মা ফাতেমা (সাঃআঃ) এর পবিত্র গৃহে আক্রমন —

—– ওহীর গৃহে আক্রমন এবং —

দৃশ্যপট – ১ —

মহানবী (সাঃ) এর গৃহে আক্রমন ও বিছানায় শুয়ে থাকা মহানবী (সাঃ) কে হত্যা করবার জন্য কুরাইশ গো্ত্রের নিয়োজিত খুনীরা নাঙ্গা তরবারী হাতে নিয়ে মোক্ষম সময়ের জন্য অপেক্ষারত ।
ভোরের আলো ফুটে উঠতেই একযোগে খুনী ঘাতকরা নাঙ্গা তরবারী নিয়ে একত্রে মহানবী (সাঃ) এর গৃহে ঝাপিয়ে পড়ল । জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছে , সেজন্য আনন্দের কোন কমতি নেই । কিন্ত যখন মহানবী (সাঃ) এর শয়ন কক্ষে প্রবেশ করে তাঁর পরিবর্তে হযরত আলী (আঃ) কে দেখতে পেল তখন খুনীদের সকলেই ক্রুদ্ব ও বিস্মিত হল ।

” মোহাম্মাদ কোথায় ” ?
ঘাতকদের প্রশ্নের জবাবে মাওলা আলী (আঃ) বললেন , ” তোমরা কি তাঁকে অামার কাছে সোপর্দ করেছিলে যে , আমাকে তাঁর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছ ” ?
রাগে তাদের আপাদমস্তক জ্বলছিল । বাধ্য হয় ব্যর্থ মন নিয়ে ফিরে গেল । কিন্ত প্রতিজ্ঞা করল যে , যে ভাবেই হোক নবীজী (সাঃ) এর অবস্থানস্থল খুজে বের করবেই ।
সূত্র – তারীখে ত্বাবারী , ২য় খন্ড , পৃ – ৯৭ ।

পবিত্র কোরআনে হযরত আলী (আঃ) এর এই নজিরবিহীন ত্যাগ স্বীকারের ঘটনা যাতে কেয়ামত পর্যন্ত সকল যুগে অক্ষয় হয় থাকে , এ কারনে একটি আয়াতের মাধ্যমে তাঁর এই প্রাণান্তকরন অবদানকে প্রশংসা করেছে এবং তাঁকে সেই ব্যক্তিদের মধ্যে গন্য করেছে যাঁরা নিজের প্রানকে তুচ্ছ মনে করে আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনে ঝাপিয়ে পড়েছে –

“— মানুষের মধ্যে এমন কেউ আছে , যে আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য নিজ জীবন ত্যাগ করে , আর তাঁর বান্দাদের প্রতি অতি দয়াবান —।”
সুরা বাকারা , ২০৭ ।

দৃশ্যপট – ২ —

মহানবী (সাঃ) এর ওফাতের অল্প কয়েকদিন পরের ঘটনা –

স্থান নবীকন্যা যাহরা (সাঃআঃ) এর পবিত্র গৃহ । যে পবিত্র গৃহে ফেরেশতাগন হরহামেশা বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করতেন । নবীজী (সাঃ) এর সেই পবিত্র ওহীর গৃহও আক্রান্ত হল ।

ঘটনার বিস্তারিতে না যেয়ে এখানে শুধু বিভিন্ন বিখ্যাত ঐতিহাসিক গ্রন্থের কথা উল্লেখ করা হল –

” আল্লাহর শপথ , আমি এ ঘর জ্বালিয়ে দেব , যদি না আশ্রয় গ্রহনকারীরা বাইআত হবার জন্য ঘর ছেড়ে বেরিয়ে অাসে ” ।
সূত্র – তারীখে ত্বাবারী , ৩য় খন্ড,পৃ – ২০২ ।

” সেই আল্লাহর শপথ , যার হাতে ওমরের প্রান , হয় ঘর ছেড়ে বের হবে , না হয় তাতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেব ” ।
ওনাকে বলা হল ,নবী দুলালী যাহরা (সাঃআঃ) এ ঘরের মধ্যে রয়েছেন ,তখন তিনি বললেন , ” থাকুক ” !
সূত্র – আল ইমামাহ , ওয়াস-সীয়াসাহ, ২য় খন্ড , পৃ-১২ / শারহে নাহাজুল বালাঘা , ইবনে আবীল হাদীদ ,১ম খন্ড , পৃ – ১৩৪ / আলামুন নিসা ,৩য় খন্ড , পৃ-১২০৫ ।

” খলীফার আজ্ঞাবাহীরা আগুন জ্বালিয়ে দিলেন , তারপর দরজা লাথি দিয়ে ভেঙ্গে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলেন ” ।
সূত্র – আসলু ছুলাইম ,পৃ- ৭৪ ( নাজাফে মুদ্রিত )

” হযরত ওমর বাইআত গ্রহনের দিনগুলোতে হযরত ফাতেমা (সাঃআঃ) এর পাঁজরের উপর জ্বলন্ত দরজা ফেলে দেন । ফলে তাঁর গর্ভস্থিত সন্তানের গর্ভপাত ঘটে । তিনি বাড়ীর ভেতরে যারা ছিলেন তাঁদের সমেত ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতেও নির্দেশ দেন , যদিও ঘরের ভিতরে আলী , ফাতেমা , হাসান ও হোসেন (আঃ) ছাড়া আর কেউ ছিল না ” ।
সূত্র – আল মেলাল ওয়ান নেহাল , ২য় খন্ড , পৃ- ৯৫ ।

দৃশ্যপট – ৩–

হযরত আলী (আঃ) কে পবিত্র রমজান মাসে মসজিদের ভিতর সেজদারত অবস্থায় বিষাক্ত তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করা হল ।

দৃশ্যপট – ৪ —

হযরত হাসান (অাঃ) কে বিষমিশ্রিত পানি পান করিয়ে হত্যা করা হল । এমনকি ওনাঁর জানাজার উপর অসংখ্য তীর নিক্ষেপ করে সাদা কাপড়ের জানাজাকে লাল রংয়ে রজ্ঞিত করে দেয়া হল । পৃথিবীর ইতিহাসে ২য় কোন নজীর নেই যে , মৃতের জানজাতে তীর নিক্ষেপ করা হয় । তাও আবার নবীজীর আদরের নাতির জানজাতে !

দৃশ্যপট – ৫ —

হায় কারবালা ! ছয় মাসের শিশুসন্তানসহ ৭২ জন সহ ইমাম হোসেন (আঃ) কে সেজদারত অবস্থায় জবাই করে মাথা আলাদা করে ফেলা হল ।

দৃশ্যপট – ৬ —

ইমাম জয়নুল আবেদীন (আঃ) কে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হল ।

এভাবে একই পরিবারের একে একে ১১ জন পবিত্র পুরুষ হযরত আসকারী (আঃ) পর্যন্ত প্রত্যেককে হয় তরবারী নাহয় বিষপ্রয়োগে শহীদ করা হয়েছে ।

প্রিয় পাঠক , এভাবে মহানবী (সাঃ) তথা ওহীগৃহে যেভাবে আক্রমনের ধারা সূচিত হল , সেই ধারাবাহিকতায় ১১তম ইমাম পর্যন্ত প্রত্যেককেই শহীদ করা হল ।

যাঁদের উপর স্বয়ং আল্লাহ নিজে দরুদ ও সালাম প্রেরন করেন , যাঁদের উপর দরুদ না পড়লে নামাজই বাতিল হয় যায় , যে সকল গৃহকে আল্লাহ বিশেষ উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন , যাঁদের প্রতি ভালবাসা ও সম্মান প্রর্দশন বাধ্যতামূলক করেছেন – তাঁদের উপর চালান হল , ইতিহাসের ন্যাক্কারজনক মর্মান্তিক বর্বরোচিত সিরিয়াল হত্যাযজ্ঞ ।

সেই যে শুরু হল নবীগৃহ থেকে আক্রমনের সূচনা , এখনও কি আমরা যথাযথ সম্মান ও ভালবাসা প্রর্দশন করতে পেরেছি ওহীগৃহের আহলে বায়েত (আঃ) গনের উপর ?

এখনও কি আমরা জানতে চেষ্টা করেছি যে , কারা কেন পবিত্র ওহীগৃহে ধারাবাহিকভাবে আক্রমন চালিয়েছিল ?
স্বয়ং আল্লাহ নিজে লানত দেন , আমরা তো ইতিহাসই জানার চেষ্টা করি না , লানত দেয়া তো দূরের কথা !
এতটাই স্বার্থপর আমরা , জান্নাতের মালিকদের হত্যাকারীদের রাঃআনহু বলি , আবার জান্নাতের কামনাও করি !!!
হায়রে মুসলমান , তোমারই অপেক্ষায় কবরে প্রতীক্ষায় আছেন , ফেরেশতাগনেরা !!!!!!

আল্লাহুমা সাল্লে আলা মোহাম্মাদ ওয়া আলে মোহাম্মাদ ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম ।

আজ আর নয় , একটু চিন্তা করুন , প্লীজ ।

— বেলায়েতের দ্যুতি ,
মূল লেখক -আয়াতুল্লাহ জাফর সুবহানী ,
বাংলা অনুবাদ – আব্দুল কুদ্দুস বাদশা এবং মোঃ মাঈনউদ্দিন ।
পৃ – ৫৮,১৮১ ছায়া অবলম্বনে ।

SKL