রাজআত (পুনরাবর্তন) সম্পর্কে বার ইমামীয়া শীয়াদের বিশ্বাস —

রাজআত (পুনরাবর্তন) সম্পর্কে বার ইমামীয়া শীয়াদের বিশ্বাস —

এ ক্ষেত্রে বার ইমামীয়া শীয়ারা ঠিক তাই বিশ্বাস করে যা রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) তথা পবিত্র বার ইমাম (আঃ) গন থেকে বর্ণিত হয়েছে ।

উক্ত বর্ণনা মতে মহান আল্লাহ একদল মৃত ব্যক্তিকে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবেন পূর্বে ঠিক যে অবস্থায় তারা ছিল সে অবস্থায় । তখন মহান আল্লাহ একদলকে সম্মাানিত করবেন এবং অপর দলকে লজ্জিত করবেন ।
তিনি সৎ কর্ম সম্পাদনকারীকে অসৎ কর্ম সম্পাদনকারীদের থেকে পৃথক করে দিবেন ,পৃথক করবেন অত্যাচারিত থেকে অত্যাচারীকে ।
আর এই সকল ঘটনা সর্বশেষ বারতম ইমাম মাহদী (আঃ) এর আবির্ভাবের পর ঘটবে ।

কাজেই পুনরাবর্তন ঘটবে না যদি না সে ঈমানের চুড়ান্ত শিখরে পৌঁছে কিংবা অনাচারের নিকৃষ্টতম স্তরে তলিয়ে যায় ।
এরপর তারা পুনরায় মৃত্যুবরণ করবে । অতঃপর তাদেরকে বিচার দিবসে পুনরায় জীবিত করা হবে এবং যার যার প্রাপ্তি অনুসারে পুরস্কার বা শাস্তি দেয়া হবে ।
এ কারণে পবিত্র কোরআনে যারা পৃথিবীতে দু ’ বার প্রত্যাবর্তন করেছিল তৃতীয়বার আসার জন্য তাদের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে মহান আল্লাহ বলেন –

“ — তারা বলবে , হে আমাদের প্রভু ! আপনি আমাদেরকে দু ’ বার মৃত্যু দিয়েছেন এবং দু ’ বার জীবন দিয়েছেন । আমরা আমাদের দোষ স্বীকার করছি । সুতরাং এখান থেকে বের হওয়ার কোন উপায় আছে কি — ?”
সুরা – মুমিন / ১১ ।

হ্যাঁ ,পবিত্র কোরআনে এ পৃথিবীতেই রাজআত বা পুনরাবর্তনের সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে বক্তব্য এসেছে ।
এছাড়া পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) গন থেকেও এ সম্পর্কে একাধিক বর্ণনা এসেছে ।
বার ইমামীয়া শীয়াদের সকলেই এ ব্যাপারে একমত। তবে শীয়াদের ক্ষুদ্রাংশের মতে রাজআতের অর্থ হল অপেক্ষমান ইমাম (আঃ) এর ফিরে আসার মাধ্যমে আহলে বাইত (আঃ) এর নিকট রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং আদেশ নিষেধের অধিকার ফিরে আসা । লোকদের প্রত্যাবর্তন বা মৃত্যুর পর পূর্নজীবন লাভ নয় ।

পাঠক ,
রাজআতের ব্যাপারটি আহলে সুন্নত কর্তৃক অস্বীকৃত হয়ে আসছে । তাদের মতে এটা হল ধর্ম বিরোধী বিশ্বাস ।
তাদের হাদীস সংকলনকারীরা রাজআত সম্পর্কে বর্ণনাকারী রাবীদের (হাদীস বর্ণনাকারী) উপর দূর্নাম দিয়েছেন যাতে করে তাদের বর্ণনাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা যায় । এমনকি তারা রাজআতে বিশ্বাসকারীদেরকে কাফের ও মোনাফেক অথবা তদপেক্ষা কুৎসিত কোন অ্যাখ্যা দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি ।
সুন্নি কর্তৃক শীয়ারা ধিকৃত ও নিন্দিত হওয়ার একটি বড় কারণ হল রাজআতের এ বিশ্বাস ।

নিঃসন্দেহে এ ধরনের ব্যাখ্যা হল সেই অস্ত্র যা পূর্বে বিভিন্ন ইসলামী দলগুলো পরস্পরকে অপবাদ দিতে ব্যবহার করত এবং যা নিয়ে বিবাদ করত ।
প্রকৃতপক্ষে পরস্পরকে দোষারোপ করার কোন কারণই আমরা দেখি না। কারণ , রাজআতের প্রতি বিশ্বাস না তাওহীদের বিশ্বাসকে খর্ব করে , আর না নবুওয়াতের বিশ্বাসকে । বরং এগুলোর সত্যতার উপর গুরুত্বারোপ করে ।
কেননা রাজআত হল পুনরুত্থান দিবসের মতই মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ । এটি হল মহানবী (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) গনের অনুসৃত মোজেযা বা অলৌকিক ঘটনা কিংবা ঈসা (আঃ) কর্তৃক মৃতকে জীবিতকরণের মোজেযার মত বরং তার চেয়েও বড় । কারণ , পচে গলে যাওয়া লাশকে জীবিত করা হয় ।
পবিত্র কোরআনের ভাষায়-

“ — বলে যে , কে নষ্ট হয়ে যাওয়া হাড়গুলোতে প্রাণ সঞ্চার করবে ? বলুন ,তিনিই যিনি তাকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন এবং তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত –। ”
সুরা – ইয়াসীন / ৭৯ ।

তবে যারা রাজআতকে অসার পুর্নজন্মবাদ (তানাসুখ) মনে করে অভিযোগ তুলছে তারা প্রকৃত পক্ষে এ তানাসুখ এবং শারীরিক পুনরুত্থানের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে নি ।
আর রাজআত হল শারীরিক পুনরুত্থানের অনুপ্রকরণ ।
অপরদিকে তানাসুখ হল পূর্বের দেহ ব্যতিরেকে অন্য কোন দেহে প্রত্যাবর্তন । অথচ শারীরিক পুনরুত্থানের অর্থ স্বতন্ত্র । কারণ , এর মানে হল পূর্বতন দেহে আত্মার প্রত্যাবর্তন । আর এরূপই হল রাজআত বা পূনর্জীবন লাভ । যদি রাজাআত তানাসুখ হয় ,তবে ঈসা (আঃ) কর্তৃক মৃতকে জীবন দানও তানাসুখ হবে । তদ্রূপ , যদি রাজাআত তানাসুখ হয় ,তবে দৈহিক পুনরুত্থানও তানাসুখ হবে ।

এখন রাজআতের উপর দুটি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন ।

প্রথমত – এটা ঘটা অসম্ভব এবং

দ্বিতীয়ত – রাজআত সম্পর্কে বর্ণিত হাদীসগুলো সঠিক নয় ।

বর্ণিত সমস্যা দু ’ টিকে সঠিক ধরে নিলেও রাজআতের প্রতি বিশ্বাস এতটা ঘৃণ্য নয় যা শীয়াদের শত্রুরা করে থাকে ।
মুসলমানদের অন্যান্য দলগুলোর এমন কত বিশ্বাস আছে যা অসম্ভব কিংবা যা সঠিক উৎস দ্বারা প্রমাণিত হয়নি । অথচ এর কারণে কাফের বা ইসলাম থেকে বের করে দেয়া আবশ্যক হয়নি । আর এগুলোর উদাহরণও কম নয় । যেমন , নবী কর্তৃক ভুল-ত্রুটি ও পাপ হওয়া , কোরআন অনাদি হওয়া ,কিংবা এ বিশ্বাস করা যে আল্লাহ যখন বললেন যে তিনি শাস্তি দিবেন ,তখন তিনি তা করতে বাধ্য (ওয়াযিব) । অথবা মহানবী (সাঃ) তার উত্তরসূরী নির্বাচন করেন নি ইত্যাদি ।

যাহোক , প্রাগুক্ত সমস্যাদ্বয়ের সত্যতার কোন ভিত্তি নেই ।
‘ রাজআত অসম্ভব ’ এর জবাবে আমরা বলব – ইতিপূর্বে আমরা বলেছিলাম যে , রাজআত হল দৈহিক পনুরুত্থানের প্রকরণ । পার্থক্য শুধু এটুকু যে তা ইহকালেই হবে । সুতরাং সেই কিয়ামতের সম্ভাবনার দলিলই রাজআতকে প্রমাণিত করে । এখানে আশ্চার্যন্বিত হওয়ার কোন কারণ নেই । কেবলমাত্র ব্যতিক্রম এটুকু যে ,পার্থিব জীবনে আমরা এতে অভ্যস্ত নই । আমরা এর সংঘটিত হওয়ার কোন কারণ বা অন্তরায় সম্পর্কে জানিনা যে তা আমাদের একে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করার কাছাকাছি পৌঁছে দিবে ।
অপরদিকে মানুষের প্রকৃতি এরকম যে , সে যাতে অভ্যস্ত নয় বা যার সাথে পরিচিত নয় তা গ্রহণ করা তার পক্ষে অসম্ভব । এটা সে রকম যে একদল কিয়ামত সম্পর্কে আশ্চার্যন্বিত হয়ে বলেছিল-

“ — কে এ নষ্ট হাড়গুলোকে জীবন দিবে — ? ”
সুরা – ইয়াসিন / ৭৮ ।

জবাবে বলা হয়েছিল –

“ — যিনি প্রথমবার একে সৃষ্টি করেছিলেন তিনিই একে জীবন দিবেন এবং তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত — । ”
সুরা – ইয়াসিন / ৭৯ ।

এমন এক পরিস্থিতিতে যেখানে রাজআতকে বিশ্বাস করার বা অগ্রাহ্য করার কোন বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল না থাকে কিংবা শুধু খেয়ালের বশবর্তী হয়ে আমরা বলে থাকি এর কোন দলিল নেই , সেখানে আমাদেরকে ওহীর উৎস থেকে প্রাপ্ত দলিলসমূহের শরণাপন্ন হতে হবে ।

পবিত্র কোরআনে কোন কোন মৃত ব্যক্তির ক্ষেত্রে পৃথিবীতে রাজাআত সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ মেলে ।
যেমন- হযরত ঈসা (আঃ) কর্তৃক মৃতকে জীবিত কারণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে এসেছে –

“ — আমি আল্লাহর অনুমতিক্রমে অন্ধকে আলো দেই , কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করি আর মৃতকে জীবিত করি — । ”
সুরা – আল ইমরান / ৪৯ ।

অনুরূপ , মহান আল্লাহর বাণী –

“ — কিরূপে আল্লাহ একে জীবন দিবেন মৃত্যুর পর ? সুতরাং আল্লাহ তাকে একশত বছরের জন্য মৃত্যু দিলেন । অতঃপর তাকে জীবিত করলেন — । ”
সুরা – বাকারা / ২৫৯ ।

এছাড়া ইতিপূর্বে আমরা উল্লেখ করেছিলাম –

“ — হে প্রভু ! আমাদেরকে দু ’ বার মৃত্যু দিয়েছেন — । ”
সুরা – মুমিন / ১১ ।

অতএব মৃত্যুর পর পৃথিবীতে ফিরে আসা ব্যতীত এ আয়াতের কোন অর্থ করা যায় না । যদিও কোন কোন তাফসীরকারক এর অন্য ব্যাখ্যা দিতে চেয়েছেন যা কোন বিশ্বস্ত রাবী থেকে বর্ণিত হয়নি এবং আয়াতের সাথে এর সামঞ্জস্য রক্ষা করে না ।

যাহোক , দ্বিতীয় সমস্যা যেখানে বলা হয়েছে যে , এর স্বপক্ষে বর্ণিত হাদীসগুলো সঠিক নয় সে সম্পর্কে আমরা বলতে পারি যে , এ কথাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন । কারণ , রাজআত আহলে বাইত (আঃ) থেকে বর্ণিত বহুলালোচিত মোতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বিষয় যার উপর বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন ।

তদুপরি এটা আশ্চর্যের বিষয় যে , আহাম্মদ আমীনের মত একজন প্রখ্যাত লেখক যিনি বিজ্ঞ বলে দাবী করে থাকেন তিনি ফাজরুল ইসলাম নামক পুস্তকে লিখেছেন –

“ রাজআতের কথায় শীয়াদের অবয়বে ইহুদীবাদের প্রকাশ ঘটে । ”

আমরা তাকে বলব , তাহলে পবিত্র কোরআনেও ইহুদীবাদ রাজাআতের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে ।
কারণ পূর্বে যে সকল আয়াত উল্লেখ করেছি তাতে রাজআতের কথাই বর্ণিত হয়েছে ।

আমরা তাকে আরও বলব যে , প্রকৃতপক্ষে ইসলামের অনেক বিশ্বাস ও আহকামে ইহুদীবাদ ও খ্রীষ্টবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে ।
কারণ ,মহানবী (সাঃ) ঐশী বিধানের যে দৃষ্টান্ত এনেছিলেন এখন তার অনেক বিধানকেই পরিত্যাগ করা হয়েছে বা অকার্যকর করা হয়েছে । সুতরাং ইসলামের বিশ্বাসে ইহুদীবাদ ও খ্রীষ্টবাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে । তবে তা ইসলামের কোন ঘাটতি বা দোষ নয় । যদি ধরেও নেয়া হয় যে , রাজআত হল ইহুদীবাদের বক্তব্য যা উক্ত লেখক দাবী করেছেন ।

যাহোক , রাজআত দ্বীনের এমন কোন মৌলিক বিষয় নয় যার উপর বিশ্বাস ও বিবেচনা আবশ্যক ,যদিও আমরা এতে বিশ্বাস করি সঙ্গত কারণেই ।
কারণ ,তা আহলে বাইত (আঃ) গনের বর্ণনা থেকে সঠিকভাবে এসেছে ।
যাদেরকে আমরা মিথ্যাচার থেকে পবিত্র মনে করি ।
আর তা অদৃশ্যালোকের বিষয় যার সম্পর্কে সংবাদ দেয়া হয়েছে এবং তা সংঘটিত হতে কোন বাধা নেই ।

SKL