মজলিস

আশ্রয় প্রার্থনা

পবিত্র কুরআন ও আখবারে আশ্রয় প্রার্থনার গুরুত্ব ঃ পবিত্র কুরআন এবং আহলে বাইতে রাসুলুল্লাহর (সাঃ) আখবারে (বর্ণনায়/রেওয়ায়েতে) যে বিষয়টির প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তা হল —– (ইস্তেআজা) অর্থাৎ শয়তানের অনিষ্টতা থেকে বাঁচার (অভিশপ্ত শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর

দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা)। যা হল ———- এর মত পবিত্র বাক্যের মাধ্যমে। কিন্তু এটা অপরিহায যে, মানুষের অন্তরে যথার্থ মূল্যায়ণের অনুভূতি সৃষ্টি হওয়াকে প্রকৃত অর্থে ইস্তেআজা বলা যেতে পারে।

ইন্তেআজার গুরুত্বকে স্পষ্ট করার লক্ষ্যে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র গ্রন্থ কোরআনুল করিমে এরশাদ করেছেঃ

———

যখন আপনি কোরআন পাঠ করেন তখন আপনি বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করুন। (সূরা নাহাল-৯৮)

নামাজের ক্ষেত্রে তাকবিরাতুল এহরামের পরেও ইস্তেআজার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু নামাজে অতি নীরবে ইস্তেআজার বাক্য উচ্চারণ করার কথা বলা হয়েছে। তাফসির কারকগণ নামাজে ইস্তেআজার বাক্য ধীরে উচ্চারণ করার কারণ উল্লেখ পূর্বক বলেছেন ঃ আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থী ব্যক্তি হল ঐ ব্যক্তির ন্যয় যে সুযোগ বুঝে শত্রর কবল থেকে পালিয়ে নিজেকে লোকান্তরিত রাখতে চায়, এখানে বিষয়টি ঐ বাস্তবতার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে যে, প্রার্থনাকারী স্বীয় স্পষ্ট শত্র থেকে পলায়নরত অবস্থায় রয়েছে যে সর্বদা সুযোগের সন্ধানে ঔৎপেতে আছে। সুতরাং যথাসম্ভব নিজেকে তার (শয়তান) থেকে লুকিয়ে ধীর চিত্তে মহান আশ্রয় দাতার দরজায় কড়া নাড়ো।

এবাদতের প্রারম্ভে ইস্তেআজা

ইস্তেআজার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময় হল এবাদতের প্রারম্ভকাল। মানুষের উচিৎ যে কোন এবাদত শুরুর পূর্বে শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা। কারণ ইবলিশ সর্বদা মনুষ্য জাতির প্রত্যেক সদস্যকে বিভ্রান্ত করতে সর্বদা ওৎ পেতে থাকে। তার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকে মানুষের সৎকর্ম সমূহকে নস্যাৎ করা অথবা সেটাকে সফল হতে না দেয়া। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঐ ব্যক্তি সেই কর্মের সওয়াব বঞ্চিত হয়। অথবা অন্ততঃ পক্ষে শয়তানের চেষ্টা থাকে মানুষকে এবাদতের ক্ষেত্রে রিয়া ও অহংকারে নিপতিত করা।

উদাহরণস্বরূপ আপনি ওজু করতে উদ্যত হলেন। এক্ষেত্রে আপনার জন্য সর্বপ্রথম জরুরী করণীয় হল ইস্তেআজা করা। অতঃপর ওজু শুরু করা। আপনারা একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেছেন আপনার এই ওজুই শয়তানের খেলনায় পরিণত হয়েছে। কারণ শয়তানের ঐ প রোচনা যা সে মানুষের অন্তরে সৃষ্টি করে যার ফলশ্রতিতে মানুষের সমস্ত এবাদত মূল্যহীন ও অর্থহীন হয়ে পড়ে।

মোদ্দকথা ইস্তেআজা এবাদত সংক্রান্ত বিষয়াবলীর মধ্যে অন্তর্ভূক্ত। যেগুলো সঠিক অর্থে এবং যথার্থভাবে সম্পাদনের জন্য জরুরী হল অভিশপ্ত শয়তানের অনিষ্টতা এবং তার অনুপ্রবেশ থেকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আশ্রয় গ্রহণ করা।

মুবাহ বিষয়বালীর ক্ষেত্রে ইস্তেআজার তাকিদ

মুবাহ বিষয়াবলী সমূহ যেমন খাওয়া-দাওয়া, পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান প্রভৃতির ক্ষেত্রেও ইস্তেআজার হুকুম রয়েছে। প্রত্যেক কাজের জন্য নির্দিষ্ট দোয়া বর্ণিত আছে। যেমন পোষাক-পরিচ্ছেদ পরিধানের সময় —————- পাঠ করা অর্থাৎ “হে আল্লাহ আমার লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখা আর সেটাকে শয়তানের করমুক্ত রাখা।”

যে কোন হীন ও নীচ এবং সুউচ্চ ও প্রিয় অবস্থায় শয়তানের অনিষ্টতা থেকে আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করা উচিত। মসজিদে যাওয়ার সময় ইস্তেআজা করা উচিৎ। কারণ সেখানেও এই লড়াকু শয়তান আপনার পিছু নেয়। এমন কি টয়লেটে যাওয়ার প্রাক্কালেও ইস্তেআজা করার জোর তাকিদ দেয়া হয়েছে ঃ

——–

“হে পওয়ারদেগার আমি খাবিশ শয়তানের নোংড়ামী ও অপবিত্রতা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”

মসজিদের দ্বারে শয়তানের উপস্থিতি ঃ

জনৈক তাক্বওয়াবান লোক বর্ণনা করেন ঃ “আমি একদা আধ্যাত্বিকতার দীব্যদৃষ্টিতে অভিশপ্ত শয়তানকে মসজিদের দরজায় দাড়িয়ে থাকতে দেখলাম, আমি তাকে বললাম ঃ হে আজীবন অভিশপ্ত, তুমি এখানে কি করছ? প্রত্যুত্তরে সে বলল ঃ আমার বন্ধু-বান্ধবরা এদিক-ওদকি ছত্রভঙ্গ হয়ে গিয়েছে, আমি তাদের জন্য অপেক্ষা করছি।”

শয়তানের কথায় আমি অবহিত হলাম তারা হলেন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিবর্গ, এই অভিশপ্ত শয়তান তাঁদের সাথে মসজিদে অনুপ্রবেশ করতে পারেনি আর তারা এতটুকু সতর্কতা অবশ্যই অবলম্বন করেছিলেন তা হল মসজিদের দরজায় তারা ইসতে আজা করেছিলেন।

গৃহত্যাগের সময় ইস্তেআজাঃ

সর্বক্ষেত্রে ইস্তেআজা জরুরী। যখন মানুষ গৃহ হতে বাইরে বের হয় তখন শয়তান দরজার উপর অপেক্ষমান থাকে। তৎক্ষণাৎ ইস্তেআজা করতঃ এই দোয়াটি পাঠ করা উচিৎ ঃ

———

“মহান আল্লাহর নামে এবং তারই তাওফিক দ্বারা সেই মহান সত্বার উপর আমার পূর্ণাঙ্গ বিশ্বাস আর তারই উপর আমার ভরসা। তিনি ব্যতীত অন্যকোন পরাক্রমশালী নেই।”

পবিত্র কুরআন জোর দিয়ে বলেছেঃ

————-

“শয়তান ও তার দল সর্বদা তোমাদের প্রত্যেক কাজ-কর্মে দৃষ্টিপাত করে থাকে আর তাদের অস্তিত্ব থেকে তোমরা বেখবর রয়েছ। তাকে নিজের শত্র“ মনে কর। কারণ আমরা শয়তানকে বেঈমানদের বন্ধু হিসেবে নির্ধারণ করেছি।”

কেবলমাত্র ইস্তেআজাই আপনাকে অভিশপ্ত শয়তান থেকে রক্ষা করতে পারে। মহান আল্লাহ তাআলার আশ্রয় ব্যতীত শয়তান থেকে মুক্তি পাওয়ার আর অন্য কোন পন্থা নেই।

ঠিক সেই ব্যক্তির ন্যায় যে কোন ধনাঢ্যের তাবুতে তার সাথে সাক্ষাৎ করতে চায় কিন্তু তার তাঁবুর প্রবেশদ্বারে রক্ত পিপাসু শিকারী কুকুর বসে রয়েছে। যে তাকে তাঁবুর ভিতরে যেতে দিচ্ছে না বাধা প্রদান করছে। এমতাবস্থায় লোকটার করণীয় হল সেই ধনাঢ্যের নিকট আশ্রয় চাওয়া। যাতে বলা যেতে পারে আমি আপনার খিদমতে হাজির হতে চাই অনুগ্রহ করে এই হিংস্র-জানোয়ারটাকে সরিয়ে দিন। এটা ছিল একটি উদাহরণ মাত্র।

নবী করিম (সাঃ) কে ইস্তেআজার নির্দেশঃ

হে মানুষ তুমি চাও যে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করতে আর শয়তানের সকল ধরনের চক্রান্ত হল তোমাকে আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত রাখা। শয়তান মানুষের কাজ-কর্মে এমনভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে থাকে যাতে মানুষ তার উদ্দেশ্যে পৌছাতে না পারে।

এমতাবস্থায় শয়তানের কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র উপায় হল আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা।

মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে হুকুম দিয়েছেনঃ

———

“হে হাবীব বলুন, হে আল্লাহ, আমি শয়তানদের ওয়াসা ওয়াসা (প্ররোচনা) থেকে এবং অন্তরের উপর শয়তানের আধিপত্য থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। তদরূপ সূরা নাসে উল্লেখ করেছেনঃ

———

অতএব শত্র“পক্ষ যখন এত শক্তিশালী ও সাহসী তখন আপনাকে আর আমাকে বিশ্রামে থাকা উচিৎ নয়। বরং নিজের সমস্ত শক্তিসমূহকে একত্রিত করে আল্লাহতাআলার আশ্রয়ে শয়তান থেকে বাঁচার জন্য তদবির করা উচিৎ। অন্যথায় আপনি হঠাৎ অনুভব করবেন যে দরজায় আপনি দীর্ঘদিন যাবৎ মস্তক অবনত করে পড়ে আছেন সেটা হল শয়তানের আস্তানা। যেটাকে আপনি অজ্ঞতাবশতঃ আল্লাহর আস্তানা বলে মনে করে রেখেছেন। সেই সময়ে আপনি আল্লাহকে ডাকতেন কিন্তু বাস্তবে আপিনার উদ্দেশ্য ছিল শয়তান। মুখে আপনি — ইয়া আল্লাহ উচ্চারণ করতেন কিন্তু আনুগত্য করতেন শয়তানের।

আজীবন শয়তানের উপাসনা করাঃ

মুনতাখাবুত তাওয়ারিখে একটি ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। আমার ওস্তাদ মরহুম সৈয়দ আলী হায়েরী (রহঃ) তাঁর কোন এক দারসে (পাঠে) বলেছিলেন ঃ ইসপাহানের কোন একটি গ্রামে এক অসুস্থ ব্যক্তি মৃত্যু মুখে পতিত হয়ে ছিল। গ্রামের মোত্তাকি আলেমকে অনুরোধ করা হল অসুস্থ ব্যক্তিটির শিয়রে বসে তালকিন পাঠ করার জন্য। তালকিন পাঠ করার সময় যখন অসুস্থ লোকটি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু” —– বলে একত্ববাদের সাক্ষ্য দিত তখন ঘরের এক কোণা থেকে আওয়াজ ভেসে আসত “আমার বান্দা তুমি ঠিক বলেছ।” আর যখন অসস্থ ব্যক্তিটি মুখ দিয়ে ——- ইয়া আল্লাহ উচ্চারণ করত তখন ঘরের এক কোণ থেকে আওয়াজ আসতো “হে আমার বান্দা আমি হাজির আছি” মোত্তাকী আলেম লোকটি জিজ্ঞাসা করলেন হে আওয়াজকারী তুমি কে? উত্তরে জবাব আসল। আমি তার খোদা। সারা জীবন যার সে উপসনা করেছে। আমি হলাম সেই শয়তান।

বস্তুতঃ সেই ব্যক্তির খোদা বা প্রভু ছিল শয়তান যার প্রত্যেকটি ডাকে সে লাব্বাইক বলেছে। সকাল-সন্ধ্যা তারই নির্দেশে আমল করেছে। তার মুখ শয়তানের তলকিন দ্বারা কথা বলত। সারা জীবন যখন সে এরূপ অবস্থায় ছিল তখন সে অন্তিমলগ্নে — অথবা — বলুক না যেন তার উদ্দেশ্য ও জবাবদাতা শয়তানই হবে। আর দেহ ত্যাগের সময় চোখের পর্দা সরে গেলে আফসোস করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। উপরন্তু তখন আফসোস করার উপকারিতাই বা কি?

ওহে ঈমানদারগণ ইস্তেআজার প্রতি আমল করার চেষ্টা করুন। আর শত্র“পক্ষকে দুর্বল ও খাটো মনে করবেন না। অবশ্য এটাও মনে করবেন না। ————- মুখে উচ্চারণকরাই যথেষ্ট। যখন পর্যন্ত আপনি এই বাক্যের যথার্থতার উপর আমল করবেন না ততক্ষণ এতে কোন সুফল লাভ হবে না।

হুকুমত নির্জনে না মাহরামের সাথে সহঅবস্থান-ক্রোধঃ

আহলে বাইত (আঃ) গণের কয়েকটি রেওয়ায়েতে ইস্তেআজার প্রতি বিশেষ তাকিদ দেয়া হয়েছে।

১. বিচারের ক্ষেত্রে ঃ বিচারকের জন্য বিচার কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে বাদীর ডাকে সাড়া দিতে এবং ন্যায় বিচারের স্পর্শকাতর স্বহতে ইস্তেআজা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

২. নির্জনে না-মাহরামের সাথে সহাবস্থান ঃ অন্য মহিলা বা অন্যের স্ত্রীর সাথে নির্জনে সহাবস্থান এতই স্পর্শকারত ও বিপদজনক মূহুর্ত হয়ে থাকে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে হোক বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হোক না কেন শয়তান মানুষের উপরে চেপে বসে। আর এমনভাবে শয়তান প্রদশিত হয়ে মানুষকে প্ররোচিত করে। ফলে মানুষ ধ্বংসের সম্মুক্ষিণ হয়।

ক্রোধ ঃ বিচারকার্য পরিচালনা ও নির্জনে না-মাহরামের সাথে সহাবস্থান এ দুটোই ঘটনা ক্রমে সংঘটিত হয়ে থাকে। কিন্তু ক্রোদ বিষয়টি হল মানুষের জন্য সংকটকাল। মানুষ যখন ক্রোধান্বিত হয় তখন তার রক্তচাপ বেড়ে যায় আর সেই সুযোগ শয়তান পূর্ণাঙ্গ শক্তি-সামর্থ নিয়ে তার উপর (মানুষের উপর) কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে বসে। কারণ শয়তান সৃষ্টির দিক থেকে আগুন ও উষ্ণ মেজাজের অধিকারী। তাই সেই বক্রের মত তড়িৎ গতিতে মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

শয়তান হযরত নূহ (আঃ) কে যা বলেছিল সেই দৃষ্টান্তের প্রতি দৃষ্টিপাত করে সত্যকে অনুধাবনের চেষ্টা করুন। শয়তানের ভাষ্য হল ঃ “ক্রোধের সময় আমার হাতে মানুষের এমন দশা হয় যেমনটা শিশুর হাতে বলের হয়।

আপনারা লক্ষ্য করেছেন শিশুবলটাকে ইচ্ছানুযায়ী যত্রতত্র সহজে ছুড়ে ফেলতে পারে। তদরূপ শয়তানও ক্রোধের অবস্থায় মানুষের উপর চেপে বসে মানুষের দ্বারা যে কোন হারাম কাজ সম্পাদন করায়। আর এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, মানুষ তার প্ররোচনায় কুফরী আমল ও সংঘঠিত করে এমনধরনের পরিস্থিতি থেকে কেবলমাত্র ঐ সকল সৌভাগ্যবান ব্যক্তিবর্গ পরিত্রাণ লাভ করতে পারেন যাদের উপর আল্লাহর বিশেষ দৃষ্টি থাকে।