আলাইস সালাম অথবা (আঃ) এর ব্যবহার প্রসংগ —

আলাইহিস সালাম বা (আঃ) এর ব্যবহার —

মহানবী (সাঃ) এর পবিত্র বার ইমাম (আঃ) গনের নামের শেষে কেন আলাইহিস সালাম বা (আঃ) বা (সাঃআঃ) লেখা হয় ?

” আলাইহিস সালাম ” যে কেবল নবী-রাসূলদের নামের শেষে ব্যবহার করা হয় তা কিন্ত নয় । যেমন , আমরা হযরত লোকমান , হযরত মারিয়াম এবং ইমাম মাহদীর নামের শেষে ” আলাইহিস সালাম ” ব্যবহার করি অথচ তাঁরা কেউই নবী-রাসূল নন ।
শুধু তাই নয় , ফেরেশতাদের নামের সাথেও আমরা ” আলাইহিস সালাম ” ব্যবহার করি ।

আমরা আরেকটি প্রশ্ন তুলতে পারি যে , পবিত্র কোরআন বা হাদীসের কোথাও কি এমন বর্ণনা রয়েছে যে , কোন মুসলমানের নামের পর “আলাইহিসসালাম” বা সংক্ষেপে (আঃ) ব্যবহার করা যাবে না বা এ ধরনের ব্যবহার হারাম ?

আমাদের জানা মতে কোরআন-হাদীসের কোথাও এমন নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করা হয় নি কিংবা এ ধরনের ব্যবহার যে অপছন্দনীয় তাও কোথাও উল্লেখ করা হয় নি ।

বরং পবিত্র কোরআনের নানা আয়াতের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ মুমিনদের , পরহিজগারদের ও বেহেশতীদের সালাম দিয়েছেন ।
যেমন – সুরা ইয়াসিনের ৫৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ,

سَلَامٌ قَوْلًا مِنْ رَبٍّ رَحِيمٍ [٣٦:٥٨]

‘ — করুণাময় পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে বলা হবে সালাম — ।’

অনুরূপ বক্তব্য রয়েছে সুরা ত্বাহার ৪৭ নম্বর আয়াতে এবং সুরা আরাফের ৪৬ নম্বর আয়াতে ।

” আলাইহিসসালাম ” শব্দের প্রকৃত বাংলা অর্থ হচ্ছে –
” তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক ।”

এটি এক বিশেষ প্রার্থনা । আমরা মুসলমানরা সবাই একে অপরকে সালাম দিয়ে থাকি ।

এবার আমরা বিশ্বনবী (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের নামের পাশে “আলাইহিসসালাম” বা সংক্ষেপে (আঃ) ব্যবহার যে বৈধ তার কিছু প্রমাণ তুলে ধরছি —

১) –
সুন্নি মাজহাবের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ বা নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ বুখারী শরীফের ” কিতাবুল ফাজায়েলে সাহাবেহ ” অধ্যায়ের (৩৭/৬২ নম্বর অধ্যায়) “বাবুল মানাক্বিবে ফাতিমাতু” শীর্ষক পর্বে (পর্ব নম্বর ৫৯/২৯) নবীকন্যা হযরত ফাতিমার নামের পর “আলাইহিসসালাম” ব্যবহার করা হয়েছে ।

একই হাদীস গ্রন্থের অর্থাৎ বুখারী শরীফের ” বাবুল মানাক্বিবি ক্বুরাবাত্বা রাসুলুল্লাহ ওয়া মানাক্বিবাতি ফাতিমাতা আলাইহিসসালাম বিনতি নাবী” শীর্ষক আলোচনায় (পর্ব নম্বর-৪১/১২) “আলাইহিসসালাম” ব্যবহার করা হয়েছে , যা এই শিরোনামের মধ্যেই লক্ষ্যনীয় ।

২) –
একই ধরণের ব্যবহার রয়েছে সুন্নি মাজহাবের আরেকটি বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ তিরিমিজি শরীফের হাদীসে ।
যেমন , কিতাবুল মানাক্বিবিত তিরমিজি’র “ফাজলি ফাতিমাত্বা বিনতি মুহাম্মাদ সাল্লিল্লাহু আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম” উপপর্বে ।
(৫০/৬১ নম্বর অধ্যায়, অর্থাৎ কিতাব নম্বর ৫০, বাব নম্বর ৬১ ) এখানেও শিরোনামের মধ্যেই “সাল্লিল্লাহু আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম” শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্যনীয় ।

একই হাদীস গ্রন্থের “মানাক্বিব আল হাসান ওয়া আল হুসাইন আলাইহিমা ওয়া সাল্লাম” শীর্ষক আলোচনার শিরোনামেই এই শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয় ।

এটা স্পষ্ট যে , বিশিষ্ট সাহাবীদের বর্ণিত এসব হাদীসে হযরত ফাতিমা (সাঃআঃ) এবং হযরত ইমাম হাসান ও হোসাইন (আঃ) এর নামের পর “আলাইহিসসালাম” ব্যবহার করা হয়েছে ।

এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলে সাহাবীরা তাঁদের বর্ণনায় কখনও এ শব্দ ব্যবহার করতেন না , বরং শুধু “রাজিয়াল্লাহু আনহু” বা এ জাতীয় অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করতেন ।

“রাজিয়াল্লাহু আনহু” শব্দের প্রকৃত বাংলা অর্থ হচ্ছে –
” আল্লাহ তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হোক ।”

৩) –
বিশিষ্ট সুন্নি মনীষী ইমাম ফাখরে রাজিও বার ইমামীয়া শীয়া মুসলমানদের পবিত্র ইমাম বা বিশ্বনবী (সাঃ) পবিত্র এর আহলে বাইতের সদস্যদের নামের পর “আলাইহিসসালাম” দোয়াটি ব্যবহার করেছেন ।
তিনি বলেছেন , রাসূল (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইত (আঃ) কয়েকটি ক্ষেত্রে রাসূল (সাঃ) এর সমান সুবিধা বা সম্মানের অধিকারী ।
সালাম এসবের মধ্যে অন্যতম ।
মহান আল্লাহ কোরআনে বিশ্বনবী (সাঃ) ও তাঁর পবিত্র বংশধরদের প্রতি সালাম দিয়েছেন –
“আলে ইয়াসিনের ওপর সালাম” শব্দের মাধ্যমে ।

৪) –
বিশিষ্ট সুন্নি মনীষী ইবনে হাজার মাক্কীও মনে করেন , কোরআনে বর্ণিত “আলে ইয়াসিন” শব্দের অর্থ আলে মুহাম্মাদ (দঃ) বা মুহাম্মাদের বংশধর ।
ইয়াসিন বিশ্বনবী (সাঃ) এরই অন্যতম নাম ।

৫) –
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে , কিভাবে আমরা আপনার প্রতি দরুদ পাঠাব ?
উত্তরে মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন , তোমরা বলবে ” আল্লাহুম্মা সাল্লি ‘আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলি মুহাম্মাদ” ।
সালামের মত দরুদ তথা সালাওয়াত পড়া বা সাল্লি আলা বলাও এক ধরনের দোয়া ।
এর অর্থ কল্যাণ কামনা করা ।

তাই এটা স্পষ্ট যে , বিশ্বনবী (সাঃ) এর পবিত্র আহলে বাইতের সদস্যদের নামের পরে বা তাঁদের নামের পাশে “আলাইহিসসালাম” বা “সালাওয়াতুল্লাহ আলাইহি” বলা পরিষ্কার একটি ধর্মীয় নির্দেশ এবং স্বয়ং রাসূল (সাঃ) এর একটি সুষ্পষ্ট সুন্নাত ।

SKL