পবিত্র আখেরী চাহার শোম্বা ও ইন্তেকাল দিবস বিভ্রাট প্রসংগ —

পবিত্র আখেরী চাহার শোম্বা ও ইন্তেকাল দিবস বিভ্রাট প্রসংগ —-

আরবী সফর মাসের ত্রিশ তারিখ ।
এই দিনটি পৃথিবীর বেশীর ভাগ মুসলমানদের কাছে তাৎপর্যপূর্ন একটি দিন ।
এই দিনটিকে পবিত্র আখেরী চাহার শোম্বা বলা হয় ।

” আখেরী” শব্দটি আরবী । এর অর্থ হচ্ছে – শেষ ।
আর “চাহার শোম্বা” হচ্ছে ফার্সী শব্দ । এর অর্থ হচ্ছে – বুধবার ।
আরবী ও ফার্সী শব্দের সংমিশ্রণে ” আখেরী চাহার শোম্বা ” ।
পবিত্র এই দিনটির বাংলা শাব্দিক অর্থ হচ্ছে – জীবনের শেষ বুধবার ।
এই দিনটি ছিল আরবী সফর মাসের শেষ দিন অর্থাৎ সফর মাসের ত্রিশ তারিখ এবং দিনটি ছিল বুধবার ।

পাঠক ,আসুন , সংক্ষেপে জেনে নেই কেন এই দিনটি পবিত্র ও তাৎপর্যময় ।

আমাদের প্রান প্রিয় শেষ নবী ও রাসুল মুহাম্মাাদ (সাঃ) জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই জগত সংসার থেকে বিদায় নেবার পূর্বে ১১ই হিজরীর সফর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে ভীষন অসুস্থ হয়ে পড়লেন । দিন দিন মহানবী (সাঃ) এর অসুস্থতা বেড়েই চলছিল ।
অসুস্থতার এই পর্যায় ১১ই হিজরীর সফর মাসের শেষ দিনটি অর্থাৎ ৩০শে সফর বুধবার ভোর বেলাতে মহানবী (সাঃ) বেশ সুস্থতা অনুভব করলেন ।
তখন উম্মুল মুমেনিন হযরত আয়েশার অক্লান্ত সেবা যত্নের ফলে রাসুল (সাঃ) অনেকখানি সুস্থ হয় উঠলেন এবং বললেন যে , ” আমার মাথা ও শরীরের প্রচন্ড ব্যাথ্যা দূর হয়ে গেছে । পূর্বের থেকে নিজেকে বেশ হালকা মনে হচ্ছে । আজ আমি বেশ সুস্থতা অনুভব করছি ” ।

এ কথা শুনে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং তাড়াতাড়ি পানি আনয়ন করে নূরে মুজাসসাম , হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র মাথা মুবারক ধুয়ে দিলেন এবং সমস্ত শরীর মুবারকে পানি ঢেলে ভালভাবে গোসল করিয়ে দিলেন ।
এই গোসলের ফলে রাসুল (সাঃ) এর পবিত্র দেহ মুবারক হতে বহু দিনের অসুস্থতাজনিত অবসাদ অনেকাংশে দূর হয়ে গেল ।
সূত্র – আদ-দীন ওয়া তারীখুল হারামাইনশি শারীফাঈন , পৃষ্ঠা – ২৮১, ২৮৩ ।

পাঠক ,
সংক্ষেপে , এই হচ্ছে পবিত্র আখেরী চাহার শোম্বার ঘটনাসমূহ ।

ইন্তেকালের ঠিক পূর্বে মহানবী (সাঃ) যেহেতু এই দিনটিতে সুস্থতা অনুভব করেছিলেন বিধায় প্রতি বছর এই দিনটিতে পৃথিবীর বেশীর ভাগ মুসলমান সম্প্রদায় ” আখেরী চাহার শোম্বা ” উপলক্ষে খুশী প্রকাশ করে সাধ্যমত হাদিয়া পেশ করা , দান-ছদক্বা করা , গোসল করা , ভাল খাওয়া , অধিক পরিমাণে মীলাদ শরীফ , ক্বিয়াম শরীফ ও দুরূদ শরীফ পাঠ করা সকলের জন্য আবশ্যিক কর্তব্য মনে করে পালন করে থাকেন ।
এইজন্য এ বছরের জন্য ২৯শে ছফর , ১৪৩৮ হিজরী , রোজ বুধবার বা ৩০ নভেম্বর , ২০১৬ ঈসায়ী সন ‘আখিরী চাহার শোম্বাহ’ । যা পালন করা হযরত সাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুমগণের খাছ সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত ।

প্রিয় পাঠক , এবার এই আলোচনার মূল প্রসংগে চলুন —

উপরে উল্লেখিত ঘটনাতে এটা খুব পরিষ্কার যে , রাসুল (সাঃ) ১১ই হিজরীর সফর মাসের ত্রিশ তারিখে বেশ অনেকটা সুস্থ হয় উঠলেন এবং ঐ দিনটি ছিল বুধবার । ঐ বুধবার দিনটি ছিল তাঁর জীবনের সর্বশেষ বুধবার ।
অর্থাৎ ৩০শে সফর বুধবারের পরবর্তী বুধবার আসার পূর্বেই মহানবী (সাঃ) ইন্তেকাল করেছেন ।

সে হিসাবে আরবী সফর মাসের পরের মাসটি হচ্ছে রবিউল আউয়াল মাস ।
তাহলে রবিউল মাসের প্রথম সপ্তাহের বুধবার হচ্ছে ৭ই রবিউল আউয়াল ।
উপরে বর্নিত ঘটনা অনুসারে রাসুল (সাঃ) অবশ্যই ৭ই রবিউল আউয়াল মাসের বুধবারের পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন ।
অংকের হিসাবে কিন্ত তাই বলে ।

পাঠক ,
এবারে আপনি অবাক হবেন যে , যে সকল মুসলমান ভাইয়েরা সফর মাসের ত্রিশ তারিখ রাসুল (সাঃ) এর জীবনের সর্বশেষ বুধবার অর্থাৎ আখেরী চাহার শোম্বা দিবসটি পালন করেন সেই সমস্ত মুসলমান ভাইয়েরা রাসুল (সাঃ) এর ইন্তেকাল দিবস পালন করেন ১২ই রবিউল আউয়াল তারিখ সোমবারে ।

পাঠক ,
অংকের হিসাবের গড়মিলটা কি ধরতে পেরেছেন ?

আসুন , আপনাকে সাহায্য করছি – সফর মাসের ত্রিশ তারিখ ছিল বুধবার । এবং ঐ দিনটি ছিল ইন্তেকালের পূর্বে মহনবী (সাঃ) এর জীবনের সর্বশেষ বুধবার । তাহলে পরবর্তী রবিউল আউয়াল মাসের বুধবার দিনটি হবে ৭ই রবিউল আউয়াল । এবং এই ঘটনা অনুসারে মহানবী (সাঃ) এর অতি অবশ্যই ৭ই রবিউল আউয়াল বুধবার আসার পূর্বেই ইন্তেকাল হয়েছে ।

কিন্ত না , ওনারা বলছেন যে , রাসুল (সাঃ) ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার – এই দিনটতে জন্ম ও ইন্তেকাল করেছেন ।

তাহলে রাসুল (সাঃ) এর জীবনের সর্বশেষ ৩০শে সফর মাসের বুধবার দিনটির সত্যতা থাকে কিভাবে ?
কারন ৭ই রবিউল আউয়াল বুধবারের পরে আরও চার দিন অর্থাৎ ১১ই রবিউল আউয়াল রবিবার পর্যন্ত মহানবী (সাঃ) এই জগতে ছিলেন । পরের দিন অর্থাৎ ১২ইন রবিউল আউয়াল সোমবার ১১ই হিজরীতে নবীজী (সাঃ) ইন্তেকাল করেছেন !

এখন আপনি যদি নবীজী (সাঃ) এর জীবনের ৩০শে সফর সর্বশেষ বুধবার – এই দিনটির ঘটনা বিশ্বাস করেন তাহলে মহানবী (সাঃ) এর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ইন্তেকাল বা ওফাত দিবস – এই দিনটি যৌক্তিক ও অংকের হিসাব মোতাবেক মানতে পারছেন না !
অপর দিকে আপন যদি মহানবী (সাঃ) এর ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার ইন্তেকাল বা ওফাত দিবস হিসাবে মানেন তাহলে নবীজী (সাঃ) এর জীবনের ৩০শ সফর সর্বশেষ বুধবার অর্থাৎ “আখেরী চাহার শোম্বা” – এই দিনটি যৌক্তিক ও অংকের হিসাব মোতাবেক মানতে পারছেন না !

প্রিয় পাঠক ,
তাহলে এখন কি করনীয় , সেটা আপনার ব্যক্তিগত অভিরুচি ।
আমি শুধু খুব সাধারন অংকের হিসাবটা আপনার নয়ন সম্মুখে তুলে ধরেছি মাত্র ।

SKL