হযরত আবু বকর আদৌ কি রাসুল (সাঃ) কতৃক নিয়োগকৃত —

হযরত আবু বকর যদি মহানবী (সাঃ) কতৃক মনোনীত হয়েই থাকেন —-

আমাদের চারিপাশে প্রচলিত ইসলামে বহুল প্রচারিত এই কথাটি বলা হয়ে থাকে যে ,
নবী করিম (সাঃ) স্বয়ং নিজে হযরত আবু বকরকে খেলাফত দিয়ে গেছেন ।
তিনি হযরত আবু বকরকে নামাজের ইমামতি করার দায়িত্ব দিয়ে বিশ্ব মুসলিমকে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যে , হযরত আবু বকরই খেলাফতের আসন অলংকৃত করার জন্যে অন্য সবার চাইতে বেশী যোগ্য । আর তাই বনু সকীফার সমাবেশে সাহাবীরা তাকে খলীফা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন ।

বেশ ভাল কথা ।

প্রিয় পাঠক ,
আসুন উপরে উল্লেখিত কথাটির কিছুটা বিশ্লেষন করা যাক ।
কিন্তু ইতিহাস স্বীকৃত সত্য যে , বনু সকীফাতে খলীফা নির্বাচনের প্রসংঙ্গ নিয়ে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে প্রচন্ড বাক-বিতন্ডা ও তর্ক বিতর্ক হয়েছিল । এমনকি সেখানে তরবারী পর্যন্ত বের করা হয়েছিল পরস্পরকে হত্যার উদ্দেশ্যে !
সেখানে তো কখনই নামাজে ইমামতির প্রসংঙ্গ উত্থাপিত হয়নি ।
উপস্থিত কেউ হযরত আবু বকরের খেলাফত লাভের জন্যে নামাজের ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করেন নি ।
বরং সেখানে আমরা দেখতে পাই , আনসাররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে সর্বাধিক যোগ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন । আর মোহাজেররা খেলাফতের জন্যে নিজেদেরকে উপস্থাপন করেছিলন ।
তারা সেখানে কোন ক্রমেই আবু বকরের নামাজের ইমামতের ঘটনা তুলে ধরেন নি ।
বরং হযরত ওমর সেখানে এগিয়ে এসে ঝগড়া ও মতভেদ এড়িয়ে ঘোষণা করলেন , “আমি আবু বকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করলাম ।”
এভাবে প্রায় তিনদিন তীব্র বাদানুবাদ ও প্রচন্ড মারামারি , হাতাহাতি ও হট্টোগোলের পর সেদিন বনু সকীফাতে উপস্থিত সাহাবীরা হযরত আবু বকরের হাতে বাইয়াত গ্রহন করেছিলেন ।

পাঠক ,
আপনি অবাক হবেন এটা ভেবে যে , তখনও রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র দেহ মোবারক দাফন করা হয়নি ! খেলাফতের ব্যাপারে সাহাবীদের মধ্যে অনৈক্য শুরু হয়ে গিয়েছিল ।
বনু সকীফার সমাবেশে সাহাবীদের মাঝে উত্তপ্ত মতবিরোধ কি প্রমাণ করে না যে , তাদের মধ্যে খেলাফতের ব্যাপারে কোন প্রকার ঐক্যমত ছিল না ?
সূত্র – তারিখে ইয়াকুবী , খণ্ড-২, পৃঃ-১২৩-১২৬ / সহীহ আল বুখারী , খণ্ড-৩, পৃঃ-১৯০ / মিলাল ওয়ান নিহাল , শাহরেস্তানী, খণ্ড-১ , পৃঃ-৫৭ / তারিখে তাবারী , খণ্ড-২, পৃঃ-৭৮ / তারিখে খোলাফা , পৃঃ-৪৩ / আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা / ইবনে হিশাম , খণ্ড-৩, পৃঃ-৩৩১ / তাফসীরে ইবনে কাসীর , খণ্ড-৪, পৃ -১৯৬ ।

মুলতঃ বনু সকীফার নির্বাচনী সমাবেশেরই বা কি প্রয়োজন ছিল ?
তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নেই যে , মহানবী (সাঃ) তো হযরত আবু বকরকে খলীফা মনোনীত করেই গেছেন !
আর যদি হযরত আবু বকর মহানবী (সাঃ) কর্তৃক খলীফা মনোনীত হয়েই থাকবেন তাহলে সেখানে সেদিন কারও মনে ছিল না কেন ?
আর যদি হযরত আবু বকর মহানবী (সাঃ) কর্তৃক খলীফা মনোনীত হয়েই থাকবেন তাহলে প্রায় তিনদিন ধরে বনু সকীফাতে এত হট্টগোল ও ঝগড়ার প্রয়োজন হল কেন ?
কেননা বনু সকীফাতে অবস্থানকারী সকলেই তো নামকরা বিখ্যাত সাহাবা ছিলেন ।
মহানবী (সাঃ) এর আদেশ তো সকলেরই বিনাবাক্য ব্যয় মেনে নেয়া উচিৎ ছিল !

হযরত আব্বাস থেকে বর্ণিত যে , তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরকে জিজ্ঞেস করেন ,
“ খেলাফতের ব্যাপারে নবী (সাঃ) আপনাকে কি কিছু বলে গেছেন ?
তারা উভয়েই বললেন , না ।
অতঃপর তিনি হযরত আলী (আঃ) কে বলেন , “ হে আলী , তোমার হাত বাড়িয়ে দাও , আমি তোমার হাতে বাইয়াত গ্রহন করি ।”
সূত্র – আল ইমামাহ ওয়াস সিয়াসাহ , ইবনে কুতাইবা , খণ্ড-১, পৃঃ-২১ ।

প্রকৃতপক্ষে সত্য সঠিক ইতিহাস এটাই যে , মহানবী (সাঃ) কর্তৃক খেলাফতের মনোনয়ন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) কেই প্রদান করা হয়েছিল যা গাদীরে খুমের ঘটনায় আমরা স্পষ্ট উপলদ্ধি করতে পারি ।

আর হযরত আবু বকর কতৃক নামাজে ইমামতির বিষয়টা কি করে খেলাফতের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে ?
সাহাবী ও তাবেয়ীনের যুগে কখনও এ ধরণের ব্যাখ্যার অবতারণা করা হয়নি ।
তাবেয়ী ও তাবে – তাবেয়ীনের যুগে যখন হযরত আবু বকরের খেলাফতের বৈধতার ব্যাপারে বিভিন্ন প্রশ্ন ও সংশয় উত্থাপিত হতে থাকে তখন পরিকল্পিত ভাবে তার নির্বাচনের বৈধতা প্রমাণের জন্যে নামাজে ইমামতির যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে ।

আর হযরত আয়েশা থেকে বর্ণিত যে , হযরত আবু বকরের নামাজে ইমামতির হাদীস ছাড়াও হযরত হাফসা থেকে বর্ণিত হাদীসও বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে ।
তিনি বলেছেন ,“আবু বকর নামাজে ইমামতি করেন নি , বরং ওমর নামাজে ইমামতি করেছেন ।”
সূত্র – ফাইযুল ক্বাদির শারহে আল জামেয়া আস সাগীর , খণ্ড-৫, পৃ -৫২১ ।

অন্যদিকে এমন সব হাদীস বিদ্যমান যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে , অসুস্থ অবস্থায়ও প্রিয় নবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে নামাজে ইমামতি করেছেন ।
সূত্র – সহীহ আল মুসলিম , খণ্ড-৩, পৃ -৫১ / মুসনাদে আহমাদ , খণ্ড-৬, পৃঃ-৫৭ / তারিখে তাবারী , খণ্ড-২ , পৃ -৪৩৯ ।

সুতরাং নামাজে ইমামতির বিষয়টা কোনক্রমেই খেলাফত লাভের বৈধ কারণ হতে পারে না ।

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলীফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে এত সাহাবীদের বিরোধীতার কারণ কি ?

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলীফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) গনের সদস্য বিশেষ করে হযরত আলী (আঃ) এবং হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) সমর্থন করেন নি কেন ?

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলীফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে হযরত আবু বকর জোরপূর্বক হযরত আলী (আঃ) এর কাছ থেকে বায়াত আদায় ব্যর্থ হয়ে নবীকন্যার বৈধ পৈত্রিক সম্পত্তি বাগে ফাদাক অবৈধ ভাবে কেন বাজেয়াপ্ত করেছিলেন ?

আর যদি হযরত আবু বকর রাসূলের খলীফা হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকবেন তাহলে হযরত আবু বকরের অনুমতিক্রমে হযরত ওমর জোরপূর্বক হযরত আলী (আঃ) এর কাছ থেকে বায়াত আদায় ব্যর্থ হয়ে নবীকন্যার পবিত্র গৃহে অগ্নি সংযোগ করে গর্ভস্থ সন্তানসহ নবীকন্যাকে কেন হত্যা করেছিলেন ?

সূত্র – আহলে যিকর – কে জিজ্ঞাসা করুন ,
মূল – ডঃ মুহাম্মাদ তিজানী সামাভী ,
বাংলা অনুবাদে – ইরশাদ আহমেদ ,
পৃষ্ঠা – ২৫৮ ।

বেলায়েতের দ্যুতি ,
মূল – আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানী ,
বাংলা অনুবাদে – আব্দুল কুদ্দুস বাদশা ও মোঃ মাঈনউদ্দিন ,
পৃষ্ঠা – ১৭৮ থেকে ১৮৭ ।

মাওলার অভিষেক ,
মূল – সূফি সম্রাট সদর উদ্দিন চিশতী ।

SKL