আযর কি হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর পিতা ছিলেন —

আযর কি ইবরাহীম (আঃ) এর পিতা ছিল ?

উপরিউক্ত আয়াতসমূহ , সূরা তাওবার ১১৫ নং আয়াত এবং সূরা মুমতাহিনার ১৪ নং আয়াতের বাহ্যিক অর্থ হচ্ছে আযর ইবরাহীম (আঃ) এর পিতৃস্থানীয় ছিল এবং হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে পিতা বলে সম্বোধন করতেন ।

কিন্ত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এবং সকল নবী-রাসূলের পূর্বপুরুষগণ তাওহীদবাদী ও খোদায় বিশ্বাসী ছিলেন ।
এতৎসংক্রান্ত সকল বার ইমামীয়া শীয়া আলেমের ঐকমত্যের (ইজমা) সাথে মূর্তিপূজক আযরের ইবরাহীম (আঃ) এর পিতা হওয়া মোটেও খাপ খায় না ।
প্রসিদ্ধ আলেম শেখ মুফিদ (রহঃ) তাঁর ‘আওয়ায়েলুল মাকালাত’ নামক গ্রন্থে উপরিউক্ত বিষয়টিতে যে ইমামীয়া শিয়া আলেমদের ইজমা রয়েছে তা লিখেছেন ।

এমনকি অনেক সুন্নী আলেমও এ ব্যাপারে তাঁদের সাথে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন । এমতাবস্থায় উপরিউক্ত আয়াতসমূহের বাহ্যিক অর্থের অবস্থাই বা কি হবে এবং কিভাবে এ সমস্যাটি সমাধান করতে হবে ?

অনেক মুফাসসির বলেছেন যে , أب (আব) শব্দটি যদিও সাধারণত আরবী ভাষায় ‘পিতা’র ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় , তবুও এ শব্দটির ব্যবহার কেবল ‘পিতা’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং কখনও কখনও আরবী ভাষা ও পবিত্র কোরআনের পরিভাষায় ‘চাচা’ অর্থেও ব্যবহৃত হয় , যেমন নীচের আয়াতে أب শব্দটি ‘চাচা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে –

)إذ قال لبنيه ما تعبدون من بعدي قالوا نعبد إلهك و إله ءابائك إبراهيم و إسماعيل و إسحاق إلها واحدا و نحن له مسلمون(

“ যখন ইয়াকুব নিজ সন্তানদেরকে বললেন , আমার পরে তোমরা কার উপাসনা করবে ? তখন তারা বলেছিল , আমরা আপনার ও আপনার পূর্বপুরুষগণ ইবরাহীম , ইসমাঈল ও ইসহাকের এক-অদ্বিতীয় উপাস্যের উপাসনা করব । আর আমরা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণকারী ।”
সূরা – বাকারা / ১৩২ ।

নিঃসন্দেহে হযরত ইসমাঈল (আঃ) হযরত ইয়াকুব (আঃ)-এর চাচা ছিলেন । তাঁর পিতা ছিলেন না । কারণ হযরত ইয়াকুব (আঃ) হযরত ইসহাক (আঃ) এর সন্তান । আর হযরত ইসহাক (আঃ) হযরত ইসমাঈল (আঃ) এর ভাই ছিলেন ।
এতদসত্ত্বেও হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর সন্তানগণ হযরত ইয়াকুব (আঃ) এর চাচা হযরত ইসমাঈল (আঃ) কে পিতা বলেছে ।

অর্থাৎ তারা أب শব্দটি তাঁর (ইসমাঈল) ওপরও প্রয়োগ করেছে ।
এ দু’ধরনের ব্যবহার সত্ত্বেও এ সম্ভাবনা থেকে যায় যে , আযরকে হেদায়েত করা সংক্রান্ত যে সব আয়াত রয়েছে সেগুলোতে উল্লিখিত أب শব্দটির কাঙ্ক্ষিত অর্থ হচ্ছে চাচা , বিশেষ করে শেখ মুফীদ যে ইজমার কথা বর্ণনা করেছেন তা থেকে ।

আর আযরকে ইবরাহীম (আঃ) পিতা বলেছিলেন তা সম্ভবত এ কারণে যে , ইবরাহীম (আঃ) এর অভিভাবকত্বের দায়িত্ব দীর্ঘদিন আযরের ওপর ছিল ।
এ কারণেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাকে পিতার ন্যায় সম্মান প্রদর্শন করতেন ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
এবারে দেখুন —

কোরআন আযরকে ইবরাহীম (আঃ) এর পিতা বলে নি —-

হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে আযরের আত্মীয়তার সম্পর্ক সংক্রান্ত পবিত্র কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করার জন্য নিম্নোক্ত দু’টি আয়াতের ব্যাখ্যার দিকে আমরা সম্মানিত পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করব —

১) –
আরব উপদ্বীপের পরিবেশ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অপার আত্মত্যাগের কারণে ঈমান ও ইসলামের নির্মল আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে । অধিকাংশ অধিবাসীই আন্তরিকতার সাথে ঈমান আনয়ন করেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল যে , শিরক ও মূর্তিপূজার চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে দোযখ এবং শাস্তি ।
তারা যদিও ঈমান আনয়ন করার কারণে আনন্দিত ও প্রফুল্ল ছিল । কিন্ত তাদের পিতা-মাতাদের মূর্তিপূজারী হওয়ার তিক্ত স্মৃতি স্মরণ করে তারা কষ্ট পেত ।

যে সব আয়াতে কিয়ামত দিবসে মুশরিকদের জীবন সংক্রান্ত বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যা এসেছে সেগুলো শ্রবণ করা তাদের জন্য ছিল খুবই কষ্টকর ও বেদনাদায়ক । নিজেদের এ আত্মিক যন্ত্রণা লাঘব ও দূর করার জন্য তারা মহানবী (সাঃ) এর কাছে অনুরোধ জানাত যেন তিনি তাদের প্রয়াত অতি নিকটাত্মীয় যারা কাফির ও মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে তাদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন ।

আর ঠিক এভাবেই হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর চাচা আযরের জন্যও এ কাজটিই করেছিলেন ।
নিম্নোক্ত আয়াতটি তাদের (আরবের নবদীক্ষিত মুসলমানগণ) অনুরোধের প্রতি উত্তরস্বরূপ অবতীর্ণ হয়েছিল —

)ما كان للنَّبِيِّ وَ الّذين آمنوا أنْ يَسْتَغْفِروا للمشرِكين و لو كانوا أولي قُربى مِن بعدِ ما تبيَّن لهم أنَّهم أصحابُ الجحيم و ما كان استغفارُ إبراهيمَ لأبيه إلّا عن موعدةٍ وعدها إيّاه فلمّا تبيَّن له إنَّه عدوٌّ للهِ تبرَّأ منه إنَّ إبراهيمَ لأوّاهٌ حليم(

“ — নবী ও যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্য শোভনীয় নয় যে , তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে যদি তারা অতি নিকটাত্মীয়ও হয় , যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে যে , ঐ সব মুশরিক জাহান্নামের অধিবাসী । আর নিজ পিতার জন্য ইবরাহীমের ক্ষমা প্রার্থনা ছিল ঐ প্রতিজ্ঞার কারণে যা তিনি তাকে (চাচা আযরকে) করেছিলেন । তবে যখন ইবরাহীমের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল যে , সে (আযর) আল্লাহর শত্রু তখন তিনি তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করলেন । নিশ্চয়ই ইবরাহীম অত্যন্ত দয়ালু ও ধৈর্যশীল —।” সূরা – তাওবা / ১১৩-১১৪ ।

অগণিত দলিল-প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , আযরের সাথে ইবরাহীম (আঃ) এর কথোপকথন এবং তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অঙ্গীকার ইবরাহীম (আঃ) এর যৌবনেই হয়েছিল ।
অবশেষে ইবরাহীম (আঃ) চাচা আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন ।
অর্থাৎ এটি ঐ সময় হয়েছিল যখন ইবরাহীম (আঃ) তাঁর জন্মভূমি বাবেল ত্যাগ করে ফিলিস্তিন , মিশর ও হিজাযে গমন করেন নি ।

এ আয়াত থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে , যখন আযর কুফর ও শিরকের মধ্যে দৃঢ়পদ থেকেছে তখন ইবরাহীম (আঃ) তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে মোটেও স্মরণ করেন নি ।

২) –
ইবরাহীম (আঃ) তাঁর জীবনের শেষভাগে একটি মহান দায়িত্ব পালন (অর্থাৎ পবিত্র কাবার পুনঃনির্মাণ কার্য সমাপ্ত করার পর) এবং পবিত্র মক্কার শুষ্ক ও মরুপ্রান্তরে নিজ স্ত্রী ও সন্তানকে আনয়ণ করার পর এমন সব ব্যক্তি সম্পর্কে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করেন যার মধ্যে তাঁর পিতা-মাতাও ছিলেন ।
তিনি মহান আল্লাহর কাছে তাঁর প্রার্থনা কবুল হওয়ার জন্য এ ধরনের দোয়াও করেছিলেন ,

)ربَّنا اغْفِرْلي وَلِوالِدَيَّ و للمُؤْمنين يومَ يقومُ الحِساب(

“ — হে আমার প্রভু ! আমাদেরকে , আমার পিতা-মাতা এবং মুমিনদেরকে যেদিন বিচার (হিসাব-নিকাশ) করা হবে সেদিন ক্ষমা করে দিন –।”
সূরা – ইবরাহীম / ৪১ ।

এ আয়াত থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , পবিত্র কাবাগৃহ নির্মাণ করার পরই ইবরাহীম (আঃ) বৃদ্ধাবস্থায় এ প্রার্থনা করেছিলেন ।
যদি উক্ত আয়াতে বর্ণিত والديَّ (আমার পিতা-মাতা) যাঁরা ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর দয়া , ভালবাসা এবং ভক্তিশ্রদ্ধার পাত্র এবং তাঁদের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করেছেন তিনিই যদি আযর হন তাহলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , ইবরাহীম (আঃ) আমৃত্যু এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেন নি এবং কখনও কখনও তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন !
অথচ যে আয়াতটি মুশরিকদের অনুরোধের উত্তরে বর্ণিত হয়েছে তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে , হযরত ইবরাহীম (আঃ) তাঁর যৌবনকালেই আযরের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন এবং তার থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন । আর ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ মোটেও সংগতিসম্পন্ন নয় ।

সম্মানীয় পাঠক ,

এ দু’টি আয়াত পরস্পর সংযোজন করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে , যে ব্যক্তি যৌবনকালে ইবরাহীম (আঃ) এর ঘৃণার পাত্র হয়েছিল এবং যার সাথে তিনি সম্পর্কচ্ছেদ করেছিলেন সেই ব্যক্তিটি ঐ ব্যক্তি থেকে ভিন্ন যাঁকে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সর্বদা স্মরণ করেছিলেন এবং যাঁর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন ?

পৃথিবীতে আগত কোন নবী রাসুলগনের সম্মানীয় পিতা মাতা কখনই মুশরিক বা মূর্তিপূজারী ছিলেন না ।
এই কথাটিই হচ্ছে বার ইমামীয়া শীয়াদের গুরুত্বপূর্ন একটি যৌক্তিক বিশ্বাস ।

SKL