্মত, পছন্দনীয় ও বাস্তবায়নযোগ্য নয় বাদ দেওয়া হোক। এই চিন্তাবিদদের উদ্দেশ্য হল, তাদের যৌথ শত্রুর বিরুদ্ধে এক সারিতে মুসলমানদের সমন্বয়।

এই চিন্তাবিদরা বলেন: মুসলমানদের মধ্যে পরস্পর সমঝোতা ও মিলের কারণ অনেক, যা হতে পারে এক শক্তিশালী ঐক্যের মূল। মুসলমান সবাই এক খোদার উপাসনা ও ইবাদত করে এবং সবাই নবী করিম (সা.) এর রেসালতকে স্বীকার করে ও তাতে বিশ্বাসি । সবার আসমানি কেতাব কোরান ও সবার কেবলা হচ্ছে কাবা। সবাই মিলে এক সাথে পবিত্র হজ্বব্রত পালন করে এবং একই রকম নামাজ আদায় করে আবার একইভাবে রোজা রাখে আবার পারিবারিক গঠন ব্যবস্থা, বেচাকেনা এবং নিজেদের সন্তানদের লালন পালন করা, মৃতদের দাফন করাও একই রকম। শুধুমাত্র কিছু ক্ষুদ্র বিষয় ছাড়া এইসব কাজে কোন পার্থক্য নেই। সমস্ত মুসলমানদের সংস্কৃতি অভিন্ন ও একই এবং একটি বিরাট পুরাতন কৃষ্টি, সভ্যতা ও মহতিতে অংশ গ্রহণ করছে।

সংস্কৃতিতে, পুরোন কৃষ্টিতে, অন্তর্দৃষ্টি ও অভ্যাসে, মাযহাবগত বিশ্বাসের বিষয় সমূহে, ইবাদত ও উপাসনাতে, সামাজিক আদব ও রীতিতে ঐক্য তাদেরকে এক জাতিতে পরিণত করতে পারে এবং এক বিরাট ও ভয়ঙ্কর শক্তির সৃষ্টি করতে পারে যাতে বৃশ্বের বড় বড় শক্তিগুলো তাদের সামনে মাথা নত করতে বাধ্য। বিশেষ করে ইসলামে এই মূলনীতির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কোরানে অকাট্য ভাষায় পরিস্কারভাবে মুসলমানদেরকে একে অপরের ভাই বলা হয়েছে, তাদের বিশেষ অধিকার ও দায়িত্বকে একে অপরের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছে। এমতাবস্থায় কেনইবা মুসলমানরা এত ব্যাপক সম্ভাবনা যা ইসলামের বরকতে তাদের ভাগ্যে জুটছে ব্যবহার করবেনা। ইসলামি আলেমদের এই দলটির দৃষ্টিতে: মুসলমানদের জন্য কোন প্রয়োজন নেই যে ইসলামি ঐক্যের কারণে নিজেদের মাযহাবের মৌলিক (উসুল) বা অ-মৌলিক (ফুরু) বিষয়ে আপোস ও সন্ধি করবে। যেমন করে নিজেদের মধ্যে মৌলিক ও অ-মৌলিক বিষয়ে কোন মতবিরোধ, আলোচনা ও যুক্তি প্রয়োগ করবে না বা বই লিখবে না এমন কোন কথাও নেই। শুধুমাত্র ইসলামি ঐক্য যা চায় তা হচ্ছে এই যে, মুসলমানদের মধ্যে আবেগ প্রবণতায় কোন ঈর্ষা ও বিদ্বেষের জন্ম না নেয় অথবা আগুনের মত গরম না হয়ে স্থিরতাকে রক্ষা করে, একে অপরের প্রতি গালাগালি না করে, একে অপরকে কোন মিথ্যা অপবাদ না দেয়, একে অপরের যুক্তিকে উপহাস না করে, মোট কথা একে অপরের অনুভূতিতে আঘাত না হানে এবং যুক্তি ও প্রমানের সীমারেখা অতিক্রম না করে। প্রকৃতপক্ষে ইসলাম অমুসলিমকে ইসলামের প্রতি আমন্ত্রণ জানানোর যে সীমাকে অপরিহার্য মনে করেছে কমপক্ষে নিজেদের মধ্যে তা মেনে চলে।

«ادعالیسبيلربكبالحكمةوالموعظةالحسنةوجادلهمبالتیهیاحسن». النحل: 125

জ্ঞান ও সুষ্ঠ উপদেশের দ্বারা তোমার প্রভুর রাস্তায় আহবান কর; আর তাদের সাথে এমনভাবে পর্যালোচনা কর যা শ্রেষ্ঠ। ১৬/১২৫

অনেকের এ ধারণা থাকতে পারে যে, যেসব মাযাহাবে শুধুমাত্র অ-মৌলিক (ফুরু) বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে, যেমন: শাফেয়ী, হানাফী তারা একসাথে ভাই হয়ে থাকতে পারে এবং এক কাতারে একসাথে দাড়াতে পারে, কিন্তু যেসব মাযহাবে মৌলিক বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে কোন মতেই একে অপরের সাথে ভাই হয়ে থাকতে পারবেনা। এ দলের দৃষ্টিতে মাযহাবের মৌলিক বিষয় সমূহ একটা আরেকটার সাথে জড়িত এবং মৌলবাদীদের পরিভাষায় এটা হচ্ছে اقلواكثرارتباطی(কম বেশির সম্পর্কের) মত, একজনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অর্থ হচ্ছে সবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। এছাড়া যেখানে ইমামতের মত একটি মূল বিষয়ে আঘাত হানা হয় ও কোরবানী বা শিকার করা হয়, যারা এ আকিদা বিশ্বাসিদের মতে এখানে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বর বিষয় অস্তিত্বহীন। আর এই যুক্তির ভিত্তিতে শিয়া ও সুন্নি কোন অবস্থাতে দুভাই হিসেবে একে অপরের হাতে হাত ধরে চলতে পারেনা।

প্রথম দলটি এ দলের কথার উত্তরে বলেন: কোন প্রশ্নই আসেনা যে আমরা মৌলিক বিষয়কে একে অপরের সাথে জড়িত বিষয়ে গণনা করব। মূল হচ্ছে হয় সবাই নয়তো কেউনা কথাটার এখানে অনুসরণ করব। এখানে একটি নিয়ম চলবে আর তা হচ্ছে:

“الميسورلايسقطبالمعسورومالايدرككلهلايترككله”.

অর্থ: সহজলভ্য বিষয় কষ্টের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়না আবার যার সবগুলো উপলদ্ধি করা হয়না তার সবগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়না

আমিরুল মুমেনিন আলী (আ.) এর সীরাহ ও পদ্ধতি আমাদের জন্য উত্তম এবং শিক্ষণীয় পাঠ। আলী (আ.) সেই যুক্তি সঙ্গত ও সঠিক পথই বেছে নিয়েছিলেন যেটা তারমত একজন মহান ব্যক্তির জন্য উপযুক্ত ছিল।

তিনি কোন চেষ্টার ত্রুটি করেননি, ইমামতকে বাচিয়ে রাখতে সমস্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছেন, কিন্তু কখনই হয় সবাই নয়তো কেউনা এর অনুসরণ করেননিউল্টো”اصلمالايدرككلهلايترككله(যার সবগুলো উপলদ্ধি করা হয়না তার সবগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়না।) কথাকে নিজের কাজের মূল হিসেবে নির্ধারণ করলেন।

তিনি মালেক আশতারের নামে নিজের কোন এক পত্রে লিখেছেন:

« فامسكتيدیحتیرأيتراجعةالناسقدرجعتعن‏الاسلام،يدعونالیمحقدينمحمدصلیاللهعليهوآله،فخشيتانلمانصرالاسلامواهله،اریفيهثلمااوهدماتكونالمصيبةبهعلیاعظممنفوت‏ولايتكمالتیانماهیمتاعايامقلائل » .

প্রথমে আমি নিজের হাত ফিরিয়ে নিয়েছিলাম, যখন দেখলাম একদল লোক ইসলাম ছেড়ে দিচ্ছে এবং জনগণকে মোহাম্মদ (সা.) এর দ্বীন ধ্বংস করার আহবান জানাচ্ছিল। অত:পর আমার ভয় হল যে, যদি আমি ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্যর উদ্যোগ না নেই তাহলে ইসলামের ধ্বংস বা ফাটল দেখতে পাব যার বিপর্যয় সাময়িক খেলাফতের মৃত্যুর চেয়ে অনেক বেশি।(নাহজুল বালাগা, পত্র নং: ৬২)

এসব হতে বোঝা যায় যে, আলী (আ.) হয় সবাই নয়তো কেউনা এর মূলকে এ বিষয়ে নিন্দনীয় মনে করেছেন, আলী (আ.) এর রীতিনীতি ও সীরাহ নিয়ে এখানে আলোচনা করার কোন প্রয়োজনই নেই। এ বিষয়ে অনেক দলিল প্রমান ইতিহাসে রয়েছে।

আল্লামা আমিনি

এখন সময় এসেছে আয়াতুল্লাহ আল্লামা আমিনিকে জানার যে, আল গাদীরের এই মহান লেখক কোন দলের লোক ছিলেন এবং তার চিন্তাভাবনা কি ছিল? তিনি কি মুসলমানদের একতা ও ঐক্যকে শুধূমাত্র শীয়া গন্ডিতে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করতেন, নাকি ইসলামি ভ্রাতৃত্বকে বিশাল আকারে মনে করতেন। আর বিশ্বাস করতেন যে, স্বীকারোক্তি ও বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ইচ্ছা অনিচ্ছায় এক অধিকারকে মুসলমানের উপর মুসলমানের অধিকার বলে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের জন্য কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে ও মুসলমানদের মধ্যে যা সংরক্ষিত, আল্লামা আমিনি এ বিষয়েও যে তার দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন এবং ইসলামি ঐক্য প্রশ্নে আল গাদীরের ভূমিকা কি, পক্ষে না বিপক্ষে, পুরোপুরিভাবে সজাগ ছিলেন। আর যারা বিরোধী দলের প্রশংসা কুড়ানোর জন্য নিজেকে প্রদর্শন করে বা যারা স্বপক্ষে ভীত সন্ত্রস্ত এরূপ প্রতিবাদকারীরা তাকে অপব্যবহারের পাত্রে পরিণত না করে, বারংবার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে ব্যাখ্যা দিয়ে পরিস্কার করে দিয়েছেন।

আল্লামা আমিনি ইসলামি ঐক্যের সমর্থক ছিলেন এবং তার প্রতি সুপ্রশস্ত ও পরিস্কার মত পোষণ করতেন। বিভিন্ন সুযোগে আল গাদীর বইতে তিনি এ বিষয়টিকে উপস্থাপন করেছেন। যার কিছু অংশ আমরা এখানে তুলে ধরব: প্রথম খন্ডের ভূমিকাতেই, ইসলামি বিশ্বে আল গাদীর কি ভূমিকা রাখবে তিনি তার সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন: আর আমরা এগুলোকে দ্বীনের খেদমত, হক্ব বাণীর ঘোষণা ও ইসলামি উম্মতের পুনর্জাগরণ মনে করি।

তৃতীয় খন্ডের ৭৭ নং পৃষ্ঠাতে, ইবনে তাইমিয়্যা, আলুসি ও ক্বাসিমির এই ভিত্তিতে কিছু বক্তব্যর যে, শীয়ারা আহলে বাইতের কিছু লোকের সাথে, -যেমন: যাইদ ইবনে আলী ইবনেল হুসাইন- সত্রুতা রাখে,نقدواصلاح(সমালোচনা ও সংশোধন) শিরোনামে উল্লেখ করে বলেন: … এই মিথ্যা ও অপবাদ বিশৃঙ্খলার বীজ বপন করবে। আর ইসলামি উম্মতের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি করবে ও ইসলামি ঐক্যকে বিচ্ছিন্নতার রূপ দেবে এবং ইসলামি উম্মতের সমাবেশকে বিক্ষিপ্ত করে দেবে যা মুসলমানদের কল্যাণ ও স্বার্থের বিরোধী

তৃতীয় খন্ডের ২৬৮ নং পৃষ্ঠাতে আবার সৈয়দ রশীদ রেজার এ কথার ভিত্তিতে যে, মুসলমানদের কপালে যত পরাজয়ই আসুকনা কেন শীয়ারা তাতে খুশী হবে, এমনকি মুসলমানদের বিরুদ্ধে রাশিয়ার বিজয়ে ইরানে সবাই খুশীতে মেতে উঠল বর্ণনা করে বলেন: এই কথাগুলো সৈয়দ রশীদ রেজার বানানো। ইরান ও ইরাকের শীয়াদেরকে ইচ্ছা করেই এসব অপবাদের শিকার করা হয়েছে, নয়তো প্রাচ্যবিদরা, পর্যটকরা বা ইসলামি দেশগুলোর প্রতিনিধিরা যারা ইরান ও ইরাকে যাতায়াত করে থাকেন তারা এসবের কোন খবরই রাখেননা। শীয়ারা বিশ্বাস করে যে, শীয়া হোক সুন্নি হোক সব মুসলমানদেরকে তাদের জান, মাল, রক্ত ও মর্যাদার খাতিরে সম্মান দিতে হবে। যখনই যে কোন স্থানে ইসলামি বিশ্বের কোন ফের্কার দুর্যোগ এসেছে, তাদের দুঃখের অংশীদার হয়েছে। শীয়ারা কখনই কোরান ও হাদীসে উল্লেখ করা ইসলামি ভ্রাতৃত্বকে শীয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করেনি এবং এদিক দিয়ে শীয়া ও সুন্নির মধ্যে কোন পার্থক্য করেনি

বরং তৃতীয় খন্ডের শেষের দিকে, পূর্ববর্তিগণের কিছু বইয়ের যেমন: ইবনে আব্দু রাব্বাহর আল ইকদুল ফারিদ, আবুল হুসায়ন খাইয়াত মুতাযেলির আল ইনতেসার, আবু মানসুর বোগদাদির আল ফারক বাইনাল ফেরাক, ইবনে হাযম ওন্দোলোসির আল ফাসল, মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল কারিম শাহরিস্তানির আল মিলাল ওয়ান নাহল, ইবনে তাইমিয়্যার মিনহাজুস সুন্নাহ, ও ইবনে কাসিরের আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ এবং সাম্প্রতিক কালের ব্যক্তিদের কিছু বই যেমন: শেখ মোহাম্মদ খেযরির তারিখুল ওমামুল ইসলামিয়্যাহ, আহমাদ আমিনের ফাজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ সাবেত মেসরির আল জাউলাতু ফি রোবুএশ শারকেল আদনা, কাসিমির আস সুরা বাইনাল ইসলাম ওয়াল ওয়াসানিয়্যাহ, ও মুসা জারুল্লাহর আল ওয়াশীআহ এর সমালোচনা করার পর বলেনঃ এইসব বইয়ের বর্ণনা ও সমালোচনা করার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের এই যে, ইসলামি উম্মতের জন্য বিপদের ঘোষনা ও তাদেরকে জাগিয়ে তুলবো যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এই বইগুলো একটি বড় বিপদ সঙ্কেত। কেননা ইসলামি ঐক্যকে দুর্বল করে ফেলবে, মুসলমানদের সমবেতকে ছত্রভঙ ও বিক্ষিপ্ত করে দেবে। এই বইগুলো ছাড়া অন্য কোন কারণই এতবেশী মুসলমানদের কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে দেবেনা এবং তাদের ঐক্যকে ধ্বংস ও ইসলামি ভ্রাতৃত্বকর বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলবেনা। আল্লামা আমিনি ৫ম খন্ডের ভূমিকাতেنظريةكريمة(উদার দৃষ্টিভঙ্গি) শিরোনামে মিশর থেকে আল গাদীরকে উদ্দেশ্য করে যে একটা প্রশংসাপত্র তার কাছে পৌঁচেছে সেই উপলক্ষে এ বিষয়ে তার দৃষ্টি সম্পূর্ণ পরিস্কার করে দিয়ে বলেছেন: মাযহাবগত ব্যাপারে আকিদা বিশ্বাস ও মতামতে স্বাধীনতা রয়েছে কিন্তু ইসলামি ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে, যাকে কোরান« انماالمؤمنوناخوة »বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে ছিঁড়ে ফেলবেনা। জ্ঞান সম্পর্কে যতই তর্ক বিতর্ক হোকনা কেন সাহাবা ও তাবেঈনদের পদ্ধতিও এটাই ছিল

ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলসমূহে আমরা লেখক গোষ্টির মধ্যে ইসলামের মৌলিক ও অন্যান্য বিষয়ে যতই বিরোধীতা হোকনা কেন এক বিষয়ে ঐক্যমত, আর তা হচ্ছে খোদা ও তার রাসুল (সা.) এর উপর ঈমান। আমাদের সবার মধ্যে একটাই অনুভূতি ও প্রাণ কাজ করছে আর সেটা হচ্ছে ইসলাম ও এখলাস শব্দটি

আমরা ইসলামি লেখক সমাজ হকের পতাকা তলে জীবনধারণ করছি এবং কোরান ও নবী করিম (সা.) এর রেসালতের নেতৃত্বের অধীনে নিজেদের দায়িত্ব পালন করছি। আমাদের সবার একই বার্তা আর তা হচ্ছে:

« انالدينعنداللهالاسلام ».

এবং আমাদের শ্লোগান হচ্ছে:

لاالهالااللهومحمدرسول‏الله “.

হ্যাঁ আমরা খোদার দল ও তার দ্বীনের সমর্থক। আল্লামা আমিনি ৮ম খন্ডের ভূমিকাতে الغديريوحدالصفوففی‏الملاالاسلامی শিরোনামে ইসলামি ঐক্যে আল গাদীরের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় তিনি, যারা বলে যে, আল গাদীর মুসলমানদের মধ্যে বেশীকরে বিভ্রান্তির কারণ হয় তাদের অপবাদকে খন্ডন করেছেন এবং প্রমান করে দিয়েছেন যে, আসলে তার উল্টো। বরং আল গাদীর নিজেদের মধ্যে অনেক রকম ভুল বোঝাবুঝিকে দুর করে দেয় এবং মুসলমানদেরকে একে অপরের কাছাকাছি আসার কারণ হয়। তারপর শীয়া নয় এমন এক জ্ঞানী ব্যক্তির স্বীকারোক্তিকে এই সম্মন্ধে প্রমান স্বরূপ পেশ করেন ও শেষে এই উপলক্ষে শেখ মোহাম্মদ দাহদুহের একটি চিঠির উল্লেখ করেন।

প্রবন্ধটি যাতে দীর্ঘায়িত না হয়, আমরা ইসলামি ঐক্যের ব্যাপারে আল গাদীরের যে ভূমিকা, তার পক্ষে আল্লামা আমিনির সম্পূর্ণ বর্ণনা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকছি। কেননা এ পর্যন্ত যা উল্লেখ করেছি উদ্দেশ্যকে প্রমান করার জন্য যথেষ্ঠ।

ইসলামি ঐক্যে আল গাদীরের ভূমিকা এই জন্য ইতিবাচক যে, প্রথমত: শীয়াদের যুক্তির দ্বারা প্রমাণিত দলিলকে পরিষ্কার করে এবং প্রমাণ করে যে, শীয়ার প্রতি প্রায় কোটি কোটি মুসলমানের আকৃষ্ট হওয়া কিছু লোকের মিথ্যা অপপ্রচারকোন রাজনৈতিক, বর্ণগত বা অন্য কোন নতুন ঘটনার প্রবাহ ছিলনা। বরং কোরান ও সুন্নাতের উপর নির্ভরশীল এক শক্তিশালী যুক্তির কারণে এই প্রবণতা। দ্বীতিয়ত: শীয়াদের উপর কিছু কিছূ অভিযোগ যেমন: শীয়ারা, অমুসলিমকে মুসলিমের উপর প্রাধান্য দেয় এবং অমুসলিমের কাছে মুসলমানদের পরাজয়ে খুশী হয় অথবা শীয়ারা হজ্বব্রত পালনের পরিবর্তে তাদের ইমামদের মাযার যেয়ারত করতে যায় বা নামাজে এটা করে সাময়িক বিয়েতে সেটা করে এ সবগুলি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা কথাগুলো প্রমাণ করে যে, শীয়া সম্প্রদায় হতে অন্যান্য মুসলমান ভাইদের দূরত্ব হয়েছে।

গাদীর সম্পর্কে অন্যান্যদের অনুমান

অনেক নিঃস্বার্থ জ্ঞানী মুসলমানের অনুমান এটাই যা আমরা বলেছি।

মোহাম্মদ আব্দুল গনি হাসান মিসরি, তার তাক্বরিয বইয়ের প্রথম খন্ড দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকাতে উল্লেখ করেছে: আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবো যে, তোমাদের স্বচ্ছ ও সুমিষ্ট পুকুরকে (আরবীতে গাদীরের অর্থ হচ্ছে পানির গর্ত) শীয়া ও সুন্নি দুই ভাইয়ের মধ্যে শান্তিময় জীবন হিসেবে নির্ধারণ করুক যাতে হাতে হাত মিলিয়ে ইসলামি উম্মতের ভিত্তি স্থাপন করা যেতে পারে।

আদেল গাদবান মিসরের আল কেতাব পত্রিকার সম্পাদক তার তৃতীয় খন্ডের ভূমিকাতে উল্লেখ করে: এই বই, শীয়াদের যুক্তিকে পরিষ্কার করে আর আহলে সুন্নাত এই বইয়ের মাধ্যমে শীয়াদেরকে সঠিকভাবে জানতে পারবে। শীয়াদের সঠিক পরিচয় শীয়া সুন্নী মতামতকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসার কারণ হতে পারে, যাতে সবাই মিলে এক জনসমষ্টি গঠন করতে পারে। আল আযহার ইউনিভারসিটির ওসুলে দ্বীন বিভাগের দর্শনের শিক্ষক ডক্টর মোহাম্মদ গোলাব, আল গাদীর সম্পর্কে যে মুখবন্ধ লিখেছেন এবং তা চতুর্থ খন্ডের ভূমিকাতে প্রকাশও পেয়েছে, বলেন: তোমাদের বই খুব সঠিক সময়ে আমার হাতে পৌঁচেছে, কেননা বর্তমানে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়ে মুসলমানদের জীবন ব্যবস্থার উপর একটি বই লিখতে ব্যস্ত ছিলাম, তাই অনেক ইচ্ছা ছিল যে, শীয়া ইমামিয়া সম্বন্ধে সঠিক তথ্য হলে ভাল হত। তাই তোমাদের বই আমাকে এ বিষয়ে সাহায্য করবে আর আমি অন্যান্যদের মত শীয়া সম্পর্কে ভুল করবোনা

ডক্টর আব্দুর রহমান কেয়ালি হালাবি তার মুখবন্ধে যা চতুর্থ খন্ডের ভূমিকাতে প্রকাশ পেয়েছে লিখেছেন, এ যুগের মুসলমানদের অধঃপতন ও তাদের নাজাতের উপাদানসমূহ এবং নবী করিম (সা.) এর ওসি ও উত্তরাধিকারির সঠিক পরিচয় হচ্ছে তার একটি উপাদানের কথা উল্লেখ করে বলেন: আল গাদীর বই ও তার মূল্যবান বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলমানদের জানা প্রয়োজন, যাতে বুঝতে পারে যে ইতিহাসবিদরা কতটা অবহেলা করেছেন আর সত্যতা কোন পর্যায়ে। আমরা এভাবে অতীতের ক্ষতিপূরণ করবো এবং মুসলেমিনদের ঐক্যের পথে চেষ্টা করে কিছুটা পুণ্য ও নেকি হাসিল করবো

হ্যাঁ, এ যুগের বিশেষ সামাজিক প্রশ্নে আল্লামা আমিনির দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এটাই। আর ইসলামি বিশ্বে এ হচ্ছে তার ভাল কাজের প্রতিকৃয়া। আল্লাহ তার থেকে রাজি থাকুক।

Source: http://www.hussainidalan.com