কে এই ঈয়াযীদ —

প্রশ্ন –
জনাব ঈয়াযীদ ইবনে মূয়াবীয়া ওরফে ঈয়াযীদ কে ?

সুপ্রিয় পাঠক ,
আমরা শুধু এতটুকু জানি যে , ঈয়াযীদ হচ্ছে মূয়াবীয়ার পুত্র এবং সে খুব খারাপ লোক ।
কে ঈয়াযীদের গর্ভধারিনী মা , কিভাবে কোথায় কোন পরিবেশে ঈয়াযীদ লালিত পালিত হয়েছে ইত্যাদি অনেক কিছুই আমরা জানি না ।
আসুন জেনে নেই ।
কথা দিলাম , অনেক কিছুই জানবেন যেটা পূর্বে আপনি জানতেন না ।

উত্তর –
ইতিহাসের এক ঘৃণিত কুলাঙ্গার , আবু সুফিয়ানের নাতী , কুখ্যাত পতিতা সর্দারনী হিন্দা – কলিজা খেকোর স্মৃতিই হচ্ছে ঈয়াযীদ ইবনে মূয়াবীয়া ওরফে ঈয়াযীদ ।

তার মা “মাইসুন ” কে শ্যাম নগরীর বিখ্যাত মহিলাদের মধ্যে গণনা কর হত ।
মুয়াবীয়া তাকে নিজের স্ত্রী করে নিল ।
ঈয়াযীদকে গর্ভে ধারণ করার পর এই মহিলাকে মূয়াবীয়া কবিতার এক শ্লোক পড়তে শুনল ।

ঐ কবিতার শ্লোকে মূয়াবীয়া ও তার প্রাসাদের শোভা সৌন্দর্য এবং শ্যাম নগরীর আবহাওয়ার নিন্দা করা হয়েছিল , এবং নিজের গ্রামের কুটীর ঘর , সেখানকার আবহাওয়া , ভেড়ার পালের সাথে থাকা নিজের চাচাতো ভাইয়ের প্রশংসা করা হয়েছিল ।
মূয়াবীয়া ঐ কবিতা শোনার পর মাইসুনকে তালাক দিলে গর্ভধারীনি নিজের গ্রামে চলে যায় ।

পরবর্তীতে সেই গ্রামেই ঈয়াযীদ জন্ম গ্রহণ করে ।
জন্মের পর ঈয়াযীদকে লালন পালন করার জন্য তায়েফ গোষ্ঠীর এক খৃষ্টান মহিলার তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয় ।

সংগত কারনেই খ্রীষ্টান ধর্মালম্বী ঐ মহিলার ইসলাম সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না ।

ঐ গোষ্ঠির প্রধান পেশাই ছিল চুরি , ডাকাতি , প্রতারনা সহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ ।
তাই শিশুকাল থেকেই অসভ্য, বদ ও লজ্জাকর কাজ ছিল তার প্রথাগত বা অভ্যাসগত ।
এরকম জঘন্য কলুষিত পরিবেশে ঈয়াযীদ প্রতিপালিত ও বয়ঃপ্রাপ্ত হয় ।

সেখানে সে মদ খাওয়া , জুয়া খেলা , মানুষ খুন করা , চুরি , ডাকাতি ইত্যাদি কাজের শিক্ষা লাভ করে ।
সেই সাথে বানরের সাথে খেলা করা ছিল তার সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ ।

“ আবু ক্বাইস ” নামে ঈয়াযীদের খুবই প্রিয় এক বানর ছিল ।
ঈয়াযীদ মনে প্রানে বিশ্বাস করত যে , এই বানরটি পূর্বে বনি ইসরাইলের এক শেখ ছিল , যে পরবর্তীতে বানরে রূপান্তরিত হয়ে যায় ।
ঈয়াযীদ সেই বানরকে মদ খাওয়াতো এবং তার চলন ভঙ্গি দেখে হাসত ।
এ প্রসংগে ইব্‌নে কাসির বলেন যে , ঈয়াযীদ সেই বানরকে রেশমের কাপড় ও সোনার তার দিয়ে তৈরি করা টুপি পড়াত ।

যেদিন বানরটির মৃত্যু হয় , ঈয়াযীদ খুবই মর্মাহত হল ।
বাদশাহী হুকুম করা হল , বানরটাকে কাফন পরিয়ে দাফন করা হোক এবং শ্যাম বাসিদেরকে সেই বানরের মৃত্যুর জন্য শোক পালন করতে বলা হল ।

নিজের বংশে মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র আহ্‌লে বায়ত (আঃ) সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী ঈর্ষা ও শত্রুতা ছিল ঈয়াযীদের মনে ।
যদিও আহলে বায়ত (আঃ) এর সাথে শত্রুতা সে বংশগত ও উত্তরাধিকারী সূত্রে পেয়েছিল ।
তবুও তার ব্যক্তিগত শত্রুতা তার চেয়েও বেশী ছিল ।
ঈয়াযীদ তার নিজের ঈর্ষা , বিদ্বেষ ও শত্রুতাকে পিতার মত গোপন রাখতে পারত না ।
বরং প্রকাশ্যে ও গর্বের সাথে তা অভিব্যক্ত করত ।

ঘটনাক্রমে একদিন ইমাম হাসান (আঃ) যে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন , ঈয়াযীদও সেখানে ছিল ।
ঈয়াযীদ তখন ইমাম হাসানকে (আঃ) সরাসরি বলল , আপনার সঙ্গে আমার শত্রুতা রয়েছে ।
ইমাম (আঃ) তার উত্তরে বললেন , তুমি ঠিকই বলছ । আমি জানি যে , আমার প্রতি তোমার শত্রুতা রয়েছে । কেননা তোমার পিতার সঙ্গে শয়তানও তোমার ভ্রুণ স্থাপনে অংশীদার ছিল ।

তারপর ইমাম (আঃ) এই আয়াত তেলাওয়াত করেন –
“ যার ভ্রুণ স্থাপনে শয়তান শরিক হয় আলে মোহাম্মদের (আঃ) সঙ্গে তার শত্রুতা থাকা নিশ্চিত ”

সূত্র – ইমাম হোসাইন , আব্বাস রাসেখী , পৃষ্ঠা – ২২ / ক্বেয়ামে ইমাম হোসাইন , পৃষ্ঠা – ৩২৫ – ৩২৭ ।

মাসউদি তাঁর তারিখে মাসউদি গ্রন্থে উল্লেখ করেন , এই উম্মতের মধ্যে ঈয়াযীদ ছিল ফেরআউনের মত ।
বরং সে ফেরআউনের চেয়েও বদ , আর ফেরআউন তার তুলনায় ন্যায়পর ছিল ।
ঈয়াযীদ মদ পান করে নিজেই নাচত , কুকুর , বানর , চিতাবাঘ নিয়ে খেলা করত এবং প্রায় সময়ই মাতাল থাকত ।

ইমাম হোসাইনকে (আঃ) হত্যা করার পর , ঈয়াযীদ একদিন মদের আড্ডায় বসে কবিতার এই শ্লোকটা পড়ল ।
তখন ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদও তার পাশে বসেছিল –
“ আমাকে মদ খাওয়াও যাতে পরিতৃপ্ত হই । তারপর ইবনে যিয়াদকে খাওয়াও , সে আমানতদার এবং আমার প্রাণ রক্ষাকারী । সে আমার ইচ্ছা পূরণকারী ও আমার শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধকারী ” ।

মাসউদি বর্ণনা করেন , তার রাজত্ব কালে তার লোকদের মধ্যে ভ্রষ্টতা ও অত্যাচারের মাত্রা ছড়িয়ে গিয়েছিল ।
মক্কা ও মদীনায় প্রকাশ্যে নাচ , গান – বাজনা হত ।
জনগণ অন্যায় লাম্পট্য , অসাধুতা ও অমিতাচারে ব্যস্ত থাকত এবং প্রকাশ্যে মদ খাওয়া আরম্ভ করেছিল ।
সূত্র – মরুজুয যাহাব , ৩য় খন্ড , পৃষ্ঠা – ২২৭ ।

হাসান বসরি উল্লেখ করেন , মুয়াবীয়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ চারটা বড় আকারের অপরাধ ছিল , যার একটাই তার ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট ছিল ।
তার মধ্যে একটি ছিল ঈয়াযীদকে তার উত্তরাধিকারী করা ।
যদিও সে প্রকাশ্যে মদ খেত , মাতলামি করত , রেশমের কাপড় পরিধান করত এবং সব সময় গান গাইত ।
সূত্র – আল ওয়েলায়াত ওয়াল ইমামত , পৃষ্ঠা – ৩৩৬ / তারিখে তাবারি , ৪র্থ খন্ড , পৃষ্ঠা – ২৪২ ।

যাইহোক ,
ঈয়াযীদের সর্বমোট রাজত্বকাল ছিল তিন বছর আট মাস ।
সে ১৭’ ই সফর ৬৪ হিজরী সনে ৩৩ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করে ।
দামেস্কে তাকে দাফন করা হয় ।
সূত্র – মুরুজুয যাহাব , ৩য় খন্ড , পৃষ্ঠা – ৬৫ / তারিখে ইয়াকুবি , ২য় খন্ড , পৃষ্ঠা – ৩১১ ।

আব্বাস রাসেখী তার ইমাম হোসাইন গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে , ঈয়াযীদের মৃত্যু হাওয়ারিয়্যিন নামক স্থানে হয় ।
মৃত্যুকালে সে মুয়াবীয়া , খালেদ , আবু সুফিয়ান ও আব্দুল্লাহ নামে চার ছেলে রেখে যায় ।

সুপ্রিয় পাঠক ,
ঈয়াযীদের তিন বছর আট মাস রাজত্বকালে মোটাদাগে নিম্নেলিখিত চারটি ভয়াবহ জঘন্য মহা অপরাধ তার প্রত্যক্ষ তত্বাবধান ও হুকুমে সংঘটিত হয়েছিল –

১ ) –
৬১ হিজরির ১০ ই মহরমে কারবালা প্রান্তরে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ও করুন হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় । সেই হত্যাযজ্ঞে আল্লাহ কতৃক নির্বাচিত ৩য় ইমাম , ইমাম হোসাইন (আঃ) ও তাঁর ৭২ সংগী সাথী সহ শাহাদাত বরন করেন । এছাড়াও প্রায় বিশজনের অধিক শিশুর কোন খোজ পাওয়া যায় নি ।

২ ) –
পবিত্র ক্বাবাগৃহে ঈয়াযীদের হুকুমে তার সৈন্যবাহিনী অগ্নিসংযোগ করেছিল ।

৩ ) –
নবীজী (সাঃ) এর নিজের হাতে গড়া মসজিদে নব্বীকে সে ঘোড়া রাখার আস্তাবল বানিয়েছিল ।

৪ ) –
ঈয়াযীদের হুকুমে তার সৈন্য বাহিনী মদীনা শহরে তিনদিন যাবৎ বিনা বিচারে নির্বিচারে হত্যা , লুটতরাজ , নারী ধর্ষনের মহা উৎসব পালন করেছিল ।
ঐ তিন দিনে মদীনা শহরে নবীজী (সাঃ) এর বহু সাহাবী , তাবেঈন ও নিরীহ জনসাধারন ও শিশুরা প্রান হারায় ।
সবচেয়ে মারাত্মক ছিল – নির্বিচারে তরুনী , মহিলা ধর্ষিত হয়েছিল । ফলশ্রুতিতে অনেক অবৈধ শিশুর জন্ম হয়েছিল ।

পাঠক , এই হল সংক্ষেপে কুলাঙ্গার ঈয়াযীদের জীবনের ঠিকুজিনামা ।

SKL