ইরানে যেভাবে মহরম মাস পালিত হয় —

শোকের মাস মহররম —
ইরান থেকে বাংলাদেশী এক ভাই , সিরাজুল ইসলামের লেখা —

শোকে মুহ্যমান সারা ইরান ।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে মহররম মানেই শোকের মাস । পুরো মাসজুড়ে চলতে থাকে শোক পালনের সংস্কৃতি । প্রায় সবার পরনে কাল কাপড় , মসজিদে মসজিদে , যেখানে সেখানে মর্সিয়া গাওয়া ।
এ মাসেই নবী বংশ বা পবিত্র আহলে বাইতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব , বেহেস্তে যুবকদের সর্দার হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) কারবালার ময়দানে শহীদ হন ।
সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে স্মরণে রেখে চলে শোক পালন ।
মনে হয় সারা ইরান শোকে মুহ্যমান ।

বার ইমামীয়া শীয়া মাজহাবে ইমাম হোসেন (আঃ) হলেন তৃতীয় ইমাম ।
তিনি ছিলেন রাসুল (সাঃ) এর প্রাণপ্রিয় নাতি । মহররম মাসের ১০ তারিখে তিনি ও তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য কারবালার ময়দানে ঘাতক ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে অত্যন্ত হৃদয়বিদারকভাবে শহীদ হন ।
ইমাম হোসেন (আঃ) এর শাহাদাত এবং তার আগে-পরের ঘটনাবলীকে স্মরণ করে মহররম মাসে ইরান রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করে ।
এ সময় বিভিন্ন জায়গায় কাল পতাকা দেখা যায় । সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান , বাসা-বাড়ি , অফিস-আদালত , রাস্তাঘাট , পাড়া-মহল্লা , মসজিদ , শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব জায়গায় শোকের চিহ্ন কাল পতাকা ওড়ানো হয় ।

মহররম মাস আসার আগেই ইরানে শুরু হয়ে যায় শোক পালনের প্রস্তুতি । মসজিদগুলোর পাশাপাশি রাস্তাঘাট , পাড়া-মহল্লা যেখানে সেখানে অস্থায়ী হোসাইনিয়া বানানো হয় ।
এসব কাজে যেমন থাকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা তেমনি থাকে ব্যক্তি ও সামাজিক উদ্যোগ । মহররম পালনের যেসব কার্যক্রম চলে তার অগ্রভাগে থাকে ইরানের তরুণ-কিশোরেরা । কাল কাপড়ে ঘেরা হোসাইনিয়া বানানো হয়ে যায় মহররম মাস শুরুর আগেই ।
এছাড়া হোসাইনিয়াগুলোতে উড়তে থাকে লাল ও সবুজ পতাকা । তাতে লেখা থাকে ইমাম হোসেন (আঃ) , হাসান (আঃ) , কিংবা ইমাম আলী (আঃ) এর নাম ।
যেসব কাপড় দিয়ে হোসাইনিয়াগুলো ঘেরা হয় তাতে লেখা থাকে নবী বংশের সদস্যদের নাম , কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনা নিয়ে ছোট ছোট বর্ণনা ইত্যাদি ।

সাধারণত সন্ধ্যার পর থেকে এসব হোসাইনিয়াতে লোকসমাগম হয় । সাউন্ডবক্সে বাজতে থাকে কারবালার বেদনাবিধুর ঘটনাবলীর বর্ণনা । সেখানে সবার জন্য বিনামূল্যে চা , কফি , চকোলেট , খোরমা , কিউবিক চিনি থাকে । যে যার মত করে খেতে পারে । চলতি পথে পথিকজনও খেয়ে যেতে পারে এসব খাবার । কখনও কখনও শরবত , কেক , বিস্কুট কিংবা মিষ্টি বিতরণ করা হয় । অনেকে স্বেচ্ছায় এসব চা-শরবত , খোরমা ও বিস্কুটের খরচ যোগান দেন ।

মহল্লার হোসাইনিয়াগুলোতে সন্ধ্যার দিকে দেখা যায় শিশু , ছেলেমেয়েদের ভিড় ।
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত একটু বাড়লেই চলে তাজিয়া মিছিল বের করার প্রস্তুতি । এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায় যায় সে মিছিল ।
এ মিছিলে অংশ নেয় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সের লোকজন । মিছিল দুই সারিতে এগিয়ে যায় আর দু’পাশ দিয়ে হেঁটে চলে তরুণী ও নারীরা । মিছিলে থাকে কারবালার শোকগাঁথা গাওয়ার আয়োজন । এর সঙ্গে চলে ড্রামের ধ্বনি । মিছিলে অংশ নেয়া ছেলে-বুড়োরা ধীরে ধীরে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে এগিয়ে যায় ।

অনেকের কাছে থাকে হাল্কা ধরনের শিকলের গুচ্ছ । সে শিকলগুচ্ছ দিয়ে কাঁধের দু’পাশে ও পিঠে মৃদু আঘাত করে ।

তবে এসব মিছিলে অংশ নেয়া লোকজনের কেউই বুক-পিঠ রক্তাক্ত করে না ।

এ ধরনের কাজকে ইরানের আলেমরা অন্যায় বলে মনে করেন ।
ইরানে মহররমের শোক পালন করতে গিয়ে বুক-পিঠ রক্তাক্ত করাকে নিষিদ্ধ বলে বিবেচনা করা হয় ।

এ বিষয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে পরিষ্কার বক্তব্যও রয়েছে ।
যাহোক , অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যায় মিছিল । এ মিছিলে বিদেশি লোকজনও অংশ নিতে পারে । বাধা নেই কারও জন্য । মিছিলে অংশ নেয়া লোকজন সবার পরনে থাকে কাল শার্ট-প্যান্ট ।
এখানে শোক প্রকাশের জন্য কালোব্যাজ ধারণের সংস্কৃতি নেই ।
শোক প্রকাশ মানেই কাল পতাকা আর গায়ে কাল জামা ।

মহররমের তাজিয়া মিছিল শেষে সাধারণত খাবার-দাবারের আয়োজন থাকে । খাবারের আইটেম হিসেবে ভাতের সঙ্গে থাকে ইরানের বিখ্যাত কোরমে সবজি , কেইমে , জেরেস্ক পোলো , জুজে কিংবা কুবিদে কাবাব ।

মহররমের শোক মিছিলে অংশ নেয়া লোকজনের খাবার দাবারের জন্য অনেকেই নিজ খরচে দুম্বা কিংবা গরু জবাই করে থাকে । এ দান নিতান্তই নবী পরিবারের সদস্য হযরত ইমাম হোসেন (আঃ) এর শহীদ হওয়ার স্মরনে , এ দান কারবালার বিয়োগান্ত ঘটনার স্মরণে ।

এভাবেই যুগ যুগ ধরে ইরানে চলে আসছে মহররমের শোক পালনের রেওয়াজ ।
কারবালার শোক মুছে যায়নি ইরানি জাতির মন থেকে । কারবালা বেঁচে আছে তাদের হৃদয়ে ।

শোক পালনের ধরন দেখলে মনে হবে , এই তো বুঝি সদ্যই ঘটে গেছে কারবালার ট্র্যাজেডি !
একটি জাতি , একটি দেশ –
পবিত্র আহলে বায়েত (আঃ) গনের দুঃখে যে এতটা শোকে অভিভূত হতে পারে , সেটা ইরানে না এলে বুঝতেই পারতাম না ।
সমাপ্ত ।

SKL