খলীফা নির্বাচনে ২য় খলীফা ওমরের শুরা কমিটি ও সেদিন যা ঘটেছিল !

5 days ago Shakeel Ahmed 0

” খলীফা নির্বাচনে ২য় খলীফা ওমরের শুরা কমিটি ও সেদিন যা ঘটেছিল ! ”

এবং কিছু প্রশ্ন ও পর্যালোচনা ——-

আবু লুলাহ কর্তৃক মারাত্মক আহত হবার পর খলীফা ওমর বুঝতে পারলেন যে , তিনি আর বাঁচবেন না ।
তখন তিনি খেলাফত বিষয়ক একটি পরামর্শ কমিটি গঠন করলেন ।

তবে তিনি বারবার জনগণকে এই বলে হুশিয়ার করেছিলেন যে , আবু বকরকে একজনের একক সিদ্ধান্তে খলীফা করা হয়েছিল যা সঠিক পদ্ধতি ছিল না । আল্লাহ আমাদের সেই ভুল থেকে বাঁচিয়েছেন ! এরকম যেন দ্বিতীয়বার করা না হয় । যদি কেউ করে তবে দু’জনকেই যেন হত্যা করা হবে ।

পাঠক ,
কি সাংঘাতিক স্বীকরোক্তি ,
অর্থাৎ খলীফা ওমরের এই বক্তব্য অনুসারেই প্রথম খলীফা নির্বাচন পদ্ধতি সঠিক তো ছিলই না বরঞ্চ সম্পূর্ন অবৈধ ছিল ।

তাহলে অবৈধভাবে নির্বাচিত প্রথম খলীফা কতৃক নির্বাচিত দ্বিতীয় খলীফার নির্বাচনও তো অবৈধ হয়ে যায় ।

যাহোক , মূল প্রসঙ্গে আসছি –
২য় খলীফা ওমরের আহত হওয়ার কথা শুনে মা আয়েশা ওমরকে বানী পাঠালেন ,

” ইসলামী উম্মাহকে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে যাবেন না । একজন খলীফা মনোনয়ন করুণ । অন্যথায় আমি অমঙ্গল ও সমস্যার আশংকা করছি ।”

পর্যালোচনা হল যে ,
মুসলিম উম্মাহকে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে গেলে যেখানে মা আয়েশা অমঙ্গল ও সমস্যার আশংকা করেন সেখানে রাসুল (সাঃ) তাঁর নিজের হাতে তিল তিল করে গড়া মুসলিম উম্মাহকে কিভাবে নেতাবিহীন অবস্থায় রেখে যান ?
মা আয়েশা তাহলে কি রাসুল (সাঃ) এরচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন ?

যাইহোক ,
কমিটিতে ২য় খলীফা ওমর – আলী ইবনে আবু তালিব (আঃ) , উসমান ইবনে আফফান , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ , জুবায়ের ইবনে আওয়ান , সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহকে সদস্য মনোনীতি করলেন ।
তিনি পরামর্শক কমিটিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করালেন যেন তার মৃত্যুর তিনদিন পর তাদের মধ্য হতে একজনকে খলীফা হিসাবে নিয়োগ করেণ এবং এ তিনদিন সুহাইব খলীফার কাজ চালিয়ে যাবে ।
বিস্ময়কর বিষয় যে , আলী (আঃ) এর যোগ্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্বেও ওমর পরামর্শক কমিটি গঠন করেছিলেন ।
তার উদ্দেশ্য ছিল খুবই পরিস্কার যে , খেলাফত যেন তার ইচ্ছার অনুকুলে যেতে পারে । অর্থাৎ আলী (আঃ) কে বঞ্চিত করা ও সেভাবেই তিনি পরামর্শ কমিটি মনোনয়ন ও কার্যপ্রনালী নির্ধারণ করেছেন ।

একজন সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরও একথা বুঝতে অসুবিধা হবে না যে , কমিটি গঠন ও কার্যপ্রনালী নির্ধারণের মধ্যেই উসমানের জয়ের সকল উপাদান নিহিত ছিল । কমিটির সদস্যগণের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ উসমানের ভগ্নিপতি , সাদ ইবনে ওয়াক্কাস আব্দুর রহমানের আত্মীয় ও জ্ঞাতি এবং সে সর্বদা আলী (অাঃ) এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করত । তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ ওসমানের প্রতি অনুরক্ত ছিল এবং সেও আলী (আঃ) এর প্রতি বিদ্বেষ পোষন করত কারণ সে তায়েমী গোত্রের ।

আবু বকরের খেলাফত দখলের ফলে তায়েমী ও হাশেমীয় গোত্রের মধ্যে সম্পর্ক ভাল ছিল না ।
এমতাবস্থায় , জুবায়ের আলী (আঃ) এর পক্ষে ভোট দিলেও উসমানের জয়ের জন্য তার একটি ভোট কোন বাধা হয়ে দাড়ায় না ।
কেউ কেউ লিখেছেন, পরামর্শক কমিটির বৈঠকের দিন তালহা মদিনায় উপস্থিত ছিলেন না ।
তার অনুপস্থিতে তাকে যদি আলী (আঃ) এর পক্ষেও ধরা হয় তবুও উসমানের জয় অনিবার্য !
কারণ ওমর তার বিচক্ষণতা দিয়ে কমিটির যে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করে দিয়েছে তাতে উসমানের জয় সুনিশ্চিত ।

পাঠক ,
এবারে নিজেই দেখে নিন –

বিশ্বসেরা অদ্ভুত সেই কার্যপ্রণালীটি নিম্নরুপ —

যদি দুজন সদস্য একজন প্রার্থীর পক্ষে যায় এবং অপর দুজন সদস্য অন্য এক প্রাথীর পক্ষে যায় তবে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর মধ্যস্থতা করবে ।
আব্দুল্লাহ যে পক্ষকে নির্দেশ দিবে সে পক্ষ থেকে খলীফা নিয়োগ করা হবে ।
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের রায় যদি তারা মেনে না নেয় তাহলে আব্দুর রহমান ইবনে আউফ যার পক্ষে থাকবে আব্দুল্লাহ সে পক্ষকে সমর্থন করবে এবং অপরপক্ষ এ রায় অমান্য করলে তাদের মাথা কেটে হত্যা করতে হবে ।
সূত্র – তারাবি ১ম খন্ড, পৃঃ ২৭৭৯-২৭৭৮০, অছীর ৩য় খন্ড, পৃঃ৬৭ ।

এখানে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের রায়ে অসম্মতির কোন অর্থ হয় না কারণ অসম্মতি জানালেও আব্দুর রহমান ইবনে আউফ যে পক্ষে থাকবে সে পক্ষকে সমর্থন করার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ।
আর সে পক্ষ থেকেই খলীফা নিয়োগ করা হবে । তাই আব্দুর রহমানের আদেশের অপেক্ষায় পঞ্চাশটি রক্ত পিপাসু লোক তরবারি নিয়ে প্রস্তুত ছিল বিরোধী পক্ষকে হত্যা করার জন্য ।

অবস্থাদৃষ্টে আলী (আঃ) তার আগেই চাচা আব্বাসকে বলেছিলেন , উসমান খলীফা হতে যাচ্ছে কারণ ওমর সে পথ পরিস্কার করে দিয়ে গেছে ।

যাইহোক,
ওমরের মৃত্যুর পর আয়েশার ঘরে নির্বাচনী সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ।
সভা চলাকালে আবু তালহা আল আনসারীর নেতৃত্বে পঞ্চাশজন লোক উন্মুক্ত তরবারী নিয়ে দাড়িয়ে ছিল ।
তালহা সভার কার্য শুরু করলেন ও উপস্থিত সকলকে সাক্ষী রেখে উসমানের পক্ষে ভোট প্রদান করলেন ।
এতে জুবায়েরের আত্ম সম্মানে আঘাত লাগে কারণ তার মা ছিল আব্দুল মুত্তালিবের কন্যা ও আলীর ফুফু । তাই তিনি আলী (আঃ) এর পক্ষে ভোট প্রদান করলেন ।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস তার ভোট আব্দুর রহমানের পক্ষে প্রদান করল । এতে তিনজনই প্রত্যেকে এক ভোট করে পেয়ে সমান হল ।
সুচতুর আব্দুর রহমান একটি ফাঁদ পেতে বলল , আলী ও উসমান তাদের দুজন থেকে একজনকে খলীফা মনোনীতি করার ভাড় যদি আমার উপর অর্পণ করে তাহলে আমি আমার প্রার্থীতা প্রত্যাহার করব অথবা তাদের দু’জনের যে কোন একজন প্রাথীতা প্রত্যাহার করে খলীফা মনোনয়ন অর্জন করতে পারে ।

আব্দুর রহমানের এ ফাদ আলী (আঃ) কে সবদিক দিয়ে জড়িয়ে ধরল ।
কারণ এ প্রস্তাবে হয় তাকে নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে খলীফা মনোনয়ন করতে হবে , না হলে আব্দুর রহমান ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়ে যা করবে তাই মেনে নিতে হবে ।
কিন্ত নিজের অধিকার ছেড়ে দিয়ে উসমান অথবা আব্দুর রহমানকে খলীফা মনোনীত করা আলী (আঃ) এর পক্ষে সম্ভব ছিল না ।
প্রথম হতে বঞ্চিত হয়েও তিনি কখনও তার অধিকার ছেড়ে দেননি ।কাজেই তিনি এবারও নিজের অধিকার আকড়ে ধরলেন ।

সুতরাং আব্দুর রহমান নিজ মনোনয়ন প্রত্যাহার করে খলীফা নিয়োগের দায়িত্ব অর্জন করল এবং আলীকে বললেন , “ আপনি যদি কোরআন , সুন্নাহ ও পুর্ববর্তী দুই খলীফার রীতি নীতি ও কর্মকান্ড মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন তাহলে আমি আপনার বায়াত নেব । ”

প্রত্যুত্তরে আলী (আঃ) বললেন , আমি কোরআন ও রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাহর আলোকে আমার বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করব ।
তিনি তিনবার জিজ্ঞাসিত হলেন ও তিনবারই একই উত্তর দিলেন ।

এরপর আব্দুর রহমান উসমানকে বললেন , আপনি কি আমার দেয়া শর্তগুলো মেনে চলতে পারবেন ?
উসমান খুশিচিত্তে তা মেনে নিলেন এবং আব্দুর রহমান তার বায়াত গ্রহন করল ।

এভাবে আলী (আঃ) এর দাবি ও অধিকার পদদলিত হলে তিনি বললন ,
এটা প্রথম দিন নয় যে , তোমরা আমাদের বিরুদ্ধাচরণ করেছ । আমাকে শুধু ধৈর্য ধারনই করতে হবে । তোমরা যা কিছু বল আল্লাহ তার বিরুদ্ধে সাহায্যকারী । আল্লাহর কসম , তুমি এ আশা ব্যতীত উসমানকে খলিফা বানাওনি যে সে তোমাকে খেলাফত ফিরিয়ে দিবে ।
এরপর আলী (আঃ) দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলেন , ” আল্লাহ তোমাদের মাঝে বিরোধ সৃষ্টি করুন ।”
পরবর্তীতে তাই হয়েছিল । দুজনের দুজনের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল । মৃত্যু পর্যন্ত কেউ কারও সাথে কথা পর্যন্ত বলে নি ।

যাহোক ,
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে ,
শুরা বলতে প্রথমত ছয়জন , তারপর তিনজন ও অতঃপর একজনকে বুঝিয়েছে কি ?

পূর্বের দুই খলীফার কর্মকান্ড মেনে চলার শর্ত কি খলীফা ওমর আরোপ করেছিলেন ?

নাকি আলী ও খেলাফতের মধ্যে পর্দা টানতে আব্দুর রহমান এ চাল চেলেছিলেন ?

তাহলে আরও প্রশ্ন জাগে ,
প্রথম দুই খলীফা কি কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করেননি ?
যদি করতেন তাহলে আলী (আঃ) আব্দুর রহমানের শর্ত মানলেন না কেন ?
কারন আলী (আঃ) তো বারবার বলেছেন , তিনি কোরআন ও সুন্নাহ অনুসারে শাসনকার্য পরিচালনা করবেন !

চিন্তাশীল মানুষজন চিন্তা করবেন ।
বিবেক দিয়ে ভাবুন ।

যারা চিন্তা করতে জানেন না , বিবেককে কাজে লাগায় না , তারা চিরজীবন অন্ধকারই দেখবেন ।

SKL