ইসলামের দৃষ্টিতে তাক্বীয়াহ করা কি জায়েয ?

প্রশ্ন –
ইসলামের দৃষ্টিতে  তাক্বীয়াহ করা কি জায়েয ?

উত্তর –
তাক্বীয়াহ বলতে আমরা কি বুঝি ?

১) – তাক্বীয়াহ হচ্ছে কোন ব্যক্তি তার ধর্মীয় বিশ্বাসকে প্রচন্ড উগ্রবাদী ও বিরুদ্ধাচারণকারী কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে গোপন করা যার বা যাদের দ্বারা কোন ভয়ের আশংকা থাকে ।
উদাহরণস্বরূপ যদি কোন মুসলমান ব্যক্তি গোঁড়া মুর্তিপূজারীদের শিকারে পরিণত হয় , এখন সে যদি ইসলাম ও আল্লাহর একত্ববাদের প্রকাশ ঘটায় তাহলে ঐ গোষ্ঠী তাকে হত্যা করবে অথবা তার জান মাল ও ইজ্জত আবরুর ক্ষতি সাধন করবে এ অবস্থায় উক্ত মুসলমান ব্যক্তি স্বীয় বিশ্বাসকে গোপন করবে যাতে তাদের আঘাত থেকে পরিত্রাণ পায় ।

অথবা যদি কোন শীয়া মুসলমান নির্জন স্থানে কোন চরমপন্থী ওহাবীর হাতে ধৃত হয় যারা শীয়াদের রক্তপাত ঘটানোকে উত্তম মনে করে , এমন পরিস্থিতিতে উক্ত মুমিন ব্যক্তি স্বীয় জান-মাল ও ইজ্জত রক্ষার্থে যদি ঐ ওহাবীর নিকটে তার ধর্মীয় বিশ্বাস গোপন করে তাহলে প্রত্যেক জ্ঞান বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি এর প্রতি সমর্থন জানাবে যে , এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এ ধরনের আচরণ যৌক্তিকতার নিরীখে পুরোপুরি ইতিবাচক ।
কেননা অকারণে প্রতিহিংসাপরায়ণ উগ্র কোন ব্যক্তির হাতে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়ার কোন অর্থ হয় না ।

২) – তাক্বীয়াহ ও নেফাকের (কপটতা) মধ্যে পার্থক্য –
নেফাক সম্পূর্ণরূপে তাক্বীয়াহর বিপরীতধর্মী একটি বিষয় ।
মুনাফেক তারা যারা মনে প্রানে ইসলামী আইন ও বিশ্বাসকে ধারণ করে না অথবা সন্দেহ পোষণ করে অথচ মুসলমানদের মাঝে প্রকাশ্য ইসলাম ধর্মকে স্বীকার করে ।
আমরা অর্থাৎ বার ইমামীয়া শীয়ারা যে তাক্বীয়াহ মেনে চলি তাহল মনের অভ্যন্তরে সঠিক ইসলামী বিশ্বাস পোষণ করা , অবশ্য কেবলমাত্র ঐ সকল চরমপন্থী ওহাবীদের আজ্ঞাবহ সে নয় যারা নিজেদের ব্যতীত সকল মুসলমানদেরকে কাফের মনে করে এবং কাফের বলে ফতোয়া দেয় ও হুমকী প্রদান করে ।
যখনই এমন ঈমানদার ব্যক্তি স্বীয় জান , মাল , ইজ্জত , আবরুর সুরক্ষার জন্য প্রতিহিংসাপরায়ণ গোষ্ঠীর কাছ থেকে স্বীয় আক্বীদা গোপন করে তাকে তাক্বীয়াহ বলে এবং এর বিপরীত বিষয় হলো নেফাক ।

৩) – তাক্বিয়াহ আকলের নিক্তিতে –
সত্যিকার অর্থে তাক্বিয়াহ হচ্ছে প্রতিরক্ষামূলক একটি ঢালস্বরূপ ।
এ কারণে আমাদের রেওয়াতসমূহে তাক্বিয়াহকে (তুরসূল মুমিন) অর্থাৎ ঈমানদার ব্যক্তিদের ঢাল বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে ।
কোন ব্যক্তির আকল অনুমতি দেয় না যে , সে তার মনে লালিত বিশ্বাসকে বিপজ্জনক ও যুক্তি বিবর্জিত কোন ব্যক্তির সামনে প্রকাশ করে এবং অযথা তার জান-মাল , ইজ্জত আবরু ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয় ।
অকারণে নিজের শক্তি সামর্থ বিনষ্ট করা বুদ্ধিবৃত্তিক কোন কাজ নয় ।
তাক্বিয়াহ সে ধরনের পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ যা যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধরত সৈনিকরা অনুসরণ করে থাকেন । তারা নিজেদেরকে বৃক্ষ , সুড়ঙ্গ অথবা বালির টিলার পেছনে লুকিয়ে রাখেন এবং গাছের পত্র পল্লবের রঙের মত নিজেদের পোষাক নির্বাচন করেন যাতে অকারণে তাদের রক্ত বৃথা না যায় ।
পৃথিবীর জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন সকল মানুষ নিজের জীবনের নিরাপত্তার লক্ষ্যে কঠোর দুশমনের মোকাবেলায় তাক্বিয়াহর ন্যায় নীতি থেকে উপকার লাভ করেন ।
কোন জ্ঞানী বা বিচক্ষণ ব্যক্তি কখনই এ ধরনের পন্থা অবলম্বনের বিরোধীতা করবেন না ।
আপনি পৃথিবীর বুকে এমন একজন ব্যক্তিও খুঁজে পাবেন না যিনি তাক্বিয়াহকে তাঁর শর্ত সাপেক্ষে গ্রহণ করেন না ।

৪) – পবিত্র কোরআনে তাক্বিয়াহ –
পবিত্র কোরআনে অসংখ্যবার তাক্বিয়াহকে কাফের ও বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবেলায় জায়েজ বলে উল্লেখ করেছে ।
উদাহারণ হিসেবে কিছু আয়াত এখানে উল্লেখ করা হল ।

১) ফেরাউনের বংশে একজন মুমিনের ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে ,
অর্থাৎ “ ফেরাউন গোত্রের এক মুমিন ব্যক্তি , যে তার ঈমান গোপন রাখত , সে বলল , তোমরা কি একজনকে এ জন্যে হত্যা করবে যে , সে বলে , আমার পালনকর্তা আল্লাহ অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করেছে…………..।
পূনশ্চঃ ঐ মুমিন ব্যক্তি বলল , যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তবে তার মিথ্যাবাদিতা তার উপরই চাপবে , আর যদি সে সত্যবাদি হয় তবে সে যে শাস্তি কথা বলছে , তার কিছু না কিছু তোমাদের উপরে পড়বে ,…………….”।
সূরা আল মুমিন ।

সুতরাং , এভাবে ফেরাউন বংশের উক্ত মুমিন ব্যক্তি তাক্বিয়াহ অবস্থায় অর্থাৎ স্বীয় বিশ্বাসকে গোপন রেখে হটকারী ও হিংসাপরায়ণ ঐ গোষ্টীকে যারা হযরত মুসা (আঃ) কে হত্যা করতে বদ্ধপরিকর ছিল তাদেরকে উপদেশ দিতে দ্বিধা করলেন না ।

২) পবিত্র কুরআনের অপর এক স্পষ্ট ফরমানে আমরা দেখতে পাই ,
অর্থাৎ, “ — মুমিনগণ যেন অন্য মুমিনকে ছেড়ে কোন কাফেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ না করে । যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না । তবে যাদি তোমরা তাদের পক্ষ থেকে কোন অনিষ্টের আশংকা কর , তবে তাদের সাথে সাবধানতার সাথে (ত্বাকীয়াহ) থাকবে……।”
সূরা আল ইমরান ।

উল্লেখিত আয়াতে সত্য দ্বীনের দুশমনের সাথে সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে বিরোধীতা আরোপ করা হয়েছে ।
তবে এমন পরিস্থিতিতে যদি কোন মুসলমানের ক্ষতির আশংকা থাকে সে ক্ষেত্রে তাক্বিয়াহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক থেকে উপকার লাভের অনুমতি আছে ।

৩) হযরত আম্মার ইয়াসির (রাঃ) ও তাঁর পিতা-মাতার ঘটনাকে-সকল মুফাস্‌সিরগণ নকল করেছেন ।
এই তিন ব্যক্তি আরব মুশরিকদের হিংসার শিকারে পরিণত হয়েছিলেন ।
মুশরিকরা তাদেরকে নবী (সাঃ) এর সঙ্গ ত্যাগ করতে বলে । আম্মার (রাঃ) এর পিতা-মাতা তাদের নির্দেশ অস্বীকার করলেন যার ফলশ্রুতিতে মুশরিকদের হাতে তাঁরা শহীদ হলেন ।
কিন্ত আম্মার ইয়াসীর (রাঃ) তাক্বীয়াহর আশ্রয় নিয়ে মুশরিকদের দাবির প্রতি সম্মতি প্রকাশ করলেন ।
অতঃপর ক্রন্দনরত অবস্থায় তিনি যখন নবী (সাঃ) এর খেদমতে হাজির হলেন তখন এ আয়াতটি নাযিল হয় –
অর্থাৎ , “ —যার উপর জবরদস্তি করা হয় এবং তার অন্তরে বিশ্বাসে অটল থাকে সে ব্যতীত যে কেউ বিশ্বাসী হওয়ার পর আল্লাহতে অবিশ্বাসী হয় এবং কুফরীর জন্য মন উন্মুক্ত করে দেয় তাদের উপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্য রয়েছে শাস্তি —“।
সূরা নাহল ।

নবী করিম (সাঃ) হযরত আম্মারের পিতা-মাতাকে শহীদদের মধ্যে গণ্য করেন এবং আম্মার ইয়াসিরের চোখ নিঃসৃত অশ্রুকে স্বীয় পবিত্র হস্ত দ্বারা মুছে এরশাদ করলেন , “তুমি কোন গোনাহ কর নি । আবার যদি মুশরিকরা তোমাকে বাধ্য করে তাহলে ওদের কথারই পুনরুক্তি কর ”।

সকল মুুফাস্‌সিরগণ এ আয়াতের শা’নে নাযুল সম্পর্কে এ মর্মে একমত পোষণ করেন যে , এ আয়াতটি হযরত আম্মার ইয়াসীর (রাঃ) ও তাঁর পিতা-মাতা সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে এবং পরবর্তীতে আল্লাহর প্রিয় নবীও (সাঃ) উপরোক্ত বক্তব্য প্রদান করেছেন ।
সুতরাং এই ঐকমত্য থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে , সকল মুসলমান তাক্বীয়াহর বৈধতায় বিশ্বাসী ।

অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল যে , পবিত্র কোরআন থেকে দালিলিক প্রমাণ এবং আহলে সুন্নাতের মুফাসসিরগণের বক্তব্য সত্ত্বেও বার ইমামীয়া শীয়াদেরকে তাক্বীয়াহর কারণে ঠাট্টা বিদ্রুপের শিকার হতে হচ্ছে ।

হযরত আম্মার ইয়াসির (রাঃ) এবং ফেরাউন বংশের ঐ মুমিন ব্যক্তি মুনাফিক ছিলেন না বরং তারা আল্লাহর নির্দেশিত তাক্বিয়াহ’র রীতিকে অনুসরন করে সুবিধা ও উপকার লাভ করেছিলেন ।

৫) – ইসলামী রেওয়ায়েতসমূহে তাক্বীয়াহ –
ইসলামী রেওয়ায়েতসমূহতেও তাক্বীয়াহ’র বিস্তর আলোচনা আমরা দেখতে পাই ।
যেমন , “মুসনদে আবি শায়বাহ” আহলে সুন্নাতের প্রসিদ্ধ মুসনদ হিসেবে বিবেচিত এ গ্রন্থে মুসাইলামা কাজ্জাব (মিথ্যাবাদি মুসাইলামা) এর একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে ।
মুসাইলামা কাজ্জাব হুজুর পাক (সাঃ) এর দু’জন সাহাবীকে তার প্রভাবাধীন একটি এলাকায় বন্দী করে এবং উভয়কে প্রশ্ন করে যে , তোমরা কি সাক্ষ্য দিচ্ছ যে , আমি আল্লাহর প্রতিনিধি ?
একজন সাহাবী সাক্ষ্য প্রদান করে নিজের জীবন রক্ষা করলেন ।
কিন্ত অপরজন সাক্ষ্য না দেয়ায় তার দেহ থেকে মস্তক নিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয় ।
এ দুঃখজনক সংবাদ যখন হুজুর পাক (সাঃ) এর নিকট পৌঁছালো তখন তিনি এরশাদ করলেন , যিনি নিহত হয়েছেন তিনি সত্য পথের অনুগামী হয়েছেন এবং অপরজন আল্লাহর অনুমতি গ্রহণ করেছেন যা কোন গোনাহ নয় ।
সূত্র – মুসনাদে আবি শায়বাহ, খঃ ১২, পৃঃ ৩৫৮ ।

আহলে বায়ত (আঃ) এর ইমামগণের হাদীসসমূহতেও বিশেষ করে যে ইমাম (আঃ)গণ বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাসীয় শাসনামলে জীবন অতিবাহিত করেছেন তাঁদের উক্তিসমূহে তাক্বীয়াহর বিষয়টির আধিক্য দেখা যায় ।
কারণ ঐ যুগে ইমাম (আঃ)গণের একনিষ্ঠ ভক্ত শীয়ারা ও মহব্বতকারীরা শাসকগোষ্ঠীকর্তৃক হত্যার শিকার হতেন ।
এ কারণে তারা আদিষ্ট হতেন তাক্বীয়াহকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নির্দয় ও অত্যাচারী দুশমনদের হাত থেকে স্বীয় প্রাণ রক্ষা করতে ।

তাক্বীয়াহ কী শুধুমাত্র কাফেরদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ যোগ্য ?
আমাদের বিরুদ্ধবাদীরা যখন এতদ্বসম্পর্কিত পবিত্র কোরআনের সুস্পষ্ট আয়াত ও বর্ণনাসমূহের মুখোমুখি হন তাদের পক্ষে তখন ইসলাম ধর্মে তাক্বীয়াহর বৈধতা মেনে নেয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় থাকে না ।
তখন তারা এ কথা বলে পালানোর পথ খোঁজার চেষ্টা করেন যে , তাক্বীয়াহ তো শুধুমাত্র কাফেরদের ক্ষেত্রে অনুমোদনযোগ্য ।
মুসলমানদের বেলায় তাক্বীয়াহ বৈধ নয় ।
যদিও উপরোল্লিখিত বর্ণনাসমূহের আলোকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে , এ দুটি ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই ।
(ক) তাক্বীয়াহ’র অর্থ যদি উগ্রবাদী বিপদজনক ব্যক্তির মোকাবিলায় স্বীয় জান-মাল , ইজ্জত-আবরু রক্ষা করা বোঝায় আর প্রকৃতপক্ষেও এমনটি নয় তাহলে অজ্ঞাত এবং উগ্রবাদী মুসলমান ও কাফেরদের মধ্যে পার্থক্য কী ?
জ্ঞান ও আকল যদি এ নির্দেশই দিয়ে থাকে যে , এগুলো রক্ষা করা জরুরী এবং অনর্থক ধ্বংসাধন যুক্তিসঙ্গত নয় তাহলে এ দু’টি ক্ষেত্রের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?

পৃথিবীতে এমন ব্যক্তিও বাস করেন যিনি প্রচন্ড অজ্ঞতা ও ভুল প্রপাগান্ডার কারণে বলেন যে , শীয়াদের রক্ত ঝরানো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উপায় হয়ে থাকে ।
এখন যদি কোন একনিষ্ঠ শীয়া এবং আমীরুল মুমিনীন (আঃ) এর সত্যিকার অনুসারী এমন মুর্খ ও উগ্রপন্থী দলের হাতে বন্দী হয় এবং তারা যদি জিজ্ঞাসা করে যে , বল , তোমার মাযহাব কি ?
উত্তরে যদি সে বলে যে , আমি শীয়া ।
তাহলে অযথা তার গর্দান অজ্ঞতা ও নিষ্ঠুরতার তরবারির তলদেশে সোপর্দ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় আছে ?
জ্ঞান-বোধ সম্পন্ন ব্যক্তি কি এ ধরনের কাজ করতে পারে ?
অন্যভাবে বলা যায় যে , যে আচরণ আরবের মুশরীকরা আম্মার ও তাঁর পিতা মাতার সাথে করেছিল অথবা মুসায়লামা কাজ্জাবের অনুসারীরা আল্লাহর প্রিয় রাসুলের (সাঃ) দু’জন সাহাবীর সাথে করেছিল যদি একই আচরন বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাসীয় খলীফা ও জাহেল মুসলমান শীয়াদের সাথে করেন তাহলে আমরা কী তাক্বীয়াহকে হারাম বলবো এবং আহলে বায়ত (আঃ) এর শত সহস্র একনিষ্ঠ ভক্ত ও অনুসারীদের ধ্বংসের কারণ সৃষ্টি করব শুধুমাত্র একারণে যে , এ শাসক গোষ্ঠী বাহ্যিক দৃষ্টিতে মুসলমান ছিলেন ?

আহলে বাইত (আঃ) এর পবিত্র ইমামগণ তাক্বীয়াহর প্রতি এত বেশী গুরুত্বারোপ করেছেন যে , তাক্বীয়াহকে দ্বীনের দশ ভাগের নয় ভাগ বলে উল্লেখ করেছেন ।
সূত্র – বিহারুল আনওয়ার , খঃ ১০৯ , পৃঃ ২৫৪ ।

তা না হলে বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাসের যুগে শীয়া নিহতদের সংখ্যা হয়তো বা লক্ষ বরং কোটি ছাড়িয়ে যেত ।
অর্থাৎ তাদের নির্দয় ও হিংস্র হত্যাযজ্ঞ দশগুন বৃদ্ধি পেত ।

এ শর্তসমূহে তাক্বিয়ার শরীয়তী অনুমোদন সম্পর্কে সামান্য পরিমাণ সন্দেহ থাকে কি ?
এ বিষয়টি আমরা অস্বীকার করতে পারি না যে , যখন আহলে সুন্নাতও বছরের পর বছর ধরে মাযহাবগত মতভেদের কারণে একে অপরের থেকে তাক্বীয়াহ করতেন ।

যেমন পবিত্র কোরআনের আধুনিক (হাদিস) অথবা প্রাচীন (ক্বাদিম) হওয়া সম্পর্কে তাদের মধ্যে প্রচন্ড মতভেদ হওয়ার কারণে অসংখ্য মানুষকে প্রাণ দিতে হয় ।
সে একই ঝগড়া ফ্যাসাদ যা আজ সত্যানুসন্ধানকারীদের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণরূপে বেহুদা ও অনর্থক ঝগড়া ফ্যাসাদ বলে বিবেচিত ।
যে দল নিজেদেরকে সত্যপন্থী বলে মনে করত তাদের মধ্যে থেকে কোন ব্যক্তি যদি প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতে বন্দী হত তাহলে তার কি স্পষ্টভাবে স্বীকার করা উচিত হত যে , তার আকীদা কি এতে তার জীবন নাশের হুমকি থাকলেও ? যদিও তার রক্ত কোন উপকার বয়ে আনবে না আর না কোন প্রভাব ফেলবে ।

২) ফখরুদ্দীন রাযী সুরা আল ইমরানের ২৮নং আয়াতের তাফসিরে উল্লেখ করেছেন যে , তাক্বীয়াহ প্রভাবশালী কাফেরদের মোকাবিলায় সঠিক ।
কিন্ত শাফায়ী মাযহাবে বলা হয়েছে যে , যদি মুসলমানদের অবস্থা একে অপরের সাথে কাফের ও মুশরিকদের মত হয় তাহলে স্বীয় প্রাণ রক্ষায় তাক্বীয়াহ’র আশ্রয় গ্রহণ করা বৈধ ।
অতঃপর মাল ও সম্পদ রক্ষার্থে তাক্বীয়াহ অবলম্বন করার সপক্ষে দলীল পেশ করতে গিয়ে বলা হচ্ছে যে , নবী (সাঃ) এর হাদীসে মুসলমানের মাল ও সম্পদের সংরক্ষণ ঠিক তার প্রাণ সংরক্ষণেরই ন্যায় ।
অনুরূপভাবে অপর একটি হাদীসে দেখা যায় যে , “যে ব্যক্তি স্বীয় মাল ও সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে সে শহীদের মৃত্যুবরণ করে ।”
সূত্র – তাফসীরে কাবীর , ফখরুদ্দীন রাযী , খঃ ৮, পৃঃ ১৩ ।

তাফসিরে নিশাবুরীতে যা কিনা তাফসীরে তাবারীর টিকাতে উল্লেখিত হয়েছে যে , “ অর্থাৎ, ইমাম শাফায়ী বর্ণনা করেন যে , জীবনের হেফাজতের জন্য মুসলমানদের থেকেও তাক্বীয়াহ করা জায়েজ , যেভাবে কাফেরদের থেকে তাক্বীয়াহ করা জায়েজ ।”
সূত্র – তাফসীরে নিশাবুরী , তাফসীরে তাবারীর টিকায় , খঃ ৩, পৃঃ ১১৮ ।

(৩) হৃদয়গ্রাহী বিষয় হচ্ছে যে , বনি আব্বাসের খেলাফতের যুগে কোন কোন আহলে সুন্নাতের মুহাদ্দীসগণ পবিত্র কোরআনের প্রাচীন হওয়ার বিষয়ে আক্বীদা পোষণ করার কারণে বনি আব্বাসের শাসকদের চাপের সম্মুখীন হন ।
তারা তাক্বীয়াহ অবলম্বন করে স্বীকার করলেন যে , কোরআন হচ্ছে সৃষ্ট গ্রন্থ ।
আর এভাবে তারা নিজেদের প্রাণ রক্ষা করলেন ।

বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে সা’দ স্বীয় গ্রন’ তাবক্বাত-এ এবং অপর প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক তাবারী স্বীয় ইতিহাস গ্রন্থে একই বিষয়ে লিখিত দুইটি পত্রের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন ।
যে পত্র দু’টি মামুনের পক্ষ থেকে বাগদাদের পুলিশ কর্মকর্তা ইসহাক বিন ইব্রাহীমের নামে প্রেরিত হয়েছিল ।

প্রথম পত্র সম্পর্কে ইবনে সা’দ লেখেন যে , মামুন পুলিশ কর্মকর্তাকে এ মর্মে জানাল যে , সাতজন বিখ্যাত মুহাদ্দিস (মোহাম্মদ বিন সা’দ, আবু মুসলিম, ইয়াহইয়া বিন মঈন, জোহায়র বিন হারাব, ইসমাঈল বিন দাউদ, ইসমাঈল বিন আবি মাসউদ এবং আহমাদ বিন আল দাওরাতি)কে হেফাজতে নিয়ে আমার নিকটে প্রেরণ কর ।
এ মুহাদ্দিসগণ মামুনের নিকটে পৌঁছালে মামুন পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে জানতে চাইল যে , কোরআন সম্পর্কে তোমাদের আক্বীদা কী ?
তারা সকলেই উত্তর দিলেন যে , কোরআন একটি সৃষ্ট গ্রন্থ ।
যদিও সে সময় মুহাদ্দিসগণের মধ্যে সুপরিচিত দৃষ্টিভঙ্গী ছিল এর বিপরীত অর্থাৎ তারা পবিত্র কোরআনের প্রাচীনত্বে বিশ্বাস রাখতেন এবং এ সাতজন মুহাদ্দীসের আক্বীদাও ছিল তদরূপ । সূত্র – তাবক্বাত ইবনে সা’দ, খঃ ৭, পৃঃ ১৬৭, বৈরুত থেকে মুদ্রিত ।

অবশ্য তারা মামুনের কঠোর শাস্তির ভয়ে তাক্বিয়াহর আশ্রয় নিলেন এবং পবিত্র কোরআনের সৃষ্ট হওয়া সম্পর্কে স্বীকারোক্তি প্রদান করে নিজেদের প্রাণ রক্ষা করলেন ।

মামুনের দ্বিতীয় পত্র সম্পর্কে যা তাবারী নকল করেছেন এবং উক্ত পত্রটিও পুলিশ কর্মকর্তার নামে ছিল ।
যখন সে মামুনের পত্রটি পেল তখন সে কিছুসংখ্যক মুহাদ্দীসকে ডেকে পাঠাল যাদের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ছাব্বিশ জন এবং মামুনের পত্রটি তাদের সম্মুখে পাঠ করল ।
অতঃপর এক একজন মুহাদ্দিসকে আলাদাভাবে কোরআন সম্পর্কে তার আক্বীদা জানতে চাইল । উপস্থিত ছাব্বিশজন মুহাদ্দিসের মধ্যে চারজন ছাড়া সকলে স্বীকার করল যে , কোরআন মজীদ সৃষ্ট গ্রন্থ এবং তাক্বীয়ার আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করল ।
যে চারজন স্বীকার করল না তাদের নাম ছিল আহমেদ ইবনে হাম্বাল , সাজ্জাদহ , আল ক্বাওয়ারেরী ও মোহাম্মাদ বিন নুহ ।
পুলিশ কর্মকর্তা তাদের কারাগারে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দিল ।
দ্বিতীয় দিন সে আবার ঐ চারজনকে ডেকে কোরআন সম্পর্কে তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল ।
সাজ্জাদাহ স্বীকারোক্তি দিল যে , কোরআন একটি সৃষ্টি গ্রন্থ । ফলে সে মুক্তি লাভ করল এবং অপর তিনজন স্বীয় আক্বীদায় অবিচল থাকায় পুনরায় তাদেরকে কারাগারে পাঠান হয় ।
পরদিন আবারও তাদেরকে ডাকা হয় ।
এবার আল ক্বাওয়ারেরী তার বিবৃতি প্রত্যাহার করে নেয় এবং মুক্তি লাভ করে ।
কিন্ত আহমাদ ইবনে হাম্বাল এ মুহাম্মাদ ইবনে নুহ পূর্বের ন্যায় স্বীয় আক্বীদায় অটল থাকেন ।
পুলিশ কর্মকর্তা তাদের উভয়কে তারতুস শহরে নির্বাসন দেয় । তারতুস সিরিয়ায় নদীর তীরে অবসি’ত একটি শহর ।
সূত্র – মো’জাম আল বালদান , খঃ ৪, পৃঃ ৩০ ।

কিছুলোক তাক্বীয়াহ গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে আপত্তি জানালে তারা কাফিরদের মুকাবিলায় আম্মার ইয়াসীরের তাক্বীয়াহ গ্রহণের বিষয়টি দলিল হিসেবে উপস্থাপন করল ।
সূত্র – তারিখে তাবারী, খঃ ৭, পৃঃ ১৯৭ ।

এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে , যখন কেউ অত্যাচারীর কবলে পড়ে এবং জীবন বাঁচানোর জন্য তাক্বীয়াহ ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকে তাহলে সে এ উপায় অবলম্বন করতে পারে ; হোক সে তাক্বিয়াহ কাফেরের মুকাবিলায় অথবা মুসলমানের মুকাবিলায় ।

৭) – যে সকল ক্ষেত্রে তাক্বিয়াহ হারাম –
কিছু কিছু বিষয়ে তাক্বিয়াহ করা হারাম ।
একজন ব্যক্তি অথবা দলের তাক্বিয়াহ অবলম্বন করা অথবা স্বীয় মাযহাবগত বিশ্বাস গোপন করার কারণে ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহ ঝুঁকির সম্মুখিন হয় অথবা মুসলমানদের প্রচন্ড ক্ষতি সাধিত হয় সে সকল ক্ষেত্রে তাক্বিয়াহ করা হারাম ।
এমন মুহূর্তে স্বীয় প্রকৃত আক্বীদা বিশ্বাস প্রকাশ করা উচিত এতে যতই বিপদ আসুক না কেন ।
আর যারা মনে করেন এ ধরনের ঝুঁকি নিয়ে শুধুমাত্র স্বীয় প্রাণ বিসর্জন দেয়া ছাড়া অন্য কোন অর্জন নেই তাদের জন্য পবিত্র কোরআন স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছে এ ধরনের চিন্তা থেকে ।

কেননা এর অর্থ হচ্ছে জিহাদের ময়দানে হাজির হওয়া হারাম ।
যদিও কোন জ্ঞানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এ ধরনের কথা বলে না । এ থেকে প্রমাণিত হয় যে , ঈয়াযীদের মোকাবিলায় ইমাম হোসাইন (আঃ) এর বিপ্লব নিশ্চিতরূপে ছিল একটি দ্বীনি দায়িত্ব ।
সে কারণে ইমাম (আঃ) তাক্বিয়াহর রীতি অনুসারেও ঈয়াযীদ ও বনি উমাইয়ার আত্মসাৎকারী জালেম শাসকদের প্রতি কোন প্রকার নম্রতা প্রদর্শন করতে রাজী হন নি ।
কেননা , তিনি জানতেন এমন হলে ইসলামের ভিত্তিমূলে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হবে ।
তাই দেখা যায় যে , কারবালায় ইমাম হোসাইন (আঃ) এর বিপ্লব ও শাহাদাত মুসলমানদের জাগরণ ও জাহিলিয়াতের নাগপাশ থেকে মুক্তির কারণ সৃষ্টি করেছিল ।

কল্যাণ চিন্তাজনিত তাক্বিয়াহ –
এটি তাক্বিয়াহর আর একটি ধরন আর এর অর্থ হচ্ছে যে , এক মাযহাবের অনুসারী মুসলমানদের কাতারে ঐক্য বজায় রাখার জন্য ঐ সকল বিষয়সমূহে যারা দ্বারা দ্বীন ও মাযহাবের ভিত্তির কোন ক্ষতি সাধন হয় না , অন্যান্য সকল ফেরকার সাথে সংহতি ও সুসঙ্গতি প্রমাণ করে ।

যেমন ধরা যাক আহলে বায়াত (আঃ) এর অনুসারী এ আক্বীদা পোষণ করেন যে , কাপড় ও কার্পেটের উপর সেজদা করা যায় না , পাথর অথবা মাটির উপর সেজদা করা জরুরী ।
আর এ ক্ষেত্রে হুজুর পাক (সাঃ) এর এই প্রসিদ্ধ হাদিসকে অর্থাৎ, “জমিনকে আমার জন্য সেজদার স্থান ও তায়াম্মুমের (মাটি দ্বারা পবিত্র হওন) উছিলা নির্ধারণ করা হয়েছে ” স্বীয় দলীল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন ।
এখন তিনি যদি ঐক্য বজায় রাখার জন্য অন্যান্য মুসলমানদের কাতারে তাদের মসজিদে অথবা মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীতে যখন নামাজ আদায় করেন অগত্যা তাকে কাপড় অথবা কার্পেটের উপর সেজদা করতে হয় ।
এ কর্মটি বৈধ ও আক্বীদা মোতাবেক সঠিক ।
আর এ ধরনের তাক্বীয়াহকে সৌজন্যমূলক ও কল্যাণজনিত তাক্বিয়াহ বলা হয় ।
কেননা এক্ষেত্রে ইপ্সিত লক্ষ্য জানমালের ভয়ভীতি নয় বরং এখানে ইসলামী ফেরকাসমূহের সাথে উদারতা ও সুন্দরভাবে একত্রে জীবন যাপন করার উদ্দেশ্য নিহীত রয়েছে । তাক্বীয়াহর এ চলমান বাহাসকে একজন বুজুর্গ আলেমে দ্বীনের বক্তব্যের মাধ্যমে সমাপ্ত করব ।

মিশরের আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বুজুর্গ ওস্তাদের সাথে জনৈক শিয়া আলেমের সাক্ষাত হয় ।
তিনি শীয়া আলেমকে তিরস্কার করে বললেন , “আমি শুনেছি তোমরা নাকি তাক্বীয়াহ কর” ?
শীয়া আলেমে দ্বীন জবাবে বললেন , “যদি শত্রুদের তরফ থেকে আমাদের জান ও মালের শংকা না থাকত তাহলে আমরা কখনোই তাক্বীয়াহ করতাম না । তারা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হোক যারা আমাদেরকে তাক্বীয়াহ করতে বাধ্য করেছে ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
অনিচ্ছাসত্বেও লেখাটি দীর্ঘ হওয়াতে দুঃখিত ।
আশা করি যিনি বা যারা তাক্বীয়া সম্বন্ধে বার ইমামীয়া শীয়াদের প্রতি অহেতুক তুচ্ছ তাচ্ছিল্য মন্তব্য করেন তারা এই লেখাটি থেকে উপকৃত হবেন ।

SKL