মাওলা আলী কেন বলা হয় —

হাদিসে গাদীর ও মাওলা শব্দের ব্যবহার প্রসংগ —-

অনেকেই প্রশ্ন করেন যে ,
হযরত আলী (আঃ) এর নামের সাথে কেন ” মাওলা ” শব্দটি ব্যবহার করা হয় ?

পাঠক ,
আসুন কারনটা জেনে নেই –

গাদীর দিবসে রাসুল (সাঃ) স্বয়ং নিজেই হযরত আলী (আঃ) সম্পর্কে যে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন যে ,
“من کنت مولاه فهذا علی مولاه”

বাংলা অনুবাদ – ” আমি যার মাওলা এই আলীও তার মাওলা বা অভিভাবক ”।

এ হাদিস সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে কোন রকম দ্বন্দ্ব না থাকলেও , নবীজী (সাঃ) এর ওফাতের বেশ কিছু বছর পরে তাঁর মাওলা শব্দের অর্থ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য দেখা যায় ।

অনেকে মাওলা শব্দকে অভিভাবক অর্থে , আবার অনেকে বন্ধু অর্থে ব্যবহার করে থাকেন ।

কিন্ত এ শব্দটি এমন একটি গ্রহনীয় শব্দ যা ওই সময় কেউই এ নিয়ে বিন্দুমাত্র দ্বিধাদ্বন্দ্ব করেনি ।
গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গরা এ হাদিসের বর্ণনার পর আলী (আঃ) কে মোবারকবাদ দেন ।

তাহলে আমাদের দেখতে হবে যে ,
ইসলামের প্রথম দিকে “মাওলা” শব্দ দিয়ে কি বুঝান হত ।

হাদিসে গাদীরে যে মাওলা শব্দের ব্যবহার রাসুল (সাঃ) করেছেন তার মূল ক্রিয়া হচ্ছে ওয়ালি আর এ শব্দ খেলাফতের জন্যও ব্যবহার করা হয়ে থাকে ।

আর ইসলামের প্রথমদিকে এ শব্দটি খেলাফতের জন্যই ব্যবহৃত হত ,
যেমনটি করেছিলেন প্রথম এবং দ্বিতীয় খলীফাগণ ।

১। প্রথম খলিফা আবু বকর বলেছিলেন ,
قال ابوبكر : قد وُلِّيتُ أمركم ولست بخيركم . إسناد صحيح . البداية والنهاية ، ج 6 ، ص ،

সহীহ হাদিসে বর্ননা মতে –
আবু বকর বলেছিলেন , আমি তোমাদের কাজের জন্য খলীফা নির্ধারিত হয়েছি ।
সূত্র – আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৩৩ ।

এ হাদিসের দ্বারা আমরা জানতে পারি যে , হযরত আবু বকর وُلِّيتُ শব্দ দিয়ে খলীফা বুঝিয়েছেন ।

আর কেউ তখন আপত্তি বা প্রতিবাদ করেনি কারণ সাধারনত ওয়ালি শব্দটি খলিফার জন্যই ব্যবহৃত হত ।

আবার অপর এক হাদিসে তিনি বলেছেন:
وَلَّيْتُ عليكم عمرَ . جامع الاصول لابن الأثير ج 4 ص .

আমি ওমরকে তোমাদের উপর খলীফা নির্ধারণ করেছি ।
সূত্র – ইবনে আসিরের জামেউল উসুল , ৪র্থ খন্ড , পৃষ্ঠা – ১০৯ ।

তখনও কিন্ত আপত্তি বা প্রতিবাদমূলক কোন কথা হয়নি ।
কারন সব মুসলমানরাই এ শব্দের অর্থের সাথে খুবই সুপরিচিত ছিলেন ।

আবারও তিনি বলেন ,
اللهم وليته بغير أمر نبيك . الثقات لابن حبان: ج

হে আল্লাহ আমি তাকে (ওমরকে) তোমার নবী’র (সাঃ) হুকুম ছাড়া খলীফা বানিয়েছি ।
সূত্র – ইবনে হাইয়ানের আস সিকাত, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৯৩ ।

এখানেও কেউ অন্য কোন অর্থের সম্ভাবনা হতে পারে বলে কথা বলেন নি ।

২। ওমর বলেছিলেন ,

قال عمر : فلمّا توفّي رسول اللّه قال أبو بكر : أنا وليّ رسول اللّه | . . . ثُمَّ تُوُفِّيَ أَبُو بَكْر وَأَنَا وَلِيُّ رَسُولِ اللَّهِ | وَوَلِيُّ أَبِي بَكْر . مسلم : 5 / 152 /
4468
ওমর বলেন , যখন আল্লাহ’র রাসুল (সাঃ) মৃত্যুবরণ করেন আবু বকর বললেন , আমি আল্লাহ’র রাসুলে’র (সাঃ) খলীফা … অতঃপর আবু বকর মৃত্যুবরণ করলেন এখন আমি হচ্ছি আল্লাহ’র রাসুলে’র (সাঃ) খলীফা ও আবু বকরের খলীফা ।
সূত্র – সহীহ মুসলিম, ৫ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৫২, হাদিস: ৪৪৬৮ ।

তখনও বেশীর ভাগ মুসলমানরা চোখ বন্ধ করে ওমরকে দ্বিতীয় খলীফা মেনে নিলেন কেউ বলল না যে , ” ওয়ালি ” শব্দের অর্থ হচ্ছে বন্ধু বা সাথি ।

এ বর্ণনা অনুযায়ী হাদিসে গাদীর এ খুমে রাসুল (সাঃ) যে বলেছিলেন ,
” আমি যার মাওলা আলীও (আঃ) তার মাওলা “।
তার অর্থ হচ্ছে আলী (আঃ) আমার পর তোমাদের উপর আমার খলীফা ।

যদি মাওলা শব্দের অর্থ বন্ধু হয় যা অনেকে বলে থাকেন তাহলে প্রথম এবং দ্বিতীয় খলীফাকে খলীফা বলা ঠিক হবে না যা অনেকেই বলেন ।
বরং বলতে হবে তারা দুজন মুসলমানদের বন্ধু ছিলেন ।

অন্যদের ক্ষেত্রে “মাওলা” শব্দটির অর্থ নিয়ে কোন প্রকার মতভেদ বা দ্বিধাদ্বন্ধ নেই ।
মতভেদ তখনই শুরু হয়ে যায় যখন একই “মাওলা” শব্দটি ইমাম আলী (আঃ) এর ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় !

তা না হলে আলী (আঃ) এর ক্ষেত্রে এই শব্দ নিয়ে এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেন ?
কেন এত চক্রান্ত ,
কেন এত মতভেদ ,
কেন এত হিংসা , বিদ্বেষ —
নাকি এসব কুতর্কের পিছনে অন্য কোন নোংরা রাজনীতির খেলা আছে ?

পাঠক ,
আমি শুধু ঐতিহাসিক তথ্যগুলো তুলে ধরলাম ।
এখন নিরপেক্ষ মন নিয়ে একটু ভেবে দেখবেন কি !

SKL