উক্তি সমূহ ১০১ – ১২৫

১০১। অন্যের প্রয়োজন মিটানো তিনভাবে দীর্ঘস্থায়ী গুণঃ একে ক্ষুদ্ৰ মনে করতে হবে তাতে এটা বড়ত্ব অর্জন করবে; একে গোপন রাখতে হবে তাতে এটা আত্মপ্রকাশ করবে এবং একে তাড়াতাড়ি সম্পাদন করতে হবে তাতে এটা আনন্দদায়ক হবে।

১০২। সহসাই এমন এক সময় আসবে যখন এমন লোককে উচ্চ মর্যাদা দেয়া হবে যারা অন্যের বদনাম করে বেড়ায়, যখন দুষ্ট প্রকৃতির লোককে বুদ্ধিমান বলা হবে এবং ন্যায়পরায়ণকে দুর্বল মনে করা হবে। মানুষ দানকে ক্ষতি বা লোকসান বলে মনে করবে, জ্ঞাতিত্বের বিবেচনা দায়িত্ব বলে মনে করবে না এবং ইবাদতের স্থান সমূহ অন্যের ওপর মহত্ত্ব দাবির স্থান হবে। এ সময় নারীর পরামর্শে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা হবে। অল্প বয়স্ক বালককে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা হবে এবং নপুংসক লোক দ্বারা প্রশাসন চালানো হবে।

১০৩। একদিন আমিরুল মোমেনিনকে ছিন্ন ও তালি দেয়া পোষাক পরিহিত অবস্থায় দেখে কেউ
একজন এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেনঃ এতে অক্তর ভয়ে থাকে, মনে অহমবোধ আসে না এবং ইমান দারগণ সমকক্ষ হবার চেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই, ইহকাল ও পরকাল পরস্পর পরস্পরের শত্রু এবং ভিন্নমুখী দুটি পথ যে এ দুনিয়াকে পছন্দ করে ও ভালোবাসে সে পরীকালের তোয়াক্কা করে না । এ দুটি হলো পূর্ব পশ্চিমের মতো । এর একটির দিকে এগিয়ে গেলে অন্যটি থেকে দূরে সরে যেতে হয় । মোটের ওপর এ দুটি হলো দুসতীনের মতো ।

১০৪ । নাউফ আল-বিকালী থেকে বর্ণিত আছে যে, একরাতে আমিরুল মোমেনিন তার বিছানা ছেড়ে
বেরিয়ে এসেছিলেন এবং তারকাপুঞ্জের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেনঃ “হে নাউফ, তুমি কি জেগে আছো না ঘুমিয়ে আছো?” আমি বললাম, “হে আমিরুল মোমেনিন, আমি জেগে আছি ।” তারপর তিনি বললেন ? হে নাউফ, তাদের ওপর রহমত বর্ষিত হোক যারা এ দুনিয়া থেকে বিরত রয়েছে এবং পরকালের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে । তারা ওই লোক যারা এ মাটিকে তাদের মেঝে, এর ধূলিকণাকে তাদের রাত্রিকালীন পোষাক এবং এর পানিকে তাদের সুগন্ধি মনে করে । তারা নিম্ন স্বরে কুরআন তেলাওয়াত করে এবং মিনতি করে উচ্চস্বরে তারপর তারা ঈসার মতো এ পৃথিবী থেকে কেটে পড়ে হে নাউফ, এ রকম এক রাতে দাউদ একই সময়ে জেগেছিলেন এবং বললেন, “এ সময়টা এমন যখন যা প্রার্থনা করা হয় তাই কবুল করা হয় যদি না সে কর আদায়কারী, গোয়েন্দা ব্যক্তি, পুলিশ অফিসার, বাদ্যযন্ত্র (বীণা জাতীয় তারের বাদ্য) বাদক ও ঢাক্কাবাদক হয় ।”

১০৫। আল্লাহ তোমাদের ওপর কতিপয় দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যা অবহেলা করা উচিত নয়, কতিপয় সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন যা লঙ্ঘন করা উচিত নয়, কতিপয় জিনিস হারাম করেছেন যা ভঙ্গ করা উচিত নয়। আবার কতিপয় বিষয়ে নীরব রয়েছেন; তাতে তোমরা মনে করো না যে, তিনি ভুলে গিয়ে এগুলো সম্বন্ধে কিছু বলেন নি।

১০৬। জাগতিক কোন কর্মকান্ডকে যথাযথ করার জন্য যদি কেউ দ্বিন সম্পকীয় কিছু পরিত্যাগ করে তবে আল্লাহ তার ওপর এমন কিছু আপতিত করবেন যা অধিক ক্ষতিকর হবে।

১০৭। কখনো কখনো শিক্ষিত লোকের অজ্ঞতা তাকে ধ্বংস করে দেয়; তখন তার যে জ্ঞান আছে তা লোপ পায় ।

১০৮। মানুষের মধ্যে এক টুকরা মাংস একটি শিরার সঙ্গে সংযুক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং এটা এক অদ্ভুত জিনিস। এটাকে ‘কাল’ব’ বলে। এটাই জ্ঞান ও জ্ঞানের সাথে দ্বান্দিক জিনিসের ভান্ড। যদি এটা কোন আশার রশ্মি দেখে, উদ্বিগ্নতা এটাকে কলুষিত করে এবং যখন উদ্বিগ্নতা বেড়ে যায়। তখন লোভ এটাকে ধ্বংস করে। যদি হতাশা এটাকে ছেয়ে ফেলে তবে শোক এটাকে হত্যা করে। যদি এর ভেতর ক্ৰোধ জেগে ওঠে তাহলে একটা মারাত্মক ক্ষিপ্ততা জন্ম নেয়। যদি এতে আনন্দ বিরাজ করে তবে এটা সতর্ক হওয়ার বিষয় ভুলে যায়। যদি এটা ভয়ে ভীত হয় তবে অমনোযোগী হয়ে পড়ে। যদি চারদিকে শান্তি বিরাজ করে তবে এটা গাফেল হয়ে পড়ে। যদি কেউ সম্পদ অর্জন করে তবে বেপরোয়া মনোভাব এটাকে ভুল পথে নিয়ে যায়। যদি এতে বিপদ আপতিত হয় তবে অধৈর্য এটাকে হীন করে দেয়। যদি এটা উপোস করে তবে দুস্থাবস্থা এটাকে পরাভূত করে। যদি ক্ষুধা এটাকে আক্রমণ করে তবে দুর্বলতা এটাকে স্থবির করে দেয়। যদি এর খাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যায়। তবে শরীরের ওজন এটাকে ব্যাথা দেয়। এভাবে প্রতিটি কমতি এবং প্রতিটি বাড়তি এর জন্য ক্ষতিকর।

১০৯। আমরা (আহলুল বাইত) মাঝখানের বালিশের মতো। যে পিছনে পড়ে আছে তাকে এটা পেতে হলে এগিয়ে আসতে হবে এবং যে অতিক্রম করে গেছে তাকে এর কাছে ফিরে আসতে হবে।

১১০। মহিমান্বিত আল্লাহর বিধান সে ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না যে ন্যায়ের ব্যাপারে কোমলতা প্রদর্শন করে, যে অন্যায়কারীর মতো আচরণ করে না এবং যে লোভের বস্তুর দিকে দৌড়ে যায় না।

১১১। সহল ইবনে হুনায়েফ আল-আনসারী সিফফিনের যুদ্ধ থে” -এর এসে কুফায় মৃত্যুবরণ করেন। আমিরুল মোমেনিন তাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাঁর মৃত্যুতে তিনি বললেনঃ যদি একটা পর্বতও আমাকে ভালোবাসত। তবে তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ধুলিসাৎ হয়ে যেত (এ কথার অর্থ হলো তাকে ভালোবাসলে অসহ্য দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা-যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়)। কিন্তু তাতেও সহল অটল ছিল। (এর পরবর্তী বাণীটিও অনুরূপ)

১১২। আহলুল বাইতকে যারা ভালোবাসে তাদেরকে অনেক দুঃখ-দুর্দশা-লাঞ্চনা-বঞ্চনা-উৎপীড়ন-যন্ত্রনা পোহাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

১১৩। প্রজ্ঞার চেয়ে লাভজনক সম্পদ আর নেই। আত্মশ্লাঘা অপেক্ষা বড় বিচ্ছিন্নকারী ও একাকীত্বে নিক্ষেপকারী আর কিছু নেই। কৌশলের মতো উত্তম প্রজ্ঞা আর নেই। খোদাভীতির মতো সম্মান আর নেই। নৈতিক চরিত্রের মতো উত্তম সাথি। আর নেই। ভদ্রতার মতো উত্তরাধিকারিত্ব আর কিছু নেই। তৎপরতার মতো দেশনা আর কিছু নেই। সৎ কর্মের মতো ব্যবসায় আর কিছু নেই। ঐশী পুরস্কারের মতো লাভজনক আর কিছু নেই। সংশয়ে মিথস্ক্রিয়ার মতো আত্মনিয়ন্ত্রণ আর কিছু নেই। নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকার মতো সংযম আর কিছু নেই। চিন্তা বা গবেষণার মতো জ্ঞান আর কিছু নেই। দায়িত্ব পালনের মতো ইবাদত আর কিছু নেই। বিনম্রতা ও ধৈর্যের মতো ইমান আর কিছুই নেই। নিরহংকার হওয়ার মতো সাফল্য আর কিছু নেই। জ্ঞানের মতো সম্মান আর কিছু নেই। ক্ষমার মতো শক্তি আর কিছু নেই। আলাপ-আলোচনার মতো বিশ্বস্ত স্তম্ভ আর কিছু নেই।

১১৪। এমন সময় আসবে যখন নৈতিক উৎকর্ষ পৃথিবীতে ও মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। তখন যদি কেউ অন্য কারো সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে যাকে মন্দ স্পর্শ করে নি। তবে সে অন্যায়কারী হবে। এমন সময় আসবে যখন পাপ পৃথিবীতে ও মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করবে। তখন যদি কেউ অন্য কারো সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করে তবে সে নিজকে বিপদ সঙ্কুল অবস্থায় নিক্ষেপ করবে।

১১৫। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করেছিলো, “হে আমিরুল মোমেনিন, আপনি কেমন আছেন।” প্রত্যুত্তরে তিনি বললেনঃ যে প্রতিটি নিঃশ্বাসে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার সুস্বাস্থ্য যে কোন মুহুর্তে রোগাক্রাক্ত হয়ে পড়তে পারে এবং যেকোন নিরাপদ স্থানেই থাকুক না কেন মৃত্যু দ্বারা যে আক্রাক্ত হতে পারে সে আর কেমন থাকতে পারে?

১১৬। অনেককে আল্লাহ উত্তম ব্যবহার দ্বারা সময় দিয়ে থাকেন এবং অনেককে বঞ্চিত করেন, কারণ তাদের পাপপূর্ণ কর্মকান্ড আল্লাহ ঢেকে রাখেন এবং অনেকে নিজের সম্পর্কে ভালো কথায় মুগ্ধ হয়। আল্লাহ কারো বিচার ওই ব্যক্তির মতো কঠোরভাবে করেন না যাকে তিনি সময় দিয়েছিলেন।

১১৭। দুশ্রেণির লোক আমাকে নিয়ে ধ্বংসের সম্মুখীন হবে- এক শ্রেণি হলো, যারা আমাকে অতিরঞ্জনের সাথে ভালোবাসে এবং অপর শ্রেণি হলো, যারা আমাকে চরমভাবে ঘূণা করে।

১১৮। সুযোগ হারালে দুঃখ পেতে হয়।

১১৯। দুনিয়ার উদাহরণ হলো সর্প। এটা স্পর্শ করতে কোমল কিন্তু এর ভেতর বিষে ভরপুর। যে অজ্ঞ এর প্রতারণায় পড়ে সে এর প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান লোক এর থেকে নিজের প্ররক্ষা বিধান করে ।

১২০। কুরাইশদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে আমিরুল মোমেনিন বললেনঃ বনি মাখজুম হলো কুরাইশদের বক্ষ। তাদের পুরুষদের সঙ্গে কথা বলা এবং নারীকে বিয়ে করা আনন্দদায়ক। বনি আবদ শামসের লোকেরা গুপ্ত বিষয়ে দূরদর্শী ও সতর্ক। আমরা বনি হাশিমগণ যা পাই তা ব্যয় করি এবং আমরা আমাদেরকে উদারভাবে মৃত্যুর কোলে সঁপে দেই। ফলে তারা সংখ্যায় অনেক, তারা ফন্দি-ফিকিরকারী ও কুৎসিত। অপরপক্ষে আমরা অত্যধিক সুভাষী, শুভাকাঙ্খী ও সুন্দর।

১২১। দুটি আমলের মধ্যে কতই না পার্থক্য— একটি আমল হলো, যার আনন্দ গত হয়ে গেছে কিন্তু কুফল এখনো বিরাজমান; অপরটি হলো, যার দুঃখ-দুর্দশা গত হয়ে গেছে কিন্তু পুরস্কার বহমান।

১২২। একজন মৃত লোকের লাশ দাফন করতে গিয়ে কাউকে হাসতে দেখে আমিরুল মোমেনিন বললেনঃ ব্যাপারটি কি এমন যে, মৃত্যু শুধুমাত্র অন্যের জন্য নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে? বিষয়টি কি এমন যে, ন্যায়। শুধুমাত্র অন্যের জন্য বাধ্যতামূলক? এটা কি এমন যে, যাদের আমরা মৃত্যু-ভ্রমণে প্রস্থান করতে দেখি তারা কখনো আমাদের মাঝে আবার ফিরে আসবে? আমি বা তাদেরকে কবরে শায়িত করে তাদের পরিত্যক্ত সম্পাক্তি উপভোগ করি। আমরা সকল উপদেশদানকারীকে (মৃত ব্যক্তিগণ) অবজ্ঞা করছি এবং নিজেদরকে মারাত্বক ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছি।

১২৩। যে নিজকে বিনম্র করে সে আশির্বাদ পুষ্ট। তার জীবিকা পবিত্র, হৃদয় পবিত্র ও আভ্যাসাবলী ধার্মিকতাপূর্ণ। সে তার সঞ্চয়কে আল্লাহর নামে খরচ করে। সে খারাপ কথা বলা থেকে তার জিবহাকে বিরত রাখে। সে মানুষকে পাপ থেকে নিরাপদে রাখে। সে রাসুলের (সঃ) সুন্নাহতে সন্তুষ্ট এবং দ্বিনের কোন বেদা’তের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।

১২৪। নারীর মাৎসর্য হলো উৎপথগামিতা আর পুরুষের মাৎসর্য বিশ্বাসের অঙ্গ।

১২৫। আমি ইসলামকে এমনভাবে সজ্ঞায়িত করছি যা পূর্বে আর কেউ করে নি; ইসলাম হলো সমর্পণ, সমর্পণ হলো প্রত্যয়-উৎপাদন, প্রত্যয় হলো সত্যতা সমর্থন, সত্যতা সমর্থন হলো স্বীকৃতি প্রদান, স্বীকৃতি প্রদান হলে! দায়িত্বপালন এবং দায়িত্বপালন হলো আমল।

Leave a Reply