ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর নারীকূলের শিরোমণি

ইসলামের প্রাথমিক যুগে মুসলমানরা ছিল চরম সংখ্যা লঘু। সেই সংকটময়কালে দুইজন সর্বাপেক্ষা ত্যাগ ও উৎকর্ষের বিরল নজির রেখেছিলেন।

প্রথমতঃ নারীদের মধ্যে ছিলেন হযরত খাদিজা (আঃ)। যিনি রাসূল (সাঃ) এর শারীরিক ও মানসিক ক্ষতসমূহের পরিচর্যা করতেন। তিনি নিজের ত্যাগ-তীতিক্ষা, ভালোবাসা, মহানুভবতা ও সহানুভূতির মাধ্যমে রাসূল (সাঃ) এর অন্তরের সব ব্যথা-বেদনা দূরীভূত করতেন।

দ্বিতীয়তঃ হযরত আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ)-এর সুযোগ্য পিতা হযরত আবু তালিব (আঃ) মক্কাবাসীদের মধ্যে তার ছিল ব্যাপক প্রভাব ও ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রচুর জ্ঞান, দূরদর্শী ও প্রখর ধী-শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন রাসূল (সাঃ)-এর জন্য শক্তিশালী ঢালস্বরূপ এবং তার একনিষ্ঠ সমর্থক।

হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃআঃ)

হযরত খাদিজা (আঃ) ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীলা ও মহীয়সী নারী। রাসূল (সাঃ)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর মক্কার নারী সমাজ তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে। তারা বললো, সে একজন নিঃস্ব ও ইয়াতিম যুবকের সাথে বিবাহ করে নিজের সমমান ও মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকে এবং হযরত খাদিজা (আঃ) গর্ভবতী হন।

রেওয়ায়েতে বর্ণিত যে, রাসূল (সাঃ) মিরাজের রাতে বেহেশতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় হযরত জিব্রাইল (আঃ) বেহেশতি তুবা বৃক্ষের একটি ফল তাকে দেন। রাসূল (সাঃ) যখন পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর জন্মের শুক্র উক্ত বেহেশতী ফল থেকে তৈরি হয়। এর জন্য হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেনঃ

فاطمةبضعةمنيهينورعينيوثمرةفؤاديوروحيالتيبينجنبيوهيالحوراءالانسيه

ফাতেমা আমার দেহের অঙ্গ, চোখের জ্যোতি, হৃদয়ের ফল এবং আমার রূহ স্বরূপ। সে হচ্ছে মানুষরূপী স্বর্গীয় হুর।

হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর মহিমাম্বিত জন্ম গ্রহণে রাসূল (সাঃ) অত্যন্ত উৎফুল্ল ও আনন্দিত হয়ে মহান আল্লাহর হামদ ও প্রশংসাতে মশগুল হয়ে যান। সাথে সাথে নিন্দুকেরা যারা রাসূল (সাঃ) কে আবতার (নির্বংশ) বলে অপবাদ দিতো, তাদের মুখও চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

আল্লাহ তায়ালা সূরা কাওসারে রাসূল (সাঃ) কেও বরকতময় জন্মের সুসংবাদ এভাবে দেনঃ

بسماللهالرحمنالرحيم

اناعطيناكالكوثرفصللربكوانحرانشانئكهوالابتر

আমরা তোমাকে কাওসার (বরকতময় প্রস্রবণ) দান করেছি। অতএব, তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কোরবানী দান কর। নিশ্চয়ই তোমার শত্ররাই হচ্ছে আবতার (নির্বংশ)।

কখনো কখনো শত্ররা হাজরে ইসমাঈলের নিকট জমায়েত হতো এবং মূর্তিসমূহের শপথ নিয়ে বলতো সেখানেই মুহাম্মদকে পাওয়া যাবে, হত্যা করতে হবে। হযরত ফাতেমা (আঃ) এ খবরটি শোনার পর পিতাকে অবহিত করেন। যাতে করে রাসূল (সাঃ) আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে পারেন। [মানাকেবে ইবনে শহরে আশুব, ১ম খন্ড, পৃ. ৭১]

কখনো কখনো নিষ্ঠুর শত্ররা রাসূল (সাঃ)-এর ওপর ময়লা আর্বজনা নিক্ষেপ করতো। যখন রাসূল (সাঃ) বাড়িতে আসতেন, হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ) উক্ত ময়লা আর্বজনাসমূহ পিতার মাথা ও শরীর থেকে পরিষ্কার করতেন এবং তখন তার চক্ষু অশ্র সিক্ত হয়ে যেত। এ সময় রাসূল (সাঃ) তাকে বলতেন, হে কন্যা! দুঃখিত হয়োনা এবং চোখের অশ্র ফেল না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমার পিতার তত্ত্বাবধায়ক ও হেফাজতকারী। (সিরাহ ইবনে হিশাম, খন্ড ১ম, পৃ. ৪১৫)

এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে, হযরত ফাতেমা (আঃ) শুধুমাত্র ঘরের অভ্যন্তরেই নয় বরং ঘরের বাইরেও পিতার হেফাজতে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন।

হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ) শুধুমাত্র সাধারণ দিনগুলোতেই নয় বরং যুদ্ধের দিনগুলোতেও তিনি এক সাহসী বীর যোদ্ধার ন্যায় পিতার পাশে দাঁড়াতেন। যখন ওহুদের যুদ্ধ সমাপ্ত হয় এবং শত্র বাহিনী ময়দান ত্যাগ করে রাসূল (সাঃ) তখনও স্বীয় দ্বন্দ্ব, মোবারকের শাহাদত ও কপালের ক্ষত নিয়ে ওহুদের ময়দানে হাজির হন এবং অল্প বয়সী ও শৈশব থাকা সত্ত্বেও মদীনা থেকে ওহুদ পর্যন্ত পায়ে হেটে চলে আসেন। তিনি পানি দিয়ে পিতার মুখ ধুয়ে দেন এবং তার চেহারা মোবারক থেকে রক্ত পরিস্কার করেন। কিন্তু রাসূল (সাঃ)-এর কপালের ক্ষত স্থান থেকে তখনও রক্ত ঝরছিল। তিনি খেজুর গাছের ডাল ভস্মিভূত করে সেটার ভস্মসমূহ রাসূল (সাঃ)-এর ক্ষত স্থানে লাগিয়ে দেন ফলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়।

امرهااليربها

ফাতেমার (বিবাহের) বিষয়টি আল্লাহর হাতে ন্যস্ত।

আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠানটি এতই সাদা সিধে ও অনাড়ম্বরভাবে উদযাপিত হয়েছিল। যা আজ আমাদের জন্য অত্যন্ত বিস্ময়কর মনে হবে। আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) বলেন, ঢালটি বিক্রয়ের কিছু অংশ রাসূল (সাঃ) হযরত উম্মে সালমা (রাঃ)-এর নিকট আমানত রেখেছিলেন, বিবাহ অনুষ্ঠানের সময় তিনি তা থেকে দশ দিরহাম আমাকে দিয়ে বলেন, কিছু পরিমাণ খুরমা, তৈল এবং দুধের ছানা ক্রয় কর। আমি সেগুলো ক্রয় করলাম। অতঃপর রাসূল (সাঃ) স্বয়ং জামার আস্তিন গুটিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন দস্তরখান আনতে বলেন, তিনি তখন সেগুলো স্বহস্তে একত্রে মিশ্রন করে খাদ্য প্রস্তুত করেন এবং তা দিয়ে সবাইকে আপ্যায়িত করা হয়।

হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর বিবাহের উপঢৌকনের ঘটনাটিও তার ওলীমায় রাত্রের অনুষ্ঠানের সাদা সিধে ও অনাড়ম্বর পরিবেশ, তার পরহেযগারীর অন্যতম প্রমাণ।

আলী (আঃ)-এর গৃহে তিনি স্বীয় সাংসারিক কাজকর্ম নিজ হাতে আঞ্জাম দিতেন এমনকি এক হাতে গম পিশানোর যাঁতাকল ঘোরাতেন এবং অপর হাতে বাচ্চাকে কোলে করে রাখতেন। বস্তুত এগুলো ছিল তার পরহেজগারীর নমুনাস্বরূপ। (হিল্লিয়াতুল আওলিয়া, খন্ড ২য়, পৃ. ৪৪)

لقدطحنتفاطمةبنترسولاللهصلياللهعليهوالهوسلمحتيمجلتيدهاورباواثرقطبالرحيفييدها

রাসূল (সাঃ)-এর কন্যা ফাতেমা যাহরা (আঃ) এত বেশি গম ভাঙ্গানোর যাঁতাকল ঘুরাতেন যে, তার হাতে ফোসকা পড়ে যেত এবং ফুলে যেত। আর এগুলোর প্রভাব তার হাতে পরিদৃষ্ট হতো। মহানবীর কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ) নারী জীবনে একজন সুগৃহীনীরূপ আদর্শ। সে রূপ মহান আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রেও তিনি এক উত্তম আদর্শ।

ইমাম সাদিক (আঃ) তার পূর্ব পুরুষ হযরত হাসান ইবনে আলী থেকে বর্ণনা করেছেনঃ আমার মা জননী জুম্মার রাত্রীগুলোতে প্রভাত অবধি ইবাদতের মেহরাবে দাঁড়িয়ে কাটাতেন এবং যখন দোয়ার জন্য হাত তুলতেন তখন সমস্ত ঈমানদার নারী-পুরুষের জন্য দোয়া করতনে, কিন্তু নিজের জন্য কিছুই বলতেন না।

একদিন আমি তাকে বললাম মা! আপনি কেন অন্যদের জন্য যেভাবে দোয়া করেন সেভাবে নিজ কল্যাণের জন্য দোয়া করেন না। তিনি বলেন, হে বৎস! এক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার রয়েছে।

(সূরা ইসরা, আয়াত-২৬)

অনুবাদঃ তোমার নিকট আত্মীয়দের দাও তাদের অধিকার। এ আয়াত নাযিল হলে মহানবী (সাঃ) হযরত ফাতেমাকে ডেকে বলেন, তোমাকে ফাদাক (যা আমার নিজস্ব সম্পদ) দেয়ার জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়েছি। হযরত ফাতেমা (আঃ) বলেন, আমি তা আপনার ও মহান আল্লাহর নিকট থেকে গ্রহণ করলাম। ফলে মহানবী (সাঃ) ফাদাক (যা একটি খেজুর বাগান ছিল) হযরত ফাতেমাকে দান করেন।

اناولشخصيدخلعليالجنةفاطمةبنتمحمد (ص)

অনুবাদঃ রাসূল (সাঃ) বলেছেন, বেহেশতে সর্বপ্রথম আমার নিকট যে পৌছাবে সে হচ্ছে আমার কন্যা ফাতেমা যাহরা। যতদিন পর্যন্ত মহানবী (সাঃ) জীবিত ছিলেন ততদিন পর্যন্ত তিনি নিজ জীবনের দুঃখ-কষ্টগুলোকে মহানবীর (সাঃ) দর্শন লাভের মাধ্যমে অবদমন করতেন। প্রিয়তম পিতার সাক্ষাত তার সমস্ত ক্লান্তি ও ক্লেশ দূর করে তাকে প্রশান্তি ও শক্তি দিত। কিন্তু পরম প্রিয় পিতার মৃত্যুর পর প্রিয়তম পতির মাজলুমিয়াত, অধিকার বঞ্চিত হওয়া এবং সর্বোপরি চড়াই-উৎরাইর মাঝে মুসলমানদের মধ্যে মহানবীর সুন্নত থেকে উম্মতের মধ্যে যে কিছুটা বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা নবী নন্দিনীকে ভীষণ মানসিক ও অবশেষে শারীরিক কষ্টে ফেলে ছিল। ঐতিহাসিকগণ বলেন, পিতার মৃত্যুর পূর্বে তার কোন শারীরিক অসুস্থতা ছিল না।

হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ) নিজের অন্তরের ব্যথা-বেদনা প্রকাশ করে সে প্রতিকুল পরিস্থিতি ও উম্মতের অবাধ্যতায় ক্ষত-বিক্ষত আলী (আঃ)-এর হৃদয়কে আরও বেশী বেদনার্ত করতে চাননি। আর এ কারণে তিনি রাসূল (সাঃ)-এর কবর মোবারকের নিকট যেয়ে মনের দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করতেন। বস্তুত তার হৃদয় বিদারক বিলাপ ও আহাজারী জ্বলন্ত আগুনের ন্যায় মানুষের অন্তরকে বিদগ্ধ না করে পারে না। তিনি বলতেন, হে আব্বাজান! আপনার ওফাতের পর বড় একাকী হয়ে গেছি। আজ আমি অত্যন্ত নিঃস্ব ও উপেক্ষিত। আমার কণ্ঠ নিস্তব্ধ ও কোমর ভেঙ্গে গেছে। জীবন যেন আমার কাছে ভীষণ দুর্বিষহ ও তিক্তকর হয়ে গেছে। আবারও কখনো কখনো বিলাপ করে বলতেন, যদি কেউ একবার রাসূল (সাঃ)-এর কবর মোবারকের পবিত্র মাটির সৌরভ অনুভব করে তবে জীবনে কখনো তার সুগন্ধির প্রয়োজন হবে না। হে আব্বাজান! আপনার ওফাতের পর আমার ওপর এতই জুলুম, দুঃখ-দুর্দশা আর বিপর্যয় নেমে এসেছে। তা যদি আলোকিত দিনের ওপরও হতো তবে তা অন্ধকারাচ্ছন্ন রাতে পরিণত হয়ে যেত।

যদিও হযরত ফাতেমা যাহরা (আঃ)-এর আয়ুষ্কাল পিতার ওফাতের পর যেরূপভাবে তিনি আল্লাহর কাছে চেয়েছিলেন, বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। অল্প কিছু দিন অতিবাহিত হতে না হতেই তিনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পিতার সান্নিধ্যে গমন করেন।