হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) এর পানিপ্রার্থীরা —

হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ) এর পানিপ্রার্থীরা —

হযরত আলী (আঃ) এর পূর্বে হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের মত ব্যক্তিরাও হযরত যাহরা (সাঃআঃ) কে বিবাহ করার জন্য নিজেদের প্রস্ততির কথা ঘোষনা করেছিলেন ।
উভয়েই মহানবী (সাঃ) থেকে জবাব পেয়েছিলেন যে , যাহরা (সাঃআঃ) এর বিবাহের বিষয় তিনি মহান আল্লাহর ওহীর অপেক্ষায় আছেন ।

ঐ দুজন যখন নবীকন্যাকে বিবাহ করার ব্যাপারে সম্পূর্ন হতাশ হয়ে গেলেন তখন আওস গোত্রের প্রধান সাদ ইবনে মুআযের সাথে আলোচনা করলেন ।
অতঃপর তারা বুঝতে পারলেন যে , আলী (আঃ) ব্যতীত অন্য কেউই হযরত যাহরা (সাঃআঃ) এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ব হওয়ার যো্গ্যতা রাখেন না এবং নবীজী (সাঃ) এর মতও এর বাইরে নয় ।

ফলে তারা একত্রিত হয়ে হযরত আলী (আঃ) এর খোজে বের হলেন ।
অবশেষে আলী (আঃ) কে একজন আনসারের সাথে খেজুর বাগানে পানি দেয়ারত অবস্থায় পেলেন ।

তারা আলী (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে বললেন , ” কুরাইশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নবীকন্যার পানিপ্রার্থনা করেছিলেন । মহানবী (সাঃ) তাদেরকে বলেছেন , যাহরা (সাঃআঃ) এর বিবাহের বিষয়টি মহান আল্লাহর অনুমতির সাথে সম্পর্কযুক্ত ।
ফলে আমরা আশা করি যে , তুমি যদি নবীকন্যার পানিপ্রার্থনা কর তাহলে তুমি ইতিবাচক ফল পাবে । এক্ষেত্রে যদি তোমার সম্পদ কম থাকে , আমরা তোমাকে সাহায্য করতে প্রস্তত ” ।

এ কথাগুলো শুনে হযরত আলী (আঃ) দুচোখ আনন্দাশ্রুতে ভরে গেল ।
তিনি বললেন , ” আমি রাসুল (সাঃ) এর কন্যাকে পছন্দ করি এবং তাঁকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক ” । তিনি একথা বলে হাতের কাজ বন্ধ করে নবীগৃহের দিকে রওয়ানা হলেন ।

মহানবী (সাঃ) তখন উম্মে সালমার গৃহে অবস্থান করছিলেন ।
আলী (আঃ) নবীগৃহের দরজাতে টোকা দিতেই মহানবী (সাঃ) উম্মে সালমাকে বললেন , ” ওঠো , দরজা খোল । এ হল সেই ব্যক্তি যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে নিজের প্রানের চেয়েও অত্যাধিক ভালবাসে ” ।

উম্মে সালমা বলেন , মহানবী (সাঃ) যাঁর এত প্রশংসা করলেন , সে ব্যক্তিকে চেনার আগ্রহ আমাকে এতটাই আছন্ন করেছিল যে , দ্রুত হাটার জন্য আমি পা পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম ।
দরজা খুলে দিলাম , আলী (আঃ) সালাম দিয়ে নবীগৃহে প্রবেশ করলেন এবং নবীজী (সাঃ) এর সামনে গিয়ে বসলেন ।
কিন্ত লজ্জা ও নবীজী (সাঃ) এর মহত্বের কারনে মাথা অবনত করে চুপচাপ বসে ছিলেন ।
নীরবতা ভঙ্গ করে নবীজী (সাঃ) বললেন , ” মনে হয় কোন কাজে এসেছ ” ।
আলী (আঃ) জবাবে বললেন , ” রিসালতের পরিবারের সাথে আমার আত্মীয়তার বন্ধন এবং দ্বীনের পথে আমার দৃঢ়তা , জিহাদ ও ইসলামের অগ্রগতিতে আমার প্রচেষ্টা সম্বন্ধে আপনি অবগত আছেন ” ।

মহানবী (সাঃ) বললেন , ” হে আলী , তুমি যা বলছ , তোমার অবস্থান তার চেয়েও বহুগুন উপরে ” ।
আলী (আঃ) বললেন , ” ফাতেমার সাথে আমার বিবাহ হওয়ার বিষয়টিকে আপনি কি মঙ্গলজনক মনে করেন ” ?

মহানবী (সাঃ) এক্ষেত্রে নিজ জীবনসঙ্গী নির্বাচনে নারীদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার মূলনীতিকে অনুসরন করলেন ।

আলী (আঃ) এর প্রস্তাবের জবাবে বললেন , ” তোমার পূর্বে আরও কয়েকজন আমার কন্যার পানিপ্রার্থনা করেছিল । আমি তাদের আবেদনের কথা আমার কন্যাকে জানিয়েছি ।
কিন্ত তাদের সম্পর্কে তাঁর চেহারায় গভীর অনাগ্রহের ছাপ ফুটে উঠেছিল ।
এখন তোমার প্রস্তাবও তাঁকে জানাব । অতঃপর তার ফলাফল তোমাকে জানাব ” ।

মহানবী (সাঃ) হযরত যাহরা (সাঃআঃ) এর গৃহে প্রবেশ করলেন ।
নবীকন্যা উঠে দাঁড়ালেন এবং পিতার কাধ থেকে রেদা ( পোষাক বিশেষ ) নামিয়ে রাখলেন , তাঁর পায়ের জুতা খুলে দিলেন ও তাঁর পবিত্র পদদ্বয় মোবারক নিজ হাতে পানি দিয়ে ধুয়ে দিলেন । অতঃপর ওযু করে পিতার পাশে বসলেন ।

নবীজী তাঁর কন্যার সাথে এভাবে কথা শুরু করলেন , ” আবু তালেবের পুত্র আলী হচ্ছে এমন ব্যক্তিদের অন্যতম , ইসলামে ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত আছি । আর আমি আল্লাহর কাছে এই কামনা করেছি যে , তিনি যেন তোমাকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বরের সাথে তোমার বিবাহের ব্যবস্থা করে দেন । এখন আলী তোমার নিকট পানিপ্রার্থনা করতে এসেছে । এই বিষয় তোমার মত কি ” ?

এ সময় হযরত যাহরা (সাঃআঃ) এক গভীর নীরবতায় নিমগ্ন হলেন , কিন্ত নিজের চেহারা পিতার কাছ থেকে ঘুরিয়ে নেন নি এবং তাঁর চেহারায় নূন্যতম অস্বস্তিও দেখা যায় নি ।
মহানবী (সাঃ) উঠে দাড়ালেন এবং বললেন , ” আল্লাহ মহান , তাঁর নীরবতাই তাঁর সম্মতি ” ।
সূত্র – কাশফুল গ্বাম্মাহ , খন্ড- ১ম , পৃ – ৫০ ।

সম্মানীয় পাঠক ,
দেখুন , কি অপূর্ব যুগল দম্পতি ।
বরের জন্ম আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা গৃহের একবারে অভ্যন্তরে ,
কনের জন্ম নবী সম্রাট মুহাম্মাদ (সাঃ) এর পবিত্র গৃহে ,
এবং এই বিবাহের ঘটক বা প্রধান সম্বন্বয়কারী হচ্ছেন স্বয়ং আল্লাহ ।

এই রকম সর্বশ্রেষ্ঠ সোনায় সোহাগা বর- কনের জুটি কেয়ামত পর্যন্ত আর দ্বিতীয়টি হয়েও নি আর হবেও না ।

এই আলী (আঃ) এবং ফাতেমা (সাঃআঃ) এর শীয়া — তথা বার ইমামীয়া শীয়া হয়েই যেন আল্লাহ আমাদের মৃত্যু দেন ।

 

— বেলায়েতের দ্যুতি ,
মূল -আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানী ,
বাংলা অনুবাদ – আব্দুল কুদ্দুস বাদশা ও মোঃ মাঈনউদ্দিন ,
পৃ- ৮৭ ছায়া অবলম্বনে ।

SKL