ইমাম হাসান আসকারি (আ.) কিভাবে শাহাদত বরণ করেন?

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সমকালীন শাসক গোষ্ঠির অপরাজনীতির শিকার হবার কারণে জন্মভূমিতে তাঁর জীবন কাটানোর সুযোগ হয়নি। আব্বাসীয় শাসকদের আদেশে ইমাম আসকারী (আ.) পিতা ইমাম হাদি (আ.) এর সাথে

প্রিয় মাতৃভূমি মদিনা শহর ছেড়ে আব্বাসীয়দের তৎকালীন শাসনকেন্দ্র সামেরায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আব্বাসীয় শাসকরা ইমাম হাদি (আ.) এবং তাঁর সন্তান ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছিলো। পরিবেশ কিংবা কালগত তারতম্যের কারণে যদিও তার রূপ ভিন্ন ছিল কিন্তু আহলে বাইতের সকল ইমামের জীবনের ওপরই একই রকম প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছিল। একইভাবে সকল ইমামও প্রায় অভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেদের সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। আব্বাসীয়রা জনগণকে ইমামের সান্নিধ্য থেকে দূরে রেখেছিল যেন ইমাম জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠতে না পারে।

আব্বাসিয় খলিফা মোতাসিম ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর জনপ্রিয়তা দেখে নিজের খেলাফত বাচাঁনোর জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ে। (পায়গাহে হওযে মাজাল্লে মওউদ, সংখ্যা ৪৩, বিষয় নিগাহি বে আসরে গায়বাতে সুগরা)

আর একারণেই আব্বাসিয় খলিফা মোতাসিম তাঁকে হত্যার করার ষড়যন্ত্র করতে থাকে এবং তাঁর অনুসারিদেরকে হেদায়াতের নূর থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে তাঁকে বিষ দ্বারা শহিদ করে। (সিরাতুল আয়েম্মা ইশনা আশার, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৯২)

আর বণি উমাইয়া এবং বণি আব্বাসিয় খলিফাদের কলঙ্কজনক ইতিহাসে বিষ দ্বারা হত্যা করার মতো ঘটনা অনেকবার ঘটেছে এবং তারা সাধারণ জনগণের কাছে উক্ত মৃত্যুর কারণ সমূহকে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করতো যেন তাদের শাষণ ক্ষমতা অটল থাকে।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর কাছে ঐশী জ্ঞান থাকার কারণে তিনি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন যে, অচীরেই তিনি ইহলোক ত্যাগ করবেন এবং তিনি বলেছিলেন যে, উক্ত ঘটনাটি ২৬০ হিজরীতেই ঘটবে এবং বণী আব্বাসীয় হুকুমতের লোকজনই তাকে হত্যা করবে।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর মা উক্ত খবরটি শুনে বিচলিত হয়ে পড়েন এবং ক্রন্দন করতে থাকেন। ইমাম (আ.) তাঁর মা’কে শান্তনা দিয়ে বলেন: আল্লাহর আমার জন্য যা নির্ধারণ করে রেখেছেন তা অবশ্যই ঘটবে সুতরাং আাপনি বিচলিত হবেন না!

যেভাবে তিনি ভবিষ্যতবাণি করেছিলেন তার শাহাদতের ঘটনা অনুরুপভাবেই ঘটেছিল এবং উক্ত বছরেই তিনি শাহাদাত বরণ করেন।(নাহজুদ দাওয়াত ওয়া মিনহাজুল ইবাদাত, পৃষ্ঠা ২৭৫)

ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর শাহাদতের কয়েকদিন পূর্বে যখন তাঁকে অত্যাচারি খলিফা মোতামেদ’এর কাছে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন আব্বাসীয় খলিফা রাগান্বিত অবস্থায় ছিল। কেননা সে জানতে পারে যে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’কে সকলেই ভালবাসে এবং সম্মান করে এবং তাকে সকল আলাভি ও আব্বাসিদের চেয়ে উত্তম বলে মনে করে। আর এ কারণে তাকেও অন্যান্য ইমামদের ন্যায় বিষ প্রদান করা হয় এবং শহিদ করা হয়। (আল ইরশাদ, পৃষ্ঠা ৩৮৩)

ইমাম (আ.)কে যখন বিষ প্রদান করা হয় তখন তাঁর সকল শরীরে বিষের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। মোতামেদ তার দরবারের ৫ জন বিশ্বস্ত ব্যাক্তিকে দ্বায়িত্ব দিয়ে বলে যে, তারা যেন ইমাম (আ.)’এর ঘরের প্রতি কড়া নজর রাখে। অনুরুপভাবে সে যুগের চিকিৎসকদের দ্বায়িত্ব দেয় তারা যেন সকাল সন্ধ্যা ইমাম (আ.)’এর শারিরিক অবস্থা সম্পর্কে খলিফাকে অবগত করতে থাকে। বিষ প্রদানের পরের দিন চিকিৎসকগণ খলিফাকে খবর দেয় যে, ইমাম (আ.)’এর শারিরিক অবস্থা অবনতির পথে। আব্বাসীয় খলিফা মোতামেদ তাদেরকে নির্দেশ দেয় এবং তারা যেন ইমাম (আ.)কে ছেড়ে মূহুর্তের জন্যও ঘরের বাইরে না যায়। মোতামেদ ১০ জন লোককে সে যুগের বিচারকের সাথে ইমাম (আ.)’এর বাড়িতে প্রেরণ করে এবং নির্দেশ দেয় তারা যেন সারা দিন রাত সেখানে অবস্থান করে এবং ইমাম (আ.)কে নজরবন্দি করে রাখে। যেন পরে ইমাম (আ.)’এর শাহাদতের পরে তারা যেন সাক্ষ্য দিতে পারে যে, ইমাম (আ.) স্বাভাবিক মৃত্যুতে মারা গেছেন। উক্ত সময়ে ইমাম (আ.)’এর বাড়িতে চিকিৎসকগণ ছাড়াও খলিফার পক্ষ থেকে আরো ১০ জন লোককে নিযুক্ত করা হয়।

ইমাম হাসান আসকারি (আ.) উক্ত অবস্থায় খলিফার নিযুক্ত ব্যাক্তিদের থাকার পরেও এক কক্ষে বসে তার বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত শিয়াদেরকে উদ্দেশ্যে করে চিঠি লিখেন এবং তা গোপনে বার্তা বাহকের মাধ্যেমে প্রেরণ করেন।(বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৫০, পৃষ্ঠা ৩২৭- ৩২৯, আল কাফি, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৫০৫, কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা ৪৭৩- ৪৭৪)

ইমাম (আ.)’এর শারিরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটতে থাকে এবং তিনি প্রতিমূহুর্তে শাহাদতের অপেক্ষা করছিলেন এবং অবশিষ্ট সময়গুলোতে তিনি নিজেকে আল্লাহর যিকরে নিমগ্ন রেখেছিলেন। অবশেষে যখন তিনি কিবলার দিকে মুখ করেন তখন তার পবিত্র রূহ ইহলোকে পাড়ি জমায়।

ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ২৬০ হিজরি রবিউল আউয়াল মাস, রোজ শুক্রবারে ফজরের নামাজের পরে শাহাদত বরণ করেন। তাঁর শাহাদতের খবর প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথে সকল নর-নারী এবং বাচ্চাদের ক্রন্দনের আওয়াজ শামেরার পরিবেশকে শোকাবহ করে তুলে। সকল শিয়ারা ইমাম (আ.)’এর বাড়িতে একত্রিত হয় এবং হুকুমতের পক্ষ থেকে খলিফার ষড়যন্ত্রকে গোপন করার জন্য দিনটিকে শোকদিবস বলে ছুটি ঘোষণা করা হয়। লোকজন উক্ত দিনে তাদের সকল ব্যাবসা এবং দোকান সমূহকে বন্ধ রাখে। মনে হচ্ছিল যেন সমস্ত সামেরা শহরটি কেয়ামতের ময়দানে পরিণত হয়েছে। (আল ইরশাদ, পৃষ্ঠা ৩৬২)

শামেরায় ইতিপূর্বে কখনই কোন জানাজায় এত লোকের সমাগম ঘটেনি। ঐদিনগুলোতে বিভিন্ন ফেরকা এবং বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন ইমাম (আ.)’এর ফযিলত ও গুণাবলির বর্ণনায় মুখরিত ছিল।(হায়াতুল ইমামুল আসকারি(আ.))

উসমান বিন সাঈদ আমরি’এর উপরে ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর গোসল, কাফন এবং দাফনের দ্বায়িত্ব ছিল।(আল গায়বা, পৃষ্ঠা ২১৬)

যখন ইমাম (আ.)’এর জানাযা প্রস্তুত হয়ে যায় তখন খলিফা তার ভাই আবু ঈসা বিন মোতাওয়াক্কেল’কে প্রেরণ করে যেন সে ইমাম (আ.)’এর জানাযার নামাজ আদায় করে। যখন সে ইমাম (আ.)’এর জানাযার কাছে আসে এবং তাঁর মুখের উপর থেকে কাফনের কাপড়কে সরিয়ে বলে ইনি হচ্ছে ইমাম হাসান আসকারি (আ.) এবং তিনি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যু বরণ করেছেন। এবং এর সাক্ষি স্বরূপ রয়েছে কাজি এবং বিভিন্ন খেদমতকারীরা। অতঃপর সে কাফনের কাপড়কে বন্ধ করে দেয় এবং নির্দেশ দেয় যেন জানাযাকে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়।

শেইখ সাদুক্ব বর্ণনা করেন যে প্রকাশ্যেভাবে জানাযার নামাজ আদায়ের পূর্বে ঘরের মধ্যে প্রথম জানাযার নামাজ আদায় করা হয়। আর যখন ইমাম (আ.)’এর ভাই জাফর নামাজ পড়ানোর জন্য এগিয়ে আসে। তখন ইমাম মাহদি (আ.) আসেন এবং বলেন: হে চাচা! পিছনে আসুন কেননা ইমাম’এর জানাযার নামাজ ইমামই পড়িয়ে থাকেন।(কামাল উদ্দিন, পৃষ্ঠা খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৭৫)

আর এভাবেই ইমাম হাসান আসকারি (আ.)’এর শাহাদতের মাধ্যেমে অত্যাচারি এবং  মিথ্যাদাবীকারির মুখোশ উন্মোচিত হয় এবং ১২ তম ইমাম, ইমাম মাহদি (আ.)’এর ইমামত শুরু হয়। 

এস, এ, এ
http://www.tvshia.com/bn/content/16245