আমার পর কেউ যদি নবী হত তাহলে হযরত ওমর হত —

বহুল প্রচারিত একটি কথা শোনা যায় –
আমার পর যদি কেউ নবী হইত তাহলে ওমর হইত — ।

বেশ ভাল কথা ।

পাঠক ,
আসুন , উপরে উল্লেখিত কথাটির কিছুটা বিশ্লেষন করা যাক ।

বিনীত অনুরোধ শুধু একটি যে , নিরপেক্ষ দৃষ্টিভংঙ্গি নিয়ে পড়ার অনুরোধ রইল ।
শীয়া সুন্নি ইত্যাদি সকল মাযহাব থেকে মুক্ত হয়ে তৃতীয় স্থানে দাঁড়িয়ে উপলব্দি করুন ।
সময় সল্পতার জন্য লিখার কলেবর বৃদ্ধি না করে সংক্ষেপে মূল ভাবটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে ।

নবী (সাঃ) বলেছেন , আমার পরে কেহ নবী হলে হযরত ওমর নবী হতেন ।
সূত্র – সহীহ আল বোখারী , আধুনিক ৩ঃ৩৪১৪ / তিরমিযি , ইফাবা-৩৬৮৬ ।

অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায় , হযরত আবু বকরের ঈমান একদিকে আর সকল মুসলিমের ঈমান একত্রে অন্যদিকে হলেও আবু বকরের ঈমান বেশী হবে !
তবে প্রশ্ন দেখা দেয় যে , হযরত আবু বকর থেকে ঈমানের দিকে অনেক দুর্বল হওয়া সত্বেও হযরত ওমর নবী হবার উপযুক্ত হলেন কিভাবে ?

উল্লেখ্য , হযরত আবু বকরের ঈমানের গভীরতা ও হযরত ওমর এর নবী হবার যোগ্যতা থাকা সত্বেও সহীহ হাদিস অনুযায়ী এনারা উভয়েই নবীজি (সঃ) কে ওহুদ যুদ্ধে সম্পূর্ন একলা ফেলে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়ন করেন ।
সূত্র – তাফসীরে মারেফুল কোরান , পৃঃ ২০০-২০১ , ২০৮ ।

উল্লেখ্য যে , নবীজী (সাঃ) এর বিপকালীন সময়ে একলা ফেলে নিজেদের জীবন রক্ষার্থে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করার বিষয়টি “বড় ঈমানদার” বা “নবী” হবার যোগ্যতাকে প্রচন্ড প্রশ্নবিদ্ব করে ।

” — হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কাফেরদের সাথে মুখোমুখি তখন তাদের কাছ থেকে পৃষ্ঠ প্রর্দশন করে পলায়ন কর না । আর যে লোক সেদিন তাদের থেকে পশ্চাদপসরণ করবে , অবশ্য যে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তনকল্পে কিংবা যে নিজ সৈন্যদের নিকট আশ্রয় নিতে আসে সে ব্যতীত অন্যরা আল্লাহর গযব সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে । আর তার ঠিকানা হল জাহান্নাম। বস্তুতঃ সেটা হল নিকৃষ্ট অবস্থান — “।
সূরা – আনফাল / ১৫ , ১৬ ।

হযরত ওমরের “নবী” হবার যোগ্যতা থাকা সত্বেও সহীহ হাদিস অনুযায়ী “জুনুব” অবস্থায় পানি পাওয়া না গেলে “তায়াম্মুম” করতে হয় – আল কোরান -৫ঃ৬ , বিধান জারি থাকলেও হযরত ওমর নামাজ ছেড়ে দিতে বলেন ।
সূত্র – সহীহ আল বোখারী , আধুনিক . ১ঃ৩২৬, ৩৩২-৩৩৫ ।

হযরত আম্মার বিন ইয়াসির (রাঃ) বর্ণিত । একদা তিনি ও হযরত ওমর (রাঃ) সফরে অপবিত্র হয়ে পড়লে ওমর নামাজ পড়লেন না । কিন্তু আম্মার (রাঃ) মাটিতে গড়াগড়ি করলেন এবং নামাজ পড়লেন । নবী (সঃ) আম্মার (রাঃ)-এর উক্ত বর্ণনা শোনে বললেন , এরূপই তোমার জন্য যথেষ্ট ছিল ।
সূত্র – সহীহ আল বোখারী , মিনা. ১ঃ৩২৬ ।

অন্যদিকে , হযরত ওমর জীবনের দীর্ঘ সময় মুশরিক ছিলেন এবং মুসলিম নির্যাতনে অংশ গ্রহণ করেন ।
আর পবিত্র আল কোরআন বলে , কোন নবী ও রাসুলগন তাদের জীবনে পৌত্তিলকতা করেন নি । তাই হযরত ওমর জীবনের বিরাট একটা অংশ “পৌত্তলিক” ছিলেন একথা জানার পরেও রাসূল (সাঃ) কি করে বলবেন যে , আমার পরে ওমর “নবী” হতেন (যদি কেউ হত) —
এটা অলীক কল্পনার মত শোনায় ।

বিশেষত , হযরত ওমর “নবী” হবার যোগ্য হলে প্রশ্ন এসে যায় তাহলে তিনি প্রথম “খলীফা” হলেন না কেন ?

তাছাড়া নবী (সাঃ) যখন খ্রীষ্টান পাদ্রীদের সাথে “মোবাহেলা” করলেন (সূত্রঃ বোখারী আ. ৪ঃ৪০৩১; মারেফুল কোরান, পৃঃ ১৮০-৮১), তখন নিজেদের লোক হতে “আবু বকর” ও “ওমর” কে এবং নিজেদের নারী হতে “আয়েশা ও হাফসা” কে নির্বাচিত করেননি ।
সেখানে তিনি “হযরত আলী (আঃ) , ফাতেমা (সাঃআঃ) , হাসান (আঃ) ও হোসেন (আঃ) কে নির্বাচিত করেছিলেন ।
তাই উপরন্তু হাদিসগুলো আমলে নিয়ে চিন্তা করতে হবে বলে সমীচিন মনে করি ।

অন্যদিকে, হযরত ফাতেমা (সাঃআঃ) আবু বকরের উপড় অসন্তুষ্ট হলেন এবং আবু বকরের সাথে সম্পর্কছেদ করলেন । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি (ফাতেমা) তার (আবু বকর) সাথে সম্পর্ক রাখেননি ।
সূত্র – সহীহ আল বোখারী , মিনা. ৪ঃ২৮৬৩ ।

উল্লেখ্য , রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ফাতেমা আমারই একটা অংশ । যা তাঁকে অসন্তষ্ট করে , তা আমাকেও অসন্তষ্ট করে । তাকে যা ‘কষ্ট’ দেয়, আমাকেও তা ‘ কষ্ট দেয় ।
সূত্র – মুসলিম, ইফাবা, ৫ঃ৬০৮৬, ৬০৮৭ / তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৮৬৭, ৩৮৬৯, মুসলিম, সোলেমানিয়া, ৪০তম অধ্যায়, ৬০৮৮ / সহীহ আল বোখারী , মিনা. ৫ঃ৩৪৮৭, মুসলিম, সোলেমানিয়া, ৪০তম অধ্যায়, ৬০৮৯ ।

রাসূল (সঃ) এর কাছে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ফাতেমা (সাঃআঃ) এবং পুরুষদের মধ্যে আলী (আঃ) ।
সূত্র – তিরমিযি , ইফাবা, ৬ঃ৩৮৭৪ ।

তাবুকের যুদ্ধে রাসূল (সাঃ) আলী (আঃ) কে স্থলাভিষিক্ত করে রেখে গেলে আলী (আঃ) বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ ! আমাকে মহিলা ও শিশুদের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছেন ?
রাসূল (সঃ) বললেন , তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে , মূসার কাছে হারুণের যে মর্যাদা ছিল , আমার কাছে তোমার সেই মর্যাদা ! তবে জেনে রাখবে আমার পরে কোন নবী নেই ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭২৪ / মুসলিম, ইফাবা, ৫ঃ৬০০০, ৬০০১, ৬০০২ ।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন , আলী তো আমার আমি তো আলীর । সে তো আমার পরবর্তী সকল মু’মিনেরই মাওলা ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, হাঃ ৩৭১২ ।

আমি যার বন্ধু আলী ও তাঁর বন্ধু ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭১৩ ।

হে আল্লাহ ! আলী যে দিকে ঘুরবে হক ও সত্যকেও তুমি সে দিকে ঘুরিয়ে দিও ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭১৪ ।
হে আলী ! তুমি আমার এবং আমি তোমার জন্য ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭১৬ ।

আলী “আমার” আমি “আলীর” । আমার পক্ষ থেকে আমি আর আলী ছাড়া আর কেউ আমার “দায়িত্ব” পালন করতে পারে না ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭১৯ ।

হে আলী ! দুনিয়া ও আখেরাতে তুমি আমারই “ভাই” ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭২০ ।

আল্লাহর সবচেয়ে “প্রিয় বান্দা” আলী ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭২১ ।

রাসূল (সাঃ) হলেন জ্ঞানের নগরী আর আলী হল সেই জ্ঞান নগরীর দরজা ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭২৩ ।

তায়েফ যুদ্ধের দিন রাসূল (সাঃ) আলী (আঃ) এর সাথে গোপনে কথা বললে লোকেরা বলাবলি করতে লাগল যে , নবীজী (সাঃ) তাঁর চাচাত ভাইয়ের সাথে দীর্ঘক্ষণ গোপনে কথাবার্তা বলছেন, রাসূল (সাঃ) বললেন , আমি তাঁর সাথে গোপনে কথা বলিনি , বস্তুতঃ আল্লাহ তা’আলাই তার সঙ্গে কথা বলেছেন ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭২৬ ।

হে আলী ! আমার ক্ষেত্রে তোমার স্থান হল মূসার ক্ষেত্রে হারুনের মত । তবে আমার পরে কেউ নবী নেই ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭৩০, ৩৭৩১ / মুসলিম, ইফাবা, ৫ঃ৫৯৯৯, ৬০০৩ / সহীহ আল বোখারী, মিনা. ৫ঃ৩৪৩৪ ।

আলী (আঃ) এক যুদ্ধে ছিলেন । তাই রাসূল (সাঃ) দুই হাত তুলে দোয়া করেছিলেন , হে আল্লাহ ! আলীকে পুনর্বার না দেখিয়ে আমার মৃত্যু দিও না ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭৩৭ ।

আলী (আঃ) প্রথম মুসলিম । সর্ব প্রথম তিনি সালাত আদায় করেন ।
সূত্র – তিরমিযি, ইফাবা, ৬ঃ৩৭৩৪, ৩৭২৮ ।

পাঠক ,
আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত ও বিবেকবান একজন মানুষ । এখন আপনিই বিবেচনা করুন , প্লীজ ।

SKL