‘অন্যায়ের কাছে মাথানত না করাই ইমাম হুসাইনের (আ.) শিক্ষা’

১৩৭৪ বছর আগে ৬১ হিজরির ১০ মহররম সংঘটিত হয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্তক ঘটনা। ইরাকের কারবালায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)র দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর ৭২ জন সঙ্গী খাঁটি মুহাম্মদি ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রক্তের সাগরে ভেসে মুসলমানদের দিয়ে গেছেন শাহাদাতের সংস্কৃতির বাস্তব শিক্ষা। মহররমের তাতপর্য ও শিক্ষা সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতকার দিয়েছেন বাংলাদেশের চাঁদপুর

জেলার ফরিদগঞ্জ আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল এবং আঞ্জুমানে সিরাজুম মুনিরার চেয়ারম্যান ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান। তার সাক্ষাতকারটি এখানে উপস্থাপন করা হলো:

রেডিও তেহরান: কেন কারবালার মজলুম বীরগণ মানব জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদা লাভ করেছেন? কেন শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-কে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন যে, হুসাইন আমা থেকে ও আমি হুসাইন থেকে? কেন শহীদদের নেতা হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)কে বিশ্বনবী (সা.) মুক্তির তরণী তথা সাফিনাতুন নাজাত বলে উল্লেখ করেছেন?

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: কারবালা শুধু একটা নাম নয়, এটা একটা ইতিহাস। রাসূল (সা.) এরশাদ করেন: আমি তোমাদের মাঝে দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, একটি কুরআন, আরেকটি হল- আমার আহলে বাইত। কিতাবুল্লাহ হল থিওরি, আর আহলে বাইত হল রাসূল (সা.) এর সুন্নতের বাস্তবায়নকারী। তো মুসলমান নামধারী একটি কুচক্রীমহল, মুনাফেকিন ও ইহুদিচক্র আহলে বাইতের চরিত্র, আকিদা, রাসূলপ্রেম এবং মানবপ্রেম ধ্বংস করার জন্যই কারবালার ময়দানে নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে।

রাসূল (সা.) বলেছেন: আমার আহলে বাইত হল, সাফিনাতুন নাজাত অর্থাৎ তারা নাজাতের কিশতি। যারা তাদেরকে অনুসরণ করবে, তারা মুক্তি পাবে আর যারা অনুসরণ করবে না, তারা ধ্বংস হয়ে যাবে। নূহ (আ.) এর ছেলে যেভাবে ডুবে যায়, সেভাবে তারা ডুবে যাবে। সে জন্য আমি বলতে চাই-কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন (আ.) এর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য নাজাতের একটি পথ। এজন্য খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী আজমীরি (রহ.) বলেছিলেন: শাহ আস্ত হুসাইন, বাদশাহ আস্ত হুসাইন, দ্বীন আাস্ত হুসাইন, দ্বীন পানাহ আাস্ত হুসাইন। অর্থাৎ সম্রাট হুসাইন, সম্রাটের সম্রাট হুসাইন, হুসাইনই দ্বীন এবং দ্বীনের রক্ষক হলেন হুসাইন। তিনি আরো বলেছেন, সার দদ না দদ দাসত দার দাসতে ইয়াজিদ, হাক্কাকে বেনায়ে লা ইলাহা আসত হুসাইন”-অর্থাৎ হুসাইন মাথা দিয়েছেন কিন্তু ইয়াজিদের সামনে মাথানত করেননি, প্রকৃতপক্ষে হুসাইন লা-ইলাহার বুনিয়াদ বা ভিত্তি। অন্যায়ের কাছে মাথানত করা যাবে না এটাই ইমাম হুসাইনের শিক্ষা।

কারবালার ময়দানে যদি ইমাম হুসাইন (আ.) তাজা রক্ত না ঢালতেন, তাহলে ইয়াজিদি ইসলাম প্রতিষ্ঠা হত, ইসলামের আসল রূপ খুঁজে পাওয়া যেত না। ইয়াজিদি ইসলামের স্বরূপ হলো- তারা মসজিদে নববীতে তিন দিন ঘোড়া বেঁধে রেখেছিল। মসজিদে নববীতে আজান হয়নি, জামায়াত হয়নি, মসজিদে নববীতে মানুষ আসতে পারে নাই। তারা আসল দ্বীনের রূহটাকে নষ্ট করে দিয়েছে। এজন্য ইমাম হুসাইন (আ.)এর শিক্ষা যদি মুসলমানরা গ্রহণ করত তাহলে শুধুমাত্র মুসলিম উম্মাহ নয় সকল মজলুম জনতা আজকে মুক্তি পেত। কিন্তু ওয়াহাবী ও ইহুদীচক্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যে, ইমাম হুসাইন (আ.) আমিরুল মুমিনিন-এর বিরোধী ছিলেন, তিনি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ছিলেন। আসতাগফিরুল্লাহ।

ইমাম হুসাইন (আ.) সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন: ইন্নাল হাসান ওয়াল হুসাইন সাইয়্যেদা শাবাবে আহলিল জান্নাহ অর্থাৎ হাসান ও হুসাইন জান্নাতের যুবকদের সর্দার হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য- তারা জান্নাতের সর্দারকে বিদ্রোহী বলছে। মূলত এরাই খেয়ানতকারী ও বিশ্বাসঘাতক।

রেডিও তেহরান: মহররমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দর্শন বা প্রধান শিক্ষাগুলো কী?

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: আশুরার দুটি দিক আছে। তাওয়াল্লা অর্থাৎ ন্যায়ের পক্ষে উত্থান আর একটা হল অন্যায়ের প্রতিবাদে উত্থান। যেহেতু দুনিয়ায় আর কোনো নবী আসবেন না সেহেতু রাসূলের আহলে বাইত ও তাঁর নাতির শাহাদাতের বিনিময়ে কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর উম্মত নাজাত পাচ্ছে। আশুরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল- অন্যায় করব না, অন্যায় সইব না, অন্যায় করতে দেব না। এতে জান চলে যাবে কিন্তু আপোষ করব না।

ইমাম হুসাইন (আ.) যখন কুফার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন, তখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-হে ইমাম! দুই দিন পর হজ। আপনি হজ না করে কেন চলে যাচ্ছেন? ইমাম হুসাইন (আ.) বললেন: হজ করা ইবাদত, আর ইয়াজিদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ। হজের ইবাদতের চেয়েও ঈমান-আকিদা ঠিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম হুসাইন (আ.) আরো বললেন: আমি বের হয়েছি আমর বিল মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার এ আয়াতের আমল করার জন্য।

এ সময় যারা বাধা দিল, তাদেরকে ইমাম বললেন: আমি রাসূল (সা.)এর নাতি হয়ে কোনদিন অন্যায়কে বরদাশত করতে পারব না। এজন্য মহররমের মূল শিক্ষাই হল আপোষহীন জিহাদ যে জিহাদে থাকবে রুহানিয়াত। দেখুন! সারা বিশ্বে কিছু জিহাদ চলছে কিন্তু সেখানে রুহানিয়াত নেই, আধ্যাত্মিকতা নেই এবং এখলাস নেই। শুধুমাত্র আছে গদির ওপর লোভ। ইমাম হুসাইন তেমন ছিলেন না। তিনি যদি পদ চাইতেন তাহলে বড় বড় পদ তাকে দেয়া হত। তিনি যদি অর্থ চাইতেন তাহলে তাকে অর্থের ভাণ্ডার দেয়া হত। কিন্তু তিনি চেয়েছেন রাসূল (সা.) এর খালেস দ্বীনকে রক্ষা করতে, যে কারণে তাকে জীবন দিতে হয়েছে। শিশু আলী আসগরের তাজা রক্ত পড়েছে তবুও তিনি আপোষ করেননি। এটাই হল মহরমের শিক্ষা।

 মহররমকে নিতে হবে অন্যায়ের প্রতিবাদে এবং ন্যায়ের প্রতিষ্ঠায়। আজকে এ বিষয়টি ভুলে যাওয়ার কারণে, অপব্যাখ্যার কারণে কারবালাকে মানুষ ভুলে গেছে। কারবালা যতদিন মানুষের অন্তরে থাকবে, ততদিন মানুষ অন্যায় করতে পারবে না। এজন্য কারবালাকে ভালভাবে শরণ করতে হবে অথেনটিক ইতিহাস থেকে। তারিখে তাবারি, বেদায়ে ও নেহায়া, তারিখে ইবনে খালদুনসহ বড় বড় ইতিহাস ও হাদিসের কিতাবগুলো না পড়ে ওলামায়ে কেরাম কারবালা সম্পর্কে নানারকম মন্তব্য করে। বিশেষ করে ওয়াহাবিজম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, তারা বলে ইয়াজিদের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইনের ময়দানে নামাটা ছিল অন্যায়। আসতাগফিরুল্লাহ। তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে তারা মহররমের অনুষ্ঠানও করে না। আর আমাদের বাংলাদেশেও বর্তমানে মহরমের অনুষ্ঠান নাই, মহররমের কোন তাজিয়া বের করা হচ্ছে না, কান্নাকাটি নেই। অথচ ইমাম হুসাইন ও তাঁর বংশধরের রক্ত কারবালায় ঝরেছে, যারা তাদেরকে ভালবাসবে তারা ক্রন্দন করবে। রাসূল (সা.) বলেছেন: আমার আহলে বাইতকে মহব্বত করা ঈমানের অংশহুসাইনও মিন্নি ওয়া আনা মিনাল হুসাইন। অর্থাৎ হুসাইন আমার অংশ আমি হুসাইনের অংশ

মুসলমানদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে হলে এই মহররম মাসেই আশুরার রক্তকে সামনে রেখে শপথ করতে হবে যে, আমরা অন্যায় করব না এবং অন্যায় করতে দিব না, সঠিক দিনকে তুলে ধরব। যে দ্বীনের নেতৃত্বে থাকবে হক্কানি ওলামায়ে কেরাম ও যোগ্য রুহানি ব্যক্তিত্ব। যেটা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান করতে পেরেছে। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আয়াতুল্লাহ ইমাম খোমেনী (রহ.)। যে নেতৃত্ব সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলেছে। এজন্য যারা ইসলামি নেতৃত্ব দিতে চান তাদেরকে তিনটি গুণ অর্জনের পরামর্শ দেব। ১. তারা যেন কুরআন-সুন্নাহ ও ফিকাহর সঠিক জ্ঞান, ২. নেতৃত্বের সঠিক জ্ঞান এবং ৩. রুহানি জ্ঞান। এই তিনটার সমন্বয় না হলে ইসলামী নেতৃত্ব হয় না।

আহলে বাইতের ইতিহাসগুলো সারা দুনিয়ায় চর্চা করা হচ্ছে না। আহলে বাইতের ইমামদের জীবনী আলোচনা হচ্ছে না; এটা দুর্ভাগ্য মুসলিম জাতির জন্য। মহররমের শিক্ষা হল- আহলে বাইতকে নিজের অন্তরে ধারণ করা, আহলে বাইতের মহব্বত অন্তরে জাগিয়ে তোলা, আহলে বাইতকে সামনে নিয়ে নিজের প্ল্যান-পরিকল্পনা করা এবং অন্যায়ের সামনে মাথানত করব না এই শিক্ষা গ্রহণ করা।

রেডিও তেহরান: আপনি চমতকারভাবে মহররমের শিক্ষাগুলো বর্ণনা করলেন। এবার আমরা জানতে চাই- কিভাবে সাধারণ নাগরিকসহ আমাদের মুসলিম সমাজের সবার জীবনে মহরমের শিক্ষাগুলো বাস্তবায়ন করা যায়? বিশেষ করে কারবালার মহান বিপ্লবের আলোকে ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষিত মুসলিম সমাজের দায়িত্ব কী?

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে আন্দোলন হচ্ছে, বিভিন্ন আন্দোলন জেগে উঠছে, মানুষের মধ্যে জাগরণ আসছে কিন্তু অনেক জায়গায় জাগরণ ব্যর্থ হচ্ছে, কোথাও হোঁচট খাচ্ছে। অনেক জায়গায় মুসলমানরাই মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, কারণ তাদের মধ্যে সঠিক আকিদা-বিশ্বাস নেই।

মনে রাখতে হবে- দ্বীন প্রতিষ্ঠার মূল হলো আকিদা। এই আকিদা যদি ঠিক না থাকে, বদ আকিদা যখন ঢুকবে তখন আন্দোলন সফল হবে না। কিন্তু আহলে বাইতের মহব্বত আজকে অনেক আন্দোলনের মধ্যে নেই। তরিকত, হাকিকত ও মারেফতকে বাদ দিয়ে আন্দোলন হচ্ছে প্ল্যাস্টিক মার্কা আন্দোলন। সে আন্দোলনের রূহ নাই। এজন্য যারা নেতৃত্বে থাকবেন তাদের জ্ঞান ও আমলের ধারা আহলে বাইতের ইমামগণ যেমন- ইমাম হাসান, ইমাম হুসাইন, ইমাম জয়নুল আবেদীন, ইমাম জাফর সাদিক, ইমাম মুসা কাজিম, ইমাম রেজার মত মুজতাহিদের মতো হতে হবে। এটা না থাকার কারণে আন্দোলন ব্যর্থ হচ্ছে।

আমি সারা বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে বলব, তারা যেন এ বিষয়টিকে মূল্যায়ন করে। আহলে বাইতের চেতনা, সুন্নত, কেয়াম ও মহব্বতকে তারা যেন মন থেকে বিশ্বাস করে। আর এ আহলে বাইতের বিশ্বাস ও মহব্বতকে উঠিয়ে দেয়ার জন্য তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করছে। যাদের কাছে এ মহব্বত নেই তাদের ঈমান নেই। লা ঈমানা লেমানলা মহাববাত লাহুযার অন্তরে রসূল ও আহলে বাইতের মহব্বত নেই, তার ঈমান নেই। আল্লামা আইনি (রহ.) বোখারী শরীফে বলেন: ঈমানের ৭৭টি শাখার মধ্যে একটি হল আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা। অথচ এই শাখাটিকে বাদ দেয়ার কারণেই ইসলামী আন্দোলনকারীরা আজ মূল লক্ষ্যে পৌঁছতে পারছে না। আহলে বাইত ও কারবালার শিক্ষাকে সামনে নিয়ে যখন আন্দোলন চলবে সে আন্দোলনকে দমানোর শক্তি কারো থাকবে না।

রেডিও তেহরান: ড. মাওলানা এ কে এম মাহবুবুর রহমান! পবিত্র মহররম মাসে রেডিও তেহরানকে আপনার মূল্যবান বক্তব্যের জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

মাওলানা মাহবুবুর রহমান: আমি রেডিও তেহরানের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারবালার এ রক্তমাখা ইতিহাস যেন সবাই ধারণ করতে পারি এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সে চেতনাকে কাজে লাগাতে পারি মহান আল্লাহর কাছে সে দোয়াই করছি।

Source: http://www.hussainidalan.com