শেখ বাহায়ি; ইসলামী দর্শনের একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি

শেখ বাহায়ি অন্তিম যুগের ইসলামী দর্শনের একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি ছিলেন, যিনি তার যুগের সব ধরণের জ্ঞান সম্পর্কে ছিলেন দক্ষ এবং এ যুগের প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট ধর্মীয় ওলামাদের একজন, যিনি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় ছিলেন পণ্ডিত।

ইরানের মহান চিন্তাবিদ ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন শেখ বাহাউদ্দিন মুহাম্মদ বিন ইয্যুদ্দিন হুসাইন আমেলী যিনি শেখ বাহায়ি নামে বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সাফাভী শাসনকালে জীবন যাপন করতেন এবং নিজের প্রতিভা ও দক্ষতাকে সে যুগের শক্তিশালী

বাদশাহ শাহ আব্বাস বুযুর্গ সাফাভী’র সময়ে তুলে ধরেন। তিনি ৯৫৩ হিজরী সনে লেবাননের বালাবাক শহরে জন্মগ্রহন করেন। ১৩ বছর বয়সে তার বাবা শেখ ইয্যুদ্দিন হুসাইন আমেলী যিনি একজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন শিয়া আলেম ছিলেন তার সাথে ইরানের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত এই পুরনো সংস্কৃতি ও সভ্যতায় বসবাস করেন।

তিনি অল্প কিছু দিনের মধ্যে ফার্সী ভাষা শিখে ফেলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো ফার্সী ভাষায় তার দক্ষতার কারণে তাকে দশম হিজরীর একজন উচ্চপর্যায়ের ফার্সীবিদ হিসেবে গণনা করা হোতো। গণিত বিদ্যায়ও তিনি শিক্ষক পর্যায়ে উন্নীত হোন, দর্শন, যুক্তি, কালাম শাস্ত্র ও দ্বীনি জ্ঞানে‌ও পূর্বেকার বড় বড় আলেমদের সমপর্যায়ের মর্যাদা লাভ করেন। প্রসংশাজনক অধ্যবসায়ের কারণে চিকিৎসা, ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্থাপত্য শিক্ষা লাভ করেন। নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি, সাহস ও প্রতিভা তাকে চিরকালের জন্য পৃথিবীর বুকে জীবিত রেখেছে। শেখ বাহায়ি’র লিখিত বিভিন্ন রকম অবদান যার বেশ কয়েকটি তার হাওযায় (ধর্মীয় শিক্ষা বোর্ড) উতসমূলক বই হিসেবে পরিগণিত হয়। এসবই তার বিভিন্ন রকম প্রতিভার ফল। তার কিছু বিখ্যাত বইসমূহর মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে:

কুরআন ও হাদিস  বিষয়ক: আরবাউন হাদিস, শারহি দর তাফসির বায়যাভী, হাল্লুল হুরুফুল কোরআন, উরওয়াতুল উসকা ও দেরায়াতুল হাদিস।

ফিকাহ, কালাম শাস্ত্র ও শিয়া সম্পর্কীয়: ইসনা আশারিয়া, জামে আব্বাসী যা কালাম শাস্ত্রে শিয়াদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই হিসেবে গণনা করা হয়, হাবলুল মতিন, হাদায়েকুস সালেহীন, তাফসির বার সাহিফায়ে সাজ্জাদিয়া, মিফতাহুল ফালাহ, আয যুবদাহ ফিল উসুল।

হেকমত বা দর্শনের ক্ষেত্রে: রেসালেয়ি দার বাবে ওয়াহদাতে ওজুদ (একত্ববাদের গবেষণামূলক পুস্তিকা)।

গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক: তাশরিহুল আফলাক, কুল্লিয়াতে হেসাব, শারহি বার রেসালেয়ে নুজুমে চোগমিনী ও তোহফায়ে হাতেমী।

আরবী ব্যকরণ ও এরফান বিষয়ে: তুতি নামে, নান ও হালুয়া, মুশ ও গুরবে, শির ও শেকার ও কাশকুল যা আরবী ভাষায় লেখা হয়েছে।

নিম্নের শ্লোকগুলো শেখ বাহায়ির লেখা কবিতাসমূহের নমুনা:

همه شب نماز خواندن همه روز روزه رفتن / همه ساله از پي حج سفر حجاز كردن

ز مدينه تا به كعبه سر و پا برهنه رفتن / دو لب از براي لبيك به گفته باز كردن

شب جمعهها نخفتن به خداي راز گفتن/ ز وجود بينيازش طلب نياز كردن

به خدا قسم كه كس را ثمر آنقدر نبخشد / كه به روي مستمندي در بسته باز كردن

অর্থাত:

সারা রাত নামাজ পড়া, সারা দিন রোজা রাখা।

সারা বছর হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে সফর করা।

মদিনা থেকে মক্কা খালি পায়ে হেটে যাওয়া।

লাব্বায়েক লাব্বায়েক বলার জন্য দু’ঠোট খোলা।

প্রত্যেক বৃহস্পতি বার রাতে না ঘুমিয়ে আল্লাহর ইবাদত করা।

তার অমুখাপেক্ষী উপস্থিতির কাছে নিজের মুখাপেক্ষী হওয়ার তলব করা।

আল্লাহর কসম কাউকে এতোটা লাভবান করবে না ।

যে একটি দরিদ্র লোকের বন্ধ দরোজা খুলে দেয়া।

সর্বসাকুল্যে শেখ বাহায়ির বিভিন্ন জ্ঞান সম্বন্ধীয় লেখা প্রায় ৯০টি বই পরিচিতি লাভ করেছে, যেমন: গণিত, দর্শন ও এরফান থেকে শুরু করে জ্যোতির্বিদ্যা ও কালাম শাস্ত্রের বইও রয়েছে।

এতোসব প্রশংসার সাথে শেখ বাহায়ির লিখিত অবদানগুলো এসকল পত্রাদি ও বইসমূহ ভিত্তি স্থাপন করে আছে যার কারণে এ মহান ব্যক্তিত্বের স্মরণ ও স্মৃতিকে শুধুমাত্র ইসফাহানের জনগণের মুখে ও মনে স্থান করে রেখেছে তাই নয় বরং সমস্ত ইরানি জাতির কাছে তাকে জীবিত রেখেছে।

যা প্রকাশ্য তা হচ্ছে, শেখ বাহায়ি ছিলেন একজন অতুলনীয় ও দক্ষ কারিগর। নিঃসন্দেহে তার কৃত পরিকল্পনাগুলোকে ইরানি ও ইসলামী শিল্পের প্রকাশ স্থল হিসেবে মনে করা উচিত। ইসফাহানের শেখ বাহায়ি গোসলখানা, কাশানের ফিন বাগান এবং ইসফাহানের শাহ মসজিদ এগুলো ইরানি ও ইসলামী শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের কয়েকটি নমুনা মাত্র যা শেখ বাহায়ির সুন্দর মন ও উত্তম চিন্তা চেতনার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। যায়ান্দে রুদ নদীর পানি সরবরাহ পদ্ধতিও যা শেখ বাহায়ির হিসাব নিকাস ও গণিতের জটিল সমাধানের মাধ্যমে সম্ভবপর হয়েছে এবং শেখ বাহায়ি পানি সরবারহ পদ্ধতি নামে পরিচিত লাভ করেছে তা তার ইঞ্জিনিয়ারিং কলা কৌশলের দক্ষতাকে প্রমাণ করে। বলাবাহুল্য, এই পানি সরবারহ পদ্ধতি পরিকল্পনাটি এতো সূক্ষ্মভাবে করা হয়েছে যে, সাড়ে ৩ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য ছিলো। শুধুমাত্র যায়ান্দে রুদ নদীতে বাধ নির্মাণ করার পর বর্তমানে শেখ বাহায়ির পানি সরবারহ পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

শেখ বাহায়িকে ইসলামী দর্শনের শেষের দিকের বিশিষ্ট প্রতিনিধি হিসেবে গণনা করা হয় যিনি তার যুগের সকল জ্ঞান সম্পর্কে ছিলেন দক্ষ। এ যুগের প্রতিনিধিদের মধ্যে অন্যতম বিশিষ্ট ধর্মীয় ওলামাদের একজন, যিনি গণিত ও জ্যোতির্বিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী। একজন বিশেষ গবেষকের ভাষায় তিনি নিজের মর্যাদা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না যে, একটি অ্যাস্ট্রোলেইব (গ্রহ -নক্ষত্রের উচ্চতা ও গতিবিধি নির্ণয়ের জন্য মধ্যযুগীয় যন্ত্র বিশেষ) তৈরি করবেন এবং সূক্ষ্মভাবে মান নির্ণয় করবে বা পরিমাপ আঞ্জাম দেবে।

শেখ বাহায়ি ইসলামের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক দিক দিয়ে মারজা বা ধর্মীয় নেতা ছিলেন। তিনি এরফান থেকেও দুরে ছিলেন না। তার লেখা বই তুতি নামে সূফীবাদ ও এরফানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে পরিষ্কার ও সুন্দর বর্ণনাকৃত ফার্সী কবিতার বই। তার এরফানের জ্ঞান ছিলো জনসাধারণের জন্য এবং চিন্তা ও পরিচিতি বিষয়গুলো যা বিশেষ করে সূফীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল তাও বাদ পড়েনি। তার দেওয়া আধ্যাত্মিক ও আরেফানা বার্তা সাধারণ সূফীদের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উজ্জ্বল আলোর মত প্রতিফলিত ও প্রচলিত হয়েছে। বিভিন্ন চায়ের দোকানে কবিতা বর্ণনাকারীরা তার লেখা কবিতাগুলোকে বর্ণনা করতো। আর তখনি বিশিষ্ট ধর্মীয় জ্ঞান অনুসন্ধানীরা বিভিন্ন মাদ্রাসাতে তার লেখা কালাম ও ফিকাহগত বই নিয়ে আলোচনা করতো।

সমাজের বুকে গণিতবিদ্যায় তার প্রতিভা ও ক্ষমতা এবং রসায়নবিদ্যায় তার খ্যাতি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পেরেছিলো। তিনি ছিলেন প্রতিভাবান আরেফ বা আধ্যাত্মিক আলেমদের একজন উত্তম প্রতিনিধি, ইসলাম ও ইরানের ইতিহাস যাদের কিছু নমুনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছে।

দর্শন বিদ্যায় শেখ বাহায়ি তার যুগের বিখ্যাত দার্শনিক মীর দামাদ ও মোল্লা সাদরার সমান নন, কিন্তু শিয়া ফিকাহ ও কালাম শাস্ত্রে তার সাহায্য -সহযোগিতা বা তার গণিত ও এরফান এমন ছিল যে সাফাভী শাসন কালে তাকে জ্ঞানের মশালধারীদের মধ্যে গণনা করা হয়। শেখ বাহায়ি ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি দশম হিজরী সনে ইরানের শিয়া সম্প্রদায়ের শিক্ষা দ্রুত প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছেন। আর তিনি এমন একজন ব্যক্তি ছিলেন যে, নিজের যুগে অন্যদের তুলনায় বেশি শরিয়ত ও তরিকত সমন্বয়ে চেষ্টা চালিয়েছেন। আসলে তিনি ইসলামের বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক বা আত্মিক দিককে রক্ষা করে ছিলেন।

তাকে যথাযথ মনে করা উচিত; কেননা সাফাভী শাসন কালে অনেক বড় বড় আলেমগণ শেখ বাহায়ির ছাত্র ছিলেন। যেমন: মুহাম্মদ তাকী মাজলিসী, সৈয়দ আহমদ আলাভী, সদর উদ্দিন শিরাযী ও মোল্লা মহসিন ফেইয কাশানীদের মত বিখ্যাত অনেক ব্যক্তিবর্গের। বলা হয়ে থাকে যে, মোল্লা সাদরা প্রথমে শেখ বাহায়ির উদ্ধৃতি ভিত্তিক ক্লাসে অংশগ্রহণ করতেন। শেখ বাহায়ি তার লেখা, নির্মাণ ও ছাত্রদের মাধ্যমে ইরানী সমাজের প্রত্যেক স্তরের মানুষের কাছে প্রভাব রাখতে পেরেছেন। নিঃসন্দেহে পুরো সাফাভী শাসন কালে তার মতো অন্য কোনো ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবেনা যে, সাধারণ ও বিশেষ ব্যক্তিবর্গের কাছে এমন পরিচিতি লাভ করেছে। ইরানী জনগণের উপর তার প্রভাব একটি জাতীয় বীরের মত ছিলো। এ কথা সাফাভী যুগের বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, লেখক ও ১০৩০ হিজরী সনে তার মৃত্যু ঘটনার বিষয়ে লিখিত আলামে আরায়ে আব্বাসী গ্রন্থের লেখকের মুনশি বা সচিব ইস্কান্দার বেইকের বর্ণনাতে পাওয়া যায়:

“যে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ রাজধানীতে ছিলেন জানাযার আগে পিছে মাগফেরাতের দোয়া পড়তে পড়তে পা ফেলছিলেন এবং জানাযাকে ঘাড়ে তুলে নেয়ার জন্য এগিয়ে যাচ্ছিলেন। জনগণের ভিড় এতো ছিলো যে, বড় জায়গা থাকা সত্বেও নাকশে জাহান চত্বরে জনকোলাহল ছিলো এবং জনগণের মাঝখান থেকে জানাযাকে নিয়ে যাওয়া খুবই কষ্টকর ছিলো”।

Source: http://www.hussainidalan.com