ইমাম হুসাইন (আ.) এর আধ্যাত্মিক সফর মদীনা থেকে কারবালা

ইমাম হুসাইন (আ.) এর মদীনা থেকে কারবালার সফর ছিল একটি আধ্যাত্মিক সফর। তিনি উক্ত সফরে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করেন এবং উম্মতে মোহাম্মাদীকে সত্যর পথে আহবান জানান। নিন্মে বিভিন্ন স্থানের নাম এবং সেখানে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ করা হলঃ

মদীনাঃ 
২৮শে রজব ৬০ হিজরীতে তিনি তার আধ্যাত্মিক সফর শুরু

করেন। সে সময় মদীনার গর্ভণর ছিল ওয়ালিদ বিন আতিক্বা, মাবিয়ার মৃত্যুর পরে তাকে নির্দেশ দেয়া হয় সে যেন ইমাম হুসাইন (আ.) এর কাছ থেকে বাইয়াত গ্রহণ করে। ইমাম হুসাইন (আ.) তার জবাবে বলেনঃ এজিদ হচ্ছে একজন ফাসিক, মদ্যপায়ি ব্যাক্তি, সে অবৈধ ভাবে বিভিন্ন নির্দোষ মানুষের রক্ত ঝরিয়েছে আমি কখনই তার বাইয়াত করব না। 
যখন মারওয়ান বিন হাকাম ইমাম হুসাইন (আ.) এর কাছে এজিদের বাইয়াতের জন্য কথা বলে তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তার জবাবে বলেনঃ হে খোদার শত্রু! আমাকে তোমরা ছেড়ে দাও কেননা আমি রাসুল (সা.) থেকে শুনেছি তিনি বলেছেনঃ আবু সুফিয়ানের সন্তানদের জন্য মুসলমানদের খেলাফতকে তিনি হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি যদি মাবিয়াকে মেম্বারের উপরে দেখতেন তাহলে তিনি তাকে সেখান থেকে নিচে নামিয়ে দিতেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে রাসুল (সা.) এর উম্মতেরা তা দেখেছে কিন্তু তারা কিছুই বলেনি। সুতরাং খোদা তাদের এজিদ নামক একজন ফাসেককে তাদের শাষক করে দিয়েছেন। 
ইমাম হুসাইন (আ.) ৬০ হিজরী ২৮শে রজব রাতে তার নিজেদের আত্মীয়স্বজন এবং সঙ্গিসাথীদের নিয়ে মদীনা থেকে মক্কার দিকে রওনা হন।

ইমাম হুসাইন (আ.) মদীনা থেকে বাহির হওয়ার সময় দুটি ওসিয়ত করেনঃ
১- আমার মদীনা থেকে বাহির হওয়ার উদ্দেশ্যে হচ্ছে শুধুমাত্র রাসুল (সা.) এর উম্মতের হেদায়াতের জন্য আমি আমার নানা হজরত মোহাম্মাদ (সা.) এবং আমার বাবা হজরত আলী (আ.) এর ন্যায় আর্দশ অনুযায়ি জনগণকে সৎ কাজের উপদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করব। 
২- তারাই নিজেরদের মুসলমান বলে দাবী করতে পারবে যারা মানুষকে খোদার পথে দাওয়াত দেয় এবং সৎকর্ম করে। যারা আমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসবে তারা রাসুল (সা.) থেকে কখনও পৃথক হবে না এবং তাদের প্রাপ্য অধিকার খোদার কাছে রয়েছে।

মক্কাঃ 
৩রা শাবান থেকে ৮ই জিলহজ্ব ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) মক্কাতে পৌছান এবং সেখানে আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালিবের ঘরে অবস্থান করেন। মক্কার জনগণ এবং হাজীরা তার সাথে সাক্ষাত করার জন্য ভিড় জমায়। 
ইমাম হুসাইন (আ.) কুফাবাসীদের কাছ থেকে ১২ হাজার চিঠি আসার পরে মুসলিম বিন আক্বিলকে ১৫ই রমজান নিজের প্রতিনিধি হিসেবে কুফাতে প্রেরণ করেন। 
ইমাম হুসাইন (আ.) মুসলিমের চিঠির উপরে ভিত্তি করে এবং মক্কাতে রক্তপাত হারাম বলে তিনি হজ্ব ছেড়ে দিয়ে ওমরা করেন এবং ৮ই জিলহজ্ব তিনি মক্কা থেকে ইরাকের দিকে রওনা হন। 
তিনি মক্কা ছেড়ে আসার পূর্বে জনগণের উদ্দেশ্যে বলেনঃ আমরা রাসুল (সা.) এর আহলে বাইতগণ খোদার সন্তুষ্টিতে সন্তুষ্ট। যারাই তাদের নিজের রক্তকে খোদার পথে এবং আমাকে সাহায্যে করার কাজে উৎসর্গ করতে চাই তারা যেন আমার সাথে এই আধ্যাত্মিক সফরে অংশগ্রহণ করে।

সাফ্ফাঃ 
বুধবার ৯ই জিলহজ্ব ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) সাফফা নামক স্থানে পৌছান। তিনি সেখানে তাঁর সফর সঙ্গিদের উদ্দেশ্যে বলেনঃ আমি স্বপ্নে আমার নানা হজরত মোহাম্মাদ (সা.) দেখেছি তিনি আমাকে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব দান করেছেন আমি অবশ্যই তা সম্পাদন করব। 
উক্ত স্থানে ফারাযদাক্ব নামক একজন কবির সাথে ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাক্ষাত হয় সে কুফার জনগণের অবস্থা সম্পর্কে তাঁকে অবগত করে। সে বলেঃ হে ইমাম! কুফার জনগণের অন্তর আপনার সাথে কিন্তু তরবারি বণী উমাইয়ার সাথে। ইমাম হুসাইন (আ.) তার উত্তরে বলেনঃ যদি ভবিষ্যতের সংঘটিত ঘটনাবলি যদি আমার মন মতো হোক বা না হোক আমি খোদার ‍শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। কেননা যাদের অন্তর হক্ব এবং তাকওয়ায় পরিপূর্ণ তারা কখনও সঠিক পথ থেকে পিছু পা হয় না এবং এজন্য তারা ক্ষতিগ্রস্থও হয় না।

যাতে ইরাক্বঃ 
১৪ই জিলহজ্ব সোমবার ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) সেখানে পৌছান। উক্ত স্থানে হজরত জয়নাব (সা.আ.) এর স্বামী মদীনার গভর্ণর আমরু বিন সাঈদের কাছ থেকে নিরাপত্তা দানের সত্যায়িত চিঠি নিয়ে আসে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) কে কুফার দিকে যেতে নিষেধ করে। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.)আমরু বিন সাঈদের চিঠির জাববে লিখেন যে, মুসলমান হচ্ছে তারা যারা খোদার পথে দাওয়াত দেয় এবং সৎকর্ম করে এবং খোদা রাসুল (সা.) কখনও পৃথক হয় না। যেহেতু তুমি আমাকে নিরাপত্তা দিবে বলেছ সেহেতু খোদা যেন তোমাকে এর সওয়াব দান করুন। 
আব্দুল্লাহ তার দুই সন্তানকে জিহাদে অংশগ্রহণ করার জন্য ইমাম হুসাইন (আ.) কে আবেদন জানায় এবং মক্কার দিকে ফিরে যায়।
ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে আমরু বিন সাঈদকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল খোদার নিরাপত্তা হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম। আমরা যেন এ দুনিয়াতে তাকে ভয় করি যেন আখেরাতের নিরাপত্তা অর্জন করতে পারি।

হাজেরঃ 
মঙ্গলবার, ১৫ই জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) হাজের নামক স্থানে পৌছান। তিনি সেখান থেকে “কাইস বিন মুসহের” এর মাধ্যমে কুফাবাসীদের উদ্দেশ্যে বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি চিঠিতে লিখেন যে মুসলিমকে তোমাদের সাহায্যে সহযোগিতার কথা আমি শুনেছি খোদা তোমাদেরকে উক্ত কাজের জন্য উত্তম প্রতিদান দান করবেন। যখন মুসহের তোমাদের কাছে পৌছাবে তখন তোমরা তার কাজে সাহায্যে করো। আমিও কিছু দিনের মধ্যে তোমাদের মাঝে পৌছে যাব। 
কিন্তু কাইসকে পথিমধ্যে বন্দি করা হয়। তখন সে বাধ্য হয়ে ইমাম হুসাইন (আ.) এর চিঠিটি ছিড়ে ফেলে যেন কেউ তা সম্পর্কে অবগত না হতে পারে। তারপরে তাকে বন্দি অবস্থায় কুফার দারুল আমারতে উবাইদুল্লাহ এর কাছে উপস্থিত করা হয়। তাকে বলা হয় যে সকল ব্যাক্তিরা ইমাম হুসাইন (আ.) কে চিঠি লিখে দাওয়াত করেছিল তিনি যেন তাদের নামগুলো বলে দেয় অথবা জনসম্মুখে ইমাম হুসাইন (আ.) এবং তার ভাই এবং পিতাকে গালমন্দ করে। তখন তিনি দারুল আমারার ছাদের উপরে যেয়ে হজরত আলী (আ.) এবং তার সন্তানদের প্রসংশা শুরু করেন এবং ইবনে যিয়াদ এবং তার সঙ্গীসাথীদেরকে তিরষ্কার করে এবং ইমাম হুসাইন (আ.) এর কুফাতে আগমনের খবর দেয় এবং জনগণকে তাঁর সাহায্যের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে। তখন উবাইদুল্লাহ নির্দেশে তাকে ছাদের উপর থেকে ফেলে দেয়া হয় এবং তার শরীরকে টুকরা টুকরা করে দেয়া হয় এবং এভাবে তিনি শাহাদত বরণ করেন।

খুযাইমিয়াহঃ
শুক্রবার, ১৮ই জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে তিনি খুযাইমিয়াহ নামক স্থানে পৌছান। ইমাম হুসাইন (আ.) সেখানে একদিন এবং এক রাত অতিবাহিত করেন। কিছু লোক তার সে আধ্যাত্মিক সফরে যোগ দেয়। যোহর বিন কাইন ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। 
ইমাম হুসাইন (আ.) এখানে তার বোন হজরত জয়নাব (সা.আ.) কে বলেনঃ হে আমার বোন! খোদা আমাদের জন্য যা ঠিক করে রেখেছেন তাই ঘটবে।

যারুদঃ 
সোমবার, ২১শে জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) যারুদ নামক স্থানে পৌছান। যোহাইর বিন ক্বাইন যে ছিল উসমানী চিন্তাধারী ব্যাক্তি যে উক্ত বছরে মক্কা থেকে হজ্ব সম্পাদনের পরে কুফার দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। যদিও প্রথমে সে ইমাম (আ.) এর সাথে সাক্ষাত করতে চাইনি কিন্তু ঘটনাক্রমে উক্ত স্থানে ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাথে তার সাক্ষাত হয়ে যায়। যখন যোহর তার লোকজনদের সাথে খাবার খাচ্ছিল তখন ইমাম হুসাইন (আ.) তার বার্তা বাহকের মাধ্যমে যোহাইর কে ডেকে পাঠায় তখন সে একটু চিন্তা করে। তার স্ত্রী বলেঃ সুবহান আল্লাহ তোমার কত সৌভাগ্য যে রাসুল (সা.) এর নাতী তোমাকে দাওয়াত দিয়েছে আর তুমি তার কবুল করবে না। 
যোহাইর এর শাহাদাতের পরে ইমাম হুসাইন (আ.) বলেনঃ হে যোহাইর! খোদা নিজের দয়া রহমত তোমার চারিদিকে দান করেছেন এবং তোমার হত্যাকারীকে অভিশপ্ত করা হয়েছে।

সাআলাবিইয়াঃ
মঙ্গলবার, ২২ জিলজৃহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) সাআলাবিইয়াতে পৌছান। ইমাম (আ.) রাতে উক্ত স্থানে পৌছান এবং এখানেই তাঁকে মুসলিম বিন আক্বিল এং হানী বিন উরওয়ার শাহাদতের খবর তিনি শুনতে পান। তখন ইমাম (আ.) বলেনঃ (اِنّا لِلّه وَ اِنّا اِلَيهِ راجِعون) হয়তো এরা (কুফাবাসীরা) আমার কোন উপকারেই আসবে না। এই বলে তিনি ক্রন্দন শুরু করেন এবং তাঁর সফরসঙ্গীরাও তার সাথে কাঁদতে শুরু করে। 
ইতিহাসে বলে হয়েছে যে ইমাম (আ.) তার সফরসঙ্গীদের কাছে নিজের হুজ্জাত সম্পূর্ণ করেন এবং যারা পার্থিব সম্পদের জন্য এসেছিল তারা উক্ত খবরটি শুনারর সাথে সাথে ইমাম (আ.) কে ছেড়ে চলে যায়।

যোবালেঃ 
বুধবার, ২৩ জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) যোবালে নামক স্থানে পৌছান। ইমাম (আ.) উক্ত স্থানে বলেনঃ কুফাবাসীরা আমার সাথে তাদের কৃত ওয়াদা ভঙ্গ করেছে এবং আমাকে নিঃসঙ্গ করে দিয়েছে। তোমাদের মধ্যে যদি কেউ ফিরে যেতে চাই তাহলে সে ফিরে যেতে পারে এবং আমি আর তার জীবনের দ্বায়িত্বভার নিতে পারব না।

বাতনুল আক্বাবাঃ 
শুক্রবার, ২৫ জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) বাতনুল আক্বাবাতে পৌছান এবং তিনি বলেনঃ বণী উমাইয়ারা আমাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হবে না এবং যখনই তারা এরকমটি করবে তখনই খোদা তাদের উপরে এমন একজনকে কর্তৃত্ব দান করবে যে সে তাদেরকে লাঞ্ছিত করবে।

শারাফ বা যু হুসামঃ 
শনিবার, ২৬ জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.)শারাফ বা যু হুসাম নামক স্থানে পৌছান এবং সবাইকে নির্দেশ দেন যে সবাই যেন যথেষ্ট পরিমাণ পানি সংগ্রহ করে এবং সকালেই তারা এখান থেকে রওনা হবেন। পথিমধ্যে প্রায় দুপুরের কাছাকাছি ইমাম শত্রুদের সৈন্যদের সম্মুখিন হন এবং শত্রুদের আগে তারা যু হুসাম নামক স্থানে পৌছান। সেখানে ইমাম (আ.) নির্দেশ দেন যেন শত্রুদের সৈন্য এবং তাদের ঘোড়াদের তৃষ্ঞা নিবারণ করা হয়। 
ইমাম হুসাইন (আ.) এর শত্রু পক্ষের সৈন্যরা যোহর ও আসরের নামাজ ইমাম হুসাইন (আ.) পিছনে আদায় করে। 
এরপরে ইমাম (আ.) শত্রুদেরকে উদ্দেশ্যে করে বক্তব্য রাখেন। যখন ইমাম (আ.) সেখান থেকে চলে যেতে চান তখন হুর বাধা হয়ে দাড়ায়। ইমাম তাকে বলেনঃ তোমার মা যেন তোমার মৃত্যুতে শোকাহত হোক! তুমি আমার কাছে কি চাও? হুর বলেঃ আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যেন আমি আপনাকে উবাইদুল্লাহর কাছে নিয়ে যায়। আর যদি আপনি তা না মেনে নেন তাহলে এমন এক পথ নির্বাচন করুন যেন তা মদীনার দিকে না হয় বরং তা কুফার দিকে হয় । তারপরে সেখানে ইমামের সাথে হুরের আরো কিছু কথা হয়।

বায়াযেঃ 
রবিবার, ২৭ জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) বায়াযে নামক স্থানে পৌছান। ইমাম হুসাইন (আ.) এবং হুরের সৈন্যরা উভয়ে একত্রে অবস্থান করে। ইমাম (আ.) এখান হুরের সৈন্যদেরকে উদ্দেশ্যে করে বলেনঃ বণী উমাইয়ারা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলেছে এবং খোদার নির্দেশাবলিকে তুচ্ছজ্ঞান করেছে, ফেসাদ সৃষ্টি করেছে, খোদার নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করেছে, বাইতুল মালকে নিজস্ব মালিকানা মনে করেছে, হারাম কে হালাল এবং হালাল কে হারাম করেছে। তোমরা আমার কাছে চিঠি লিখেছিলে এবং বলেছিলে তোমরা আমার বাইয়াত করেছ। এখন যদি তোমরা তোমাদের কৃত ওয়াদার উপরে অটল থাক তাহলে বুদ্ধিমানে কাজ করেছ কেননা আমি হচ্ছি তোমাদের রাসুল (সা.) এর নাতি ও হজরত ফাতেমা (সা.আ.) এর সন্তান। আর যদি বাইয়াত ভঙ্গ কর, যদিও তোমাদের কাছে এটা অসম্ভব কিছুই না। কেননা তোমরা আমার বাবার আলী (আ.) , আমার ভাই হাসান (আ.) এবং আমার দূত মুসলিম ইবনে আক্বিলের সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করেছ। তিনি আরো বলেনঃ হে লোকেরা! রাসুল (সা.) বলেছেনঃ যদি কোন অত্যাচারী বা শাষক যে ওয়াদা ভঙ্গ করে, হারাম কে হালাল ঘোষণা করে, রাসুল (সা.) এর সুন্নাতের উপরে আমল না করে তাহলে তার চীরস্থায়ী ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।

উযাইবুল হাজানাতঃ 
সোমবার, ২৮শে জিলহজ্ব, ৬০ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) উযাইবুল হাজানাত নামক স্থানে পৌছান। সেখানে কুফার কয়েকজন লোক তাঁর সাথে সাক্ষাত করে এবং কুফার অবস্থা সম্পর্কে ইমাম (আ.) কে অবগত করে। তারা বলেঃ কুফার অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকেরা উৎকোচ গ্রহণ করেছে এবং শত্রু পক্ষের হয়ে কাজ করছে এবং অবশিষ্ট লোকদের অন্তর আপনার সাথে কিন্তু প্রয়োজনে তারা আপনার বিরূদ্ধে তরবারি ধরতে দ্বিধাবোধ করবে না।

কাসরে বণী মুকাতেলঃ 
বুধবার, ১লা মহরম, ৬১ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) কাসরে বণী মুকাতেল নামক স্থানে পৌছান। এখানে কুফার কিছু লোক তাবুতে অবস্থান করছিল। ইমাম (আ.) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন তোমরা কি আমাকে সাহায্যে করার জন্য অপেক্ষা করছ? তাদের মধ্যে কিছু লোক বলে আমাদের অন্তর আপনার সাথে কিন্তু আমরা অপারগ কেননা আমাদের স্ত্রী, সন্তান রয়েছে, আমাদের কাছে বিভিন্ন লোকদের সম্পদ গচ্ছিত রয়েছে এবং আমরা এর পরিণাম সম্পর্কেও অবগত না সুতরাং আমরা আপনাকে সাহায্যে করতে পারব না। 
ইমাম (আ.) বণী হাশিমের যুবকদের বলেনঃ তারা যেন যথেষ্ট পরিমাণে পানি সংগ্রহ করে এবং আজ রাতেই আমরা এখান থেকে চলে যাব। 
তারপর তিনি উবাইদুল্লাহ বিন জোয়ফি নামক ব্যাক্তিকে বলেনঃ যেহেতু তোমরা আমাকে সাহায্যে করবে না সেহেতু তোমরা খোদাকে ভয় কর এবং এখান থেকে এত দূরে চলে যাও যেন আমার সাহায্যের শব্দ তোমাদের কানে না পৌছায়। কেননা যদি কেউ আমার শব্দ শুনতে পাই এবং আমার সাহায্যের জন্য এগিয়ে না আসে তাহলে তাকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।

নাইনাওয়াঃ
বৃহঃস্পতিবার, ২রা মহরম, ৬১ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) নাইনাওয়া নামক স্থানে পৌছান। এখানে হুর নির্দেশ প্রাপ্ত হয় যে ইমাম (আ.) কে মরুপ্রান্তরে সৈন্যবেষ্টি করে রাখা হয়। ইমাম (আ.) তখন এক উপযুক্ত আর্দ্রতাযুক্ত স্থান খুঁজতে থাকেন এবং এমন এক স্থানে পৌছান এবং সে স্থানের নাম জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন সে স্থানটির নাম হচ্ছে কারবালা। তখন তিনি ক্রন্দন করেন এবং বলেনঃ সবাই নেমে আস কেননা এটাই হচ্ছে সে স্থান যেখানে আমাদের শহীদ করা হবে এবং এখানে আমাদের কবরস্থান হবে এবং রাসুল (সা.) আমাকে এ স্থানই দেখিয়ে ছিলেন।
উবাইদুল্লাহ ইমাম (আ.) কে চিঠি লিখে যে হয় আপনি এজিদের বাইয়াত করুন অথবা এখানেই হত্যা করা হবে। ইমাম তার চিঠি পড়ে বলেনঃ তোমার জন্য খোদার আযাব নির্ধরিত হয়ে গেছে।

কারবালাঃ
শুক্রবার, ৩রা মহরম, ৬১ হিজরীতে ওমর বিন সাআদ চার হাজার সৈন্য সহ কারবালাতে উপস্থিত হয়।

কারবালাঃ
শনিবার, ৪ঠা মহরম, ৬১ হিজরীতে উবাইদুল্লাহ কুফার মসজিদে তার বক্তব্যে বলেঃ হে কুফাবাসী তোমরা আবু সুফিয়ানের বংশধরদেরকে চিনতে পেরেছ তারা যা চাই তা করতে পারে!! এজিদকে চিনতে পেরেছ সে চাইলে তোমাদেরকে ক্ষমাও করতে পারে। সে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে আমি তোমাদেরকে অর্থ দান করি যেন তোমরা হুসাইনের সাথে যুদ্ধ করতে যাও। 
– শিমর চার হাজার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সৈন্য বাহিনী নিয়ে।
– ইয়াযিদ বিন রেকাব দুই হাজার সৈন্য নিয়ে।
– হাসিন বিন নুমাইর চার হাজার সৈন্য নিয়ে।
– মাযায়ের বিন রাহিয়ে চার হাজার সৈন্য নিয়ে।
– নাসর বিন হারসা দুই হাজার সৈন্য নিয়ে। কারবালার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

কারবালাঃ
রবিবার, ৫ই মহরম, ৬১ হিজরীতে কুফা শহরে বিভিন্ন স্থান থেকে ওমর বিন সাআদের সৈন্য দলে যোগ দেয়ার জন্য লোকেরা জমা হতে থাকে। উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ কারবালার পথে কিছু লোককে তদারকির দ্বায়িত্ব দিয়ে রাখে যেন কেউ ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাহায্যের জন্য কারবালাতে যেতে না পারে।

কারবালাঃ 
সোমবার, ৬ই মহরম, ৬১ হিজরীতে ওমরে সাআদ উবাইদুল্লাহকে চিঠি লিখে যে এবং সাবধানে থাকতে বলে। 
হাবীব ইবনে মাযাহির ইমাম (আ.) এর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বণী আসাদ গোত্রের কাছে যায়। যারা কারবালার কাছেই জীবন যাপন করতো। তাদের কাছে সাহায্যে চাইলে প্রায় ৯০ জন ইমাম (আ.) সাহায্যে করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু পথিমধ্যে তারা ওমরে সাআদের সৈন্য দলের সম্মুখিন হয়। শত্রুরা তাদের উপরে হামলা করে এবং তারা বিভিন্ন দিকে পালিয়ে যায়। হাবীব ইবনে মাযাহির উক্ত ঘটনা সম্পর্কে ইমাম (আ.) কে অবগত করলে তিনি বলেনঃ (لا حَولَ وَلا قُوَّةَ اِلاّ بِاللهِ) । 
ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর ভাই মোহাম্মাদ ইবনে হানাফিয়া এবং বণী হাশিমদেরকে চিঠি লিখেন। 
ইমাম বাহিনীর ডান দিকের সৈন্য বাহিনীর প্রধান ছিলেন যোহাইর বিন কাইন, বাম দিকের সৈন্য বাহিনীর প্রধান ছিলেন হাবীব ইবনে মাযাহির এবং পতাকাবাহি ছিলেন হজরত আব্বাস (আ.)। যদিও এজিদি সৈন্য কাহিনী ইমাম (আ.) এর তাবুর কাছাকাছি ছিল কিন্তু ইমাম তাদের উপরে আগে হামলা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন যে হামলা যেন আগে তাদের পক্ষ থেকে হোক।

কারবালাঃ 
মঙ্গলবার, ৭ই মহরম, ৬১ হিজরীতে বণই উমাইয়ার প্রায় ৩০ হাজার সৈন্য বাহিনী ইমাম হুসাইন (আ.) এর সাথে যুদ্ধের জন্য আসে। 
উবাইদুল্লাহ ওমরে সাআদকে নির্দেশ দেয় যে, ইমাম হুসাইন (আ.) এর জন্য ফুরাত নদীর পানিকে বন্ধ করে দাও। যেন এক বিন্দু পানি তার তাবুতে না পৌছায় যেমনভাবে উসমানের জন্য পানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল! 
ওমরে সাআদ ৫০০ অশ্বারোহিকে ফুরাত কিনারাতে অবস্থানের নির্দেশ দেয়। তাদের মধ্যে একজন বলে হে হুসাইন! তোমাকে এক বিন্দু পানি দেয়া হবে না তুমি তৃষ্ঞার্ত অবস্থায় মারা যাবে। ইমাম (আ.) তাকে বদদোয়া দেয় যে, সে যেন পানি বিনা মারা যায়।

কারবালাঃ 
বুধবার, ৮ই মহরম, ৬১ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) এবং হজরত আব্বাস (আ.) এজিদী সৈন্যদের প্রাচীর ভেদ করে ফুরাত নদী থেকে মশকে পানি ভরে তাবুতে নিয়ে আসে। 
ইমাম হুসাইন (আ.) ওমরে সাআদ এর সাথে সাক্ষাত করে এবং তাকে বলেনঃ হে সাআদের সন্তান! তুমি কি খোদা কে ভয় পাও না?
ওমর সাআদ বলেঃ আমি যদি এ দল থেকে সরে যায় তাহলে তারা আমার ঘরকে ধ্বংস করে দিবে এবং আমার সমস্ত সম্পদকে কেড়ে নিবে আমি আমার পরিবারের জন্য ইবনে যিয়াদ থেকে ভয় পাই। 
ইমাম (আ.) তাকে বলেনঃ তুমি কি মনে কর আমাদেরকে হত্যা করে তুমি “রেই” নামক স্থানের হুকুমত অর্জন করবে। খোদার শপথ তুমি কখনই তার স্বাদ ভোগ করতে পারবে না। 
তারপর ইমাম (আ.) তার সঙ্গিদের উদ্দেশ্যে করে বলেনঃ তোমরা ধৈর্য ধারণ কর বেহেস্ত তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

কারবালাঃ 
বৃহঃস্পতিবার, ৯ই মহরম, ৬১ হিজরীতে শিমর ইমাম (আ.) এর তাবুর কাছে আসে এবং হজরত আব্বাস এবং উম্মুল বানিনের অন্যান্য সন্তানদের উদ্দেশ্যে করে চিৎকার দিয়ে বলেঃ আমি তোমাদের জন্য উবাইদুল্লাহর কাছ থেকে নিরাপত্তার চিঠি নিয়ে এসেছি। জাবাবে তারা বলেনঃ তোমার এবং তোমার নিরাপত্তা দানের চিঠির উপরে লানত হোক, এটা কিভাবে সম্ভব যে আমরা নিরাপত্তার মধ্যে থাকব আর রাসুল (সা.) এর নাতী এবং হজরত ফাতেমা (সা.আ.) এর সন্তান নিরাপত্তা পাবে না। 
ইমাম হুসাইন (আ.) শত্রুদের কাছ থেকে এক রাত সময় চান যেন সেই রাতে মন ভরে খোদার ইবাদত এবং কোরআন তেলাওয়াত করতে পারেন। 
ইমাম তাবুর চারিদিকে পরিখা খনন করেন এবং তার আশেপাশে তাঁর সাহাবীদের মোতায়েন করেন যেন শত্রুরা কোনমতে তাবুর কাছে আসতে না পারে। 
ওমরে সাআদের সৈন্য বাহিনী থেকে কিছু লোক ইমাম (আ.) এর সাথে যোগ দেয়। 
ইমাম (আ.) শত্রুদে উদ্দেশ্যে করে বলেনঃ তোমাদের জন্য আমার মায়া হয় যে আমার সাহায্যের আবদন শুনার পরে তোমাদের কত বড় ক্ষতি হয়ে যাবে যা তোমরা বুঝতে পারছ না। আমি তোমাদেরকে সীরাতে মুসতাকিমের পথে আহবান জানাচ্ছি কিন্তু তারপরেও তোমরা আমার কথায় কর্ণপাত করছ না। কেননা তোমাদের পেট হারামে পূর্ণ হয়ে গেছে এবং তোমাদের অন্তরে মোহর লেগে গেছে।

কারবালাঃ 
শুক্রবার, ১০ই মহরম ৬১ হিজরীতে ইমাম হুসাইন (আ.) তার সাহাবীদের সাথে ফজরের নামাজ আদায় করেন এবং তাদেরকে বলেনঃ আমার এবং তোমাদের শাহাদতের মধ্যে খোর সন্তুষ্টি নিহিত রয়েছে। সুতরাং তোমরা ধৈর্য ধারণ কর। 
ইমাম বাহিনীর ডান দিকের সৈন্য বাহিনীর প্রধান ছিলেন যোহাইর বিন কাইন, বাম দিকের সৈন্য বাহিনীর প্রধান ছিলেন হাবীব ইবনে মাযাহির এবং পতাকাবাহি ছিলেন হজরত আব্বাস (আ.)। যদিও এজিদি সৈন্য কাহিনী ইমাম (আ.) এর তাবুর কাছাকাছি ছিল কিন্তু ইমাম তাদের উপরে আগে হামলা করেননি। তিনি চেয়েছিলেন যে হামলা যেন আগে তাদের পক্ষ থেকে হোক।
ওমরে সাআদ ইমাম হুসাইন (আ.) এর তাবুর দিকে তীর নিক্ষেপ করে এবং বলে তোমরা সাক্ষি থাক যে, আমি সর্বপ্রথম ইমাম হুসাইন (আ.) এর তাবুর দিকে তীর নিক্ষেপ করলাম! তারপর এজিদী বাহিনীরা একত্রে তীর নিক্ষেপ করা শুরু করে। 
যুদ্ধের প্রথম হামলাতে চারজন শহীদ হয় এবং এর পরে একক যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমে সাহাবী শহীদ হয় এবং তারপরে আহলে বাইতের সদস্যরা শহীদ হয়। অবশেষে ইমাম হুসাইন (আ.) একা থেকে যান। যখন ইমাম তাবুর বাচ্চা এবং নারীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কারবালার ময়দানে যুদ্ধে আসেন এবং আবার সবাইকে হজরত আলী (আ.) এর যুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি কারবালাতে এক নজির বিহিন যুদ্ধ করেন। কিন্তু শত্রুরা তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং যে যা পায় পাথর, বল্লম, তীর দিয়ে ইমাম (আ.) এর উপরে হামলা করে। একটি তিন মাথা বিশিষ্ট তীর ইমাম (আ.) এর বুকে এসে বিধে যায়। ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইমাম (আ.) এর শরীরে প্রায়েএক হাজার তীর বর্শার আঘাত পরিলক্ষিত হয়। এভাবেই শেরে খোদার সন্তান আধ্যাত্মিকভাবে শাহাদত বরণ করেন এবং ইহলোক কে বিদায় জানিয়ে পরলোকে পাড়ি দেন। (و سَيَعلَمُ الَّذينَ ظَلَموا اَيَّ مُنقَلَبٍ يَنقَلِبُونَ)

সূত্রঃ মাদীনে তা কারবালা, হামরাহে সাইয়াদুশ শোহাদা।
এস, এ, এ
http://www.tvshia.com/bn/content/15358