ইমাম হোসেন (আঃ) স্মরনে প্রকাশ্য শোক মিছিল , মাতম , ক্রন্দন , আযাদারী করা ওয়াজীব নাকি সুন্নাত —

ইমাম হোসেন (আঃ) স্মরনে প্রকাশ্য শোক মিছিল , মাতম , ক্রন্দন , আযাদারী করা ওয়াজীব নাকি সুন্নাত ?

ইদানীং এই বিষয়টি অনেকেই বলছেন যে , কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার স্মরনে আশুরার দিন প্রকাশ্য শোক মিছিল , মাতম , দুঃখের গান গাওয়া , তাজিয়া , আযাদারী করা বেদআত ।
অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) করেন নি ।

বেশ ভাল কথা !
তাই যদি হয় তবে রাসুল (সাঃ) তো অনেক কিছুই করেন নি ।

যেমন – উনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত টাইলসে মোড়ানো আলিশান মসজিদে কার্পেটের উপর মোটা জায়নামাজে নামাজ আদায় করেন নি , উনি জাহাজ বা বিমানে চঁড়ে মক্কাতে হজ্ব করতে যান নি , উনি রংগীন টেলিভিশনে ধর্মীয় প্রোগ্রাম করেন নি , উনি লাখ টাকার বায়না নিয়ে ওয়াজ করতে যান নি , উনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত প্রাডো জীপ গাড়ীতে চলাফেরা করেন নি , উনি বৌ বাচ্চা ফেলে রেখে সাত , তিন , চল্লিশ দিনের চিল্লাতে যান নি , উনি ট্যাক্স ভ্যাট ফ্রী পীরালী ব্যবসাতে নামেন নি , উনি কোন রাজা বাদশাহের বেতনভুক্ত গ্রান্ড মুফতীর গোলামি করেন নি – ইত্যাদি আরও বলা যাবে !

এগুলি যদি বেদআতি না হয় তাহলে মহান আল্লাহ ও তাঁর নবীজীর (সাঃ) প্রানপ্রিয় নাতি হোসেনের (আঃ) এর জন্য আযাদারী কেন বেদআতি হবে ?

পবিত্র কোরআন এবং সহীহ হাদিসের কোথাও কি বলা আছে যে , আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) হোসেনের (আঃ) জন্য আযাদারী করতে নিষেধ করেছেন ?

পাঠক , এই বিষয় যখন কোন প্রমান হাজির করতে পারে নি তখন আরেক টেকনিক শুরু হয়েছে –

তবে হ্যা , চার দেয়ালের মধ্যে আপনি ওঁনাদের স্মরনে কান্নাকাটি , আলোচনা সভা , দোয়া দরুদ ইত্যাদি করতে পারেন । কিন্ত কিছুতেই প্রকাশ্যে করা যাবে না ।

প্রকাশ্য দিবালোকে খোলা আসমানের নীচে ৭২ জনকে হাজার হাজার কুলাঙ্গার মিলে জবাই করতে পারল , কিন্ত এই জঘন্য হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্বে নীরব প্রতিবাদ , ক্ষোভ বা আযাদারী প্রকাশ্যে করলেই বিদআত !

প্রকাশ্যে জবাই করাটা বিদআত নয় – শুধু প্রকাশ্যে আযাদারী করাটাই বিদআত !

এই হল , সার সংক্ষেপ ঈয়াযীদি রাজনীতি ।

সোজা কথা হল – যিনি বা যারা প্রকাশ্য আযাদারীর বিপক্ষে বলেন , তারা হোসেনিয়াতকে আঁড়াল করতে চান ।
ঠিক যেভাবে বহু খলীফা ও বাদশাহ কারবালার জিয়ারত নিষিদ্ব করেছিল ।

যাইহোক , মূল প্রসংগে আসি ।

আযাদারী — ওয়াজীব নাকি সুন্নতে রাসুল (সাঃ) ?

দেখুন , পবিত্র কোরআনে নামাজ , হজ্ব , যাকাত , ফেৎরা , বিবাহ ইত্যাদি বহু বিষয় পালন করার জন্য আল্লাহ হুকুম দিয়েছেন ।
এখন নামাজ কিভাবে , কোন নামাজে কত রাকাত , নামাজে সুরা ফাতিহা , তাশাহুদ , রুকু , সেজদাতে কি বলতে হবে বা কিভাবে হাত বাঁধতে হবে কি হবে না , কিভাবে সালাম ফেরাতে হবে ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয় কোরআনের কোথায় বলা আছে ?

হজ্বে কতবার তাওয়াফ করবেন , শয়তানকে কতবার ঢিল ছুড়বেন , সাফা মারওয়া কতবার সাঁঈ করবেন ইত্যাদি খুটিনাটি বিষয় কোরআনে কোথায় বলা আছে ?

একই ভাবে কতটুক পরিমান সম্পদ থাকলে কত পার্সেন্ট যাকাত , কোন বিধান অনুযায়ী বিবাহ করবেন ইত্যাদি বহু ইবাদত আমল কিভাবে কোন পদ্বতিতে করতে হবে তার বিস্তারিত বর্ননা কোরআনে কোথাও বলা নাই ।

ইত্যাকার যাবতীয় বিষয়াবলী সবিস্তারে মৌখিক বর্ননা ও নিজে পালন করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে মহানবী (সাঃ) নিজে পালন করে , বলে ও দেখিয়ে দিয়েছেন ।
তো রাসুল (সাঃ) এর এই বলা বা করাটুকু আমাদের জন্য ওয়াজীব হয়ে গেছে ।

নামাজ , হজ্ব , যাকাত , ফেৎরা ইতাদি বিষয়গুলোর ব্যাপারে মহানবী (সাঃ) এর মৌখিক নির্দেশ ও পালনের পদ্বতিগুলো যদি আমরা ওয়াজীব হিসাবে গ্রহন করে নিতে পারি —–
তাহলে ঐ একই রাসুল (সাঃ) ইসলামের প্রথম শহীদ হযরত হামজা (রাঃ) এর মৃত্যুতে হামজার শোকে সকল মহিলাদের সম্মিলিত ভাবে ক্রন্দনের নির্দেশকে — আমাদের ওয়াজীব হিসাবে গ্রহনে সমস্যা কোথায় ?

জীবিত নিখোঁজ পুত্র হযরত ইউসুফ (আঃ) এর শোকে পিতা ঈয়াকুব (আঃ) ক্রন্দন করতে করতে দুই চোখ পুরোপুরি ভাবে অন্ধ হয় যায় ।
একবার ভাবুন , নিখোঁজ জীবিত পুত্রের জন্য শুধু ক্রন্দন করতে করতে চোখ অন্ধ হয় যায় –
কই এখানে তো আল্লাহ নবীকে একবারও শাসন করেন নি – এই বলে যে ,
হে নবী ! তোমার এত বড় সাহস যে , তুমি বেদআতি কর্ম করিতেছ !

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর পরিষ্কার আদেশ যে , নবীজী (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বায়েত (আঃ) গনকে মহব্বত ও ভালবাসতে হবে ।
এবং আল্লাহ শুধু এটা বলেই ক্ষান্ত হন নি – উনি স্বয়ং নিজে ও ফরেশতাগন সহ নবী (সাঃ) ও আহলে বায়েতের (আঃ) উপর সালাম ও দরুদ পেশ করেন এবং আমাদেরকেও একই আদেশ করেছেন ।
প্রাত্যাহিক নামাজে আহলে বায়েতের উপর দরুদ পড়া বাধ্যতামূলক করেছেন ।

আহলে বায়েতের (আঃ) প্রতি মহব্বত হল মূল বিষয় ।

ঈবলীশের ৬ লক্ষ বছরের সমস্ত নামাজ বাতিল হয়ে গেল শুধুমাত্র আল্লাহ কতৃক নির্বাচিত খলীফা হযরত আদম (আঃ) এর প্রতি মহব্বতের অভাবে ।
কারবালার ময়দানে ইমাম হোসেন (আঃ) কে জবাই যারা করেছিল তারাও নামাজি মুসলমান ছিল ।
তাদের আদায়কৃত নামাজ ব্যর্থ হল , শুধুমাত্র ইমাম হোসেন (আঃ) এর প্রতি মহব্বতের অভাবে ।

নামাজ তো মুনাফিকরাও আদায় করে ।
কিন্ত কোন মুনাফিক ও হারামজাদা কখনই আহলে বায়েতকে মহব্বত করতে পারবে না ।

বিষয়টি পরিস্কার যে , আহলে বায়েতের প্রতি মহব্বত , ভালবাসা ব্যতীত সকল প্রকার এবাদত বন্দেগী বাতিল ।

কারবালার মর্মান্তিক দুঃখজনক ঘটনার স্মরনে প্রকাশ্য শোক মিছিল , মাতম , আযাদারী হচ্ছে – একজন বার ইমামীয়া শীয়ার রুহ বা প্রান ।
এই রুহ বা প্রান যদি না থাকে তাহলে এবাদত বন্দেগী করবে কিভাবে ?
রুহ ব্যতীত শরীর যেমন মৃত ঠিক তেমনি ভাবে হোসেনের আযাদারী ব্যতীত ঐ মানুষটি হচ্ছে জিন্দা লাশ ।

ভুলে যাবেন না যে , মানব শিশুর জীবন শুরুই হয় ক্রন্দণের মধ্য দিয়ে । শিশু যদি জন্মের সাথে সাথে চীৎকার দিয়ে না কাঁদে তখন ডাক্তার তার পিঠে থাপ্পড় মেরে হলেও কাঁদায় ।
এই ক্রন্দন যদি বেদআত হয় তাহলে পৃথিবীর সব শিশু কি বেদআতি জন্ম বাচ্চা !

যে কাঠমোল্লা এই ক্রন্দন এই আযাদারীকে বেদআত বলে ফতোয়া দেয় সেই কাঠমোল্লাও কিন্ত জন্মের সময় চীৎকার করে কেঁদেছে ।

অতএব , হে আযাদারগন পৃথিবীর মানুষ কে কি বলল সেটা বিবেচনার প্রয়োজন নেই —

আজ সকল নবী রাসুল , চির দুঃখিনী মা যাহরা (সাঃআঃ) অঝোরে কাঁদছেন – আপনিও সেই আযাদারীতে শরীক হয়ে যান ।

দুটি হাদিস বলে আপাতত বিদায় —

আহলে বাইত (আঃ) প্রেমীদের মৃত্যু হচ্ছে শাহাদতের সমতুল্য –
ফাতেমা বিনতে মুসা ইবনে জাফার (আঃ) হতে বর্ণিত , – যার সনদ হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃ আঃ) এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে – তিনি বলেন , আল্লাহর রাসূল (সঃ) বলেছেন –
জেনে রাখ ! যে ব্যক্তি আহলে বাইত (আঃ) এর ভালবাসা অন্তরে নিয়ে মৃত্যুবরণ করে , তার মৃত্যু শহীদের মৃত্যুর ন্যায় ’।
সূত্র – আওয়ালেমুল উলুম , খণ্ড ২১ , পৃ. ৩৫৩ ।

ইমাম হুসাইন (আঃ) এর জন্য ক্রন্দন , মাতম , আযাদারী , শোক প্রকাশ প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন ,
” নিশ্চয়ই প্রত্যেক মু’মিনের হৃদয়ে হুসাইনের শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে , তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হবে না । ”
তিনি (সঃ) আরও বলেছেন , ‘ নিশ্চয়ই সমস্ত চোখ কিয়ামতের দিন কাঁদতে থাকবে , কেবল সেই চোখ ছাড়া যা হুসাইনের বিয়োগান্ত ঘটনায় কাঁদবে , ঐ চোখ সেদিন হাসতে থাকবে এবং তাকে জান্নাতের সুসংবাদ ও বিপুল নেয়ামত দান করা হবে । ‘
ইমাম জয়নুল আবেদিন (আঃ) থেকে নিম্নের হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে –

” যদি কোন মু’মিন ইমাম হুসাইনের (আঃ) শাহাদতের কথা স্বরণ করে ক্রন্দন করে , তাহলে এ ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে তার চোখ থেকে যে অস্রু ঝড়বে , সেগুলোর প্রতিটি ফোটার জন্য আল্লাহ তায়ালা বেহেস্তে তার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করবেন এবং সেখানে সে চিরন্তন অবস্থান করবে ” ।
সূত্র – সওয়াবুল আমাল , ১ম খন্ড , পৃ. ১০৮ এবং মুনতাখাবুল মিযানুল হিকমাহ , পৃ. ২৮ ।

সুপ্রিয় আযাদারগন , যার যা সামর্থ অনুযায়ী আশুরার যে কোন প্রকাশ্য শোক মিছিল , মাতম , আযাদারীতে যোগ দিন ।

অন্যান্য এবাদত বন্দেগী অতি অবশ্যই ওয়াজীব আমল ।
তবে সর্বোৎকৃষ্ট ওয়াজীব আমল হচ্ছে – মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বায়েত (আঃ) গনের দুঃখে নিজেকেও শরীক করা ।

ইয়া মজলুম , ইয়া ইমাম (আঃ) ,
ইয়া হোসাইনিয়া – ইয়া হোসেন , ইয়া হোসেন (আঃ) ।

SKL