বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবকে কেন জাফরী মাযহাব বলা হয় —

বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবকে কেন জাফরী মাযহাব বলা হয় —-

আমরা বনু উমাইয়া সরকারকে এমনকি হযরত ইমাম বাকির (আঃ) ও হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর যুগেও শক্তিশালী একটি সরকার রূপে চিনি ।
বনু উমাইয়া সরকারের শাসনামলের শেষ সময় পর্যন্ত সহিংসতা , অত্যাচার ও স্বৈরচারীতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয় । অর্থাৎ তারা তাদের হুকুমতের শেষের দিকেও তেমনভাবে দূর্বল হয়ে পড়েনি । আর তাছাড়া ‘আব্দুল মালেক’ নামধারী শাসকগণ ও ‘ওয়ালিদ নামধারী শাসকদের ক্ষেত্রে এ কথা আদৌ মানায় না যে, তারা দূর্বল শাসক ছিল । তারা চরম সহিংসতা , অত্যাচার , স্বৈরচারিতার মাধ্যমে হুকুমত করত ।
অতএব , অন্যভাবে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে ।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি দিলে উল্লিখিত উত্তরের চেয়ে সঠিক উত্তর আমাদের হস্তগত হয় । এ বিষয়টি ‘হযরত মহানবী (সাঃ) এর সুন্নত (হাদীস) লিপিবদ্ধ করনের’ বিষয়ের প্রতিই প্রত্যাবর্তন করে ।
আপনারা অবগত যে , প্রথম খলীফার হযরত আবু বকরের যুগ হতে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর হাদীস লিপিবদ্ধ ও বর্ণনার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ।
আর এই নিষেধাজ্ঞা ‘উমর বিন আব্দুল আযিযে’র যুগ অবধি অর্থাৎ তার পূর্বেকার অন্যান্য খলীফার যুগেও প্রযোজ্য ছিল । এ ক্ষেত্রে কাউকে রাসুল (সাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস লেখা এবং প্রচারের অনুমতি দেয়া হত না ।
ইবনে কাসির দামেস্কি তার ‘আল বেদায়াহ ওয়ান নেহায়াহ’ গ্রন্থে হযরত আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন যে , তিনি বলেন , ‘আমার পিতা আবু বকর , হযরত মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণিত ৫০০টি হাদীস আমাকে দিয়ে তা তুলে রাখতে বললেন । (অতঃপর) একরাতে আমার পিতাকে দেখলাম তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ও নির্ঘুম অবস্থায় রাত কাটাচ্ছেন । সকাল হলে তিনি আমাকে ডেকে বললেন , হে কন্যা ! তোমাকে যে হাদীসগুলো দিয়েছিলাম সেগুলো আমাকে দাও। আমি যখন উক্ত হাদীসগুলো তাকে দিলাম , তিনি আগুন চাইলেন এবং সেগুলোকে জ্বালিয়ে দিলেন’।

অপর এক রাবী (বর্ণনকারী) বলেছেন যে , দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব আমাদেরকে ইরাকে প্রেরণের সময় বললেন , সেখানে গিয়ে আল্লাহর নবী (সাঃ) এর হাদীস লিপিবদ্ধ ও বর্ণনা করবে না ! তিনি এ সময় আমাদেরকে সতর্ক করে (হুমকি) দিয়ে আমাদেরকে বোঝান যে , বনু সকীফারর খেলাফতের নীতিকে অব্যাহত রাখতে হবে ।

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর হাদীস লিপিবদ্ধ , বর্ণনা ও প্রচার না করার নীতিটি খলীফাদের মাযহাবের অতি প্রসিদ্ধ একটি নীতি ।

উক্ত নীতি অবলম্বনের ফলে যা মুসলমানদের ভাগ্যে জুটেছিল তা হচ্ছে , ইবনে হাজার আসকালানী’র মতে ১২০ বছর এবং গাজালী’র মতে ১৪০ বছর আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর হাদীস লিপিবদ্ধ করণের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকে ।

উমর বিন আব্দুল আযিয উক্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার পর সমগ্র ইসলামি রাষ্ট্রে ঘোষণা করে দেয়া হয় যে , মহানবী (সাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস লিপিবদ্ধ করা যায়েজ ও মুবাহ ।
উক্ত ঘোষণার পর আহলে সুন্নতের অনুসারীদের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে ওঠে । কেননা তারা যখনই চাইত মহানবী (সাঃ) এর হাদীস বর্ণনা করতে ও লিপিবদ্ধ করতে , তখন তাদের মাঝে এমন কেউ ছিল না যে , রাসুল (সাঃ) হতে বর্ণিত হাদীস সমূহ মুসলমানদের জন্য বর্ণনা করবে । মহানবী (সাঃ) এর সাহাবীদের কেউ কেউ শহীদ হয়েছিলেন এবং অনেকে স্বাভাবিক মৃত্যু বরন করেছিলেন । সুতরাং হাদীস বর্ণনা ও লিপিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাদের সম্মুখে দু’টির বেশি রাস্তা খোলা ছিল না ।

উক্ত রাস্তা দু’টি হচ্ছে –
(ক) হাদীস জাল করা (অন্য ভাষায় হাদীস তৈরী করা) ।
(খ) মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) হতে হাদীস গ্রহন করা ।

প্রথম পদ্ধতিতে ,
রাবীগণ এবং যারা নিজেদেরকে মোহাদ্দেস হিসেবে মনে করত (যেমন: আবু হোরায়রা) তারা হাদীস তৈরীর কার্যক্রম শুরু করে দেয় । ‘আল ইমাম সাদিক (আঃ)’ গ্রন্থে ‘আসাদ হায়দার’ সুন্নি মাযহাবের গ্রন্থ হতে বর্ণনা করেছেন যে , একদা বনি আব্বাসের একজন খলীফা সভা সদদের নিয়ে দরবারের বসেছিল । এমন সময় হাদীস জালকারী এক মোহাদ্দেস দরবারে প্রবেশ করল । খলীফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন , তুমি কি মহানবী (সাঃ) হতে একটি হাদীস আমাদের জন্য বর্ণনা করতে পার ?

মিথ্যাবাদী ঐ মোহাদ্দেস বলল , মহানবী (সাঃ) বলেছেন: আমি চারটি জিনিসকে ভালবাসি । যদিও প্রসিদ্ধ এ হাদীসটিতে তিনি (সাঃ) বলেছেন , আমি তিনটি জিনিসকে পছন্দ করি । কিন্তু মিথ্যাবাদী ঐ হাদীস জালকারী লোকটি আব্বাসী খলীফার দরবারের বলল , রাসুল (সাঃ) বলেছেন , আমি চারটি জিনিসকে পছন্দ করি ।
ঐ চতুর্থ জিনিসটি হল , কবুতর নিয়ে খেলা করা !!
অর্থাৎ মহানবী (সাঃ) একথা বলেছেন যে , যারা কবুতর প্রতিপালন করে ও কবুতরবাজী করে আমি তাদেরকে পছন্দ করি (নাউজুবিল্লাহ) ।

খলীফা মিথ্যাবাদী উক্ত হাদীস জালকারীকে সেদিন পুরস্কারও দিয়েছিল ।
মিথ্যাবাদী লোকটি দরবার ত্যাগ করার পর , খলীফা উপস্থিত সভাসদদের উদ্দেশ্যে বলল , আল্লাহর কসম এ (কথিত) মোহাদ্দেস মিথ্যা বলেছে এবং মহানবী (সাঃ) এর সাথে একটি মিথ্যা বিষয়কে সম্পৃক্ত করেছে । অর্থাৎ মহানবী (সাঃ) এর উপর মিথ্যা আরোপ করেছে । কেননা মহানবী (সাঃ) এর হাদীসে তিনটি বিষয় বর্ণিত হয়েছে । কিন্তু যেহেতু এ কথিত মোহাদ্দেস জানে যে , আমি কবুতর ভালবাসি তাই আমাকে সন্তুষ্ট করতে মহানবী (সাঃ) এর উপর এ মিথ্যা অপবাদ সে আরোপ করেছে ’!

দ্বিতীয় যে পথটি খোলা ছিল —
তা হচ্ছে মহানবী (সাঃ) এর হাদীস সমূহকে পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) হতে গ্রহণ করা । কিন্তু তখন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) ও হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) দুনিয়া হতে বিদায় নিয়েছিলেন এবং ইমাম হাসান (আঃ) , ইমাম হুসাইন (আঃ) ও ইমাম সাজ্জাদ (আঃ) শহীদ হয়েছিলেন ।
কিন্তু ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আঃ) এর ইমামতকালের (কিছুকাল) এবং হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর ইমামতের সময় হাদীস লিপিবদ্ধ ও বর্ণনা করার বৈধতা দেয়া হয় ও এ কর্মকে মোবাহ ঘোষণা করা হয় ।

এ দুই মহান ইমাম উক্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন ।
তাঁরা দু’জনে প্রায় ৪০ বছর যাবত এ সুযোগ হতে উপকৃত হয়ে ছাত্র প্রশিক্ষণ ও সত্য প্রচারের ক্ষেত্রে নিজেদেরকে নিয়োজিত করেন ।

হযরত ইমাম বাকের (আঃ) ও হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) বিশেষ করে হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ)- বারংবার এ কথা বলেছেন যে , ‘আমাদের হতে বর্ণিত হাদীস সমূহ মহানবী (সাঃ) এর হাদীস ও সুন্নত এবং আমরা নিজেদের পক্ষ থেকে কিছুই বলি না’ ।

সুন্নি মাযহাবের বড় বড় ব্যক্তিগণ হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর দরস (ক্লাস)-এ অংশগ্রহণ করতেন ।
এছাড়া বিভিন্ন ধর্ম ও মাযহাবের সাহিত্যিক , মুহাদ্দিস , মুফাসসিরগণও তাঁর (আঃ) দরসে অংশগ্রহণ করতেন । এ ধরণের কাজ হযরত আমিরুল মু’মিনীন আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ) বা হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আঃ) এর যুগে সম্ভব ছিল না ।
কিন্তু ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) এর যুগে যখন কেউ মসজিদে প্রবেশ করত তখন সে দেখতে পেত যে , লোকেরা দলে দলে মসজিদের বিভিন্ন স্থানে বসে আছে এবং বলছে , হাদ্দাসানী জাফার ইবনে মুহাম্মাদ (অর্থাৎজাফর ইবনে মুহাম্মাদ বলেছেন ) ।

অতএব ,
আমার দৃষ্টিতে উক্ত প্রশ্নের সর্বোত্তম জবাব হচ্ছে , যেহেতু ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আঃ) ও ইমাম মুহাম্মাদ জাফর সাদিক (আঃ) এর যুগে মহানবী (সাঃ) এর সুন্নত এবং হাদীস লিপিবদ্ধ করার উপর হতে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয় এবং তৎকালীন যুগে সাহাবীরাও উপস্থিত ছিলেন না যে , তাদের নিকট হতে সুন্নিরা হাদীস সংগ্রহ করতে পারে। সুতরাং তারাও এ দুই ইমাম (আঃ) এর শরণাপন্ন হয় ।
আর তারাও এ সুযোগকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগায় ।

রেজাল শাস্ত্রে সুন্নি মাযহাবের সবচেয়ে পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব হলেন যাহাবী ।
তিনি মিযানুল এ’তেদাল গ্রন্থে ‘আবান ইবনে তাগলাব’ সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করেছেন যে , ‘স্পষ্ট যে , আবান ইমাম বাকের ও ইমাম সাদিক (আা) এর ছাত্র’।
যাহাবী আবানের পরিচিতি তুলে ধরতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে , সে হচ্ছে ‘সিকাহ’ (বিশ্বস্ত), ‘সাদেক’ (সত্যবাদী) এবং ‘তাকওয়াধারী’ । কিন্তু একই গ্রন্থে পরবর্তীতে তার সম্পর্কে আরও একটি বিষয় সংযুক্ত করে লিখেছেন যে , আবান তাকওয়াধারী , ঈমানদার ও বিশ্বস্ত হওয়া সত্ত্বেও সে একজন বিদআতী! অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আবান হচ্ছে শিয়া মাযহাবের অনুসারী ।
তাই এখানে প্রশ্ন জাগে , যদি আবান বিদআতী হয়ে থাকে তবে কেন যাহাবী তার বিশ্বস্তার বিষয়টিকে সমর্থন করলেন এবং কেন তাকে তাকওয়াধারী ও খোদাভিরু হিসেবে পরিচয় করালেন ?

তিনি উত্তরে বলেন , যদি আমরা সুন্নি মাযহাবের অনুসারীরা আবানের মত ব্যক্তিত্বের হাদীসকে আমাদের গ্রন্থসমূহ হতে বের করে দেই তবে মহানবী (সাঃ) এর রেখে যাওয়া সুন্নতের অধিকাংশই বের হয়ে যাবে । আমরা কি ইমাম বাকের (আঃ) ও ইমাম সাদিক (আঃ) এর মত ব্যক্তিত্বের ছাত্রদের হাদীসকে দূরে সরিয়ে দিতে পারি ?
অথবা খতিব বাগদাদী তারিখে বাগদাদ গ্রন্থে লিখেছেন , যদি আমরা আহলে বাইত (আঃ) ও তাদের ছাত্রদের হাদীস সমূহকে দূরে সরিয়ে দেই তবে আমাদের গ্রন্থগুলোতে বিশৃংখলার সৃষ্টি হবে । কেননা প্রত্যেকটি গ্রন্থই বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে গঠিত হয় ।
আর আহলে বাইত (আঃ) ও ইমাম সাদিক (আঃ) এর ছাত্রদের হতে বর্ণিত হাদীস সমূহের জন্য আমাদের গ্রন্থসমূহে আলাদা আলাদা অধ্যায় রয়েছে । তাই যদি আহলে বাইত (আঃ) ও শীয়াদের হতে বর্ণিত হাদীস সমূহ আমাদের গ্রন্থ হতে বের করে দিতে চাই তবে আমাদের গ্রন্থ সমূহের সন্নিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে ।

অতএব ,
স্পষ্ট হল যে , সুন্নি মাযহাবের হাদীস গ্রন্থ সমূহতেও ইমাম বাকের (আঃ) ও ইমাম সাদিক (আঃ) হতে বর্ণিত সর্বপরী আহলে বাইত (আঃ) ও ইমামগণ (আঃ) এর ছাত্রদের হাদীস দ্বারা পরিপূর্ণ ।
আর এ কারনেই আহলে বাইত (আঃ) তথা বার ইমামীয়া শীয়া মাযহাবকে ‘জাফরী’ মাযহাব নামে নামকরণ করা হয়েছে ।
কেননা হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আঃ) হাদীস লিপিবদ্ধ করনের উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর উক্ত সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করেছিলেন এবং এ মাযহাব প্রচারের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম ভূমিকা রেখেছিলেন ।

SKL