তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই —

তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই —-

আশুরার দিনে ইমাম হোসেন (আঃ) এর খোৎবা ——

আশুরা অর্থাৎ ১০ই মহরমের পড়ন্ত বিকেল ।
সকাল থেকে কয়েকটি ঘন্টার ব্যবধানে একে একে ৭১ জন সংগী সাথিকে হারিয়ে মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) এখন বড় একাকী ।
জীবনের শেষ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ইমাম (আঃ) সাধ্যমত চেষ্টা করছেন যে , এরপরেও যদি কিছু মানুষ হেদায়েত প্রাপ্ত হয় !
পাষন্ড ঈয়াযীদের ৩০০০০ হাজার সৈন্য বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে ইমাম হোসেন (আঃ) তাঁর জীবনের সর্বশেষ আহবান জানালেন ।

” হে শীয়ানে মূয়াবীয়া !
বিবেচনা কর , আমার পরিবার সম্পর্কে এবং গভীরভাবে ভাব আমি কে , এরপর নিজেদের তিরস্কার কর । তোমরা কি মনে কর আমাকে হত্যা করা এবং আমার পবিত্রতা ও সম্মাান লুট করা তোমাদের জন্য বৈধ ?
আমি কি তোমাদের নবীজী (সাঃ) এর নাতি , তার ওয়াসী ও তার চাচাত ভাইয়ের সন্তান নই ?
যিনি ছিলেন বিশ্বাস গ্রহনে সবার আগে এবং সাক্ষী ছিলেন সে সব কিছুর উপরে যা নবী (সাঃ) আল্লাহর কাছ থেকে এনেছেন ।

শহীদদের সর্দার হামযা (রাঃ) কি আমার পিতার চাচা ছিলেন না ?
জাফর , যিনি বেহেশতে দু পাখা নিয়ে ওড়েন , তিনি কি আমার চাচা নন ?

নবী (সাঃ) এর হাদিস কি তোমাদের কাছে পৌছে নি যেখানে তিনি আমার সম্পর্কে ও আমার ভাই সম্পর্কে বলেছেন যে , আমরা দুজন জান্নাতের যুবকদের সর্দার ?

তাই যদি আমি যা বলছি তার সাথে একমত হও , এবং নিশ্চয়ই আমি যা বলেছি তা সত্য ছাড়া কিছু নয় । তাহলে তা উত্তম , কারন আল্লাহর শপথ , যে সময় থেকে আমি যা বুঝেছি যে আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের অপছন্দ করেন তখন থেকে আমি কখনই মিথ্যা বলিনি ।
আর যদি তোমরা আমি যা বলেছি তা বিশ্বাস না কর তাহলে তোমাদের মাঝে এখনও নবীর জীবিত সাহাবাগন আছে , তাদের কাছে যাও এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর এবং তারা আমার বক্তব্যের সত্যতার সাক্ষী দিবে ।

জাবির বিন আবদুল্লাহ আনসারি , আবু সাঈদ খুদরি , সাহল বিন সাদ সায়েদি , যায়েদ বিন আরকাম এবং আনাস বিন মালিককে জিজ্ঞেস কর , তারা তোমাদের বলবে যে , তারা আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এর কাছ থেকে আমার ও আমার ভাই সম্পর্কে এই হাদিস শুনেছে । এটি কি তোমাদের জন্য আমার রক্ত ঝরানোর চাইতে যথেষ্ট নয় ” ?

তখন অভিশপ্ত শিমর বিন যিলজাওশান বলল , ” আমি আল্লাহর ইবাদত করি ঠোট দিয়ে এবং তুমি যা বলছো তা আমি বুঝি না “।
এ কথা শুনে হাবীব বিন মুজাহির বললেন , ” আমি দেখছি তুমি সত্তুর ধরনের সন্দেহ নিয়ে আল্লাহর ইবাদত কর এবং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে , তুমি সত্য বলেছ , তুমি ইমাম যা বলেছেন তা বুঝতে পার নি কারন তোমার অন্তরে মোহর ( মূর্খতার ) মারা হয়েছে “।

ইমাম (আঃ) পুনরায় বললেন , ” যদি তোমরা এতে সন্দেহ পোষন কর , তোমরা কি এতেও সন্দেহ কর যে আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নাতি ?
আল্লাহর শপথ , পূর্বে ও পশ্চিমে , আমি ছাড়া নবী (সাঃ) এর কোন নাতি নেই তোমাদের মধ্যে অথবা অন্যদের মধ্যে । দুর্ভোগ তোমাদের জন্য , আমি কি তোমাদের মধ্যে থেকে কাউকে হত্যা করেছি যে তোমরা তার প্রতিশোধ নিতে চাও ? অথবা আমি কি কারও সম্পদ বেদখল করেছি অথবা কাউকে আহত করেছি যার প্রতিশোধ তোমরা আমার উপর নিতে চাও “?

ঈয়াযীদ বাহিনীর যখন কেউ তাকে উত্তর দিল না , তিনি উচ্চ কন্ঠে বললেন , ” হে শাবাস বিন রাবঈ , হে হাজ্জার বিন আবজার , হে ক্বায়েস বিন আল আশআস , হে ঈয়াযীদ বিন হুরেইস , তোমরা কি আমার কাছে চিঠি লিখো নি যে , ফল পেকেছে এবং আশেপাশের ভূমিতে ফুল ফুটেছে এবং একটি বিশাল সেনাবাহিনীর কাছে আসুন , যা আমার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ” ?
তারা উত্তর দিল যে, তারা এ ধরনের কোন চিঠি লিখে নি ।
ইমাম (আঃ) তখন বললেন , ” সুবহান আল্লাহ ,আল্লাহর শপথ অবশ্যই তোমরা তা লিখেছিলে ” ।
এরপর ইমাম (আঃ) বললেন , ” হে জনতা , এখন যদি তোমরা আমার আগমনকে পছন্দ না কর তাহলে আমাকে ছেড়ে দাও যেন আমি কোন আশ্রয়ের জায়গায় চলে যেতে পারি ” ।

ক্বায়েস বিন আশআস বলল , ” তুমি যা বলছ তা আমরা জানি না , আমার চাচাতো ভাইদের ( বনি উমাইয়ার ) কাছে আত্মসমর্পন কর , তারা তোমার সাথে সেভাবে আচরন করবে যেভাবে তুমি চাও “।
ইমাম (আঃ) বললেন , ” আল্লাহর শপথ , নিকৃষ্ট মানুষের মত আমি তোমাদের হাতে হাত দিব না , না আমি পালিয়ে যাব কোন দাসের মত ” ।

এরপর ইমাম (আঃ) উচ্চকন্ঠে বললেন ,
“—- আমি আমার ও তোমাদের রবের কাছে আশ্রয় নিচ্ছি , পাছে তোমরা আমাকে পাথর নিক্ষেপ কর ( হত্যা কর ) —” ।
সুরা – দুখান /২০ ।

“—-মুসা বলেছিল , নিশ্চয়ই আমি নিরাপত্তা চাই আমার প্রভুর কাছে এবং তোমাদের প্রভুর কাছে , প্রত্যেক দাম্ভিক থেকে , যে হিসাব দিনে বিশ্বাস করে না —-” ।
সুরা – মুমিন /২৭ ।

কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের বিশাল সৈন্যবাহিনী বোবার মত দাঁড়িয়ে রইল ।

এবারে ইমাম (আঃ) শেষের এই কথাগুলি বললেন –
” — হে শীয়ানে মূয়াবীয়া ! তোমরা কেন আমাকে হত্যা করতে চাও ?
আমি কি কোন পাপ অথবা অপরাধ করেছি ?”

পুনরায় মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) বললেন ,
আমাকে শহীদ করলে আল্লাহর কাছে তোমরা কি জবাব দেবে ?
কি জবাব দেবে বিচার দিবসে মহানবী (সাঃ) এর কাছে ?

ঈয়াযীদের সৈন্যবাহিনী পাথরের মত দাঁড়িয়ে আছে ।

এবারে ইমাম হোসেন (আঃ) বললেন –
‘হাল্ মিন্ নাস্রিন ইয়ানসুরুনা ?”
অর্থাৎ – ‘আমাদের সাহায্য করার মত কি তোমাদের মাঝে একজনও নাই ?

পাঠক ,
এরপরের আহ্বানটি ছিল মারাত্মক অশ্রুসিক্ত ।
ঐতিহাসিকদের মতে এটাই ছিল ইমাম হোসেন (আঃ) এর শেষ আহ্ববান ।

হায় মজলুম ইমাম !
শেষ এই একটি কথাটিতে মজলুম ইমাম হোসেন (আঃ) কেয়ামত পর্যন্ত পুরো জগতবাসীকে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে , কারবালার মাঠে ঈয়াযীদের বিশাল দলটি আদৌ মুসলমানের কোন দলই ছিল না !

পাঠক ,
জেনে নিন , ইমাম হোসেন (আঃ) এর নিজের স্বীকারোক্তি —
ইমাম হোসেন (আঃ) বিশাল ঈয়াযীদের বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে জীবনের সর্বশেষ কথাটি বলছেন —

“ আলাম্ তাস্মাও ?
আলাইসা ফিকুম্ মুসলিমু ?
অর্থাৎ – ‘আমার কথা কি শুনতে পাও না…
তোমাদের মাঝে কি একজনও মুসলমান নেই ??

তথাকথিত নামধারী মুসলমানের এই অপদার্থ কুলাংগারের দল মজলুম শহীদ ইমাম হোসেন (আঃ) এর খুতবার কোন জবাব দিতে পারল না ।
কিছুক্ষনের জন্য সমস্ত কারবালা নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেল !

ইমাম হোসেন (আঃ) নিজের জীবন দিয়ে জগতবাসীকে চিনিয়ে দিয়ে গেলেন যে , কারবালা প্রান্তরে ঈয়াযীদের বাহিনীতে একজনও মুসলমান ছিল না ।

অতীতের মত কেয়ামত পর্যন্ত অনেক দলীয় মুসলমানের আবির্ভাব হবে ।
একমাত্র সত্য সঠিক মুমিন মুসলমানের দল হচ্ছে – হোসেইনী মুসলমান ।

সম্মাানীয় পাঠক ,
একটা কথা বলি । দয়া করে রাগ করবেন না , শীয়া পরিবারের একটা শিশু কারবালা ঘটনা সম্পর্কে যতটা জানে , সেই তুলনায় মুসলমানদের বৃহৎ অংশ কারবালার অনেক ইতিহাস সম্বন্ধে অবহিত নন ।
তাই আসুন , এবারে সকলেই মিলে একটু জানা বা বোঝার চেষ্টা করি ।

 

— শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস ,
(১ম খন্ড) ,
মূল লেখক – শেইখ আব্বাস কুম্মি ,
বাংলা অনুবাদ – মুহাম্মাাদ ইরফানুল হক ,
পৃ-১৯৪ , ১৯৫ , ১৯৬ ছায়া অবলম্বনে ।

SKL