রাসূলের নব্যুয়ত প্রাপ্তি

রাসূলের ওপর যখন সূরায়ে মুদ্দাস্সিরের প্রথম চার আয়াত নাযিল হয়, তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর ওপর অর্পিত জনশুদ্ধির মহান দায়িত্ব পালনের কাজ শুরু করার সময় এসে গেছে এবং আল্লাহ চান জনগণের মাঝে হেদায়াতের আলো উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক।

সূরা মুদ্দাসসিরে বলা হয়েছে: “হে চাদরাবৃত ! উঠুন, বিশ্ববাসীকে সতর্ক করুন এবং আপনার প্রতিপালকের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন ! এবং আপনার পোশাক পবিত্র করুন !”

পুরুষদের মাঝে যিনি রাসূলের প্রতি সর্বপ্রথম ঈমান এনেছিলেন তিনি হলেন হযরত আলী (আ.)। তাঁর বয়স ছিল তখন এগারো বছরের মতো। রাসূল যখন হযরত আলী (আ.) কে ইসলামের দাওয়াত দিলেন, আলী (আ.) অত্যন্ত আগ্রহ-উদ্দীপনার সাথে তাঁর ছোট্ট হাত দুটো রাসূলের পবিত্র হাতে সঁপে দিলেন। রাসূল (সা.) আলতোভাবে আলীর হাতে চাপ দেন ৷ আলী এ সময় উত্ফুল্ল মনে তাঁর ঈমানের সাক্ষ্য দিয়ে বললেন : আশহাদুআল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদুআন্না মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। হযরত আলী (আ.) আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং মুহাম্মাদ (আ.) এর রেসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে ইসলামের ওপর প্রথম ঈমান আনলেন। শাহাদাতের মুহূর্ত পর্যন্ত এই ঈমানের ওপর অটল থেকে ইসলামের খেদমতে তিনি সাধ্যমতো নিয়োজিত ছিলেন। এভাবেই তিন ব্যক্তি সমন্বয়ে ইসলামের প্রাথমিক সমাজটি মক্কা শহরে গড়ে উঠেছিল। এ সমাজটির মূল ভিত্তি ছিল একত্ববাদ। তাই মূর্খতা এবং শেরেকির সাথে তাঁদের সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়।

মুহাম্মাদ (সা.) দৃঢ় সংকল্পের সাথে তৌহিদ বা একত্ববাদের দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। নবুয়্যতির দায়িত্ব পাবার পর থেকে আল্লাহর রাসূল খাদীজা ও আলীকে সঙ্গে নিয়ে ফেরেশতা জীব্রাঈল (আ.) এর (আল্লাহ প্রেরিত) শিক্ষা অনুযায়ী নামায আদায় করেন। রাসূলে খোদা (সা.) একটানা তিন বছর দাওয়াতী কাজ চালান। এ সময় তিনি প্রকাশ্যে দাওয়াতী কাজ করার পরিবর্তে গোপনে গোপনে তৌহিদের পথে মানুষকে আহ্বান করাটাকে কল্যাণময় ও শ্রেয় মনে করলেন। আলী (আ.) এর পর যায়েদ বিন হারেসা হলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি যিনি রাসূলের ওপর ঈমান আনেন। এরপর ধীরে ধীরে অন্যান্যরা ইসলাম ও রাসূলের ওপর ঈমান আনে। রাসূল (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে এবং সচেতনভাবে দাওয়াতী কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন। তিনি তাঁর অন্তর্চক্ষু দিয়ে যাকে উপযুক্ত দেখেছেন তাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। এই তিন বছরে যে স্বল্পসংখ্যক লোক মুসলমান হয়েছিল কুরাইশ নেতারা তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিবাদ বা বিক্ষোভ দেখায় নি। কিন্তু যেদিন রাসূল বিশেষ দাওয়াতী কাজ অর্থাত্‍ তাঁর নিকটাত্মীয়দের মাঝে গণদাওয়াত দেওয়ার কাজ শুরু করলেন এবং শের্ক ও মূর্তি পূজার সমালোচনা করলেন, সেদিন থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাসূলের বিরোধিতা শুরু হয়ে যায় ৷
নিঃসন্দেহে যে সমাজে কুসংস্কারের বীজ গভীরে প্রোথিত ঐ সমাজের আমূল সংস্কার করতে হলে দুটি জিনিস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমতঃ কথা বলা বা ব্যাখ্যা দেওয়ার শক্তি খুবই প্রয়োজন। জনগণের সামনে এমনভাবে নতুন চিন্তাদর্শন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে হবে যাতে জনগণের চিন্তায় ঐ বক্তব্য বা ব্যাখ্যা গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে জনগণ নতুন চিন্তাদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে শুরু করে।

দ্বিতীয়তঃ প্রতিরক্ষামূলক শৃঙ্খলা বিধান করা, যাতে বিরোধীদের অত্যাচারের বিপরীতে যথার্থ প্রতিক্রিয়া দেখানো যায়।

তো রাসূলের বাচনভঙ্গী এবং ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ছিল সর্বোত্কৃরষ্টমানের। তাঁর বাচনভঙ্গী এতো বেশি হৃদয়গ্রাহী ছিল যে, তাঁর কথা শুনে সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত। অলঙ্কারপূর্ণ এবং প্রাঞ্জল বাচনভঙ্গীতে তিনি কোরআনের অদ্ভুত সুন্দর আয়াতগুলো মানুষের সামনে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতেন। কোরআনের এই আয়াতগুলো এতো বেশী চিত্তাকর্ষক ছিল যে, মুশরেকদের কেউ কেউ যখন রাসূলের কাছে আসতো, তারা চমত্কার চমত্কার ওইসব আয়াত শুনে ভীষণভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়তো।

কিন্তু দাওয়াতী কাজের প্রাথমিক দিনগুলোতে মুসলমানদের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। কারণ তিন বছরের গোপন দাওয়াতী কাজের ফলে মাত্র চলি্লশজন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। রাসূল (সা.) আল্লাহর আদেশক্রমে প্রকাশ্যে তাঁর গণদাওয়াতী কাজ শুরু করলেন নিকটাত্মীয়দেরকে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের মধ্য দিয়ে। নিকটাত্মীয়দের মাঝে দাওয়াতী কাজের সূক্ষ্ম দর্শনটি এই ছিল যে, তারা যদি নবীজীর ওপর ঈমান না-ও আনে তারপরও গোত্রগত এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার কারণে তাঁর প্রতিরক্ষায় হয়তো এগিয়ে আসবে। কেননা রাসূলের নিকটাত্মীয়রা ছিলেন মক্কার মধ্যে খুবই প্রভাবশালী। পবিত্র কোরআনের সূরা শুয়ারার ২১৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে : ওয়া আনজির আশিরাতাকাল আকরাবীন….. অর্থাত্‍ এবং নিকটাত্মীয়দেরকে উপদেশ দিন এবং সতর্ক করুন। এই আয়াত নাযিলের পর রাসূল (সা.) তাঁর নিকটাত্মীদের মধ্য থেকে ৪৫ জনকে নিজের বাড়িতে দাওয়াত করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁদের সামনে নিজস্ব রহস্য উন্মোচিত করবেন।

ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছিল আর মেহমানদের আসার সময়ও ঘনিয়ে এসেছিল। আলী (আ.) মেহমানদের অভ্যর্থনার স্থানের দিকে একটু তাকালেন। সবকিছুই প্রস্তুত ছিল। বনী হাশেম গোত্রের মুরুব্বীরা যাঁদের মাঝে রাসূলের অধিকাংশ চাচারাও ছিলেন, একেক করে সবাই প্রবেশ করছিলেন। আবু তালেব, হামযা, আব্বাস, আবু লাহাব এবং এমনকি রাসূলের সবচে বয়োজ্যেষ্ঠ চাচা হারেসও এই আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন। রুমের ভেতর বিশাল দস্তরখান পাতা হলো। দস্তরখানের দুইপাশে ফিরোযা রঙের মাটির তৈজস বা পাত্র এনে রাখা হলো। আলী এবং যায়েদ সুস্বাদু অথচ খুবই সাধারণ খাবার দাবার মেহমানদের পরিবেশন করলেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ হয়ে যাবার পর এবার তাঁর আসল কথা বলার সুযোগ আসলো। তিনি এবার উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন :

প্রথমেই মহান স্রষ্টার কৃতজ্ঞতা জানাই এবং তাঁর সাহায্য কামনা করছি এবং সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরীক নেই। হে আমার স্বজন ! জেনে রাখুন, আমি আপনাদের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী। আপনাদের সমৃদ্ধি বা ভালো ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা আমার নেই। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি তাঁরই প্রেরিত রাসূল। তোমাদের এবং সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্যে আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে। খোদার শপথ ! মৃত্যুর পর পুনরায় জাগ্রত হবে, যেভাবে ঘুমানোর পর আবার জেগে ওঠো। সেদিন তোমাদেরকে তোমাদের কাজের প্রতিফল দেওয়া হবে। আর প্রতিফল হলো সত্‍ বা পুণ্যবানদের জন্যে স্থায়ী বেহেশত এবং অসত্‍ বা পাপীদের জন্যে স্থায়ী দোযখ। আমি সবচে ভালোটাই আমার কাওমের জন্যে নিয়ে এসেছি। আল্লাহ আমাকে আদেশ দিয়েছেন যেন আমি তোমাদেরকে তাঁরই দিকে আহ্বান জানাই।

এ সময় আবু লাহাব রাসূলের বক্তব্যকে উড়িয়ে দিয়ে ঠাট্টা করে বললো : আমরা তোমার উপহার গ্রহণ করার জন্যে ভীষণ আগ্রহী।

রাসূল বললেন : আমি তোমাদের জন্যে ইহকাল এবং পরকালীন মঙ্গল ও কল্যাণই উপহার হিসেবে এনেছি। আমি তোমাদেরকে দুটি কথা বলার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। এ্যাক, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, অপরটি হচ্ছে আমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল-এ দুটি কথার সাক্ষ্য দেবে। এখন তোমাদের মধ্য থেকে যে এক্ষেত্রে আমাকে সহযোগিতা করবে, সে আমার পরে তোমাদের মাঝে আমার স্থলাভিষিক্ত ও প্রতিনিধি হবে। এই ঘোষণার পর পুরো মজলিশ নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কেবল আলী (আ.) তাঁকে সাহায্য করবেন বলে ঘোষণা দিলেন। রাসূল তাঁর ঐ আহ্বান আরো দুবার জানালেন। প্রত্যেকবারই কেবল হযরত আলী (আ.) ই সহযোগিতা বা রাসূলের আনুগত্য করার ঘোষণা দিলেন ৷ রাসূল তখন ঘোষণা দিলেন, হে জনগণ, এই যুবক আমার ভাই, তোমাদের মাঝে আমার স্থলাভিষিক্ত এবং আমার দায়িত্বভারপ্রাপ্ত।

মজলিশে এক ধরনের গুঞ্জন দেখা দিল ৷ আবু লাহাব আবারো ঠাট্টা-মশকরা শুরু করলো ৷ এমন সময় রাসূলের সহযোগী ও সার্বক্ষণিক পৃষ্ঠপোষক চাচা আবু তালেব উঠে সমাবেশকে শান্ত হবার আহ্বান জানালেন এবং রাসূলকে সম্বোধন করে বললেন : হে প্রিয় বত্স! তুমি তোমার প্রতিপালকের বার্তা পৌঁছিয়েছো এবং আমরাও শুনেছি। এখন আমাদেরকে একটু চিন্তা-ভাবনা করার সময় দাও ! আবু লাহাব আবারো শোরগোল করে পরিবেশটাকে অশান্ত করে তুললো। আবু তালিব এবার সুস্পষ্ট জবাব দিয়ে বললেন : হে বংশের কলঙ্ক ! ক্বাবার খোদার শপথ ! আমরা তাকে সহযোগিতা করার জন্যে প্রস্তুত রয়েছি এবং শেষ পর্যন্তও তার সহযোগিতায় থাকবো।

সে সময়কার মূর্তি পূজা ও শেরেকি ব্যবস্থার মধ্যে তৌহিদের পথে মানুষকে আহ্বান জানানো খুবই কঠিন কাজ ছিল। এদিকে শুরু থেকেই একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, একটি দল রাসূলের বিরোধী। কিন্তু আল্লাহ চান তাঁর রাসূল যেন এতো শত্রু আর বিরোধীদের দেখে ভয় না পান বরং প্রকাশ্যে এবং সুস্পষ্টভাবে দাওয়াতী কাজ করেন।

অতএব আপনি যে ব্যাপারে আদিষ্ট হয়েছেন, মুশরিকদের পরোয়া না করে প্রকাশ্যে তা শুনিয়ে দিন। আপনার পক্ষ থেকে ঠাট্টা-বিদ্রুপকারীদের জন্যে আমিই যথেষ্ট।

এভাবেই রাসূল (সা.) তাঁর গণ দাওয়াতী কাজ শুরু করেন। এবার তিনি সাফা পর্বতের পাশে সমবেত জনগণকে একত্ববাদী ধর্ম ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে ব্যাপক দক্ষতার সাথে তিনি মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান জানান। এমনিতেই তাঁর সততা ছিল সর্বজনবিদিত, সুতরাং এখন দাওয়াতী কাজের ক্ষেত্রে তাঁর সেই সততা, অবস্থান ও অভিজ্ঞতা কাজে লেগে গেল। রাসূল নিজেই বলেছেন : “তোমাদের মাঝে আমার অবস্থান হলো সেই পর্যবেক্ষণকারী বা পাহারাদারের মতো, যে দূর থেকে শত্রুকে দেখতে পেয়ে নিজের কওমকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যায়। হে কুরাইশ গোত্র, নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাও।”

রাসূলের এই বক্তব্য শুনে রাসূলের চাচা আবু লাহাব জনগণের মাঝে তীব্র হৈ-চৈ বাধিয়ে দিল এবং রাসূলে খোদার বক্তব্যে বিঘ্ন ঘটালো, আর লোকজনকে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিল।

গণ দাওয়াত দিতে গিয়ে নবী করীম (সা.) নতুন এবং স্পর্শকাতর একটি পর্যায়ে গিয়ে উপনীত হলেন। এরপর থেকেই কুরাইশ কাফেররা প্রকাশ্যভাবে বিরোধিতা শুরু করে দেয়। তারা ইসলামের অগ্রগতি রোধ করতে বিচিত্র ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় অতি দ্রুতই মুহাম্মাদের ধর্ম আরবের সীমানা ছেড়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।

Source: http://www.hussainidalan.com