সূরা বনী ইসরাইল; আয়াত ১০৭-১১১

পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাইলের ১০৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
قُلْ آَمِنُوا بِهِ أَوْ لَا تُؤْمِنُوا إِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ مِنْ قَبْلِهِ إِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ يَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ سُجَّدًا (107)
“(হে রাসূল তোমার শত্রুদেরকে) বল : তোমরা এটা বিশ্বাস কর বা না কর (তাতে আল্লাহর কিছু এসে যায় না),এর পূর্বে যাদের জ্ঞান দেয়া হয়েছিল,তাদের কাছে যখনই (আল্লাহর বাণী) আবৃত্তি করা হয়,তখনই তারা বিনয়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে।” (১৭:১০৭)



আগের আয়াতে আমরা উল্লেখ করেছি: আল্লাহ পবিত্র কুরআনকে ধাপে ধাপে অবতীর্ণ করেছেন এবং দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর পর্যায়ক্রমে কুরআন নাজিল হয়। কাফেররা অভিযোগ করে বলতো: কেনো সম্পূর্ণ কুরআন একসাথে নাজিল হল না? তাই আমরা এর ওপর ঈমান আনব না।

এ আয়াতে আল্লাহ এ ধরনের অযৌক্তিক প্রশ্নকারী ব্যক্তিদের বলেন: আল্লাহ তোমাদের ঈমান আনার মুখাপেক্ষী নন, তোমরা ঈমান না আনলে আল্লাহর কোন ক্ষতি হবে না, তাই এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করে লাভ নেই। যারা জ্ঞানী এবং আগের আসমানি কিতাবগুলো সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা কুরআন পাঠ করে এর সত্যতা উপলব্ধি করেছেন। তারা কুরআনের বিশালত্বের সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। তাদের সিজদা এমন হয় যে, শুধু কপাল নয় বরং চোয়ালসহ সমস্ত মুখমণ্ডল মাটিতে মিশে যায়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. মানুষের ঈমান আনা বা কুফরি করার ওপর কুরআনের সত্যতা নির্ভর করে না। পৃথিবীর সব মানুষও যদি কাফের হয়ে যায় তারপরও কুরআনের সত্যতায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়ে না। সবাই কাফের হয়ে গেলে তার অর্থ হবে এই যে, সবাই চোখ বন্ধ করে রেখে এটা বলার চেষ্টা করছে যে, আকাশে সূর্য ওঠেনি।
দুই. সত্যিকার জ্ঞানী ব্যক্তি সত্যকে মেনে নেয়। যে জ্ঞান সত্য এবং সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে শেখায় তা প্রকৃত জ্ঞান নয়। 

সূরা বনী ইসরাইলের ১০৮ ও ১০৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَيَقُولُونَ سُبْحَانَ رَبِّنَا إِنْ كَانَ وَعْدُ رَبِّنَا لَمَفْعُولًا (108) وَيَخِرُّونَ لِلْأَذْقَانِ يَبْكُونَ وَيَزِيدُهُمْ خُشُوعًا (109)
“এবং তারা বলে,আমাদের প্রতিপালকই পবিত্রতম। আমাদের প্রভুর প্রতিশ্রুতি কার্যকরী হবেই।” (১৭:১০৮)
“তারা (নিজেদের অজান্তেই) অশ্রুসিক্ত নয়নে সিজদাবনত হয় এবং তা তাদের আন্তরিক বিনয়কে বৃদ্ধি করে।” (১৭:১০৯)

শেষ নবীর আগে আল্লাহ তাওরাত ও ইনজিল গ্রন্থে বিশ্বনবীর আগমনের অগ্রিম বার্তা দিয়েছিলেন। ফলে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা রাসূল (সা.) এর ওপর ঈমান আনেন তারা বলতেন : আল্লাহ তার প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। তাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। স্বাভাবিকভাবেই এসব ব্যক্তি আল্লাহর সামনে সিজদাবনত থাকে। তারা যতবেশি কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতেন ততবেশি তাদের মন নরম হত এবং তারা সিজদা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়তেন। কুরআন তাদের এ ধরনের খাঁটি ইবাদতের প্রশংসা করেছে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. কুরআন তেলাওয়াত ঈমানদার মানুষের মনকে এতটা নরম করে দেয় যে তারা তাঁর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে এবং মনের অজান্তে তাদের চোখে পানি এসে যায়। আল্লাহর মর্যাদা ও ক্ষমতা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানই তাদের চোখে পানি এনে দেয়।
দুই. কুরআন তেলাওয়াতের ফলে মানুষের মর্যাদা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়তে থাকে। আল্লাহর প্রতি শ্রদ্ধা মানুষকে পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।
তিন. ইবাদতরত অবস্থায়- বিশেষ করে সিজদায় গিয়ে কান্নাকাটি করার উচ্চ মর্যাদা রয়েছে।

সূরা বনী ইসরাইলের ১১০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেছেন: 
قُلِ ادْعُوا اللَّهَ أَوِ ادْعُوا الرَّحْمَنَ أَيًّا مَا تَدْعُوا فَلَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى وَلَا تَجْهَرْ بِصَلَاتِكَ وَلَا تُخَافِتْ بِهَا وَابْتَغِ بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا (110)
“(হে রাসূল!) বলুন, তোমরা সৃষ্টিকর্তাকে আল্লাহ বা রহমান যে নামেই ডাক না কেন সব সুন্দর নাম তো তাঁরই। নামাজে তোমাদের স্বর খুব উচ্চ বা অতিশয় ক্ষীণ কর না। বরং এ দুইয়ের মধ্য পথ অবলম্বন কর।” (১৭:১১০)

হাদিসে এসেছে, রাসূল্লাহ (সা.) পবিত্র কাবা শরীফে দোয়া পড়ার সময় বলতেন, ‘হে আল্লাহ’, ‘হে রহমান’। এ কথা শুনে কিছু লোক ভাবল, রাসূলুল্লাহ দুই সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাসী। এদের একজন হলেন আল্লাহ, আর দ্বিতীয়জন রহমান। আল্লাহ তাদের এ ভ্রান্ত ধারণার জবাবে এ আয়াতে বলেন: ওই দু’টি নাম এক আল্লাহর এবং এ ছাড়াও আল্লাহর আরো অনেক সুন্দর ও গুণবাচক নাম আছে। এসব নামের প্রতিটিতে তাঁর পরিপূর্ণ সত্ত্বার এক একটি দিক ফুটে উঠেছে। কাজেই এসব নামের যে কোনো একটি ধরে তাঁকে ডাকা যায়। 
এ ছাড়া, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজে উচ্চস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন মক্কার মুশরিকরা চিত্‌কার দিয়ে অন্য কোনো আরবি কবিতা আবৃত্তি করে বিশ্বনবীকে উপহাস করত। আবার যখন তিনি নিচুস্বরে কুরআন তেলাওয়াত করতেন তখন সাহাবীরা তা শুনতে পেতেন না। এজন্য আল্লাহ এ আয়াতের মাধ্যমে নামাজে মোলায়েম সুরে কুরআন তেলাওয়াতের নির্দেশ দিয়েছেন।
আসলে ইসলামে প্রতিটি ইবাদতের বিশেষ রীতি ও মান বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে নামাজের রয়েছে বিশেষ আদব-কায়দা; যা সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলতে হবে।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. সর্বোত্তম ও গুণাবলীসম্পন্ন নাম হল আল্লাহর নাম। আর এ সব নামের সঙ্গে আল্লাহর সত্ত্বার সঙ্গতি রয়েছে। অপরদিকে মানুষের এমন অনেক নাম আছে যার সঙ্গে ব্যক্তির আচার-আচরণের বিন্দুমাত্র মিল নেই।
দুই. ইসলাম মধ্যবর্তী পথ পছন্দ করে, এমনকি নামাজে সূরা পাঠ করার ক্ষেত্রেও মধ্যবর্তী পন্থা অবলম্বন করতে হবে।

সূরা বনী ইসরাইলের সর্বশেষ আয়াত অর্থাত্‌ ১১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ وَلِيٌّ مِنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا (111)
“(হে রাসূল! আপনি) বলুন, সব প্রশংসা আল্লাহরই,তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং সার্বভৌমত্বেও তাঁর কোন অংশীদার নেই। তিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না বলে তার অভিভাবকের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং সসম্ভ্রমে তার মাহাত্ম্য ও মহিমা ঘোষণা কর।” (১৭:১১১)

কিছু কিছু সূরা শুরু হয়েছে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তনের মাধ্যমে। এই সূরাটিও শুরু হয়েছে আল্লাহর গুণকীর্তনের মাধ্যমে এবং এটি শেষ হয়েছে একই সুরে অর্থাত্‌ তাঁর প্রশংসা দিয়ে। অবশ্য এ প্রশংসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আল্লাহর পবিত্রতা ও উচ্চ মর্যাদা। এ আয়াতে আল্লাহকে যে কোনো ধরনের শরীক, সহধর্মী এবং সন্তান গ্রহণ থেকে অনেক উর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি যে দুর্বল ও অসহায় নন- তাও বর্ণনা করা হয়েছে। খুব স্বাভাবিকভাবেই এমন শ্রেষ্ঠ ও মহান সৃষ্টিকর্তা প্রশংসা ও গুণকীর্তনের যোগ্য।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
এক. ‘আলহামদুলিল্লাহ’, ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ বলে জিকির করার জন্য আল্লাহ তার রাসূল ও মুমিন বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন।
দুই. আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন। এমনকি পিতা-মাতা, পুত্র-সন্তান কারো প্রয়োজন তাঁর নেই। তাই আল্লাহকে অন্যান্য মানুষের মত মনে না করে এসবের অনেক ঊর্ধ্বে ভাবতে হবে।

(সূরা- সূরা বনী ইসরাইল সমাপ্ত) 
সূত্রঃ রেডিও তেহরান