চিঠি-১৭

মুয়াবিয়ার একটি পত্রের প্রত্যুত্তর’ তোমার পত্রে তুমি আমার কাছে দাবি করেছে। আমি যেন সিরিয়া তোমার কাছে হস্তান্তর করি। এ বিষয়ে তোমাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছি যে, আমি গতকাল যা অস্বীকার করেছি আজ তা স্বীকার করে তোমাকে দিতে পারি না। তুমি বলেছে। যুদ্ধ সমগ্র আরবকে গ্রাস করে ফেলেছে, এখন শুধু শেষ নিশ্বাসটুকু বাকি আছে। এ বিষয়ে জেনে রাখো, সত্য ও ন্যায় যাকে গ্রাস করে সে বেহেশতে স্থান লাভ করে; আর অন্যায় ও ফেতনা যাকে গ্ৰাস করে সে দোযখের স্থায়ী বাসিন্দা। যুদ্ধ কৌশল ও জনবলে আমার সমকক্ষতার কথা তুমি বলেছে। এ বিষয়ে তুমি জেনে রাখো, ইমানে সংশয় ঢোকাতে তুমি যতটুকু পারঙ্গম; নিশ্চয়ই, আমি ইমানে তার চেয়ে বেশি দৃঢ় এবং ইরাকের জনগণ পরকালের জন্য যতটুকু লোভাতুর, সিরিয়ার জনগণ ইহকালের জন্য তার চেয়ে বেশি লোভাতুর নয়। তুমি লেখেছে যে, আমরা উভয়েই আবদ মনাফের বংশধর। তোমার একথা নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু উমাইয়া কোন ক্রমেই হাশিমের সমতুল্য নয়; হারব কোন দিক দিয়েই আবদাল মুত্তালিবের সমতুল্য নয় এবং আবু সুফিয়ান কখনো আবু তালিবের সমতুল্য নয়। সাধারণ ক্ষমাপ্রাপ্তগণ (মক্কা বিজয়ের পর) কোন অবস্থাতেই মুহাজিরগণের সমতুল্য হতে পারে না। একজন দত্তকপুত্র (পালিতপুত্র) কখনো একজন বিশুদ্ধ বংশধরের সমতুল্য হতে পারে না। কোন বিপদগামী একজন সত্যের অনুসারীর সমতুল্য হতে পারে না। এবং কোন মোনাফিক ইমানদারের সমতুল্য হতে পারে না। যারা দোযখে নিক্ষিপ্ত হয়েছে তাদের অনুসরণকারী উত্তরসূরীগণ কতই না মন্দ উত্তরাধিকারী। এছাড়াও আমাদের বংশ নবুয়তের বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এবং এ বৈশিষ্ট্য বলে আমরা পরাক্রান্তগণকে পরাভূত করেছি ও পদদলিতগণকে ওপরে তুলে এনেছি। যখন মহিমান্বিত আল্লাহ্ আরবকে তাঁর দ্বিনের জন্য নির্বাচিত করলেন এবং মানুষ ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক তাতে আত্মসমৰ্পণ করেছিলো তখন তুমি তাদেরই একজন ছিলে যারা লোভে অথবা ভয়ে দ্বিনে প্রবেশ করেছিলো। তুমি এমন এক সময়ে দ্বিনে প্রবেশ করেছো যখন তোমার পূর্ববতীগণ অনেক এগিয়ে গেছে এবং মুহাজিরগণ একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য অর্জন করে ফেলেছে। এখন তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, শয়তানকে তোমার অংশীদার হতে দিয়ো না এবং তোমার নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করার সুযোগ তাকে দিয়ে না। এখানেই বিষয়টি শেষ করলাম।
১। সিফফিনের যুদ্ধ চলাকালে আমিরুল মোমেনিনের কাছে সিরিয়া প্রদেশ দাবি করার জন্য মুয়াবিয়া পুনরায় মনস্থ করলো। তার এ দাবি ছিল একটা ছল-চাতুরির কৌশল মাত্র। বিষয়টি আমর ইবনে আসের সাথে আলোচনা করলে সে মুয়াবিয়ার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বললো, ”হে মুয়াবিয়া, একটু চিন্তা করুন, আপনার এ লেখা আলীর ওপর কোন প্রভাব ফেলবে কি? সে কখনো আপনার এ ফাঁদে পড়বে না।” একথা শুনে মুয়াবিয়া বললো, “আমরা উভয়েই আবদ মনাফের বংশধর। আলী ও আমার মধ্যে এমন কী ব্যবধান আছে যা আলীকে আমার চেয়ে বেশি বৈশিষ্ট্য মন্ডিত করেছে এবং আমি তাকে প্রতারিত করতে ব্যর্থ হবো?’ আমর ইবনে আস বললো, “যদি আপনি তাই মনে করেন। তবে লেখুন এবং দেখুন কী ফলাফল হয়।” ফলে মুয়াবিয়া সিরিয়া প্রদেশ দাবি করে আমিরুল মোমেনিনকে এক পত্র দিয়েছিল। তার পত্রে সে একথাও লেখেছিলো, “আমরা উভয়ই আবদ মনাফের বংশধর। কাজেই আমাদের একের ওপর অপরের কোন বৈশিষ্ট্য নেই।” মুয়াবিয়ার পত্রের জবাবে আমিরুল মোমেনিন এ পত্র লেখেন এবং এতে তাঁর নিজের পূর্বপুরুষদের সাথে মুয়াবিয়ার পূর্বপুরুষের তুলনা করে তাঁর সাথে মুয়াবিয়ার সমতা অস্বীকার করেন। তারা উভয়ে আবদ মনাফের বংশধারার হলেও আবদ শামসের বংশধরগণ ছিল। চরিত্রহীন, পাপী, নৈতিকতা বিবর্জিত, ধর্মত্যাগী ও মূর্তিপূজক। অপর দিকে হাশিম ছিলেন এক ইলাহর উপাসক এবং তিনি কখনো মূর্তিপূজা করতেন না।
একই গাছের বিভিন্ন শাখায় যদি একই ফুল, ফল ও কাটা থাকে। তবেই তার সব শাখা সমান বলে মনে করা যায়। শাখা গুলোতে বিভিন্ন ফল ও ফুল হলে একে অন্যের সমতুল্য বলা যায় না। কাজেই সকল ঐতিহাসিক ও জীবনীলেখক এ বিষয়ে একমত যে, উমাইয়া ও হাশিম, হারব ও আবদাল মুত্তালিব এবং আবু সুফিয়ান ও আবু তালিব কোন দিক থেকেই একে অন্যের সমতুল্য ছিল না। এ পত্র লেখার পর মুয়াবিয়াও এ বিষয়ে কোন মতদ্বৈধতা করে নি। কারণ এটা সুস্পষ্ট ইতিহাস যে, আবদ মনাফের পর হাশিমই কুরাইশদের মধ্যে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। কাবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। এপদ দুটি হলো— ‘মিকায়াহ’ (হাজিদের পানি সরবরাহের তত্ত্বাবধায়ন) ও “রিফাদাহ (হাজিদের থাকা-খাবার ব্যবস্থাপনা)। ফলে হজের সময় দলে দলে লোক তার কাছে এসে থাকতো। তিনি এত অতিথিপরায়ণ ও উদার ছিলেন যে লোকেরা চলে যাবার পরও অনেক দিন ধরে তার প্রশংসা করতো। তার সুযোগ্য পুত্র হলো আবদাল মুত্তালিব যার নাম ছিল শায়বাহ এবং পরিচিতি ছিল ‘সায়্যেদুল বাছা।” (মক্কা উপত্যকার প্রধান)। আবদাল মুত্তালিবের পুত্র আবু তালিবের কোলেই রাসুল (সঃ) লালিত পালিত হয়েছিলেন এবং নবুয়ত প্রকাশের পর তাঁর শত্রুর বিরুদ্ধে বর্মের মতো ছিলেন। বংশ মর্যাদার ব্যবধান বর্ণনার পর আমিরুল মোমেনিন তাঁর বৈশিষ্ট্যের দ্বিতীয় পয়েন্ট উল্লেখ করে বলেন যে, তিনি একজন মুহাজির। অপরপক্ষে মুয়াবিয়া হলো ‘তালিক’ (মক্কা বিজয়ের পর যারা সাধারণ ক্ষমা পেয়েছিল)। রাসুল (সঃ) যখন বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রবেশ করলেন তখন তিনি কুরাইশগণকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, তারা কিরূপ ব্যবহার পেতে চায়। তখন তারা এক বাক্যে বলেছিল যে, তারা মহৎ পিতার মহৎ পুত্রের কাছে কল্যাণ ছাড়া আর কিছু আশা করে না। এতে রাসুল (সঃ) বললেন, “যাও, তোমাদের সকলকে ক্ষমা করে দেয়া হলো।” মুয়াবিয়া ও আবু সুফিয়ান এ সাধারণ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত ছিল (হাদীদ’, ১৭ শ খন্ড, পৃঃ ১১৯; আবদুহ’, ৩য় খন্ড, १8 S१) । আমিরুল মোমেনিন তাঁর বৈশিষ্ট্যের তৃতীয় পয়েন্টে উল্লেখ করেন যে, তাঁর বংশধারা সঠিক ও স্পষ্ট এবং এতে কোন স্তরে সন্দেহের অবকাশ নেই। অপরপক্ষে মুয়াবিয়ার বংশধারায় ‘লাসিক’ (দত্তক বা পালিত বা পিতৃ পরিচয়হীন) রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে উমাইয়া আবদে শামসের বাইজেনটাইন কৃতদাস ছিল। আবদে শামস তার বুদ্ধিমত্তা দেখে তাকে মুক্ত করে দিয়ে দত্তক হিসাবে গ্রহণ করে। এতে সে নিজেকে উমাইয়া ইবনে আবদে শামস পরিচয় দিতে থাকে (মজলিসী***, ৮ম খন্ড, পৃঃ ৩৮৩)। তদুপরি হারবও উমাইয়ার পুত্র নয়— পালিত ক্রীতদাস। এ বিষয়ে হাদীদ ও ইস্পাহানী লেখেছেন; বংশধারা বিশেষজ্ঞ জাফাল ইবনে হানজালাকে মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করেছিল। সে আবদাল মৃত্তালিবকে দেখেছিল। কিনা । সে হাঁ সূচক জবাব দিলে মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করলো আবদুল মুক্তালিব দেখতে কেমন ছিল । জাফাল উত্তরে বললো যে, আবদুল মুক্তালিব অত্যক্ত সুন্দর, সুপুরুষ ও সন্মানী লোক ছিলেন । তাঁর প্রশস্ত কপাল ও উজ্জ্বল মুখ মন্ডলের কমনীয়তা মনোহর ছিল । তারপর মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করেছিল যে, সে আবদে শামসকে দেখেছে। কিনা | সে হাঁ সুচক উত্তর দিল । মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করলো যে, সে দেখতে কেমন ছিল । জাফল বললো যে, সে দুর্বল ও বাঁকা দেহের অন্ধ ছিল যাকে তার ক্রীতদাস জাকওয়ান এখানে সেখানে ধরে ধরে নিয়ে যেত। মুয়াবিয়া জিজ্ঞেস করলো যে, আবু আমার (হারবি) কি তার পুত্র ছিল? জাফল বললো যে, তোমরা তা বললেও কুরাইশগণ ভালোভাবে জানে হারব তার ক্রীতদাস ছিল । (হাদীদ’, ১৭শ খন্ড, পৃঃ ২৩১-২৩২ ইসপাহানী”, ১ম খন্ড, পৃঃ ১২) । (আবদে মনাফি ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ছিলেন। কাবার তত্বাবধায়ক । তার পুত্র আবদে শামসের পুত্ৰ উমাইয়া এবং হাশিমের পুত্র আবদাল মৃত্তালিব । এ উমাইয়া বংশেই মুয়াবিয়া এবং হাশিম বংশে আমিরুল মোমেনিন জন্মগ্রহণ করেন / আবদে মনাফের পর থেকে মক্কা ও কাবার নেতৃত্ব ছিল হাশিম বংশের / এজন্য উমাইয়াগণ সর্বদা হাশিমিদের প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ ছিল । উমাইয়াগণ এ বিদ্বেষের ফলে হাশিমিদের বিরুদ্ধে কয়েকবার যুদ্ধও করেছিল । হাশিমের হাতে উমাইয়া পরাজিত হয়ে মক্কা থেকে বহিস্কৃত হয়েছিল । উমাইয়ার পুত্ৰ হারব এবং তার পুত্র আবু সুফিয়ান ছিল রাসুলের (সঃ) ঘোরতর শক্ৰ / বংশগত শত্রুতার জের হিসাবে রাসুলের (সঃ) সকল দুঃখ-কষ্টের মূল কারণ ছিল উমাইয়াগণ । রাসুলের পরেও : হাশিম বংশের সাথে উমাইয়া বংশ বিদ্বেষ ও শক্রিতা পোষণ করতো এবং উমাইয়্যাগণ চিরদিন হাশিম বংশকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল । যার ফলশ্রুতিই হলো সিফাফিন ও কারাবালা । উমাইয়াগণ চিরকালই অন্যায়, অসত্য ও অধমীর্কতার ভূমিকা পালন করেছে। পক্ষাত্তরে হাশিমগণ বংশ মর্যাদা ও ঐতিহ্য গৌরব নিয়ে ধর্মীয় নেতৃত্ব প্রদান করেছে এবং সত্য ও ন্যায়ের ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত ছিল; সাকী, দৈনিক ইনকিলাম, ১২ই জুলাই, ১৯৯২ —বাংলা অনুবাদক)