শোকাশ্রু ও কান্না কাটা

শোক – দুঃখ, কান্না – কাটা, ও অশ্রু বিসর্জন মানুষের স্বভাবজাত।প্রকৃতিগতভাবেই এ বৈশিষ্টগুলো মানব জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। শিশু জন্ম গ্রহণ করার পরই ক্রন্দন দিয়ে তার এ পৃথিবীর জীবনের সূচনা করে।

কোন শিশু যদি জন্মের পর না কাঁদে আমরা

সেটাকে অস্বাভাবিক মনে করি এবং শিশুটির বেঁচে থাকার ব্যাপারে সন্দেহ পোষন করি। তখন সাথে সাথেই চিকিৎসক ডেকে এনে শিশুটির কান্নার ব্যবস্থা করি। যতক্ষণ পর্যন্ত সে না কাঁদে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তার বেঁচে থাকার ব্যাপারে সন্দেহমুক্ত হতে পারি না।

শুধু শিশুদের বেলায় কেন, বয়স্কদের ক্ষেত্রেও এ সত্যটি অনস্বীকার্য। কোন লোক যখনতার পরম পাওয়ার কোন বস্তু হারিয়ে ফেলে, কিংবা নিকটতম কোন প্রিয়জনের মৃত্যু ঘটে তখন মানুষ কেবল কান্নায় ভেঙ্গেই পড়ে না বরং নিজেকে নিজে আঘাত করে মাতমজারি করতে থাকে। যদিও সে জানে যে, এর দ্বারা তার হারানো বস্তু বাআত্মীয়জনকে সে আর ফিরে পাবে না। তথাপীও তার অন্তরের বিয়োগ জ্বালার কারণে সৃষ্ট অদৃশ্য শোক মাতম ও কান্নাকে রুখতে পারে না। এমনকি কখনও ইচ্ছা না থাকলেও উষ্ণ অনুভূতির ভাবাবেগে মানুষ নিজের অজান্তেই কেঁদে ফেলে। এক্ষেত্রে এমনও দেখা যায় যে, অনেকে শোকে – দুঃখে মুহ্যমান হয়ে একটি নিটল পাথরের মূর্তির আকার ধারণ করে। অর্থাৎ তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলে, বোধশক্তি রহিত হয়ে যায় এবং সে হয়ে যায় একটা অস্বাভাবিক মানবমূর্তি। তখন এ ব্যক্তির বেঁচে থাকার ব্যাপারেও আমরা আশংকা বোধ করি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ীতাকে কাঁদানোর নানা রকম পদ্ধতি অবলম্বন করি।

বরং এসব ক্ষেত্রে যদি কোন লোকের মধ্যে দুঃখের ছাপ পরিলক্ষিত না হয় এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করে, কিংবা আনন্দ উল্লাসের কোন কাজে শরীক হয়। তখন লোকেরা তার সম্বন্ধে নানা রকম কথাবার্তা বলে থাকে। লোকেরা ধারণা করে যে, এ লোকটি পাষাণ হৃদয়ের লোক। এর মধ্যে মানবতা, মনুষত্ব ও মমত্ববোধ বলতে কি কিছুই নেই। সে অত্যন্ত নিকৃষ্ট প্রকৃতির একটি লোক। এ জাতীয় আরও বহু ভৎর্সনাব্যঞ্জক কথাবার্ত। লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, বেদনা – বিধুর ও শোক – দুঃখজনিত ঘটনাবলী যাদের মধ্যে কোনই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে না তারা হয় পাগল নাহয় নির্বোধ মানব আকৃতির প্রাণী বিশেষ। অথবা হিংস্র প্রকৃতির এক পাষান।

আল্লামা মুহাম্মদ আলী শারকি রচিতকেয়ামে হক্বগ্রন্থে সপ্তম পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে যে, জন্মের পর থেকে মানুষের জীবন কিছু ঘটনাবলী ও অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে থাকে। যেমন: অসুখ – বিসুখ বাসুস্থতা, কিশোর – যৌবন বা বৃদ্ধাবস্থা, নিদ্রা – বিনিদ্রা ইত্যাদি। এ ছাড়াও বিশেষ দুটি অবস্থা হচ্ছে সুখ – স্বাচ্ছন্দ বা দুঃখ  – কষ্ট। প্রথম অবস্থাটা মানুষের মধ্যে তখন দেখা দেয় যখন তার মনে কামনা – বাসনা কিছুটা পূর্ণ হয় অথবা খোদার নেয়ামত লাভ করে। এরই বাহ্যিক প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার চেহারায় আনন্দ ও খুশীর ছাপ। দ্বিতীয় অবস্থাটা মানুষের মধ্যে তখন পরিলক্ষিত হয় যখনসে বুঝতে পারে যে, তার নিজের কিংবা নিকটতম কোন আত্মীয় – স্বজনের অথবা আন্তরিক কোন বন্ধু – বান্ধবের কারো কোন ক্ষতি বা অপ্রত্যাশিত কোন কাজ সাধিত হয়েছে। এমতাবস্থায় তার প্রকাশ ও প্রতিক্রিয়া ও প্রভাবটাই হচ্ছে তারচেহারায় শোক দুঃখের ছাপ, কান্না – কাটা ও অস্থিরতা।

ক্রন্দনের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে মঞ্জুর উল্লেখ করেছেন:আলফাররা বলেন: ক্রন্দনের অর্থ হচ্ছে শোক – দুঃখ প্রকাশের সময় যে শব্দ বাআওয়াজ বের হয় অথবা অশ্রু বিসর্জন বা চোখ দিয়ে পানি নির্গত হওয়া(১)এ পর্যায়ে আল খলিল বলেন: ক্রন্দন অর্থ উদ্বেগ বা আহাজারীর শব্দ।

খোদার গজব ও আযাবের ভয়ে, কিংবা জাহান্নামে দগ্ধ হবার ভয়ে অথবা খোদার নেয়ামত হাতছাড়া হয়ে যাবার আশংকায় ক্রন্দন করা আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়। অনেকে কারো মৃত্যুতে এ কারণে কান্না করে থাকেন যে, খোদার নেয়ামত হাত ছাড়া হয়ে গেছে। হযরত রাসুলে করিম (সা.) নিজ পুত্র ইব্রাহীমের মৃত্যুতে কেঁদেছিলেন। সাহাবাগণ যখন জিজ্ঞেস করলেনইয়া রাসুলাল্লাহ ! আপনিও কাঁদছেন?উত্তরে নবী করিম (সা.) বললেন: এ কান্না রহমতের কান্না।(২)

অবশ্য কখনও কখনও ক্রন্দন নিন্দনীয়ও হয়ে থাকে। যেমন: কোন তুচ্ছ বস্তুর জন্য কিংবা ধোকা বা প্রতারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অথবা অহেতুক কোন কাজের জন্য কাঁদা। আর ইসলামের দৃষ্টিতে সেটা হচ্ছে খুবই নিন্দনীয় কাজ।(৩)

মানব জাতীর প্রথম ব্যক্তি হযরত আদম (আ.) এর এই পৃথিবীর জীবন শুরু হয় ক্রন্দন দিয়েই। সাইয়েদ আবু তোরাব সাফায়ি আমোলি তাঁর লেখা ক্বেস্সেহায়ে কোরানগ্রন্থে লিখেছেন: যে, এ পৃথিবীতে এসে হযরত আদম (আ.) নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনায় ও লজ্জায় একশত বছর কেঁদেছিলেন। অতঃপর মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনতাঁকে ক্ষমা করেছেন। যখন জিব্রাঈল ফেরেস্তা তাঁর তওবা কবুল হওয়ার সুসংবাদ পরিবেশন করলেন তখন তিনি আরও একশত বছর খুশীতে আনন্দাশ্রু নিঝরণ করলেন এবং খোদার শুকুর আদায় করলেন।

হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ.) বলেন: আমাদের পিতৃপুরুষ হযরত ইব্রাহীম (আ.) মহান আল্লাহর দরবারে একটি কন্যা সন্তানেরজন্য প্রার্থনা করেছিলেন। যেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জন্য কাঁদতে পারে(৪)

তিনি আরও বলেন যে, আমার বাবা বলেছেন হজ্বের সময় মিনার ময়দানে যে দিনগুলোতে লোকেরা জড়ো হয়, সে সময় তারা যেন আমার জন্য কাঁদতে ও শোক মাতম করতে পারে। তদ্বজন্য আমার বিশেষ সম্পদ থেকে এতো পরিমাণ সম্পদ ওয়াক্‌ফ করো(৫)

তিনি আরও উল্লেখ করেন: মহান আল্লাহ হযরত ঈসা (আ.) এর প্রতি ওহী নাযিল করে বলেন:হে ঈসা ! এমন কাজ করো যাতে তোমার চক্ষুদ্বয় থেকে আমার জন্য অশ্রু নির্গত হয়। এভাবে তূর পাহাড়ে হযরত মুসা (আ.) কে আল্লাহ বলেন: হে মুসা! তোমার জাতির লোকদেরকে বল, যদি কেউ আমার সান্নিধ্য লাভ করতে চায় তাহলে আমার জন্য ক্রন্দনকরা ব্যতীত আর কোন আমল নেই।অনুরূপভাবে হযরত শোআইব (আ.) খোদার প্রেমে এতো কেঁদেছেন যে, তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। তেমনি কাঁদতে হযরত ইয়াহ্‌য়া নবী, হযরত নূহ্‌ ও অন্যান্য নবী রাসুলগণ। স্বয়ং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) ও এতো বেশী কাঁদতেন যে, কাঁদতে কাঁদতে বেহুশ হয়ে যেতেন।(৬)

ক্রন্দন করা প্রেম ও ভালবাসার নিদর্শন। হযরত ইয়াকুব নবী (আ.) স্বীয় পুত্র ইউসুফকে (আ.) নিজের কাছে না পেয়ে তাঁর ভালবাসায় কেঁদে কেঁদে নিজের দৃষ্টি শক্তিহারিয়ে ফেলেছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: তিনি (ইয়াকুব নবী (আ.))বললেন: হায় ইউসুফের জন্য আমার আফসোস ! (তিনি এতো অধিক পরিমান কেঁদেছেন যে, কাঁদতে কাঁদতে) তাঁর চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গেছে। আর তিনি ছিলেন দুঃখ – কষ্টেরও ধৈর্যের প্রতীক।(৭)

আমরা আমাদের পিতা – মাতা, ভাই – বোন, পুত্র – কন্যা, নিকটতম আত্মীয় – স্বজন, ঘনিষ্ট বন্ধ – বান্ধব ও প্রিয়জনদের মৃত্যুতে ভালবাসা, প্রেম – প্রীতি ওস্নেহ – মমতার নিদর্শন হিসেবে উদ্বেগ প্রকাশের উদ্দেশ্যে শোক – মাতম ওক্রন্দন করে থাকি। আর সেটা একটা সীমিত সময় পর্যন্তই থাকে, ধীরে ধীরে সে উষ্ণতা হ্রাস পেতে পেতে এক পর্যায়ে এসে আমরা যেন তাদেরকে ভূলে যাই। কিন্তু ৬১ হিজরী মহরম মাসে কারবালার মরু প্রান্তরে মহানবীর (আ.) দৌহিত্র ইমামহোসাইন (আ.) এর মর্মান্তিক শাহাদাতকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই নয় বরং প্রতিনিয়তই এবং পৃথিবীর সব দেশেই শোক – মাতম ও কান্না কাটি অব্যাহত রয়েছেএবং কেয়ামত পর্যন্ত থাকবে। এখন প্রশ্ন হল ইমাম হোসাইন (আ.) এর জন্য কেন এশোক মাতম ও কান্না ? এর জবাব লিখতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ রয়েছে। কিন্তু প্রবন্ধ দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় সংক্ষেপে কিছু কথা আলোচনা করবো।

ইসলামেরপ্ রথম থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে এক লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বর তথা নবী -রাসুল আবির্ভূত হয়েছেন। প্রত্যেকেই নিজ নিজ উম্মত ও জাতির সামনে তাদের জন্যপ্রযোজ্য খোদায়ী আইন কানুন, নীতিমালা, করণীয় – বর্জনীয়, কর্তব্য – অনুচিত, ফরজ – ওয়াজিব, সুন্নত ও মোস্তাহাব, হালাল – হারাম, মাকরূহ – মোবাহ ইত্যাদি কাজগুলোকে তুলে ধরেছেন। আর নিজেরা বাস্তবে আমল – অনুশীলন করে লোকদেরকে তাশিক্ষা দিয়েছেন। এর মধ্যে দেখা যায় কিছু কিছু নীতিমালা ও আমল অনুশীলন সব নবীর যুগেই সব উম্মতের জন্য প্রযোজ্য হয়ে আসছে। শ্রেষ্ঠ শহীদ ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্য কাঁদা ও শোকাশ্রু নির্ঝরণ করা তেমনি একটি কাজ, যা হযরত আদম (আ.) এর সময় হতে চলে আসছে।

আল্লামা মজলিসি তাঁর বিহার গ্রন্থে তাফসিরে দুর্রুস্‌ সামিনের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেছেন: হযরতআদম (আ.) যখন হযরত জিব্রাঈলের মারফতে নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে হযরত মোহাম্মদ (সা.) হযরত আলী (আ.) হযরত মা ফাতেমা (সা.) ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন (আ.)এর নামের উসিলা দিয়ে নিজের তাওবা কবুলের জন্য আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেছিলেন, তখন তাঁর তাওবা কবুল হয়েছিল। এ সময়ে তিনি যখন ইমাম হোসাইনের (আ.) নাম উচ্চারণ করলেন, তখন তাঁর দুচোখ দিয়ে অশ্রু নির্গত হতে লাগলো। জিব্রাঈরকে (আ.) তিনি এর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে জিব্রাঈর বললেন:আপনার সন্তান এমন সব দুঃখ – কষ্ট ও অবস্থার মোকাবিলা করবেন যা, পৃথিবীর আর কোন দুঃখ – কষ্ট এবং ঘটনার সাথে তুলনা করা যাবে না। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন কি ধরণের দুঃখ – কষ্ট হবে সেটা ? উত্তরে বললেন: আপনারএ সন্তান হোসাইন যে সময় তৃষ্ণার্ত, ক্ষুধার্ত, অসহায় ও একা থাকবেন এবং অন্যায়ভাবে তাঁকে হত্যা করা হবে। তিনি যখন পানি চাইবেন তখন তাঁর জবাবে তাঁর প্রতি নিক্ষেপ করা হবে তীর, বল্লম, নেযা, তলোয়ার ইত্যাদি। তাঁকে শোয়ায়ে পশুর মত জবাই করা হবে। দেহ থেকে তাঁর মস্তককে বিচ্ছিন্ন করে বর্শাগ্রে ধারণকরে তাঁর পরিবারবর্গের সাথে নিয়ে যাওয়া হবে। এ কথা শুনে হযরত আদম (আ.) জার জার করে এমনভাবে কাঁদতে লাগলেন যে, যেন কোন মায়ের যুবক সন্তানের মৃত্যু তাঁর সামনেই ঘটেছে।(৮)

হযরত ইব্রাহীম (আ.) যখন আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে স্বীয় আদুরেপুত্র ইসমাঈলকে (আ.) কোরবানি করতে যাচ্ছিলেন, তখন মহান আল্লাহ তার পক্ষ হতেএকটি দুম্বা পাঠালেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি কঠিন পরীক্ষা ছিল। কিন্তু তিনি এ পরীক্ষায় নিজের হস্তে পুত্রকে কোরবানি করার মাধ্যমে এ কঠিনতম কষ্ট ওমুছিবতের কাজটি আঞ্জাম দিয়ে আল্লাহর আজ্ঞাবহ পূণ্যবান বান্দাদের মধ্যেসর্ব্বোচ্চ মর্যাদা ও সুউচ্চ আসনের অধিকারী হতে চেয়েছিলেন। তখন মহানআল্লাহর পক্ষ থেকে ঐশী বাণী প্রেরণ করা হলো:হে ইব্রাহীম ! আমার সৃষ্টির মধ্যে তোমার নিকট সব চেয়ে হিতৈষী ব্যক্তি কে ? উত্তরে তিনি বললেন:আমার দৃষ্টিতে শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.) এর চেয়ে অধিক হিতৈষী ব্যক্তি তোমার সৃষ্টির মধ্যে কাউকে দেখিনা। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জিজ্ঞেস করলেন: তাঁকে বেশী ভালবাস, নাকি নিজেকে ? তিনি বললেন: তাঁকেই বেশী ভালবাসি। আল্লাহ বললেন: তাঁর সন্তানকে বেশী ভালবাস নাকি নিজের সন্তানকে? তিনি বললেন: তাঁর সন্তানকে। অতঃপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করলেন:জালিম দুশমনের হাতে তাঁর সন্তানের হত্যা হওয়াটা তোমার নিকট অধিক দুঃখ ও বেদনাদায়ক নাকি তোমার নিজের হাতে তোমার সন্তানের জবাই ? উত্তরে তিনি বললেন: তাঁর সন্তানের হত্যাই আমার নিকট সর্বাধিক কষ্টদায়ক ও দুঃখজনক। এরপর আল্লাহ বললেন: হে ইব্রাহীম ! একদল লোক যারা নিজেদেরকে মহানবী (সা.) এর উম্মত বলে দাবী করবে, আর তাঁরই প্রিয় সন্তান হোসাইনকে জুলুম – অত্যাচার করে নির্মমভাবে হত্যা করবে। এ কথা শোনার সাথে সাথে হযরত ইব্রাহীম (আ.) জার জার করে কাঁদলেন এবং দুশমনদেরকে অভিসম্পাত করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন।(৯)

এভাবে প্রত্যেক নবী রাসুলগণই ইমাম হোসাইন (আ.) এর মর্মান্তিক শাহাদাতের সংবাদপেয়ে কেঁদে কেঁদে অশ্রু বিসর্জন দেন এবং শোক জ্ঞাপন করেন। এমন কি নবীরাসুলগণের সংবাদ বাহক জিব্রাঈল আমিনও যখন ইমাম হোসাইন (আ.) এর নির্মম শাহাদাতের সংবাদ মহা নবীকে (সা.) পরিবেশন করছিলেন তখন নিজেই কেঁদে ফেলেন।(১০)

কারবালায় ইমাম হোসাইনর (আ.) এ শাহাদাতের কথা স্মরণ করে বিশ্ব নবী (সা.) জার জার করে কেঁদেছেন এবং অত্যন্ত শোক প্রকাশ করেছেন। এ সম্বন্ধে অসংখ্য হাদীস বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: মুসনাদে আহমাদ ইবনে হান্বাল, তিরমিযি, মিশকাত, বাইহাক্বি, সাওয়ায়েক্বে মুহরিক্বা, ইউনাবিয়ুল মুয়াদ্দাহ, বিহারুল আনওয়ার, কানযুল ওম্মাল, কাবীর, আশ্‌ শাহীদ, মাওলানা আব্দুল হামিদ দেহলাভী রচিত ফতোয়ায়ে আযিযি ইত্যাদি ছাড়া আরও অনেক গ্রন্থাদি। আমরা এখানেমাত্র দুটি হাদীস উল্লেখ করবো:

ইবনে সাদহতে বর্ণিত: হযরত শাধী (রাঃ) বলেন: সিফ্‌ফিনের যুদ্ধের ময়দানে যাবার সময়হযরত আলী (আ.) কারবালার নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। যখন ফোরাত নদীর তীরে নাইনাওয়ানামক স্থানে পৌঁছালেন তখন তিনি হঠাৎ থেমে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন: এ স্থানটির নাম কি? লোকেরা বললো: এ স্থানের নাম কারবালা। তখন তিনি এমন ভাবে কাঁদলেন যে, তাঁর অশ্রু ঝরে যমীন সিক্ত হলো। অতঃপর তিনি বললেন: একদিন আমি আল্লাহর নবীর (সা.) খেদমতে গেলাম, দেখলাম তিনি রোনাজারী করছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে আল্লাহর রাসুল (সা.) ! আপনি এভাবে কাঁদছেন কেন ? উত্তরে তিনি বললেন: এই মাত্র জিব্রাঈল আমিন আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমাকে সংবাদ দিলেন যে, আমার সন্তান হোসাইনকে ফোরাতের তীরে কারবালা নামক স্থানে হত্যা করা হবে। জিব্রাঈল সেখানকার এক মুঠো মাটিও এনে তার ঘ্রাণআমাকে শুঁকিয়ে গেলেন(১১)

হযরত রাসুলে আকরাম (সা.) যখন স্বীয় সন্তান ইমাম হোসাইন (আ.) এর শাহাদাত ও তাঁর কঠিনতম অবস্থার সংবাদ হযরত মা ফাতেমাকে (সা.) শোনান , তখন তিনিও দীর্ঘক্ষণ ধরে অঝোরে কাঁদলেন। তারপর বললেন:হে আমার বাবা ! আমার হোসাইনকে কখন শহীদ করা হবে ? রাসুল (সা.) বললেন: আমি বর্তমান থাকবো না, তুমিও থাকবে না আর আলীও থাকবে না। এ কথা শুনে তিনি আরো অঝোরে কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন:তখন তাঁর জন্য কাঁদবে কে ? আর কারা কায়েম করবে তার জন্য কান্নার ধারা ? রাসুল (সা.) বললেন:আমারউম্মতের নারীরা আমার আহলে বায়তের নারীদের জন্য কাঁদবে, আর আমার উম্মতের পুরুষরা কাঁদবে আমার আহলে বায়তের পুরুষদের জন্য। প্রতি বছর যুগে যুগেহোসাইনের জন্য এ ক্রন্দন ধারা অব্যাহত থাকবে। অতঃপর কেয়ামতের দিন তুমি ঐনারীদের জন্য (আল্লাহর দরবারে) সুপারিশ করবে, আর আমি করবো পুরুষদের জন্য সুপারিশ। যারা হোসাইনের এই বিপদ ও কষ্টকে স্মরণ করে কাঁদবে আমরা তাদের হাতধরে জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দেবো(১২)

কারবালার শহীদদের স্মরণে শোক সভা, শোক মিছিল, শোক মাতম, রোনা জারী, কান্না কাটা, অশ্রু বিসর্জন ইত্যাদি সর্ব প্রথম রাসুল পরিবার থেকেই শুরু হয়। কারবালার ময়দানেই এর গোড়া পত্তন হয়। কারবালার মর্মান্তিক হত্যালীলা সংঘটিত হবার পরযখন রাসুলের আহলে বায়তদেরকে বন্দী করে কুফার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন স্বজন হারা কাফেলার অসহায় শিশু, তরুণী, অবলা নারী ও একমাত্র পুরুষ ওয়ারিস ইমাম হোসাইনের (আ.) পুত্র ইমাম যয়নুল আবেদিন (আ.) সহ সকলেই নিজেদের আত্মীয়স্বজনদের ক্ষত – বিক্ষত মস্তক বিহীন মৃতদেহসমূহের উপর লুটিয়ে পড়েন এবং রক্তাক্ত মৃতদেহসমূহকে জড়িয়ে ধরে সকলে মিলে হৃদয় বিদারক করুণ স্বরে মারসিয়া পড়েন ও বিলাপ করে ক্রন্দন করেন।(১৩)

বিখ্যাত দার্শনিক শহীদ মুতাহারী বলেছেন: ইমাম হোসাইন (আ.) এর প্রতি কান্না ওআযাদারী হচ্ছে নিজের ন্যায্য অধিকার চাওয়া এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার দৃঢ়প্রত্যয়ের ঘোষণা করা।

জার্মান দার্শনিক মরবিন তাঁর ইসলামী রাজনীতি গ্রন্থে লিখেছেন: যারা ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্য কান্না কাটি ও আযাদারী করে তারা জ্ঞান বুদ্ধি সম্পন্ন রাজনৈতিক কাজ করছে। আমার বিশ্বাস, ইসলাম ও মুসলমানদের অগ্র যাত্রার মূল কারণ হচ্ছে ইমাম হোসাইনের (আ.) দুঃখজনক শাহাদাত বরণ। আমি এও বিশ্বাস করি যে, মুসলমানদের জ্ঞানগর্ভ এবং জীবনদানকারী অনুষ্ঠানাদিই হচ্ছে ইমাম হোসাইনের (আ.) জন্য শোক মাতম ও আযাদারী। মুসলমানদের মধ্যে যতদিন এ প্রক্রিয়া টিকে থাকবে, ততদিন তারা হীনতায় কারও সামনে মাথা নত করবে না।(১৪)

সূত্রসমূহ:

১। লিসানুল আরাব, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৪৭৫।

২। মিসবাহুল হারামাইন, পৃষ্ঠা: ৩১১।

৩। মিসবাহুল হারামাইন, পৃষ্ঠা: ৩১১।

৪। মাসকানুল ফুয়াদ, পৃষ্ঠা: ১০৮।

৫। সাফিনাতুল বিহার, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ৩৬২।

৬। সাফিনাতুল বিহার, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ৯৫ – ৯৭; কেয়ামে হক, পৃষ্ঠা: ১৫।

৭। সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৮৪।

৮। বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খন্ড, পৃষ্ঠা:২৪৫, হাদীস নং: ৪৪।

৯। বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খন্ড, পৃষ্ঠা:২২৫, হাদীস নং: ৬; আমালিয়ে সাদুক।

১০। বিহারুল আনওয়ার, ৪৪তম খন্ড, পৃষ্ঠা:২৪৫।

১১। মুসনাদে আহমাদ ইবনে হান্বাল; সাওয়ায়েক্বে মুহরিক্বা, পৃষ্ঠা: ১৯১; আশ্‌ শাহীদ, পৃষ্ঠা: ১২২।

১২। বিহারুল আনওয়ার, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৬৪; আশ্‌ শাহীদ, পৃষ্ঠা: ১২৪।

১৩। ইতিহাসের দৃষ্টিতে মহররম শোক ও আযাদারী, পৃষ্ঠা: ১২।

১৪। ফালসাফায়ে কেয়ামে সাইয়েদুশ শুহাদা ওয়া আযাদারীয়ে অন হাযরাত, পৃষ্ঠা: ১৫৯ ও ১৬০।

মূল: সৈয়দ এহসান হোসাইন হোসাইনী।

Source: http://www.hussainidalan.com