নামাজে সেজদাতে মাটির টুকরো ব্যবহার প্রসংগ —

মাটির টুকরো ও সিজদা —

বার ইমামীয়া শীয়াগণ মাটি ,পাথর , নুড়ি প্রভৃতি ভূমির অংশ বলে পরিগণিত বস্তু এবং ভূমি হতে উদ্ভূত বস্তুতে (যেমন উদ্ভিদজাত চাটাই ও মাদুর) সিজদা করে ।
কিন্ত কার্পেট ,কাপড় ,পরিধেয় বস্ত্র , অলংকার ও সাজসজ্জার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার্য বস্তুতে সিজদা করা জায়েয মনে করে না ।

এ বিষয় অনেক সুন্নি ভাই অজ্ঞতাঃবশত বিভিন্ন কমেন্টস করে থাকেন ।

শীয়া-সুন্নি পৃথিবীর সকল মুসলমান রাসুল (সাঃ) এর উম্মত ।

আসুন দেখে নেই ,
এ বিষয়ে শীয়া-সুন্নী উভয় সূত্রে অসংখ্য হাদিস রয়েছে যে ,

রাসুল (সাঃ) সবসময় ভূমি বা মৃত্তিকার উপর সিজদা করতেন এমনকি মুসলমানদেরও তা করার নির্দেশ দিতেন ।

এ কারণেই একদিন সাহাবী বেলালকে (রাঃ) মাটির উত্তপ্ততার কারণে পাগড়ির একাংশে সিজদা করতে দেখে মহানবী (সাঃ) নিজ হাতে তার কপাল হতে পাগড়ির কাপড় সরিয়ে দিয়ে বলেন ,
‘ হে বেলাল , তোমার ললাটকে ধূলায়িত কর বা ধূলায় আবৃত হতে দাও । ’

রিবাহ এবং সাহিবের প্রতিও তিনি এরূপ কথা বলেছেন যেমন-
‘ হে সাহিব , তোমার মুখমণ্ডলকে ধূলায়িত হতে দাও ’
বা ‘ হে রিবাহ , তোমার মুখমণ্ডলকে ধূলায়িত কর ’
সূত্র – এ বর্ণনাসমূহ সহীহ আল বুখারী ,কানজুল উম্মাল ,আব্দুর রাজ্জাক রচিত মুসান্নাফ এবং কাশেফুল গিতা রচিত ‘ আস সুজুদ আলাল আরদ ’ গ্রন্থে রয়েছে ।

এরূপ করার অন্যতম দলিল হল এ হাদিসটি যা সহীহ বুখারী ও অন্যান্য গ্রন্থে মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে –

جعلت لی الارض مسجدا و طهورا
“ আমার জন্য পৃথিবীকে (ভূ-পৃষ্ঠ) মসজিদ ও পবিত্রকরণের উপকরণ করা হয়েছে । ”

তদুপরি মাটির উপর সিজদা বা সিজদার জন্য মাটির উপর কপাল রাখা আল্লাহর সামনে সিজদার সর্বোত্তম রূপ , উপাস্যের সামনে উপাসকের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ ও আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত এবং বিনয় ও নম্রতার সবচেয়ে নিকটবর্তী ।
এ বিষয়টি মানুষকে তার মূল উৎসের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ।

মহান আল্লাহ এ কথা বলেন ,
) م ِنها خَلَقنَاکُم وَفِيها نُعِيدُکُم وَ مِنها نُخرجُکُم تارَةً اُخری (

“ আমরা তোমাদের তা (মৃত্তিকা) হতেই সৃষ্টি করেছি ,তাতেই তোমাদের ফিরিয়ে আনব । পুনরায় (কিয়ামতের দিন) তোমাদের তা হতে বের করে আনব । ”
সূত্র – আল কোরআন ।
নিশ্চ য়ই সিজদা হল বিনয়ের চূড়ান্ত প্রকাশ ।

বিনয়ের চূড়ান্ত রূপের প্রকাশ জায়নামাজ ,কার্পেট , বস্ত্র বা মূল্যবান অলংকারের উপর ঘটে না । এ রূপটি তখনই প্রকাশ পায় যখন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান অংশ মানুষের ললাট সবচেয়ে মূল্যহীন বস্তু অর্থাৎ মৃত্তিকার উপর রাখা হয় ।
সূত্র – এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন দশম হিজরী শতাব্দীর আলেম আশ শারানী আনসারী আল মিসরী রচিত আল ইয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির গ্রন্থটি ।

সুন্নি ফিকহার সকল শাখার ফকীহগন মাটি বা মাটি হতে উৎপন্ন বস্তর উপর সেজদা করাকে বৈধ মনে করেন ।

মাটিতে সেজদা করা নিশ্চ য়ই রাসুল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদের রীতি ছিল ।
আবু সাঈদ খুদরী বর্ননা করেন যে , আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কে কাদা মাটিতে সেজদা করতে দেখেছি এবং তাঁর কপালে কাদা মাটির চিন্হও দেখেছি ।
সূত্র – সহীহ আল বুখারী , খন্ড – ১ , অধ্যায় – ১২ , হাদিস নং – ৭৯৮ , খন্ড – ৩ , অধ্যায় – ৩৩ , হাদিস নং – ২৪৪ (ইংরেজী অনুবাদ) ।

মাটির একখন্ড টুকরা বা ছোট্ট পাথর খন্ড – এর উপর রাসুল (সাঃ) সেজদা দিতেন এ বিষয় বিখ্যাত সুন্নি গবেষক আল-শাওকানী সুন্নি উৎসের বিশেষ করে সহীহ মুসলিম , সহীহ তিরমিজি , সুনানে আবু দাউদ , সুনানে আন-নাসাঈ এবং আরও অনেকগুলো উৎসের উল্লেখ রয়েছে ।
সূত্র – আল-শাওকানী , নাইল আল-আওতার খুমরা অধ্যায় , খন্ড- ২, পৃষ্ঠা – ১২৮ ।

এ ছাড়াও দেখুন –
সহীহ আল বুখারী , খন্ড- ১, অধ্যায় – ৮ , হাদিস নং – ৩৭৬ (ইংরেজী অনুবাদ ) ।

হ্যাঁ ,
অবশ্যই সিজদার মাটি পবিত্র হতে হবে ।
আর এজন্যই তার পবিত্রতার কথা চিন্তা করে বার ইমামীয়া শীয়ারা তাদের সঙ্গে একখণ্ড মাটির টুকরা (যা বিভিন্ন মাটির মিশ্রনে প্রস্তুত) বহন করে ।

কখনও কখনও এ সিজদার মাটি বরকত লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র কোন স্থান হতে নেয়া হয়ে থাকে । যেমন কারবালা যেখানে মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (আঃ) শহীদ হয়েছিলেন
এজন্য বার ইমামীয়া শীয়ারা এক্ষেত্রে কারবালার পবিত্র মাটির টুকরা ব্যবহার করে থাকে ।
অবশ্য আজকের আলোচ্য বিষয় এটা নয় ।
যদিও এই বিষয় সুন্নিদের বিখ্যাত রেফারেন্স বিদ্যমান আছে ।

মহানবী (সাঃ) এর কোন কোন সাহাবা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কা নগরীতে সফরের সময় সেখান হতে পাথর ও নুড়ি সিজদার জন্য বহন করে নিয়ে যেতেন ।
সূত্র – এ বিষয়টি সানআনির মুসান্নিফ গ্রন্থে এসেছে ।

বার ইমামীয়া তথা জাফরী মাযহাবের শীয়ারা এরূপ করতেই হবে এবং সবসময় এমনটিই হতে হবে তা অপরিহার্য মনে করে না বরং যে কোন পরিস্কার ও পবিত্র পাথরে সিজদা করা জায়েয মনে করে ।
যেমন পবিত্র মসজিদে নববী ও মসজিদে হারামের মেঝে যেরূপ পাথরে প্রস্তুত হয়েছে তাতেও সিজদা করাতে কোন অসুবিধা নেই ।

বার ইমামীয়া শীয়ারা নামাজের মধ্যে বাম হাতের উপর ডান হাত রাখে না অর্থাৎ হাত বাঁধে না ।
কারণ মহানবী (সাঃ) কখনই এমনটি করতেন না এবং এর স্বপক্ষে কোন অকাট্য ও সুস্পষ্ট দলিল নেই ।
ঠিক একারণেই সুন্নি মালেকী মাজহাবের অনুসারীরাও নামাজে হাত বাঁধেন না ।
সূত্র – বুখারী , মুসলিম ও বায়হাকী দ্রষ্টব্য , মালেকী মাজহাবের মত সম্পর্কে জানতে দেখুন ইবনে রুশদ আল কুরতুবী রচিত বেদায়াতুল মুজতাহিদ সহ অন্যান্য গ্রন্থ ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
বার ইমামীয়া শীয়াদের প্রতি অযাচিত ও অশোভন মন্তব্য করার পূর্বে দয়া করে মহানবী (সাঃ) এর কাজ বা আমল সম্পর্কে আরও বেশী করে জানুন , প্লীজ ।

SKL