খোৎবা-২১৯

প্রাচুর্যের দম্ভ সম্বন্ধে আমিরুল মোমেনিন নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করলেনঃ প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন রাখে, যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও (কুরআন-১০২ ও ১-২২) । তারপর তিনি বললেনঃ তাদের লক্ষ্য অর্জন আর কতদূর। এসব লোক কতই না গাফেল এবং তাদের কর্মকান্ড কতই না। কঠিন। শিক্ষাপূর্ণ বিষয়গুলো থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করছে না, কিন্তু তারা দূর-দূরান্ত থেকে ঐশ্বৰ্য ংগ্রহ করেছে। তারা কি তাদের পূর্বপুরুষের মৃতদেহের ওপরও দম্ভ করে অথবা তারা কি মৃত লোকদেরকেও তাদের সসংখ্যার অন্তর্ভুক্ত করে সসংখ্যাধিক্যের গর্ব অনুভব করে? যেসব দেহ আত্মাহীন ও নিশ্চল হয়ে গেছে তারা সেগুলোকে পুনরুজীবিত করতে চায়। মৃত্যগণ গর্ব অপেক্ষা শিক্ষার অধিক উপযোগী। তারা সম্মান অপেক্ষা বিনয়াবনতার উৎস হিসাবে অধিক উপযোগী । তারা দুর্বল-দৃষ্টি সম্পন্ন চোখে মৃতদের দিকে তাকায় এবং অজ্ঞতার গহবরে নেমে আসে। যদি তারা জীর্ণকুটির ও শূন্য আঙ্গিনা থেকে মৃতদের জিজ্ঞেস করতো, তবে তারা বলতো যে, তারা পথভ্রষ্ট অবস্থায় মাটির নিচে চলে গেছে এবং তোমরাও অজ্ঞভাবে তাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । তোমরা তাদের মাথার খুলি মাড়িয়ে চলো এবং তাদের শবদেহের উপর ইমারত তুলতে চাও। তোমরা তাদের চারণভূমিতে পশু চরাও এবং যে ঘর। তারা খালি করেছে। সে ঘরে তোমরা বাস কর । তাদের ও তোমাদের মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান হয়েছে তাতে শোক প্ৰকাশ ও শোক-গান এখনো শেষ হয় নি। লক্ষ্যে পৌছার ব্যাপারে তারা তোমাদের পূর্বসুরী এবং তোমাদের পূর্বেই তারা জলাধারের কাছে পৌছেছে। তাদের মর্যাদাকর অবস্থা ও অসামান্য গর্ব ছিল। তারা ছিল শাসক ও পদমর্যাদাধারী। এখন তারা মাটির সংকীর্ণ ফাকের মধ্যে চলে গেছে যেখানে মাটি তাদেরকে চারিদিক থেকে চেপে ধরে তাদের ংশ খাচ্ছে ও রক্ত চুষে নিচ্ছে। তারা প্রাণহীন অবস্থায় কবরের সংকীর্ণ গর্তে পড়ে আছে। তারা আর কোন দিন ফিরে আসবে না এবং কেউ তাদেরকে আর দেখতে পাবে না । বিপদের আশঙ্কা তাদেরকে আর শঙ্কিত করবে না এবং অবস্থার অনানুকূল্য আর তাদেরকে শোকাহত করবে না। ভূমিকম্পে তাদের কিছু যায় আসে না এবং বজপাতেও তারা কর্ণপাত করে না। তারা চলে গেছে এবং আর ফেরার কোন আশা করা যায় না। তারা বিদ্যমান। কিন্তু অদৃশ্য। তারা ছিল ঐক্যবদ্ধ কিন্তু এখন তারা বিচ্ছিন্ন। তারা ছিল পরষ্পর বন্ধুভাবাপন্ন কিন্তু এখন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তাদের হিসাব-নিকাশ অজানা এবং তাদের গৃহগুলো নিচুপ। এটা সময়ের দৈর্ঘ্য বা স্থানের দূরত্বের জন্য নয়। এটা এ কারণে যে, তাদেরকে মৃত্যুর পেয়ালা পান করানো হয়েছে। এতে তাদের সবাক মুখ নির্বাক হয়ে গেছে, তাদের শ্রুতি বধির হয়ে গেছে এবং তারা নিশ্চল হয়ে গেছে। তারা নিস্ক্রিয় হয়ে পড়ে আছে। তারা পরস্পরের প্রতিবেশী। কিন্তু একের প্রতি অপরের কোন মমত্ববোধ নেই। তারা একে অপরের বন্ধু কিন্তু কেউ কারো সাথে দেখা করে না। তাদের একে অপরকে জানার রশি ছিন্ন হয়ে গেছে এবং তাদের বন্ধুত্বের বন্ধন কেটে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তাদের প্রত্যেকেই এখন একাকী যদিও তারা এক সময় দলবদ্ধ ছিল এবং এখন তারা একে অপরের অপরিচিত যদিও একসময় তারা বন্ধু ছিল। রাতের অবসানে ভোর ও দিনের অবসানে সন্ধ্যা সম্বন্ধে তারা অনবহিত। প্রস্থানের পর থেকেই রাত অথবা দিন তাদের কাছে চির বিদ্যমান হয়ে গেছে। তারা দেখেছিলো যে, তাদের স্থায়ী আবাসের বিপদ তাদের অনুমান থেকে অনেক বেশি মারাত্মক এবং তারা লক্ষ্য করেছিলো যে, এর চিহ্নসমূহ তাদের ধারণা থেকে অনেক বৃহৎ। দুটি লক্ষ্যবস্তু (বেহেশত ও দোযখ) ভয় ও আশার নাগালের বাইরে একটা বিন্দুতে তাদেরকে টেনে নিয়ে গেছে। যদি তারা কথা বলতে পারতো। তবে তারা যা দেখেছে তা বর্ণনা করতে গিয়ে বোবা হয়ে যেতো । যদি তাদের চিহ্ন মুছেও ফেলা হয় এবং তাদের সংবাদ প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয় তবুও চক্ষুষ্মানগণ যেহেতু তাদের দিকে তাকিয়েছিল। সেহেতু তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্ৰহণ করতে পারে। তারা কোন প্রকার শব্দ না করে কথা বললেও বুদ্ধিমানের কান তাদের কথা শুনতে পায়। সুতরাং তারা বলে, “সুন্দর মুখমন্ডল ধ্বংস হয়ে গেছে এবং কোমল দেহ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। আমরা জীৰ্ণ কাফন পরে আছি, কবরের সংকীর্ণতা আমাদেরকে অসহায় করে রেখেছে এবং অপরিচিতি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের নীরব বাসস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। আমাদের দেহের সৌন্দর্য চলে গেছে। আমাদের সর্বজ্ঞাত বৈশিষ্ট্যসমূহ ঘূণিত হয়ে পড়েছে। অপরিচিত স্থানে আমাদের বাস দীর্ঘায়িত হয়ে গেছে। আমরা যন্ত্রণা থেকে মুক্তি এবং সংকীর্ণতা থেকে নিস্কৃতি পাচ্ছি না।” এখন যদি তোমরা তোমাদের মনের মধ্যে তাদের প্রতিকৃতি অঙ্কন কর অথবা যে সব পর্দা তাদেরকে তোমাদের কাছ থেকে গোপন করে রেখেছে তা সরিয়ে ফেল তবে নিশ্চয়ই, তোমরা দেখতে পাবে যে, তাদের কান শ্রবণ ক্ষমতা হারিয়ে বধির হয়ে আছে, তাদের চোখ কোটরাগত হয়ে তাতে বালি ভরে আছে, তাদের সক্রিয় জিহ্বা টুকরো টুকরো হয়ে আছে, তাদের চিরজাগ্রত হৃদপিন্ড স্পন্দনহীন হয়ে পড়ে আছে এবং তাদের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে একটা অদ্ভুত ধ্বংস সংঘটিত হয়ে সেগুলো বিকৃত ও ক্ষমতাহীন অবস্থায় পড়ে আছে। তাদেরকে সাহায্য করার কেউ নেই এবং তাদের জন্য শোক প্ৰকাশ করার কেউ নেই। তাদের প্রতিটি বিপদ এমন যে, এর অবস্থার পরবর্তন হয় না এবং দুঃখ-দুৰ্দশা কখনো শেষ হয় না। আহা! কতই না মর্যাদাসম্পন্ন দেহ ও মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যকে এ মাটি গলাধঃকরণ করেছে। অথচ এ পৃথিবীতে থাকাকালে তারা প্রচুর আরাম আয়েশ ও সুখ-সম্ভোগ উপভোগ করেছিল এবং সম্মানের মাঝে লালিত-পালিত হয়েছে। শোকের সময়েও তারা আনন্দ-উল্লাসে ছিল। দুঃখ-দুৰ্দশা আপতিত হলে তারা আনন্দ-উল্লাস ও খেলা-ধুলায় সান্তুনা খুঁজে পেত। পৃথিবী তাকে (মৃত ব্যাক্তি) উপহাস করলে সেও পৃথিবীকে উপহাস করতো, কারণ তার জীবন ছিল বিস্মরণপূর্ণ। তারপর সময় তাকে রূঢ়ভাবে পদদলিত করলো, দিন দিন তার শক্তিমত্তা দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলো এবং মৃত্যু তার সন্নিকট থেকে তার দিকে তাকাতে লাগলো। এরপর সে এক প্রকার শোকে অভিভূত হতে লাগলো যা জীবনে কখনো অনুভব করে নি এবং তার সুস্থ-সবল শরীর রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তে লাগলো। তারপর সে এমন অবস্থায় পতিত হয় যাতে সে চিকিৎসকের নিকট অতি পরিচিত হয়ে ওঠে। চিকিৎসকগণ ঠান্ডা (ঔষধ) দ্বারা গরম (রোগ) দাবিয়ে রেখে চিকিৎসা করে। কিন্তু গরম বৃদ্ধি পেলে ঠান্ডা বস্তু কোন কাজে আসে না। এভাবে তার রোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় চিকিৎসকগণ উপায়হীন হয়ে পড়ে, তার সেবায় নিয়োজিতগণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তার আপনজন তার রোগের বর্ণনা দিতে বিরক্তিবোধ করে, কেউ তার অবস্থা জিজ্ঞেস করলে জবাব এড়িয়ে যায় এবং কেউ তার সম্মুখে অবস্থার অবনতির কথা বললে রাগান্বিত হয়। তাই কেউ কেউ তার আরোগ্যের আশা ব্যক্ত করে সান্তুনা দেয়, কেউ কেউ তাকে হারাবার জন্য ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দেয় এবং তার পূর্ববতীগণের প্রস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এ অবস্থায় যখন সে প্রিয়জনদের ত্যাগ করে এ পৃথিবী থেকে চির প্রস্থানের জন্য প্রস্তুত হয় তখন এমন শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা তাকে ঘিরে ধরে যে, তার সকল অনুভূতি হতবুদ্ধি হয়ে পড়ে এবং তার জিহবার আদ্রতা শুকিয়ে যায়। এ সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর তার জানা থাকা সত্ত্বেও সে কিছুই উচ্চারণ করতে পারে না। এ সময় অনেকের কথা সে শোনে যা তার হৃদয়ের জন্য পীড়াদায়ক, কিন্তু তবুও সে নিচুপ হয়ে পড়ে থাকে যেন সে বধির—কারো কথা শুনতে পায় না—না জ্যেষ্ঠদের যাদের সে শ্রদ্ধা করতো, আর না কনিষ্ঠদের যাদের সে স্নেহ করতো। মৃত্যুর যন্ত্রণা এতই কষ্টদায়ক যে, মানুষ না পারে তা ভাষায় বর্ণনা করতে, আর না পারে তা হৃদয়ে অনুভব করতে।