আলীকন্যা উম্মে কুলসুমের সহিত হযরত ওমরের বিবাহ প্রসংগ —

হযরত ওমর ও হযরত আলী (আঃ) এর কন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সম্পর্কিত বিষয় —–

বিবাহ হচ্ছে একটি ঐশি বিধান , রাসুল (সাঃ) এর সুন্নত এবং সকল মানুষের একান্ত ব্যাক্তিগত , সামাজিক , পারিবারিক ও দৈহিক চাহিদা ।

ইতিহাসে এমন অনেক বিবাহের ঘটনা রয়েছে যা বর্ণনার উপযুক্ত এবং শিক্ষনীয় ।

আবার এমনও কিছু বিবাহ রয়েছে যা ইতিহাসে ঠিকভাবে বর্ণিত হয় নি বা বিকৃত করা হয়েছে । অর্থাৎ এই জাতীয় বিবাহের প্রচার সম্পূর্ন মিথ্যা ও ভুয়া ।

ঠিক এই রকম একটি শতভাগ ভুয়া ও মিথ্যা বিবাহের ঘটনা হচ্ছে হযরত ওমর এবং আলীকন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহের ঘটনা ।

হযরত ওমরের সাথে হযরত আলি (আঃ) এর কন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সম্পর্কে একাধিক রেওয়ায়েত শীয়া ও সুন্নি মতাদর্শের পক্ষ থেকে বর্ণিত হয়েছে ।

নিন্মে কিছু মতামত উক্ত বিবাহ সম্পর্কে উল্লেখ করা হল —

১) – হযরত ওমরের সাথে আলীকন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয় নি ।
শেইখ মুফিদ (রহঃ) সহ আরো কয়েকজন আলেম যেমন , সৈয়দ মির নাসের হুসাইন লাখনাভি এবং শেইখ মোহাম্মাদ জাওয়াদ বালাগি তাদের স্বীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে , হযরত ওমরের সাথে হযরত উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয় নি ।

২) – হযরত ওমরের সাথে উম্মে কুলসুমের বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয় –
অনেকের দৃষ্টিতে উক্ত বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয়েছিল ।
সৈয়দ মোর্তজা তার ‘শাফি’ এবং ‘তানযিয়াতুল আম্বিয়া’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে , উক্ত বিবাহটি জোরপূর্বক সংঘটিত হয়েছিল ।
সূত্র – আশ শাফি , খন্ড ৩ , পৃষ্ঠা ২৭২ / তালখিসে শাফি , খন্ড ২ , পৃষ্ঠা ১৬০ ।
কুলাইনি তার ‘কাফি’ নামক গ্রন্থে ।
সূত্র – আল ফুরুগ মিনাল কাফি , খন্ড ৫ , পৃষ্ঠা ৩৪৬ হাদিস নং ১-২ ।
– কুফি তার ‘আল ইস্তেগাসা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ।
সূত্র – আল ইস্তেগাসা , পৃষ্ঠা নং ৮০- ৮২ ।
– কাজি নোমান তার ‘শারহুল আখবার’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ।
সূত্র – রহুল আখবার , খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৫০৭ ।
– তুসি তার ‘তামহিদুল উসুল’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ।
সূত্র – উসুল, পৃষ্ঠা ৩৮৬- ৩৮৭ ।
– তাবারসি তার ‘আলামুল ওয়ারা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।
সূত্র – আলামুল ওয়ারা, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯৭ ।
– মাজলিসি তার ‘মারআতুল উকুল এবং বিহারুল আনওয়ার’ নামক গ্রন্থে উক্ত বিবাহ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন ।
সূত্র – মারআতুল উকুল, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪২, বিহারুল আনওয়ার, খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ১০৯ ।

৩- হযরত ওমরের সাথে ইমাম আলি (আঃ) এর পালিত কন্যার বিবাহ হয় –
– হজরত আবু বকরের কন্যা এবং মোহাম্মাদ বিন আবু বকরের বোন আসমা ছিল ইমাম আলি (আঃ) এর স্ত্রী ।
আর উম্মে কুলসুম ছিলেন আসমার পূর্বের স্বামীর কন্যা সন্তান ।
সুতরাং উম্মে কুলসুম ইমাম আলি (আঃ) এর ঔরসজাত সন্তান ছিল না ।
কেননা জাফর বিন আবু তালিব আসমা বিনতে উমাইসকে বিবাহ করেন । জাফরের পক্ষ থেকে দুটি সন্তান জন্মলাভ করে ‘অউন ও জাফর’ ।
পরে জাফরের শাহাদতের পরে হযরত আবু বকর তাকে বিবাহ করেন । হযরত আবু বকরের পক্ষ থেকে উম্মে কুলসুম জন্মগ্রহণ করে ।
আর উক্ত উম্মে কুলসুমকে হযরত ওমর বিবাহ করেন ।
সূত্র – এহকাকুল হাক, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৭৬, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৩১৫ ।

আর এই তথ্য বিভ্রাটের কারণেই অনেক মুহাদ্দিস এবং ঐতিহাসিকগণ বর্ণনা করেছেন যে , হযরত ওমরের সাথে উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত হয় ।

৪) – উম্মে কুলসুম নামের কোন কন্যা ইমাম আলি (আঃ) এর ছিল না –
– ইতিহাসে জয়নাবে কুবরা , জয়নাবে সুগরা এবং রুকাইয়া’ এর উপনাম ছিল উম্মে কুলসুম ।
সূত্র – আল ইরশাদ, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫৪, বিহারুল আনওয়ার , খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৭৪ / ইনাবিউল মোয়াদ্দাত, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৪৭ / এহকাকুল হাক, খন্ড ১০, পৃষ্ঠা ৪২৬ ।

– গবেষকগণ আজও উম্মে কুলসুম নামের কোন কন্যার সঠিক তথ্য উদঘাটন করতে পারে নি । কেননা যদি এই নামে কোন কন্যা সন্তান জন্ম হত তাহলে অবশ্যই তার জন্মস্থান এবং তারিখ ইতিহাসে উল্লেখ করা হত ।

৫) – উম্মে কুলসুম ছিল এক দাসির সন্তান যাকে হযরত ওমর বিবাহ করেছিলেন –
– এক বর্ণনা মতে উম্মে কুলসুম নামে হযরত ফাতেমা (সাঃআঃ) এর কন্যা ছিলেন না ।
বরং সে ছিল উম্মে ওয়ালাদ অর্থাৎ দাসি থেকে জন্ম নেয়া সন্তান ।
বিভিন্ন গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে , জয়নাব সুগরা ছিলেন উম্মে ওয়ালাদ । আর উম্মে কুলসুম ছিলেন উম্মে ওয়ালাদ ।
সূত্র – মাওয়ালিদুল আয়েম্মা, পৃষ্ঠা ১৫, নুরুল আবসার, পৃষ্ঠা ১০৩ / নেহায়াতুল এরাব, খন্ড ২০, পৃষ্ঠা ২২৩ ।

৬) – পারিবারিক জীবন শুরুর পূর্বেই হযরত ওমরের মৃত্যু ঘটে –
– বিভিন্ন আলেমগণের মতে যেহেতু হযরত উম্মে কুলসুম ছোট ছিলেন এবং হযরত ওমরের সাথে দৈহিক সম্পর্ক হওয়ার পূর্বেই হযরত ওমর মারা যান ।
সূত্র – মানাকেবে আলে আবি তালিব, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ৮৯, বিহারুল আনওয়ার , খন্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৯১ ।

– অন্যান্য রেওয়ায়েতেও বর্ণিত হয়েছে যে , যেহেতু উম্মে কুলসুম বিবাহের বয়সের তুলনায় অনেক ছোট ছিলেন । সেহেতু হযরত ওমরের সাথে বিবাহ হয়েছিল ঠিক , কিন্ত তাদের মধ্যে বয়সের অধিক তারতম্য থাকার কারণে দৈহিক সম্পর্ক সংঘটিত হয় নি এবং অবশেষে হযরত ওমর মারা যান ।
সূত্র – আল আনওয়ারুল আলাভিয়া, পৃষ্ঠা ৪৩৫ ।

উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে ইতিহাসে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে ।

তবে উক্ত বিবাহটি সংঘটিত হোক বা না হোক এতে হযরত ওমরের জন্য কোন মর্যাদা বা গৌরবের বিষয় ছিল না ।

কেননা এমন কিছু কারণ ছিল যে , উক্ত বিবাহের বিষয়টি যে একটি মিথ্যা প্রচারনা সেটাই প্রমান করে দেয় ।
নিন্মে উক্ত কারণগুলো উল্লেখ করা হলো –

১) – হযরত ওমর পুতঃপবিত্র বা মাসুম ছিলেন না । কেননা স্বয়ং আহলে সুন্নাতের বর্ণনামতে তিনি অনেকবার ফিকহ বা মাসআলা বর্ণনার ক্ষেত্রে ভুলের সম্মুখীন হয়েছেন এবং নিজের অপারগতা এবং দূর্বলতাকে স্বীকার করেছেন ।

২) – হযরত ওমর রাসুল (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) এর সম্মান বা মর্যাদাকে তেমন গুরুত্ব দিত না ।
তবে তিনি রাসুল (সাঃ) এর জামাই হওয়ার কয়েকবার বৃথা চেষ্টা করছিলেন । আর উম্মে কুলসুমকে বিবাহ করার মাধ্যেমে তিনি উক্ত মর্যাদাটি অর্জনের চেষ্টা করেছিলেন ।

৩) – সে যুগে অনেক নারীরা হযরত ওমরকে বিবাহ করতে অনীহা প্রকাশ করত । কেননা তিনি ছিলেন উগ্র ও কঠোর মেজাজের পুরুষ । আর এ কারণেই অনেক গোত্রের লোকেরা তাঁর সাথে নিজের মেয়েদের বিবাহ দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করত ।

৪) – হজরত আয়েশা আমরু বিন আস এবং মুগাইরা বিন সোঅবা’এর কাছে সাহায্যে চায় যেন কোন মতেই হজরত উমরের সাথে আবু বকরের কন্যা উম্মে কুলসুমের বিবাহ সংঘটিত না হয় ।

৫) – এক বছর হজে হযরত ওমর এবং মুগাইরা অংশগ্রহণ করে । তখন হযরত ওমর উম্মে জামিলকে দেখে বলে মেয়েটি কে ?
মুগাইরা তাকে বলে , হ্যাঁ সে হচ্ছে হযরত আলি (আঃ) এর কন্যা উম্মে কুলসুম !
তখন থেকে তিনি উক্ত উম্মে কুলসুমকে বিবাহ করার জন্য চেষ্টা করতে থাকেন এবং বারবার হযরত আলি (আঃ) এর বাড়িতে যাতায়াত করতে থাকেন ।
জনগণ হযরত ওমরের উক্ত বিষয়টিকে ভাল দৃষ্টিতে না দেখার কারণে একবার তিনি বাধ্য হয়ে মেম্বারে আরোহন করে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন ।

৬) – হযরত ওমর এবং উম্মে কুলসুমের বিবাহের বিষয়টিকে শীয়ারা অস্বীকার করেছে এবং এর বিপরীতে একাধিক দলিল উপস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছে ।

অনুরপভাবে আহলে সুন্নাত মতাদর্শের লোকেরাও বিষয়টিকে আলোচনা করতে সংঙ্কোচবোধ করে থাকেন ।

কেননা উক্ত বিষয়টিকে নিয়ে ইতিহাস যেভাবে বর্ণনা করেছে তাতে মুসলিম জাহানের খলিফার প্রকৃত ভাবমূর্তি যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে তা হচ্ছে ইসলাম এবং রাসুল (সাঃ) এর সুন্নাত বিরোধী ।
সূত্র – তাযকেরাতুল খাওয়াস, পৃষ্ঠা ২৮৮ ।

পরিশেষে বিষয়টির উপসংহারে আমরা বলতে পারি যে , উক্ত বিবাহের ঘটনাটি ইতিহাসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয় নি ।

কেননা বিবাহটি যদি সত্যই হয় থাকে তাহলে বিবাহটি স্বেচ্ছায় নাকি জোরপূর্বক ?
উম্মে কুলসুমের কোন সন্তান জন্ম লাভ করেছিল কি না ?
সন্তান জন্মলাভ করলে তাদের নাম কি ছিল ?
সত্যিই কি উম্মে কুলসুমের সাথে হযরত ওমরের বিবাহ হয়েছিল কিনা ?
উম্মে কুলসুম কি হযরত আলি (আঃ) এর সন্তান ছিল না পালিত সন্তান ?
উম্মে কুলসুম কি হযরত ফাতেমা (সাঃআঃ) এর সন্তান ছিল নাকি হযরত আলি (আঃ) এর কোন দাসি বা অন্য কোন স্ত্রীর কন্যা ছিল ?
উম্মে কুলসুম কখন এবং কিভাবে মারা যায় ?
কে তার জানাযার নামাজ পড়ায় ?

আর উক্ত বিষয়গুলো প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসে অস্পষ্ট থেকে গেছে ।
আর তাই এ ধরণের অস্পষ্ট বিষয়কে নিয়ে গৌরব বোধ করা সমুচিত না ।

যাইহোক , সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্য উপাত্ত থেকে এই কথাটি জলের মত পরিস্কার যে , হযরত আলী (আঃ) এর কন্যার সাথে হযরত ওমরের বিবাহের যে গল্পটি বাজারে প্রচলিত আছে সেটা প্রকৃত অর্থেই একটা নির্ভেজাল মিথ্যা কল্প কাহিনী ।

সম্মানীয় পাঠক , আশা করি বহুদিনের একটি বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হলেন ।

 

SKL