কবরের উপর সৌধ নির্মান —

কবরের উপর সৌধ নির্মান ——–

এই প্রসংগটির উপর খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে একটি পর্যালোচনা ।

পৃথিবীর সমগ্র মুসলমান সম্প্রদায়ের সাথে বৃটিশ রাজার প্রতক্ষ্য তত্বাবধানে সৃষ্ট ওয়াহাবীদের বিরোধের অন্যতম বিষয় হলো কবরের উপর গম্বুজ ও সৌধ নির্মান সম্পর্কিত ।

ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে মুসলমানগন এই রীতিটি অনুসরন করে এসেছে এবং এ বিষয়টি জায়েজ ও মুস্তাহাব হওয়ার সপক্ষে পবিত্র কোরআন ও হাদিস হতে দলিল প্রমান উপস্থাপন করেছে ।
উপরন্ত এ কর্মটি যৌক্তিক এবং তা বুদ্বিবৃত্তি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অনুসৃত রীতির সাথে সামজ্ঞস্যশীল ।

কিন্ত ইবনে তাইমিয়ার সময় হতে এই রীতির প্রচন্ড বিরোধীতা শুরু হয় ।
সৌদী শাসকগনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সৃষ্ট ওয়াহাবী আলেমগনের ফতোয়ার প্রেক্ষিতে তারা সকল মাজার , কবরের উপর নির্মিত সৌধ ও গম্বুজ ধ্বংস কার্যে রত হয় ।

মহানবীর (সাঃ) এর মাজার ব্যতীত সকল সৌধ তারা ধ্বংস করে ।
মহানবীর (সাঃ) রওজা ধ্বংসের ইচ্ছা থাকা সত্বেও বিশ্বের মুসলমানদের প্রতিরোধের ভয় তারা তা এখনও করতে পারে নি ।

ওয়াহাবীদের মূল ফতোয়া ——-
নবী রাসুল , পবিত্র ইমামগন ও প্রকৃত ওলী আউলীয়াদের কবরের উপর নির্মিত সৌধ মূর্তির ন্যায় এবং তার সামনে নত হয় সম্মান প্রর্দশন মুশরিকদের মূর্তিপুজার ন্যায় ।
অতএব যে সকল সৌধ নির্মিত হয়েছে সবই হারাম ও বিদআত ।
কবরের উপর সৌধ নির্মান নিষিদ্ব বিদআত যা কবরবাসীর প্রতি অতিমানবীয় বিশ্বাস ও তার প্রতি অতিরজ্ঞিত সম্মান প্রর্দশনের মাধ্যমে হয় থাকে এবং তা মানুষকে শিরকের দিকে ধাবিত করে ।
তাই মুসলমানদের দায়িত্বশীল নেতা অথবা তার প্রতিনিধির কবরের উপর নির্মিত এরুপ সৌধসমূহ মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে শিরকের মূলোৎপাটন করতে হবে ।

এ প্রসংগে বলে রাখি ,
সৌধ নির্মান বা কবর পাকা করা হারাম ও বিদআত বললেও তাদের ধর্মীয় গুরু ইবনে তাইমিয়ার কবরটা ঠিকই কিন্ত মার্বেল পাথর দিয়ে পাকা করে রাখা হয়েছে ।

কবরের উপর সৌধ নির্মান ও পবিত্র কোরআন ————–
কবরের উপর সৌধ নির্মান আল্লাহর নির্দশন সমূহের প্রতি সম্মান প্রর্দশনের সামিল ।

“—- যারা আল্লাহর নির্দশন সমূহের সম্মান করে তা অন্তরের পরহেজগারীর প্রমানস্বরুপ —“।
সুরা – হজ্জ/৩২ ।

আল্লাহর নির্দশন হলো এমন কোন প্রতীক যা আল্লাহর দিক নির্দেশক ।
যদি কেউ আল্লাহর সান্নিধ্য পেতে চায় তবে ঐ প্রতীকের মাধ্যমে তাতে পৌছাতে পারে । অবশ্য
” আল্লাহর নির্দশন ” অর্থ যদি তার দ্বীনের নির্দশন বুঝায় তবে আয়াতটির অর্থ হবে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে চায় তবে তার দ্বীনের নিদর্শন সমূহের স্থান প্রদর্শনের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হবে ।

“—- নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নির্দশন —-” ।
সুরা – বাকারা /১৫৮ ।

এমনকি কোরবানীর উদ্দেশ্যে যে উটকে মিনায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকেও আল্লাহর নির্দশন বলা হয়েছে ।

“—- আমরা কোরবানীর হ্রষ্টপুষ্ট উষ্ট্রকে তোমাদের জন্য আল্লাহর নির্দশন বানিয়েছি —” ।
সুরা – হজ্জ/৩৬ ।

“—— আল্লাহ যে সব গৃহকে মর্যাদায় উন্নীত করার এবং সেগুলোতে তার নাম উচ্চারন করার আদেশ দিয়েছেন , সেখানে সকাল ও সন্ধায় তার পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষনা করে এমন লোকেরা যাদের ব্যবসা বানিজ্য ও ক্রয় বিক্রয় আল্লাহর স্মরন থেকে , নামাজ প্রতিষ্ঠা করা থেকে এবং জাকাত প্রদান করা থেকে বিরত থাকে না —-‘ ।
সুরা – নূর / ৩৬,৩৭ ।

প্রথমত উপরে উল্লেখিত আয়াতে গৃহ বলতে শুধু মসজিদ বুঝানো হয় নি ।
বরং আয়াতের উদ্দেশ্য মসজিদসহ যে কোন স্থান যেখানে আল্লাহর নাম স্মরন করা হয় , যেমন নবীগন ও তাদের স্থলাভিষিক্ত পবিত্র প্রতিনিধিদের গৃহ ।
যে সমস্ত গৃহে ফেরেশতাগন হরহামেশা যাতায়াত করতেন বা করেন ।
এমনকি এ দাবিও সত্য যে , উপরিউক্ত আয়াতটিতে মসজিদ ভিন্ন অন্য গৃহে বা গৃহ সমূহের কথা বলা হয়েছে ।

“—— যখন তাহারা তাহাদিগের কর্তব্য বিষয় নিজদিগের মধ্যে বির্তক করিতেছিল তখন অনেকে বলিল ” উহাদিগের উপর সৌধ নির্মান কর ” । উহাদিগের প্রতিপালক উহাদিগের বিষয় ভাল জানেন । তাহাদিগের কর্তব্য বিষয় যাহাদিগের মত প্রবল হইল তাহারা বলিল ” আমরা তো নিশ্চয়ই উহাদিগের উপরে মসজিদ নির্মান করিব —-” ।
সুরা – কাহফ / ২১ ।

উপরে উল্লেখিত আয়াতে এটা পরিস্কার যে , কবরের উপর সৌধ বা মসজিদ নির্মান যদি অবৈধ বা বিদআত হত তাহলে অবশ্যই আল্লাহ অন্য আয়াতে তা নিষেধ করতেন ।
কিন্ত এর বিপক্ষে নেতিবাচক কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে কোথাও নেই ।

ইসলামের প্রথম যুগ এবং কিছু হাদিস ——————–
ইসলামের আর্ভিভাবের যুগ থেকেই মুসলমানদের মধ্যে কবরের উপর সৌধ নির্মানেরর প্রচলন ছিল এবং এ বিষয়টি কখনোই সাহাবী , তাবেঈন , তাবে তাবেঈনগনের প্রতিবাদের মুখোমুখি হয় নি ।

ইতিহাসের পরিক্রমায় একমাত্র ওয়াহাবী সম্প্রদায় এ রীতির বিরুদ্বে মৌখিক ও ব্যবহারিক প্রতিবাদ শুরু করে ।

যার চুড়ান্ত কার্যক্রম বর্তমানের ISIL এর মাজার ধ্বংসের কার্যক্রম পৃথিবীবাসী প্রত্যক্ষ করছে ।

বুখারীর বর্ননায় ,
আবদুর রহমান ইবনে আবি বাকরের মৃত্যুর পর হযরত আয়েশা নির্দেশ দিয়েছিলেন যে , তার কবরের উপর তাবু নির্মান এবং দেখাশোনার জন্য একজন ব্যক্তি নিয়োগের জন্য ।
— সহীহ বুখারী ২য় খন্ড , পৃ-১১৯ ।

হযরত উমর রাসুলের (সাঃ) স্ত্রী জয়নাব বিনতে জাহাশের কবরের উপর স্থাপনা নির্মানের আদেশ দেন এবং কেউ এ কাজে বাধা বা ফতোয়া প্রদান করে নি ।
তাবাকাতে ইবনে সাদ , ৮ম খন্ড , পৃ-৮০ ।

সাইয়েদ বাকরী বলেন যে , কবরের উপর সৌধ নির্মানের নিষেধাজ্ঞা হতে নবীগন , শহীদ ও সৎকর্মশীল বান্দারা বহির্ভুত ।
ইয়ানাতুত তালেবীন , ২য় খন্ড , পৃ-১২০ ।

কবরের উপর সৌধ নির্মানের বৈধতার বিষয় একদিকে বিশেষ দলীল রয়েছে যেমন সুন্নাত ও মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত রীতি অন্যদিকে সার্বজনীন বৈধতার দলিলও রয়েছে ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
এ বিষয় যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত আকারে মূল বিষয় গুলো তুলে ধরার চেষ্টা করেছি ।
বিস্তারিত জানতে হলে দয়া করে অতি সত্বর ” ওয়াহাবীদের সৃষ্ট সংশয়ের অপনোদণ ” বইটি সংগ্রহ করে পড়ুন ।

ওয়াহাবীদের সৃষ্ট সংশয়ের অপনোদন ,
আলী আসগর রেজওয়ানী ,
পৃষ্ঠা – ৬৯ ছায়া অবলম্বনে ।

SKL