বনু সকীফা কোথায় অবস্থিত এবং ওখানে কি ঘটেছিল —

” বনু সকীফা ” ,
ইহা কি , কোথায় অবস্থিত , কি কারনে ইহা বিখ্যাত —
ইত্যাদি নিয়ে খুবই খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে ইতিহাস থেকে এক ঝলক দেখে নেয়া —

দৃশ্যপট – ০১ –
নবীজী (সাঃ) তখন মৃত্যু বা ওফাতের শেষ প্রান্তে । ঘর বোঝাই আত্মীয় স্বজন এবং সাহাবাগন । উনি বললেন , ” আমায় খাতা কলম দাও । তোমাদের জন্য ওসিয়ত লিখে দিয়ে যাব , যাতে আমার মৃত্যুর পরেও তোমদের যেন কোনও ক্ষতি না হয় “।

নবীজী (সাঃ) এর আদেশ বলে কথা , সকলেই আদেশ পালনে তৎপর হলেন । এমন সময় হযরত ওমর প্রচন্ড আপত্তিসহ বললেন , ” উনি মৃত্যু যন্ত্রনায় প্রলাপ বকছেন , খাতা কলম দেয়া যাবে না , আমাদের কাছে কোরআন আছে , সেটাই যথেষ্ট ।”

কিন্ত পবিত্র কোরআনের আদেশ অনুযায়ী যারা নবীজী (সাঃ) এর আনুগত্যে অটল ছিলেন , তারা খাতা কলম কিছুতেই দিতে পারলেন না । কারন হযরত ওমরসহ ওনার দলবলের প্রচন্ড বিরোধিতার কারনে । এতে করে নবীজী (সাঃ) এর সামনেই খুবই বিশৃংখলা শুরু হল যা আদবের মারাত্মক বরখেলাপ ।
অগত্যা নবীজী (সাঃ) বিরক্ত হয়ে হযরত ওমরসহ ওনার দলবলকে নবীজী (সাঃ) এর ঘর থেকে বিতাড়িত করে দিলেন ।

দৃশ্যপট – ০২ –
বনু সকীফা হচ্ছে মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত ।
এই স্থানটি ছিল তৎকালীন জাহেলী যুগে অসৎ ও ষড়যন্ত্রকারী আরবদের যে কোন অসৎ উদ্দেশ্যে মিলিত হবার গোপন আস্তানা ।
মহানবী (সাঃ) এর ওফাতের সময় ও তাঁর জানাজা দাফন ইত্যাদি ফেলে রেখে মদীনার আনসার নামে পরিচিত বেশ কিছু সাহাবা ঐ কুখ্যাত গোপন আস্তানায় জড়ো হয়েছে – এই আশায় যে , নবীজী (সাঃ) এর মৃত্যুর পরে তাঁর গদীতে কে বসবে সেটা নির্ধারনের জন্যে ।
আনসার সাহাবীদের অতি বয়স্ক অসুস্থ নেতা সাদ ইবনে উবাদাহকে কম্বল জড়িয়ে রাজকীয় লেবাসে চেয়ারে বসিয়ে তাকে নবী পরবর্তী খলীফা বাননোর মহা আয়োজন চলছে ।
সাদ ইবনে উবাদাহ আনসারদের গুনাবলীর ভূয়সী প্রশংসা করে ছোটখাট একটা বক্তৃতা দিলেন । উপস্থিত সকল আনসার সাহাবীরা তাকে প্রথম খলীফা বানাতে একমত হল । শুধু আলোচনা হচ্ছিল যে , কুরাইশ মুহাজিরদেরকে কিভাবে রাজী করান যায় ! কুরাইশরা যদি এই নির্বাচনে রাজী না হয় তাহলে তাদের ভিতর থেকেই একজনকে খলীফা বানানোর প্রস্তাব দেয়া হবে । এ কথা শুনে সাদ বলল , এটা হল তোমাদের দেখান প্রথম দূর্বলতা ।

দৃশ্যপট – ০৩ –
নবীগৃহ থেকে বিতাড়িত হযরত ওমরের কানে খবর চলে গেল যে , কুখ্যাত বনু সকীফাতে আনসার গোত্র থেকে নবী পরবর্তী খলীফা মনোনয়ন প্রায় সম্পাতির পথে । এখনি কোন ব্যবস্থা না নিলে আনসারগন খলীফা নির্বাচিত করে ফেললে কিছুই করার থাকবে না । নতুবা একবার নির্বাচিত করে ফেললে পরে বদলানো খুবই ঝামেলা হতে পারে ।
এ কথা শোনামাত্র ঝানু রাজনীতিবিদ হযরত ওমর কালবিলম্ব না করে হযরত আবু বকরসহ আরও সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে দ্রুতই বনু সকীফার দিকে যাত্রা শুরু করলেন ।
মহানবী (সাঃ) এর জানাজা , কাফন , দাফন ইত্যাদি ফেলে রেখে ওনারা ছুটলেন মুসলিম জাহানের প্রথম খলীফা হবার জন্যে ।

দৃশ্যপট – ০৪ –
বনু সকীফাতে অবস্থিত ছোট সেই দরবার রুমে তখন সাবিত ইবনে কায়েস দাঁড়িয়ে আনসারদের পক্ষ থেকে খলীফা নির্বাচনের প্রস্তাব দিলেন । প্রস্তাবটি সেখানে উপস্থিত কুরাইশরা ব্যতীত অন্য সকল আনসার সাহাবাগন সমর্থন করলেন ।
আনসারদের বক্তৃতা শেষ হবার সাথে সাথে হযরত ওমর বললেন যে , হে সম্মানিত আনসারবৃন্দ , ইসলাম ধর্ম রক্ষার জন্য আমরা আপনাদের অবদান , ত্যাগ , সংগ্রাম ও ভাল গুনাবলী এবং যোগ্যতা সম্পর্কে সম্পূর্ন অবগত আছি । কিন্ত এটা তো আপনারা জানেন যে , আরবদের ভেতর একমাত্র কুরাইশ গোত্র অন্যসব গোত্র থেকে অধিক সম্মানিত এবং এজন্যই আরবরা খেলাফতের এই দায়িত্ব কুরাইশ বংশ ছাড়া অন্য কাউকে কিছুতেই দেবে না । কেননা আমরা মুহাজিররা প্রথম ইসলাম গ্রহনকারী এবং নবীজী (সাঃ) আমাদের কুরাইশ বংশ থেকে । তাই এই সম্মান আমাদের পাওয়া উচিৎ । আপনারা কুরাইশদের মন্ত্রনাদাতা হিসাবে থাকুন । কথা দিচ্ছি , আপনাদের সাথে পরামশ করেই খেলাফত চালান হবে ।

দৃশ্যপট – ০৪ –
হযরত ওমরের এহেন বক্তব্য শুনে খাজরাজ গোত্রের একজন আনসার আল হুবাব ইবনে আল মুনজীর ইবনে জায়েদ ওমরকে প্রচন্ড চ্যালেজ্ঞ দিয়ে বলে উঠলেন , আল্লাহর কসম ! আমাদের গোত্র ছাড়া অন্য কাউকে খলীফা হতে দেব না । তোমাদের ভেতর থেকে আসবে একজন ও আমাদের ভেতর থেকে আসবে একজন ।
আবু বকর বললেন , না এটা কিছুতেই হতে পারে না । এটা আমাদের অধিকার । শাসক আমরাই হব আর তোমরা হবে মন্ত্রনাদাতা ।
আল হুবাব বলল , হে আনসারবৃন্দ ! এই লোকের কথার সমর্থন কর না , শক্ত হও — আল্লাহর কসম ! আমার কথার প্রতিবাদ কেউ করলে এই তলোয়ার দিয়ে তার নাক কেটে ফেলব ।
প্রচুর বাকবিতন্ডা ও হৈ চৈ এর মধ্যে হযরত ওমর বললেন , আল্লাহর কথামত দুজন খলীফা হওয়া ঠিক নয় । একই রাজত্বে দুজন রাজা থাকতে পারে না । মহানবী (সাঃ) তোমাদের গোত্রের নয় বিধায় আরবরা তোমাদের নেতৃত্ব কিছুতেই মানবে না ।
এই বিষয় নিয়ে ওমর ও আল হুবাবের মধ্যে প্রচন্ড কথা কাটাকটি শুরু হল । এমনকি তারা দুজনে দুজনকে অভিশাপ দিলেন এই বলে যে , আল্লাহ এখুনি যেন তোমাকে মেরে ফেলেন !
উত্তেজিত ওমর এরপর সাদ ইবনে উবাদাহের সামনে এসে বললেন , আমরা তোমাদের প্রত্যেকটা হাঁড় ভেঙ্গে দেব ।
ওমরের এহেন ধমকের ফলে উবাদাহ তৎক্ষনাত ওমরের মুখের দাঁড়ি সজোরে টেনে ধরেন । ওমর এর জবাবে বললেন , যদি দাঁড়ির একটা চুল ছেড়ে তবে তোমার সাথে কেউ এখানে আস্ত থাকবে না ।
বয়স্ক রাজনীতিবিদ হযরত আবু বকর ওমরকে শান্ত ও ধর্যধারন করতে বললেন ।
ওমরকে উদ্দেশ্য করে উবাদাহ বলছিল , আল্লাহর কসম ! আমার যদি দাঁড়াবার ক্ষমতা থাকত তবে মদীনার প্রতিটি কোনায় তোমরা সিংহের গর্জন শুনতে পেতে এবং তোমরা কুরাইশরা তখন ইদুঁরের গর্তে পালাতে । হে ওমর , আমি তোমাকে সেই মানুষদের কাছে পাঠাব যেখানে তুমি খুবই সাধারন ছিলে কখনও নেতা হতে পার নি ।

দৃশ্যপট – ০৫ –
ইবনে কুতাইবা বলেন যে , যখন আউশ গোত্রের নেতা বশির ইবনে সাদ লক্ষ করেন যে , আনসাররা খাজরাজ গোত্রের প্রধান সাদ ইবনে উবাদাহের পিছনে গিয়ে সম্মিলিত হচ্ছে তখন প্রতিহিংসার বশে তিনি দাঁড়িয়ে কুরাইশ মুহাজির পক্ষে খেলাফতের দাবী তোলেন ।
মোক্ষম এই সুযোগে ধূর্ত রাজনীতিবিদ হযরত ওমর সাথে সাথে হযরত আবু বকরকে বলেন যে ,
” আপনার হাতটা বাড়ান যেন আমি আপনাকে বায়াত দিতে পারি ” ।
বশির ইবনে সাদ আবু বকরের আনুগত্য মেনে নিল ।

দৃশ্যপট – ০৬ –
যাইহোক ,
কুখ্যাত বনু সকীফাতে ক্ষমতার হালুয়া রুটির লড়াই যখন চলছিল তখন মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) কতৃক মনোনীত ও নির্বাচিত খলীফা , ইমাম , হাদী , পথপ্রদশক , উত্তরসূরী মাওলা আলী (আঃ) নবীজী (সাঃ) এর প্রকৃত সাহাবীদের সংগে নিয়ে মহানবী (সাঃ) এর গোসল , কাফন , জানাজা ও দাফনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন ।

সম্মানীয় পাঠক ,
সার সংক্ষেপে এই হল বনু সকীফার ঐতিহাসিক ঘটনা ।
যে ঘটনা বোধকরি বাংলার শেষ নবাব সিরাজ উদ দৌলার সাথে মীরজাফরের বেঈমানীর ঘটনাকেও ম্লান করে দেয় ।

কারন বনু সকীফাতে অবস্থানরত প্রত্যেক আনসার ও মুহাজির সাহাবাগন ভাল মতই জানতেন যে , বিদায় হজ্ব থেকে ফেরার পথে গাদীর এ খুম নামক স্থানে লক্ষাধিক হজ্ব ফেরৎ হাজী সাহাবাগনের সম্মুখে মহানবী (সাঃ) স্বয়ং নিজে হযরত আলী (আঃ) কে তাঁর ওফাত পরবর্তী খলীফা , ইমাম ও উত্তরসূরী হিসাবে মনোনীত ও নির্বাচিত করে গেছেন ।
হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর সেই ঘোষনার প্রেক্ষিতে ইমাম আলী (আঃ) কে অভিনন্দিত করেছিলেন ।

এরপরেও ক্ষমতার মধুর স্বাদ বলে কথা !

সুপ্রিয় পাঠক ,
যদি আগ্রহী থাকেন , তাহলে বনু সকীফার অবৈধ ক্ষমতা গ্রহনের পরবর্তী ইতিহাস বিশেষ করে ইমাম আলী (আঃ) এর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লেখার ইচ্ছা রাখি ।

একটি বিশেষ অনুরোধ –
ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসাবে ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে সম্পূর্ন নিরপেক্ষ মন নিয়ে জানুন , প্লীজ ।

 

উপরে লেখাটির তথ্য সমূহ নিম্নে উল্লেখিত হল –
গিয়াসুল লুঘাত , পৃ – ২২৮ – ২৩০ / খিলাফতের ইতিহাস , পৃ – ১৩ , ইসলামিক ফাউন্ডেশন / নাহজ আল বালাঘা , পৃ – ২০ – ২৬ , অনুবাদ – জেহাদুল ইসলাম / সহীহ আল বুখারী , খন্ড – ০৬ , হা – ৬৩৫৭ আধুনিক , ১৯৯১ ইং / আল মুরাজাত , পৃ – ৩০৫ , শারাফুদ্দিন মুসাভা / ইমামত , পৃ – ৬৩ , সাঈদ আখতার রিজভী / রওয়াদাতুস সাফা , খন্ড – ০২ , পৃ – ২২১ / আত তাবারী আত তরিকাহ , খন্ড – ০৪ , পৃ – ১৮২০ মিশর / আল কামিল , খন্ড – ০২ , পৃ – ৩২৫ , লেইডেন / আল ইমামত ওয়াস সিয়াসাত , খন্ড – ০১ , পৃ – ১৮ কায়রো / তারিখে ইয়াকুবী , খন্ড – ০২ , পৃ – ১২৩ মিশর / সহীহ আল বুখারী , খন্ড – ০৩ , পৃ – ১৯০ আরবী / আল মিনাল ওয়াল নিহাল , খন্ড – ০১ , পৃ – ৫৭ শাহেরেস্তানী / আর রিয়াদ আন নাদেরা , খন্ড – ০১ , পৃ – ৩৭২ / তারিখ আল খোলফা , পৃ – ৪৩ / মারেফাত , ইমামত ও বেলায়েত , পৃ – ১২০ – ১২২ , মোঃ নাজির হোসাইন / সহীহ বুখারী , খন্ড – ৬ , হাদিস – ৬৭১৬ (আধুনিক) / সহীহ বুখারী , খন্ড – ৬ , হাদিস – ৩২৪২ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) / সহীহ বুখারী , খন্ড – ৬ , হাদিস – ৭২২২ (আহলে হাদিস লাইব্রেরী ) / সহীহ মুসলিম , খন্ড – ৫ , হাদিস – ৪৫৫৪ , ৪৫৫৫ , ৪৫৫৭ , ৪৫৫৮ , ৪৫৫৯ (ই,ফা) / সহীহ আবু দাউদ , খন্ড – ৫ , হাদিস – ৪২৩০ , ৪২৩১ (ই,ফা) / সহীহ বুখারী , খন্ড – ৫ , হাদিস – ৬৭৯৬ (বৌরুত) / সহীহ মুসলিম , খন্ড – ৬ , পৃ – ৩৩৮ / সহীহ তিরমিজি , খন্ড – ২ , পৃ – ৪৫ / মুসনাদে আহমদ , খন্ড – ১ , পৃ – ৩৯৮ / আরজাহুল মাতালেব , পৃ – ৫৮৮ (উর্দ্দু) / মুস্তাদরাক হাকেম , খন্ড – ৩ , পৃ – ৬১৭ , ১৮ (ভারত) / তারিখে বাগদাদ , খন্ড – ১৪ , পৃ – ৩৫৩ , হাদিস – ৭৬৭৩ (আরবী) / কানজুল উম্মাল , খন্ড – ১২ , পৃ – ১৬৫ , হাদিস – ৩৪৫০১ / তারিখে দামেস্ক , খন্ড – ৭ , পৃ – ১০৩ (আরবী ) / উসুদুল গাবা , খন্ড – ৫ , পৃ – ৫৭৪ (আরবী) / মুসনাদে হাম্বল , খন্ড – ৫ , পৃ – ৯০ , ৯২ / মুয়াদ্দাত কুরবা , পৃ – ৯৮ / ইয়া নাবিউল মুয়াদ্দাত , পৃ – ৪১৬ (উর্দ্দু) / কানজুল উম্মাল , খন্ড – ৬ , পৃ – ২০১ / মারেফাতে ইমামত ও বেলায়েত , পৃ – ৪০ , ৪১ , ৪২ , ৪৯ , ৫০ ।

SKL