নামাজ আদায় = হাত ছেড়ে নাকি হাত বেঁধে

নামায কি ভাবে আদায় করব –
হাত ছেড়ে নাকি হাত বেধে ?

প্রিয় পাঠক ,
আসুন পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীসের আলোয় দেখা যাক –
” — সালাত সেইভাবেই কায়েম কর যেভাবে তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন আর যেভাবে ফিরিয়া আসিবে — ” ।
সূত্র – সূরা আরাফ – ২৯ ।

পবিত্র এই আয়াতের দ্বারা আমরা স্পষ্ট ধারণা নিতে পারি যে , “যেভাবে তোমাদের সৃষ্টি করেছেন” অর্থাৎ যেভাবে আমরা মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীতে আসি তখন আমাদের উভয় হাত সোজা থাকে , বাঁধা নয় এবং “যেভাবে তোমরা ফিরিয়া আসিবে” (অর্থাৎ সোজা থাকে) ।
তাই নামাযকেও ঠিক একই রূপে আদায় করতে হবে ।

ঠ — সালাতে যেন সতর্ক ও সশস্ত্র থাকে — ঠ ।
সূরা – নেসা -১০২ ।
এখন বুঝার বিষয় সশস্ত্র থাকলে কিভাবে দাঁড়াতে হয় ।

” — প্রত্যেকেই জানে তাহার ইবাদতের ও পবিত্রতা ঘোষণার পদ্ধতি , যেভাবে এক পাখি আল্লাহর পবিত্রতা মহিমা ঘোষণা করে উড়ন্ত অবস্থায় ডানা ছড়িয়ে — ” ।
সূরা – নূর / ৪১ ।

পবিত্র কোরানের উক্ত আয়াতের কারীমা থেকে আমরা আরও প্রমাণ পাই যে , পৃথিবীতে প্রত্যেকেই আল্লাহর ইবাদতের মহিমা জানে , একটি পাখি যখন আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় থাকে তখনই সে আল্লাহর ইবাদত করতে থাকে ।
তাহলে পাখি যখন আকাশে উড়ে তখন তার ডানা মেলে উড়ে এবং তার দুটো ডানা সোজা রেখে উড়তে থাকে । যদি সে তার হাতকে (ডানা) বন্ধ বা বেঁধে রাখে তাহলে সে উড়ন্ত অবস্থাতেই পড়ে যাবে তখন সে তার ইবাদত থেকে সরে যাবে , থেমে যাবে তার ইবাদত । তাই নামযকেও ঠিক একই রূপে আদায় করতে হবে ।

” — ইহুদীরা বলে , আল্লাহর হাত বাধা , উহারাই হাত বাধা এবং যারা বলে তার জন্য উহারাই অভিশপ্ত, বরং আল্লাহর উভয় হস্তই প্রসারিত — ” ।
সূরা – মায়িদা / ৬৪ ।

” — যাহারা মোনাফেক নর ও নারী উহারা হাত বদ্ধ করিয়া রাখে — ” ।
সূরা – তওবা / ৬৭ ।

হাত বাধা অবস্থায় নামায পড়া বিদাত বা হারাম বলে পরিগণিত হয় ।
আমিরুল মোমেনিন আলী (আঃ) বলেন , “নামাযীরা যখন আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়ায় তখন যেন তার হস্তদয়কে পরস্পরের উপড় না রাখে (অর্থাৎ হাত না বাধে) কারন , এরূপ আমলের দ্বারা মাজুসী কাফেরদের সাদৃশ্য প্রকাশ করে ।
সূত্র – ওয়াসায়েলুশ শীয়া , খন্ড – ৪ , অধ্যায় -১৫ , হাদিস-০৭ ।

প্রখ্যাত সাহাবী আবু হামিদ সায়েদী একদল সাহাবী যাদের মধ্যে আবু হুরায়রা দুসী , সাহাল সায়েদী , আবু ওসাইদ সায়েদী , আবু কাতাদাহ , হারেস ইবনে রাবয়ী এবং মোহাম্মাদ ইবনে মোসলামাহ ও ছিলেন । তাদের জন্য মহানবী (সঃ) থেকে নামায পড়ার পদ্ধতি এবং ছোট-বড় মোস্তাহাবগুলোও বর্ণনা করেছেন , কিন্তু এরূপ কোন আমলের কথা অর্থাৎ হাতের উপড় হাত বাঁধা বর্ণনা করেন নি ।
স্পষ্টতই যদি মহানবী (সাঃ) কদাচিৎ একাজটি করতেন তবে তা তিনি বর্ণনা করতেন এবং উপস্থিত ব্যাক্তিবর্গকে স্বরণ করিয়ে দিতেন ।
সায়েদির হাদিসের অনুরূপ হাদিস হাম্মাদ ইবনে ঈসার মাধ্যমে ইমাম জাফর সাদেক (আঃ)-এর ভাষায় হাদিস গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হয়েছে ।
সূত্র – বায়হাকী সুনান -২/৭২ , ৭৩, ১০১, ১০২ / সুনানে আবু দাউদ-১/১৯৪ বাবে এফতেতাহে সালাত, হাদিস-৭৩০, ৭৩৬ / তিরমিযি সুনান ২/৯৮ বাবে সেফাতুস সালাত / ওয়াসায়েলুশ শীয়া ৪ বাব-১, (আফয়ালে সালাত) হাদিস-৮১) ।

আল্লামা শাহ্ ইসমাইল (ভারত) তিনি বলেন , হাতকে সোজা রেখে রাসূল (সাঃ) এর যুগে নামায আদায় হত ।
সূত্র – হেদায়াতুল মাহদী , আল্লামা ওয়াহেদ খান , ৪র্থ খন্ড, পৃঃ ১২৬ / তানভিরুল য়া’নাঈম (লাহর মুদ্রিত) আল্লামা ইসমাইল (ভারত দেওয়াবন্দ) পৃঃ ২১) ।

হাফেয ইবনুল কাইয়্যেম (রহঃ) লিখেন , ইমাম মালেক (রহঃ) হাত ছেড়ে দিয়ে নামায পড়তে বলেছেন ।
ইমাম মালেক (রহঃ)-এর অনুসারীরা এভাবে নামায পড়তে শুরু করে দিয়েছে ।
সূত্র – মাওলানা মুফতি মোহাম্মদ ইদরীছ কাছেমী, পত্রিকা-ইনকিলাব, ঢাকা বৃহঃ বার, ২১ মে ২০০৯, ধর্ম দর্শন ।

নামাযে হাত বাঁধা রাসূল (সাঃ) এর পছন্দ নয় —
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত –
রাসূল (সাঃ) কোমরে হাত রাখা পছন্দ করতেন না এবং বলতেন , ইহুদীরাই এরূপ করে ।
সূত্র – বোখারী-৩য় খন্ড , পৃঃ ৪০১, হাঃ ৩২০০, আধুনিক প্রকাশনী ।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত ।
তিনি বলেন নবী (সাঃ) কোমরে হাত রেখে নামায পড়তে নিষেধ করেছেন ।
সূত্র – বোখারী-১ম খন্ড , পৃঃ ৪৯৭ , হাঃ – ১১৪০, আধুনিক প্রকাশনী ।

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন , রাসূল (সাঃ) নিষেধ করেছেন নামাযের মধ্যে কোমরে হাত রাখিয়া দাঁড়াইতে ।
সূত্র – মেশকাত শরীফ, ৩য় খন্ড, হাঃ ৯১৮-(৪), পৃঃ ১২, সন-২০০৬) ।

প্রচলিত নামাযে দাঁড়িয়ে নাভীর নীচে হাত বাঁধা হয় । এটাও সহিহ হাদিসের বিপরীত ।
সূত্র – বোখারী-১ম খন্ড , পৃঃ ১০২ / মুসলিম-১ম খন্ড, পৃঃ ১৭৩ / আবু দাউদ-১ম খন্ড, পৃঃ ১১০ / তিরমিযি -পৃ – ৩৪,৩৫ / নাসাঈ-পৃঃ ১৪১ / ইবনে মাযাহ-পৃ – ৫৯ / মিশকাত-পৃ – ৭৫ / ইবনে খুজাইমাহ-১ম খন্ড , পৃ – ২২৩ / মুআত্তা মুহাম্মাদ-পৃ – ১৬০ ।

সাহল ইবনে সাদ থেকে বর্ণিত হাদীসে আমরা পাই যে , হাত বেঁধে নামায পড়া মহানবী (সাঃ)-এর পরে চালু হয়েছে ।
কারণ তিনি বলেন , ” মানুষকে যদি এ কাজের জন্য আদেশ করা হত অথবা এটা যদি মহানবী (সাঃ) এর আদেশ হত তবে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করা হত ।
সূত্র – ফাতহুল বারী ২/২২৪ এবং সুনানে বায়হাকী ২/২৮ ।

আল্লাহ বলেন , ” — অতঃপর তাদের পরে এল অপদার্থ পরবর্তীরা । তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃদ্ধির অনুবর্তী হল । সুতরাং তারা অচিরেই পথভ্রষ্টতা প্রত্যক্ষ করবে — ” ।
সূরা – মারিয়াম / ৫৯ , ৬০ ।

” — সুতরাং , দূর্ভোগ সেই সালাত আদায় কারিদিগের , যাহারা তাহাদিগের সালাত সম্বন্ধে উদাসীন , যাহারা লোক দেখানোর জন্য উহা করে — ” ।
সূরা – মাউন / ৪ , ৬ ।

রাসূল (সাঃ) এর ইন্তেকালের পরে নামায নষ্ট হতে চলেছে ।
সূত্র – বোখারী-১ম খন্ড , পৃঃ ২৪৯ , হাঃ ৪৯৯, আধুনিক প্রকাশনী ।

আমর ইবনে যুরারা (রাঃ) যুহরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , আমি দামেশকে আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর নিকট উপস্থত হলাম , তিনি তখন কাঁদছিলেন ।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম , আপনি কাঁদছেন কেন ?
তিনি বললেন , রাসূল (সাঃ) এর যুগে যা কিছু পেয়েছি তার মধ্যে কেবল মাত্র সালাত ছাড়া আর কিছুই বহাল নেই । কিন্তু এই সালাতকেও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ।
বাকর (রাঃ) বলেন , আমার কাছে মুহাম্মদ ইবনে বাকর বুরসানী (রাঃ) উসমান ইবনে আবু রওওয়াদ (রাঃ) সূত্রে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন ।
সূত্র – সহীহ বোখারী , ২য় খন্ড, পৃঃ ৮, হাঃ ৫০৫, (ইফাবা) ৫০৪) ।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন , “তোমরা সেইভাবে নামায আদায় কর যেভাবে আমাকে নামায আদায় করতে দেখ” ।
সূত্র – সহীহ বোখারী – মিশকাত আরবী ৬৬ পৃঃ / মিশকাত বাংলা আরাফাত পাবলেকেশন্স, ২য় খন্ড, পৃঃ ৫৮ কিতাবুস সালাত, হাঃ ৬৬২ ।

হযরত আলী (আঃ)-এর নামায রাসূল (সঃ)-এর নামাযের সদৃশ্য পূর্ণ । অর্থাৎ রাসূল (সঃ) যেভাবে নামায পড়তেন হযরত আলী (আঃ) ঠিক সেইভাবে নামায পড়তেন ও পড়াতেন ।
সূত্র – সহীহ বোখারী , ১ম খন্ড, পৃঃ ৩৫৪, হাঃ ৭৪০, ৭৪২, আধুনিক প্রকাশনী ।

মুতাররাফ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন , আমি এবং ইমরান ইবনে হোসাইন , আলী ইবনে আবু তালিবের পিছনে কোন এক সময় নামায পড়লাম ।
তিনি নামাযে সালাম শেষ করার পর ইমরান আমার হাত ধরে বললেন , এ ব্যাক্তি (আলী) আমাদেরকে মুহাম্মাাদ (সাঃ) এর নামাযের সাথে সদৃশ্যপূর্ণ নামায পড়ালেন এবং বললেন , এ ব্যাক্তি আমাদেরকে রাসূলের (সাঃ) নামাযের কথা স্বরণ করিয়ে দিলেন । অর্থাৎ মুহাম্মদ (সাঃ) যেভাবে নামায পড়তেন আলী (আঃ) ও ঠিক সেই ভাবে নামায পড়ালেন ।
সূত্র – সহীহ বোখারী-১ম খন্ড, পৃঃ ৩৫৪, হাঃ ৭৮০, আধুনিক প্রকাশনী ।

পাঠক ,
এখন সিদ্বান্ত আপনার । কেননা আপনি যথেষ্ট জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষ ।