উক্তি সমূহ ৩২৬ – ৩৫০

৩২৬। আমি মোমেনের ইয়াসুব” আর সম্পদ দুষ্টদের ইয়াসুব’।’
১। ২৬২ নং বাণীতে ইয়াসুব’ শব্দের ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। তা ছাড়াও আবু লায়লা গিফারী, আবুজর, সালমান, ইবনে আব্বাস ও হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসুল (সঃ) বলেছেনঃ আমার মৃত্যুর পরপরই বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ দেখা দেবে। এ সময় তোমরা আলী ইবনে আবি তালিবকে অনুসরণ করো । কারণ শেষ বিচারের দিন সে হবে প্রথম ব্যক্তি যে আমাকে দেখবে এবং আমার সাথে। করমর্দন করবে। সে হলো সাদিক আল-আকবর (সত্যের মাহপূজারী), আমার উম্মতের মধ্যে সে সর্বশ্রেষ্ঠ ফারুক (সত্য-মিথ্যার প্রভেদকারী) এবং সে হলো মোমেনগণের ইয়াসুব” আর সম্পদ হলো মোনাফেকদের ইয়াসুব’ । (শাফী***, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৩৫৮; হিন্দি’, ১২শ খণ্ড, পৃঃ ২১৪, ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৩ হাদীদ’, ১৩শ খণ্ড, ২২৮ আসাকীরা, ৯ম খণ্ড, পৃঃ ৭৪-৭৮ শীর্ষকী***)

৩২৭ । কয়েকজন ইহুদি আমিরুল মোমেনিনকে বললো, “তোমাদের নবিকে কবরস্থ করতে না করতেই আমাদের কোন মতদ্বৈধতা নেই। মতদ্বৈধতা সৃষ্টি হয়েছে তাঁর পরে তাঁর উত্তরাধিকার ও স্থলাভিসিক্তের ব্যাপারে। অপরপক্ষে নীলানন্দ পার হয়ে পায়ের পানি না। শুকাতেই তোমরা তোমাদের নবিকে বলেছে, “এদের যেমন ঈশ্বর আছে আমাদের জন্য সেরূপ একটি ঈশ্বর তৈরি কর । তিনি বললেন নিশ্চয়ই তোমরা অজ্ঞ লোকের মতো আচরণ কর” (কুরআন-৭ ঃ ১৩৮)

৩২৮। এক ব্যক্তি আমিরুল মোমেনিনকে বললো, কিসের দ্বারা আপনি আপনার প্রতিপক্ষকে পরাভূত করেন। তিনি। বললো, যখনই আমি শক্রর মোকাবেলা করি তখন সে নিজেই তার বিরুদ্ধে আমাকে সহায়তা করে।
১ । এটা একটা সুন্দর আরবি বাচনভঙ্গী। শক্র নিজের বিরুদ্ধে সহায়তা করে- একথার মানে হচ্ছে। আমিরুল মোমেনিনের মোকাবেলা হলেই শত্রু তার সুনাম ও খ্যাতির কারণে মনোবল ও দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলে । ফলে সে সহজে পরাভূত হয়।

৩২৯ । আমিরুল মোমেনিন। তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়াকে বলেছিলেন, “হে আমার পুত্র, আমার ভয় হয়। পাছে দারিদ্র তোমাকে পাকড়াও করে। সুতরাং এ থেকে রক্ষা পাবার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করো। কারণ দারিদ্র হলো দ্বিনি ইমানের স্বল্পতা, বুদ্ধির বিহবলতা এবং তা একগুয়ে লোকের ঘূণার উদ্রেক করে।

৩৩০। এক ব্যক্তি আমিরুল মোমেনিনকে নানা ধরনের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, বুঝার জন্য আমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেস করো— সংশয় সৃষ্টির জন্য নয়। মনে রেখো, যে অজ্ঞ ব্যক্তি শিখতে চায় সে শিক্ষিত লোকের মতো। অপরপক্ষে যে শিক্ষিত ব্যক্তি সংশয় সৃষ্টি করতে চায় সে অজ্ঞের চেয়েও অধম ।

৩৩১। একবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস আমিরুল মোমেনিনের অভিমতের বিরুদ্ধে তাকে উপদেশ দিলে তিনি বললেন, “তুমি শুধু আমাকে উপদেশ দিতে পার আমি ভেবে দেখবো কী করা যায়। যদি আমি তোমার উপদেশ অনুযায়ী কাজ না করি তবে তোমার উচিত হবে আমাকে অনুসরণ করা” ।

৩৩২। সিফফিন থেকে কুফায় ফেরার পথে আমিরুল মোমেনিন যখন শিবাম গোত্রের এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন সিফফিনে নিহতদের জন্য নারীর ক্রুন্দন শুনতে পেলেন। এ সময় শিবাম গোত্রের নেতা হারব ইবনে সুরাহবিল আশ-শিবামী আমিরুল মোমেনিনের কাছে এলে তিনি বললেন, “তোমাদের নারীরা কি তোমাদের নিয়ন্ত্রণ করে? এভাবে চিৎকার করা থেকে তোমরা কি তাদের নিবৃত্ত কর না?” আমিরুল মোমেনিন ঘোড়ায় সওয়ার ছিলেন। হারব তাঁর সাথে হাঁটতেছিল। আমিরুল মোর্মেনন বললেন, “তুমি ফিরে যাও; কারণ তোমার মতো লোক আমার সঙ্গে হাঁটলে এটা শাসকের জন্য অমঙ্গল আর ইমানদারের জন্য অমর্যাদাকর” ।

৩৩৩। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর আমিরুল মোমেনিন খারিজিদের মৃতদেহের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তিনি বললেন “তোমাদের ওপর আল্লাহর লানত, তোমরা সে লোক দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে তোমাদের প্রতারণা করেছে”। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, “হে আমিরুল মোমেনিন, কে তাদের প্রতারণা করেছে?” তিনি বললেন, “শয়তান সেই প্রতারক। তাদের রিপু তাদেরকে কুপথে পরিচালনা করে কামনা-বাসনার মাধ্যমে এবং পাপে নিমজ্জিত হওয়াকে সহজ করে দেয়; তাদেরকে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু পরিণামে আগুনে নিক্ষেপ করে” ।

৩৩৪। একাকীত্বে আল্লাহর অবাধ্য হওয়া সম্পর্কে সাবধান থেকে; কারণ যিনি একাকীত্বের সাক্ষী তিনিই বিচারক ।

৩৩৫। যখন মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরের’ নিহত হওয়ার সংবাদ আমিরুল মোমেনিনের কাছে পৌছলো তখন তিনি বললেন, “তার মৃত্যুতে শত্রুরা যতটুকু আনন্দিত হয়েছে আমরা তার বহুগুণ বেশি শোকাহত হয়েছি। তাদের একজন শত্রু চলে গেল আর আমরা একজন বিশেষ বন্ধু হারালাম।”

১। ৩৮ হিঃ সনে মুয়াবিয়া বিশাল বাহিনীসহ অমর ইবনে আল-আসকে মিশরে প্রেরণ করেছিল। ইবনুল মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। যুদ্ধে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর নিহত হলেন। মুয়াবিয়া ইবনে হুদায়েজ তাঁর মৃতদেহ একটি মৃত গাধার পেটে ঢুকিয়ে জ্বলিয়ে দিয়েছিল। তখন মুহাম্মদের বয়স ছিল ২৮ বছর। বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মদের নিহত হবার খবর যখন তার মায়ের কাছে পৌছলো তখন তিনি ক্ষোভে-দুঃখে পাগল প্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। মুহাম্মদের বৈমাত্রেয় বোন আয়শা তার দুঃখে জীবিতকালে আর কখনো মাংশ খান নি। তিনি (আয়শা) মুয়াবিয়া ইবনে আবি সুফিয়ান, আমর ইবনুল আস ও মুয়াবিয়া ইবনে হুদায়েজকে প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর অভিশাপ দিতেন। মুহাম্মদের মৃত্যুতে আমিরুল মোমেনিন অত্যন্ত শোকাহত হয়েছিলেন। বসরায় অবস্থানকারী ইবনে আব্বাসকে অত্যন্ত শোকাতুর ভাষায় তিনি পত্র লিখেছিলেন। ইবেন আব্বাস আমিরুল মোমেনিনকে সান্তুনা দেয়ার জন্য কুফায় চলে এসেছিলেন। আমিরুল মোমেনিনের একজন গুপ্তচর সিরিয়া থেকে ফিরে এসে বললো, “হে আমিরুল মোমেনিন, মুয়াবিয়া যখন মুহাম্মদের মৃত্যু সংবাদ শুনতে পেয়েছে তখন সে মিনারে গিয়ে হত্যাকারীদের অনেক প্রশংসা করেছে এবং সিরিয়ার লোকেরা এত বেশি আনন্দ উল্লাসে ফেটে পড়েছে যা এর আগে কখনো দেখা যায় নি। একথা শুনে আমিরুল মোমেনিন উপরোক্ত মন্তব্য করেন। মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর সম্পর্কে আমিরুল মোমেনিনের বাণী ৬৭ নং খুৎবায় বর্ণনা করা হয়েছে (তাবারী *, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৪০০-৩৪১৪; আছীর, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৫২-৩৫৯; কাহীর’, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৩১৩-৩১৭; ফিন্দা”, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৭৯; হাদীদ”**, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৮২-১০০; খালদুন।**, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৮১-১৮২৭; বার”, ৩য় খণ্ড, পৃঃ১৩৬৬-১৩৬৭; হাজর***, পৃঃ ৪৭২-৪৭৩; ছাকাকী’, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৭৬-৩২২; বাকরী”, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৩৮-২৩৯)।

৩৩৬। ষাট বছর বয়স পর্যন্ত আল্লাহ মানুষের ওজর গ্রহণ করেন।

৩৩৭। পাপ যাকে পরাভূত করেছে সে বিজয়ী নয় এবং পাপের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করা প্রকৃতপক্ষে পরাভূত হওয়া।
৩৩৮। আল্লাহ দুঃখীজনের জীবিকা ধনীদের সম্পদের মাঝে রেখেছেন। ফলে, যখন কোন অভাবগ্রস্তলোক উপোস থাকে তখন বুঝতে হবে কোন ধনী ব্যক্তি তার সম্পদে অভাবগ্রস্ত লোকটির হিস্যা অস্বীকার করেছে। মহিমান্বিত আল্লাহ ধনী লোকদের এজন্য একদিন জিজ্ঞেস করবেন।
৩৩৯। দায়িত্ব পালনে সত্য-সঠিক ওজর দেখানো অপেক্ষা ওজর না দেখানোর অবস্থা অনেক ভালো।
৩৪০। তোমাদের প্রতি আল্লাহর ন্যূনতম অধিকার হলো তোমরা তার নেয়ামতকে পাপ কাজে ব্যবহার করবে না ।
৩৪১। কোন অসমর্থ ব্যক্তি যখন মহিমান্বিত আল্লাহর আনুগত্যের আমলসমূহ করতে না পারে তখন এটা পালন করা বুদ্ধিমানের একটা ভালো সুযোগ।
৩৪২। এ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রহরীগণই সার্বভৌম।
৩৪৩। সে ব্যক্তি ইমানদার যার মুখমণ্ডল আনন্দোৎফুল্ল, হৃদয় দুঃখ ভারাক্রান্ত, প্রশস্ত বক্ষ (উদারতা পূর্ণ) এবং বিনয়াবনত মন। সে উচ্চ মর্যাদাকে ঘূণা করে এবং সুনাম পছন্দ করে না। তার শোক স্থায়ী, তার সাহস সুদূর প্রসারী, তার নীরবতা অধিক, অধিক সময় সে ব্যস্ত (আল্লাহর কাজে)। সে কৃতজ্ঞ, সহিষ্ণু, চিন্তায় মগ্ন, বন্ধুত্বে সংযমী আচরণে মধুর ও মেজাজে কোমল। সেপাথরের চেয়ে শক্ত কিন্তু ক্রীতদাস অপেক্ষাও বিনয়ী।
৩৪৪। যদি কোন ব্যক্তি জীবনের শেষ এবং তার শেষভাগ্য দেখতে পায় তখন সে কামনা-বাসনা ও এর বঞ্চনাকে ঘূণা করতে শুরু করে।
৩৪৫। প্রত্যেক ব্যক্তির সম্পদে দুধরনের অংশীদার রয়েছে উত্তরাধিকারী ও আকস্মিক।
৩৪৬। কোন ব্যক্তিকে কোন বিষয়ে অনুরোধ করা হলে যে পর্যন্ত সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয় সে পর্যন্ত ওই বিষয়ে সে মুক্ত।
৩৪৭। যে ব্যক্তি প্রার্থনা করে। অথচ তাতে গভীর মনোনিবেশ করে না সে ওই ব্যক্তির মতো যে ছিলাবিহীন ধনুকে শার যোজনা করে।
৩৪৮। জ্ঞান দুরকমের— আত্মভূত জ্ঞান ও শ্রুত-জ্ঞান। শ্রুত জ্ঞান আত্মভূত না হলে কোন উপকারে আসে না।
৩৪৯। সিদ্ধান্তের সঠিকতা কর্তৃত্বের ওপর নির্ভরশীল। কর্তৃত্ব থাকলে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা থাকে। কর্তৃত্ব না থাকলে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় না।
৩৫০। দুস্থের শোভা হলো সততা আর ধনীর শোভা হলো কৃতজ্ঞতা।