নামাযের শিক্ষা

নামাযের শিক্ষা

ওস্তাদ মহসীন ক্বারাআতী

অনুবাদঃ নাসরীন সুলতানা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

 

দাসত্বই সৃষ্টির উদ্দেশ্য

এ পর্যন্ত কখনো কি অন্যদের সদাচার, সাহায্য ও বন্ধুত্বের বিপরীতে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন? অবশ্যই হ্যাঁ। কেন?

কারণ, মানুষের বুদ্ধি ও বিবেক তাকে অপরের সদাচরণ, সৎ কাজ এবং তাদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে থাকে।

সুতরাং, নেয়ামত তথা উপকার মানুষকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে ফেলে। আর চেতনা, উপলব্ধি এবং বিবেকই হলো মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধের মূল নির্দেশক। এমনকি যদি কোন বন্ধু আমাদেরকে লেখাপড়ায় সাহায্য করে থাকে, তার বই বা খাতাখানি আমাদের কাছে আমানত প্রদান করে কিংবা প্রশ্নমালার উত্তরগুলো সমাধান করে দিয়ে আমাদেরকে সাহায্য করে, আমাদের পিছিয়ে পড়া লেখাপড়াগুলোকে কাটিয়ে উঠতে সহযোগিতা করে, আমাদের লেখাপড়ার উপকরণগুলো জোগাড় করে দেয়, আমাদের অসুবিধাগুলো দূর করে দেয়… তাহলে উক্ত সকল ক্ষেত্রেই আমরা নিজেকে তার কাছে ঋণী বলে মনে করি। আর চেষ্টা করি কোনো না কোনোভাবে তার উপকারগুলোর প্রতিদান দিয়ে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম নেয়ামতগুলো মহান আল্লাহই আমাদেরকে দান করেছেন। আমাদেরকে বুদ্ধি, প্রাণ, ইচ্ছা ও চিন্তা শক্তি এবং প্রতিভা দান করেছেন।

আমাদের জীবনে চলার পথে কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে অগণিত পথ প্রদর্শক প্রেরণ করেছেন।

আমাদের জীবন ও অস্তিত্ব তাঁরই হাতে।

আমাদের সব কিছুই আমাদের স্রষ্টার কাছ থেকে পাওয়া। তিনি আমাদের স্রষ্টা আর আমরা তাঁর দাস ও তাঁর সৃষ্টি।

তিনি নিরভাব ও ক্ষমতাবান আর আমরা অভাবী, হীনবল, তুচ্ছ ও নগণ্য দাসানুদাস।

যদি এমনকি কোন কিছু পড়াশোনা করে সামান্য কোন বিদ্যা অর্জন করি তাহলে সেটাও তাঁরই দয়া ও করুণার ছায়ায় সম্ভব। কারণ তিনিই আমাদেরকে জ্ঞান শিক্ষার ও বুঝার প্রতিভা দান করেছেন।

যদি শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করে আমাদের জীবনটাকে সচল রেখেছি তাহলে সেটাও সেই উত্তম ও সৌন্দর্যবান এবং প্রেম ও পূর্ণতার আধার মহান আল্লাহর দান করা সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেই সম্ভব হচ্ছে।

এক অভাবগ্রস্ত বান্দার থেকে কি-ই বা আশা করা যায়, ইবাদত ও উপাসনা ব্যতিত?

এক অপারগ সৃষ্টির থেকে কি-ই বা আশা করা যায় কেবল অনুনয়, বিনয়, আন্তরিকতা, অনুধ্যান, বন্দেগী, হীনতা, তুচ্ছতা আর অভাব প্রকাশ ছাড়া যা ঐ মহান স্রষ্টার দরবারে নিবেদন করতে হবে?

মহান আল্লাহর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল নেয়ামত লাভে ধন্য একজন মানুষের কাছ থেকে কি আর আশা করা যেতে পারে শুধু ঐ নেয়ামতসমূহের মালিক অর্থাৎ মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ছাড়া?

আমরা বুদ্ধিসম্পন্ন ও বিবেকবান, অপরের অধিকার সম্পর্কে পরিজ্ঞাত এবং কৃতজ্ঞ, দাসানুদাস এবং অভাবী। আমরা যদি আমাদের স্রষ্টার সম্মুখে মাটিতে মাথা রাখি, ইবাদত করি, নামায পড়ি, মনোবাঞ্ছা প্রার্থনা করি, মনের কথা ব্যক্ত করি তাহলে সেটা এ কারণে যে, আমরা তার খোদায়ীত্ব এবং নিজেদের দাসত্বকে প্রকাশ করতে চাই।

আমরা যদি ইবাদত না করি তাহলে সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য থেকে দূরে ছিটকে পড়ব। কেননা, আমাদের সৃষ্টির পূর্ণতা আল্লাহর উপাসনার মধ্যেই নিহিত। ইরশাদ করেনঃ

وَمَاخَلقتُالجنَّوَالاِنْسَاِلاَّلِيَعْبُدُون

অর্থঃ আমি জ্বীন ও মানুষকে শুধুই আমার ইবাদতের জন্যে সৃষ্টি করেছি। (যারিয়াত ৫৬)

অপর এক আয়াতে ইরশাদ করেনঃ

وَاَناعْبُدُونِيهَذاصِرَاطٌمُسْتَقِيم

অর্থঃ এবং তোমরা আমার ইবাদত করো, এটাই সোজা পথ। (ইয়াসিনঃ ৬১)

অতএব, যদি আল্লাহর দাসত্ব না করি এবং তাঁর নির্দেশের আনুগত্য না করি আর তাঁর ঐশী ও চিরন্তন ধর্মের অনুসরণ না করি তাহলে আমরা অকৃতজ্ঞের পরিচয়ও দিলাম, তাঁর অনুগ্রহ থেকেও দূরে সরে গেলাম। তদ্রƒপ জীবনের উদ্দেশ্য ও নেয়ামতের মালিককে চেনার ব্যাপারেও ঔদাসীন্যের প্রকাশ ঘটালাম।

যে ব্যক্তি আল্লাহর দাসত্ব করে না, সে শয়তানের চক্রে এবং ইবলিসী, তাওতী ও খোদা বিরোধী শক্তিসমূহের কবলে পড়ে।

আল্লাহর বন্দেগী মানুষকে এতটা সম্মানিত করে তোলে যে স্বৈরাচারী শক্তিসমূহের গোলামী করা থেকে তাকে মুক্তি দান করে।

আমরা কেন এবং কিভাবে নামায পড়ব?

মহান আল্লাহ আমাদের নামায পড়া থেকেও লাভবান হন না, আমাদের নামাজ বর্জনও তাঁর কোনো ক্ষতি সাধন করে না। যদি আমরা নামায পড়ি তাহলে আমাদের মনের পবিত্রতা, আত্মার পরিশুদ্ধতা এবং কলুষতা থেকে মুক্তি অর্জন করতে সক্ষম হবো। আর যদি নামাজের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করি তাহলে তার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হব, পরকালেও আমরা অকৃতজ্ঞতা এবং আল্লাহর থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণে আর ফেসাদে নিমজ্জিত হওয়ার দায়ে শাস্তি ভোগ করবো।

যখন আমাদের কল্যাণ ও সৌভাগ্য নিহিত রয়েছে আল্লাহর বন্দেগীর মধ্যে, তখন এ বন্দেগী ও ইবাদতটি নামায রূপে একটি খোদায়ী ফরজ কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে প্রকাশ লাভ করে। কাজেই নামায হলো সেই ইবাদত, উপাসনা এবং আল্লাহর দরবারে অনুনয়-বিনয় করা আর তাঁর প্রতি ও তাঁর দানকৃত নিয়ামতসমূহের প্রতি মনোযোগী থাকার নাম যা প্রত্যেহ কয়েকবার সম্পাদন করা হয়।

এই ইবাদত আমাদেরকে সব সময় আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন করে। আর আল্লাহর স্মরণ আমাদেরকে নীচতা, অন্যায়, পাপ ও ফেসাদ থেকে বিরত রাখে।

যে ব্যক্তি আল্লাহর দাস হয়, সে আর শয়তানের দ্বারা শৃঙ্খলিত হয় না এবং রিপু কামনার বশীভূত হয়ে পড়ে না।

যে ব্যক্তি নামায সম্পাদনে আল্লাহর নির্দেশকে কাঁধে তুলে নেয় এবং আত্মসমর্পণ করে, সে আর অপশক্তি ও শয়তানী শক্তিসমূহের বিপরীতে মাথানত করে না।

আমরা নামায পড়ব যাতে সারা দিন, সারাক্ষণ আজীবনকাল আমাদের অন্তরে আল্লাহর স্মরণ বেঁচে থাকে। আর আল্লাহর প্রতি মনোযোগ আমাদেরকে সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমরা বান্দা। আর তিনিই আমাদের মালিক ও প্রভু, প্রতিপালক। কোন বান্দারই উচিত নয় তার মালিক ও কর্তৃত্ববান নির্দেশ দাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আচরণ করবে।

মহান আল্লাহ বলেনঃ

وَاَقِمِالصَّلاةَلِذِكْري

অর্থাৎ, আমার স্মরণের জন্যই নামায কায়েম কর। (কাহফঃ ১০১)

অপর এক আয়াতে বলেনঃ

اِنَّالصَّلاةَتَنْهَيعَنالْفَحْشَاءِوَالْمُنْكَر

অর্থাৎ, নামায মানুষকে অশ্লীল ও অসঙ্গত কাজ থেকে বিরত রাখে। (আঙ্কাবুতঃ ৪৫)

কিন্তু নামায কিভাবে পড়ব?

যদিও প্রত্যেক কাজই যখন দয়াময় স্রষ্টার প্রতি আমাদের বিনয়, একাগ্রতা ও বন্দেগীর পরিচায়ক হয় তখন সেটা এক প্রকার ইবাদত বলে গণ্য হতে পারে। কিন্তু যেহেতু তিনি আমাদের প্রতিপালক, পরিচালক আর আমরা তার আজ্ঞাবহ দাসানুদাস কাজেই কিভাবে এবং কোন কাজের ও কোন কথা দ্বারা তাঁর উপাসনা করবো এবং তাঁর দরবারে আমাদের দাসত্ব প্রকাশ করবো? তিনি যেভাবে পছন্দ করেন এবং যে নির্দেশই প্রদান করেন সেভাবেই তা পালন করা আবশ্যক।

আমরা যেভাবে নামায পড়ি সেটা আল্লাহ ও তাঁর রসূলে (সাঃ) নির্দেশনা বটে। যদি আমরা সঠিক বান্দা হই তাহলে কোনো ওযর আপত্তি কিংবা কম বেশি ছাড়াই যা কিছু দ্বীন ও ফেকাহর বিধি-বিধানে বর্ণিত হয়েছে তার সবগুলোকেই পালন করবো। যাতে এই ইবাদত আমাদেরকে আল্লাহর নিকটে পৌঁছে দেয়।

মহান আল্লাহ, তাঁর প্রিয় নবী (সাঃ) এবং মাসুম ইমামগণ থেকে বর্ণিত নির্দেশনা মোতাবেক ইবাদত ও নামায হতে হবেঃ

১. জ্ঞাতসারে

অন্ধভক্তি, অমনোযোগ আর যুক্তিহীন ইবাদতের কোনো মূল্য এবং সুফলও নেই। অর্থাৎ নামাজের মধ্যে মানুষের উচিত বাক্যসমূহ, যিকরসমূহ এবং দোয়া মোনাজাতের প্রতি মনোযোগী থাকা। তাকে জানতে হবে যে, কার সামনে সে দন্ডায়মান রয়েছে এবং কি বলছে। মহানবী (সাঃ) বলেনঃ

মনোযোগের সাথে দুই রাকাত নামায পড়া, উদাসীনভাবে সারা রাত জাগ্রত থাকার চেয়ে উত্তম। (বিহারুল আনোয়ার, খ-৮৪, পৃ. ২৫৯)

২. ভক্তিসহকারে

যে নামায অলসতা, বিচলতা ও অভক্তির সাথে পড়া হয় তার কোন ফল নেই। নামাজী ব্যক্তির মনে আল্লাহর মহব্বত নিহিত থাকতে হবে এবং যে আল্লাহ এতসব নেয়ামত ও রহমত তাকে দান করেছেন তাঁর প্রতি ভক্তি ও আগ্রহসহকারে নামায পড়বে। আল্লাহ তার প্রতি যেসব দয়া প্রদর্শন করেছেন সেগুলোর বাবদ কৃতজ্ঞতা প্রকাশার্থে আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার সাথে নামাজ পড়তে হবে।

মহানবী (সাঃ) নামাজকে তাঁর নিজের চোখের মণি বলে মনে করতেন। তিনি (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি আযানের ধ্বনি শুনতে পায় আর উপেক্ষা করে, সে অবিচার করলো। (নাহজুল ফাসাহা, ১৩২নং বক্তব্য)।

ইবাদত ও নামাজের প্রতি আগ্রহ এমন হতে হবে যে নামাজের আহ্বান শোনার সাথে সাথে যে কোনো কাজকে বর্জন করবে এবং বিশ্ব ব্রম্ভান্ডের খোদার সাথে কথোপকথনের দিকে ধাবিত হবে।

৩. একনিষ্টতা সহকারে

কুরআনের নির্দেশ মতে, দ্বীনদারী এবং দ্বীনের কার্যক্রম মহান আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা সহকারে সম্পাদন করতে হবে। তার মধ্যে খোদা ভিন্ন অন্য কোন সংকল্প ও উদ্দেশ্য যেন অনুপ্রবেশ না করে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

وَمَااُمِرُوااِلالِيَعْبُدُوااللهَمُخْلِصِينَلَهُالدِّين

অর্থাৎ, তাদেরকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে আল্লাহর উপাসনা করতে এবং দ্বীনকে তাঁর জন্যে একনিষ্ঠ করতে। (বাইয়্যেনাহঃ ৫)

কপোটতা এক প্রকারের শিরক, কাজের মূল্যকে বিলোপ করে দেয়। আল্লাহও যে নামায খোদা ভিন্ন অপর কারো মনোযোগে আকর্ষণ করার জন্য এবং মানুষকে ধোঁকা দেবার উদ্দেশ্যে হয়, সে নামাযকে গ্রহণ করেন না, তার প্রতিদানও প্রদান করেন না।

একনিষ্ঠতা ছাড়া ইবাদত হলো প্রাণহীন দেহের মতো। নামাজের আত্মা হলো তার একাগ্রতা।

৪. বিনয় সহকারে

অনেকে নামাজের মধ্যে তাদের মনোযোগ থাকে না, স্বীয় হাত, মাথা ও কাপড় নিয়ে খেলায় মেতে উঠে, এদিক সেদিক তাকায়। নামাযও পড়ে আবার অন্যদের কথার প্রতিও কর্ণপাত করে। দৈহিকভাবে শান্ত নয় আর আন্তরিকভাবে মনোযোগী নয়। আর এগুলো সবই প্রমাণ করে যে তারা তাদের নামাজে বিনয়ী ও বিনম্র নয়।

নামাজের মধ্যে বিনয়ী হওয়ার অর্থ হলো নামাযী ব্যক্তি অন্তর দ্বারা আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করবে আর তার ধ্যান জ্ঞান স্রষ্টার দিকে নিবন্ধ করবে। শরীরের নড়াচড়া বন্ধ করে শান্ত হয়ে দাঁড়াবে। আর বাস্তবিকই নিজেকে এমন খোদার সম্মুখে প্রত্যক্ষ করবে যিনি যে কোন ব্যক্তিত্ব ও পদের উর্ধ্বে আর যে কোন ক্ষমতাবানের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ

اُعْبُداللهَكَاَنَّكَتَرَاهُ

অর্থাৎ, আল্লাহকে এমনভাবে ইবাদত করো যেন তুমি তাকে প্রত্যক্ষ করছো। (মিসবাহুশ শারীআ, পৃ. ৮)

আপনি যদি এই অবস্থায় উপনীত হতে পারেন তাহলে এমন স্তরে পৌছে গেলেন যে আল্লাহ তাদেরকে সৎকর্মী মুমিন বলে আখ্যায়িত করেছেন। আর তাদের গুণাবলীর মধ্যে একটি গুণের বর্ণনায় এভাবে বলেছেন ঃ

الذِينَهُمْفِيصَلاتِهِمْخَاشِعُونَ

অর্থাৎ, তারা তাদের নামাজে বিনয়ী (মুমিনুনঃ ২)

আল্লাহর পছন্দনীয় নামাজের উপরোক্ত এসব গুণ বৈশিষ্ট্য বর্ণনার পর মানুষ যখন আম্বিয়া, ইমামগণ ও পূতঃপবিত্র সিদ্ধ পুরুষদের নামায ও ইবাদতের দিকে লক্ষ্য করে এবং স্বীয় নামাজের সাথে তার তুলনা করে তখন সে নিজের থেকে ও তার নামায থেকে লজ্জিত হয়।

ইস্! যদি এমন নামায পড়তে পারতাম যা আল্লাহর পছন্দনীয় এবং গ্রহণীয়, যার বিনিময়ে মহা পুরস্কার দান করবেন!

নামাযকে সব সময় এবং নিয়মিত পড়তে হবে। কেননা, নামাজের ব্যাপারে আলসেমি করা ও অবহেলা প্রদর্শন করা আর কখনো পড়া আর কখনো না পড়া পাপ কাজ।

নামাজের জন্য প্রস্তুতি

যদি আপনি সাবালক হলেন তাহলে সুসংবাদ জানাই আপনাকে। কারণ আপনি এখন সেই যোগ্যতা লাভ করলেন যে, আপনার প্রতিপালক আপনাকে স্বীয় সম্বোধন দ্বারা আহ্বান করবেন এবং আপনার প্রতি ইবাদত যেমন নামাজ সম্পাদনের জন্য তলব করবেন। এই নেয়ামতের জন্য উৎসব পালনের দরকার, তাকলীফের উৎসব।

ছেলেদের যখন ১৫ বছর পূর্ণ হয় আর মেয়েদের ৯ বছর পূর্ণ হয় তখন তাদের সাবালক হওয়ার সূচনা ঘটে। এটাই তাদের তাকলীফের বয়স। অর্থাৎ আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন করা তাদের উপর আবশ্যক হয়। নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে জোরালোভাবে বিরত থাকতে হবে।

যদি তাকলীফের বয়সে উপনীত নাও হয়ে থাকেন তবুও নামায পড়বেন। যাতে সঠিকভাবে নামায শিক্ষা এবং তদসংক্রান্ত নিয়মাবলী রপ্ত করার মাধ্যমে পবিত্র এই ইবাদতটির সাথে পরিচিতি ও সখ্যতা গড়ে তুলতে সক্ষম হোন। অতঃপর যখন তা আপনার জন্য ওয়াজিব তথা আবশ্যক হয়ে যাবে তখন তা সম্পাদন করা কিংবা তার খুঁটিনাটি নিয়ম-কানুন জানার ব্যাপারে যেন কোন অসুবিধায় পড়তে না হয়।

অবশ্য এটাও জানেন যে, সাবালক হওয়া ছাড়াও আরো কতিপয় বিষয় তাকলীফের জন্য শর্ত রয়েছে। যেমন ঃ সক্ষমতা, স্বাধীনতা এবং সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন হওয়া। অর্থাৎ যদি কেউ পাগল কিংবা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয় অথবা এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যেখানে নিজের ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে অথবা সাবালক হওয়ার বয়সে পদার্পণ না করে থাকে তাহলে শরীয়তে নির্দেশিত তাকলীফ তথা দায়-দায়িত্ব পালন করা তার ওপর ওয়াজিব নয়।

যাহোক, নামায এবং তদসংশ্লিষ্ট মাসআলাগুলোকে শিখে রাখুন। নিজেকে নিয়মিত নামায পড়ার উপর অভ্যস্ত করে ফেলুন। আল্লাহ এবং তাঁর স্মরণের সাথে পরিচিত হোন, সখ্যতা গড়ে তুলুন। আর এভাবে আল্লাহর নির্দেশ সম্পাদনের উদ্দেশ্যে নিজের মধ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গড়ে তুলুন।

শত্র“র সাথে লড়াইয়ে এবং যুদ্ধের ময়দানে তার মোকাবিলার জন্য যেমন প্রস্তুতিমূলক কসরতের দরকার হয় নামাযের বেলায়ও তদ্রƒপ কসরতের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ এটাও এক প্রকার যুদ্ধ। নফসানী শয়তানের বিরুদ্ধে ইবাদতের রণক্ষেত্রে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

যদি পূর্বাহ্নেই আপনার মন ও প্রাণকে সঠিক ও নিয়মিতভাবে এই আত্মগঠনে সহায়ক ইবাদতকে সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত না করে থাকেন তাহলে তা ওয়াজিব হওয়ার সময়ে এটা আপনার উপর কঠিন ও ভারী হয়ে দাঁড়াবে।

নামায কবুল হওয়া

সঠিক নামায হলো একটি ধাপ আর গ্রহণযোগ্য নামায হলো আরেকটি উচ্চতর ধাপ।

আপনি হয়তোবা খুব ভালো মতো পড়াশোনা করতে পারেন। কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষায় পাস করা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার।

মানুষ হয়তো সব সময় তার নামায ও ইবাদতসমূহকে সম্পাদন করে থাকে। অথচ তার নামাযের মধ্যকার ভুল-ত্র“টি ও অসম্পূর্ণতার কারণে আল্লাহর দরবারে তা গ্রহণীয় নাও হতে পারে।

একজন ছাত্র হয়তো খুব ভালো নম্বর পায়। কিন্তু তার আচরণ ও চাল-চলন শিক্ষকের কাছে পছন্দনীয় নাও হতে পারে।

অতএব নামাযের মাপকাঠি হলো তা কবুল হওয়া। কাজেই চেষ্টা করতে হবে আল্লাহর দরবারে তাঁরই পছন্দনীয় নামাযকে উপস্থাপন করার জন্য।

ইমাম আলী (আঃ) বলেনঃ

كُونُواعَلَيقَبوُلِالعَمَلِاَشَدُّعِنَايَةمِنْكُمْعَلَيالعَمَلِ

অর্থাৎ আমল সম্পাদন করার চেয়ে তা কবুল হওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী হও। (বিহারুল আনোয়ার, খন্ড ৭১, পৃ. ১৭৩)

ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য কি কি শর্ত প্রয়োজন?

১. ঈমান

নামায কবুল হওয়ার প্রথম শর্ত হলো আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ঈমান ও বিশ্বাস রাখা। যদি একজন ব্যক্তি আজীবনকাল নামায ও ইবাদতে কাটায় কিন্তু অন্তরে তাঁর প্রতি বিশ্বাস না রাখে তাহলে তার নামায গ্রহণীয় নয়। শুধু নামাযের বেলায় নয়, অন্য যে কোন ভালো কাজের ক্ষেত্রেও ঈমানের শর্ত রয়েছে। কাফের যারা আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখে না তাদের আমল মূল্যহীন ও প্রতিদানবিহীন হয়। (আম্বিয়াঃ ৯৪)

২. বেলায়াত তথা আনুগত্যশীলতা

ইবাদতের কার্যসমূহ আল্লাহ তার নিকট থেকেই গ্রহণ করেন যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এবং মাসুম ইমামগণ সম্পর্কে মান্য ও আনুগত্যশীল এবং সহযোগিতা ও মহব্বত করার মানসিকতার অধিকারী হয়। আর তাঁদেরকে স্বীয় পথপ্রদর্শক নেতা হিসেবে মেনে চলে ও তাঁদের নির্দেশের আনুগত্য করে। বেলায়াত বিহীন ইবাদত গ্রহণীয় নয়।

ইমাম সাদিক (আঃ) বলেনঃ

مَنْلَمْيَتَوَلَّنَالَمْيَرْفَعِاللهُلهُعَمَلاً

অর্থাৎ যে ব্যক্তির মধ্যে আমাদের বেলায়াত থাকবে না এবং আমাদের নেতৃত্বকে মানবে না তার কোন আমলই গ্রহণীয় হবে না। (উসুলে কাফী, খন্ড-১, পৃ. ৪৩০)

এটা পরিস্কার যে, আহলে বাইত (আঃ)-কে বাদ দিয়ে দ্বীনদারী করা এবং মাসুম ইমামগণের প্রতি বিশ্বাস ব্যতিরেকে ইবাদত পালন করা কোন উপকারে আসে না। বরং কখনো কখনো বিপথগামিতার কারণও হয়। বেলায়াত হলো সঠিক নেতৃত্বকে মেনে নেবার নাম যা ঐশী ও খোদায়ী ইমামগণের মধ্যে প্রতিমূর্ত হয়।

৩. তাকওয়া

তাকওয়া হলো খোদাভীতি ও পাপ থেকে বিরত থাকা। যে ব্যক্তি হারাম কাজগুলোকে বর্জন করে না এবং তাকওয়াহীন হয় তার ইবাদতও তার কোনো উপকারে আসে না। যে ব্যক্তি চুরি করে সেগুলোকে অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দেয় কিংবা জিহাদ করে কিন্তু জনগণের মাল সম্পদকেও লুণ্ঠন করে তার এ দান খয়রাত বা জিহাদের কোনো প্রতিদান নেই।

নামাযও একটি ইবাদত হিসেবে তখনই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে যখন তা হবে তাকওয়াসহকারে। আল্লাহ পাপাচারী লোকদের এবং বেপরোয়া লোকদের নামাযকে গ্রহণ করেন না। ইরশাদ হচ্ছেঃ

اِنَّمَايَتَقَبَّلُاللهُمِنَالمُتَّقِين

অর্থাৎ, আল্লাহ কেবল তাকওয়াবানদের নিকট থেকেই গ্রহণ করেন। (মায়িদাঃ ২৭)

৪. অপরের অধিকার মেনে চলা

নামায হলো এমন ইবাদত যা মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে। নামাযী ব্যক্তি যদি কতিপয় কাজের দ্বারা আল্লাহ ও তাঁর সন্তুষ্টি থেকে দূরে সরে যায় তাহলে নামায কিভাবে তাকে আল্লাহর প্রতি তার নৈকট্য লাভের মাধ্যম হবে?

যে ব্যক্তি দেনাদার, অপরের টাকা পরিশোধ করে না, খুমস ও যাকাত পরিশোধ করা তার উপর আবশ্যক, কিন্তু পরিশোধ করে না।

যে ব্যক্তি অপর মুসলমানদের গীবত করে কিংবা অপবাদ আরোপ করে।

যে ব্যক্তি অপর মুসলমানের সাথে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ছিন্ন করে।

যে ব্যক্তি অন্যদের ব্যাপারে মনের মধ্যে কু-পোষণ করে এবং তার বিরুদ্ধে শত্র“তাকে মনের মধ্যে গোপন করে রাখে।

যে ব্যক্তি অন্যদের সাথে, পরিবারের সদস্যদের সাথে এবং পিতামাতার সাথে অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করে এবং তাদেরকে দুঃখ ও কষ্ট দেয়।

এ সমুদয় কাজগুলো হলো এমন যা কোনো না কোনো ভাবে অন্যদের অধিকার বিনষ্টের এবং আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ হয়। যে ব্যক্তি এরূপ হয় সে আল্লাহর কাছে তার নামায কবুল হওয়ার প্রত্যাশা করতে পারে না।

নামাযী ব্যক্তি একদিকে নামাযের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে দৃঢ় ও মজবুত করবে অপরদিকে তেমনি মুমিনদের সাথে ও অপরাপর মানুষের সাথে তার বন্ধুত্ব, অন্তরঙ্গতা ও ভ্রাতৃত্বকে শিথিল করবে না, তাদের অধিকারসমূহকে মেনে চলবে। কারো প্রতি অবিচার করবে না।

একটি হাদীসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ যে ব্যক্তি নিজ স্ত্রীকে কষ্ট দেয় অথবা যে স্ত্রী লোক স্বীয় স্বামীকে যন্ত্রণা দেয়, আল্লাহ তাদের ভালো ও উত্তম কাজগুলোকে গ্রহণ করেন না। (ওসায়িলুশ শিয়া, খন্ড-১৪, পৃ. ১১৬)

ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় পিতামাতার প্রতি ক্রোধ ও বিদ্বেষসহকারে তাকাবে, আল্লাহ তার নামাযকে গ্রহণ করবেন না যদিও তার পিতামাতা তার অধিকারের ব্যাপারে অনুচিত করে থাকে। (উসুলে কাফী, খন্ড-২, পৃ. ৩৪৯)

কোথা থেকে বুঝা যাবে যে, আমাদের নামাযসমূহ আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় হয়েছে নাকি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে? এ মর্মে ইমাম সাদিক (আঃ)-এর থেকে চমৎকার একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছেঃ

مَنْاَحَبَّاَنْيَعْلَمَأقُبِلَتْصَلاتُهُاَمْلَمْتُقْبَلْفَلْيَنْظُرْهَلْمَنَعَتْهُصَلاتُهُعَنِ

الْفَحْشَاءِوَالْمُنْكَر؟فَبِقَدْرِمَامَنَعَتْهُقُبِلَتْمِنْهُ

অর্থাৎ, কেউ যখন জানতে চায় তার নামায কবুল হয়েছে কি হয়নি তখন সে যেন লক্ষ্য করে তার নামায তাকে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রেখেছে কি-না? যতটুকু পরিমাণে তার নামায তাকে অসঙ্গত কাজ থেকে বিরত রেখেছে ততটুকু পরিমাণে তার নামায গ্রহণীয় হয়েছে। আসুন, আমরা চেষ্টা করি আমাদের নামায যেন আমাদের প্রতিপালন ও আত্মগঠনের শিক্ষালয় হয়ে ওঠে। আর নামাযের মধ্যে আমরা যেমনটা আবেদন করি ঠিক সেভাবে যেন নিজেকে আল্লাহর বান্দা মনে করি। সর্বোপরি বন্দেগীর যে শর্ত রয়েছে আল্লাহর আনুগত্য এবং পাপ থেকে দূরে থাকা তা মেনে চলতে পারি। কেবল তখনই আমরা নামায পড়ে মজা পাব এবং আল্লাহর সাথে মোনাজাত ও কথা বলা আমাদের জন্যে সুমিষ্ট হয়ে উঠবে। তখন নামায পড়া থেকে আমাদের ক্লান্তি ও অবসাদ ভর করবে না।

হে আল্লাহ!

তোমার ইবাদতের মজা ও মিষ্টি স্বাদ আমাদেরকে আস্বাদন করাও। আর আমাদের নামাযকে তোমার দরবারে গ্রহণীয় করো।

একজন মুমিনের জন্যে এর চাইতে মজাদার আর কিছুই নয় যে, সে নিজেকে মহান আল্লাহর নির্দেশ সম্পাদনকারী দেখবে আর খোদায়ী দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বলবে ঃ

হে আল্লাহ! যেহেতু তুমি বলেছ তাই পালন করেছি।

হে আল্লাহ! যেহেতু তুমি চেয়েছে তাই সম্পাদন করেছি।

হে আল্লাহ! যেহেতু তুমি নির্ধারণ করে দিয়েছ তাই কোন ওযর আপত্তি ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেছি।

এটাই হলো মুসলমানীত্ব, আল্লাহর নির্দেশনাবলী এবং খোদায়ী তাকলীফের সামনে আত্মসমর্পণ।

আয়াত ও রেওয়ায়েতের দৃষ্টিতে নামায

কোরআন ও হাদীসে নামায সম্পর্কে শত শত আয়াত ও রেওয়ায়েত বিদ্যমান রয়েছে যেগুলো নামাযের মূল্য, তাৎপর্য, অর্থ ও রহস্যকথা বর্ণনা করে। অসংখ্য এ আয়াত ও রেওয়ায়েতের মধ্যে থেকে নামাযের স্বরূপ ব্যাখ্যাকারী কয়েকটি বিষয় এখানে তুলে ধরছিঃ

নামায হলো পয়গাম্বরদের কর্তৃক তাঁদের সন্তানদের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ।

নামায ঔদাসীন্যতা বিদূরিতকারী এবং আল্লাহর স্মরণকে জাগ্রতকারী।

নামায হলো রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চোখের জ্যোতি।

নামায অহঙ্কারকে অপসারিত করে।

নামায বিপদ আপদে ও সমস্যায় মানুষের সহায়।

নামায আল্লাহর নেয়ামতসমূহের জন্য কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।

নামায হলো দ্বীনের ভিত, ইসলামের পতাকা, বেহেশতের চাবিকাঠি আর মানুষের ঈমান পরিমাপের মাপকাঠি।

নামায হলো সৃষ্টির সাথে স্রষ্টার সম্পর্ক। পাপসমূহকে মোচন করে দেয় আর বস্তু মানবকে আধ্যাত্মিক করে তোলে।

নামায হলো এমন ইবাদত যা কোন অবস্থাতেই রহিত হয় না। এটা পরহেযগার মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম।

নামায হলো ইব্রাহিম (আঃ)-এর সুন্নত, মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সীরাত এবং হুসাইন (আঃ)-এর উদ্দেশ্যকে উজ্জীবিত রাখা।

নামায হলো মানুষের জীবনের সংকটকালে আধ্যাত্মিক নির্ভর স্থল।

নামায ইবাদতকূলের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।

তাকওয়াবান লোকের দুই রাকাত নামায বেপরোয়া লোকের হাজার রাকাতের চাইতে শ্রেষ্ঠ।

সেই মুমিনরাই সফলকাম যারা তাদের নামাযের মধ্যে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করে।

নামায হলো শয়তানকে চপেটাঘাত করা, প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জন করা আর স্রষ্টার সামনে দন্ডায়মান হওয়া।

নামায হলো ক্ষুদ্র ও দুর্বল এক সৃষ্টির জন্য উচ্চতর, ক্ষমতাবান ও মহান অস্তিত্বের সাথে বন্ধনের যোগসূত্র।

হযরত ঈসা (আঃ) দোলনায় বলেন ঃ আল্লাহ আমাকে নামাযের প্রতি আদেশ করেছেন।

ইমাম সাদিক (আঃ) শাহাদাতের মুহূর্তে বলেন, যে ব্যক্তি নামাযকে তুচ্ছ জ্ঞান করবে সে আমাদের শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হবে।

আমিরুল মুমিনীন আলী (আঃ) সিফফীনের ময়দানে নামাযের সময় হলে যুদ্ধ থামিয়ে দিলেন এবং নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন।

ইমাম হুসাইন (আঃ) তার নামাযকে এতবেশি দীর্ঘায়িত করতেন যে তাঁর পদযুগল ফুলে যেত।

হযরত আলী (আঃ) নামাযের মধ্যে এমনভাবে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন হয়ে যেতেন যে আল্লাহ ভিন্ন সব কিছুর কথা ভুলে যেতেন। যারা নামায পড়ে না তাদের শাস্তি হলো দোযখ। ধিক তাদের ওপর যারা নামাযকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এবং এ ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে। ইরশাদ হচ্ছেঃ

فَوَيْلٌلِلْمُصَلِّيناَلَّذِينَهُمْعَنْصَلاتِهِمْسَاهُون

অর্থাৎ, দুর্ভাগ্য সে সব নামাযীর যারা তাদের নামায সম্বন্ধে বে-খবর। (মাউন-৫)

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ

مَنْتَرَكَالصَّلاةَمُتَعَمِّدًافَقَدْكَفَرَ

অর্থাৎ, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায পরিত্যাগ করে সে ইসলামের সীমানা অতিক্রম করে কুফরীতে পতিত হয়। (মাহাজ্জাতুল বাইদা, খন্ড-১, পৃ. ৩০১)

যে ব্যক্তি নামাযকে উপেক্ষা করে আল্লাহ তার আয়ু ও মাল সম্পদ থেকে কর্তন করে নেন, তার কর্মের প্রতিদান বিনষ্ট করে দেন, তার দোয়াসমূহ কবুল হয় না, মৃত্যুর সময়ে ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও লাঞ্ছনার অনুভূতি নিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে, বারযাখে শাস্তি ও আযাবের সম্মুখীন হয় আর কিয়ামতে তার হিসাব নিকাশ কঠিন হয়। (ওসায়িলুশ শিয়া, খন্ড-২, পৃ. ৪৩)

এ অধ্যায়ের শেষ ভাগে খুবই উপযুক্ত মনে হচ্ছে নামায সম্বন্ধে হযরত ইমাম খোমেনী (রহঃ) এর কিছু উক্তি উল্লেখ করি। তিনি বলেনঃ

ইসলামে নামাযের চাইতে বড় কোন ফরয নেই… নামায হলো জাতির পৃষ্ঠপোষক, নামায হলো মানুষ গড়ার এক কারখানা…, একটি জাতির মধ্যে থেকে নামায অশ্লীলতা ও মন্দকে দূর করে দেয়…, আপনারা মসজিদগুলোকে খালি রাখবেন না।

নামায হলো সর্বোৎকৃষ্ট যিকির, এই শক্তিশালী দুর্গগুলোকে মজবুত করে আগলে রাখুন, এমন বলবেন না যে, আমরা তো বিপ্লব করেছি, এখন কেবল চিৎকার করবো। না, নামায পড়–ন, এটাই সব চিৎকারের উর্ধ্বে…,

শয়তানগুলো নামায থেকে ভয় পায়, মসজিদ থেকে ভয় পায়…। (সহীফায়ে নূর, খন্ড-১২, পৃ. ১৪৮, ১৪৯)

নামাযের সাথে

এতক্ষণ অবধি আলোচনা হলো মুল নামায ও তার গুরুত্ব, তাৎপর্য ও প্রভাব নিয়ে। এবার সুযোগ হয়েছে নামাযের নিয়মাবলী সম্পর্কে এবং তার রহস্য ও ভাবার্থ এবং তার মধ্যে অন্তর্নিহিত শিক্ষাগুলো সম্পর্কে কিছু আলোচনা করার। যাতে এর মাধ্যমে আমাদের নামাযসমূহ নতুন প্রাণশক্তি লাভ করে এবং এ মহান ইবাদতের নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে অধিকতর উপকার পেতে পারি।

নামাযের প্রাথমিক কাজসমূহ

নামাযের জন্য পাক পবিত্র হতে হবে। শরীর এবং কাপড় দুটোই পবিত্র করতে হবে। আর আহকামের বই পুস্তকে যেভাবে বর্ণিত রয়েছে সেভাবে ওযু গ্রহণ করতে হবে।

ওযু হলো নামাযে প্রবেশের অনুমতিস্বরূপ এবং এই ইবাদত সম্পাদনের আত্মিক ক্ষেত্রস্বরূপ। ওযু ছাড়া নামায বাতিল। (ওসায়িলুশ শিয়া, খন্ড-১, পৃ. ২৫৬)

ওযু হলো ঈমানের অঙ্গ, অন্তরের জ্যোতি এবং আধ্যাত্মিক মনোসংযোগ দানকারী। ইমাম রেযা (আঃ) এর বর্ণনা মতে, যে ব্যক্তি প্রতিপালকের সম্মুখে ইবাদতে দন্ডায়মান হয় তাকে অবশ্যই কলুষতা থেকে মুক্ত হতে হবে, আলসেমি, ক্লান্তি ও অবসন্নতা থেকে দূরে থাকতে হবে এবং ওযুর মাধ্যমে মহাশক্তিমান আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার জন্য মনকে পবিত্র ও প্রস্তুত করতে হবে। (ওসায়িলুশ শিয়া, খন্ড-১, পৃ. ২৫৭)

সর্বাবস্থায় ওযু সহকারে থাকা ভালো। এমনকি ওযু সহকারে ঘুমানো সারা রাত ইবাদতের সমান সওয়াবের কাজ। এছাড়া অনেক ইবাদতমূলক কাজের জন্য যেমন দোয়া, যিয়ারত, কোরআন পাঠ এবং পড়ার সময়ে ওযুতে থাকার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আর বিনা ওযুতে কোরআনের আয়াত ও আল্লাহ, মহানবী (সাঃ) এবং ইমামগণের (আঃ) নাম স্পর্শ করতে বারণ করা হয়েছে।

অবশ্য পোশাক ও শরীরের বাহ্যিক পবিত্রতা বজায় রাখা এবং ওযু সহকারে থাকা ছাড়াও অন্তরও মুনাফেকী, হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে পাক হতে হবে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সব ধরনের অপরাধ ও দুষ্কর্ম থেকে মুক্ত থাকতে হবে।

সত্যি! যদি পোশাক ও শরীর পবিত্র থাকে অথচ আত্মা থাকে নাপাক, তাহলে এটা কি এক প্রকার মোনাফেকী নয়? সুতরাং দৈহিক ও বাহ্যিক পবিত্রতা অর্জনে যেমন চেষ্টা করতে হবে তদ্রƒপ অভ্যন্তরীণ ও আন্তরিক পবিত্রতা অর্জনের জন্যও চেষ্টা করা আবশ্যক যাতে আল্লাহর সকাশে উপস্থিত হওয়াটা অধিকতর আদবের সাথে সম্পন্ন হয়।

যারা জানাবাত অবস্থায় থাকে তাদের জন্য গোসল করা আবশ্যক। বিশেষ এক পদ্ধতিতে শরীরকে ধৌত করার মাধ্যমে এ গোসল করতে হয়। আর যদি পানি না পাওয়া যায় কিংবা পানির ব্যবহার ক্ষতিকর হলে অথবা ওযু ও গোসলের জন্য যথেষ্ট সময় হাতে না থাকলে তায়াম্মুম করতে হবে।

নামাযী ব্যক্তির শরীরকে ঢেকে রাখতে হবে। মানুষের জন্য উত্তম হলো নামাযে পরিস্কার, সাদা এবং সুগন্ধীযুক্ত কাপড় পরিধান করা। কেননা, সে আল্লাহর সাক্ষাতে চলেছে। আর আদবের শর্ত হলো সর্বোত্তম কাপড় পরিধান করা।

নামাযীর কাপড় ও স্থান মোবাহ হতে হবে। অর্থাৎ পরের জিনিস না হয়। ক্বিবলামুখী হয়ে তাকে নামাযে দাঁড়াতে হবে যদিও আল্লাহ নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বিরাজ করেন না। তিনি সর্বত্র বিরাজমান এবং সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেন। কিন্তু পবিত্র কাবা এবং আল্লাহর হেরেমের দিকে মুখ করে দাঁড়ানোর অর্থ হলো হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর একত্ববাদকে এবং সেই মহান পিতা ও পুত্রের নিষ্ঠা ও এক আল্লাহর উপাসনার সুন্নতসমূহকে জাগ্রত করা যারা কা’বার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

কিবলাহ্ হলো মুসলমানদের তৌহিদী চেতনার দিক দর্শন। শুধু নামাযের বেলায় নয়, বরং দোয়া, কুরবানী, বসা, খাওয়া, ঘুমানো, মৃতদেরকে দাফন করা… ইত্যাদি সকল কাজে কিবলার দিকটি মেনে চলতে হয়।

এটা এমনি এক শিক্ষা যা গোটা জীবনভর আমাদের মনোযোগকে মহান আল্লাহর ঘরের প্রতি নিবন্ধ করে, যিনি আমাদের অন্তর্যামী, প্রতিপালক। আর মুসলমানদের কাতারে ঐক্য ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করে।

দ্বীনের শ্লোগান-আযান

আযান হলো একত্ববাদ ঘোষণার একটি মাধ্যম এবং মানুষদেরকে নামাযের উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়ার আহ্বান। এটি ইসলামের একটি সুন্দর ও প্রভাব সম্পন্ন শ্লোগান।

আযানের মধ্যে তকবীর, তৌহিদ, রাসূলের রেসালাত ও আমিরুল মুমিনীনের বেলায়াতের প্রতি সাক্ষ্য এবং মানুষকে নামায ও কল্যাণের দিকে ধাবিত হওয়ার আহ্বান নিহিত রয়েছে।

আযান হলো ইসলামের বিদ্যমানতার ঘোষণা আর মুসলমানদেরকে আহ্বান করা এবং দ্বীনি আকীদা বিশ্বাসকে পরিচয় করানোর প্রয়াস।

আযান হলো নীরবতা ভেঙ্গে কাল্পনিক উপাস্যসমূহের বিরুদ্ধে জোরদার ধ্বনি আর ইসলামের স্বপক্ষে বলিষ্ঠ শ্লোগান ও আল্লাহর ধর্মের পক্ষে সমর্থন জ্ঞাপন।

ইসলামে মুয়াজ্জিনের বিশেষ সম্মান রয়েছে। কিয়ামতেও সে উন্নত শির।

বেলাল হাবাশী ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের প্রথম সারির মুসলমান। মুয়াজ্জিন উপাধিটি তার জন্য গৌরবের ছিল। তিনিই ছিলেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন। মক্কা বিজয়ের দিনেও তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর নির্দেশে কা’বার উপরে আরোহণ করেন এবং মুশরিকদের মুর্তিগুলোর উৎপাটন করেন। (ওসায়িলুশ শিয়া, খন্ড-৪, পৃ. ৬১৪)

আযান একবার বলা হয় সাধারণ ঘোষণা হিসেবে এবং নামাযের সময় সমাগত হওয়ার ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে। আরেকবার বলা হয় বিশেষ করে নামায শুরুর জন্য।

আযানের পরে একামাতের তাৎপর্যও এক ও অনুরূপ। নামায শুরুর জন্য এবং আত্মিক প্রস্তুতি লাভ ও আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ ও নামাযের ছায়াতলে মুক্তির অভিপ্রায়ে মুখে একামাত উচ্চারণ করা হয়। আযান ও একামাত যদিও মুস্তাহাব কিন্তু ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শ্লোগানসমূহের মধ্যে পরিগণিত হয়। তাই তা বলার জন্য অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

আল্লাহর বন্দেগীকারী একজন মুসলমান আযানের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নামকে বিশ্ব মাঝে যথা সম্ভব প্রকাশ্যে ও স্পষ্টরূপে ছড়িয়ে দেয়। এই ঐশী ও একত্ববাদী ধ্বনিই শত্র“দের পৃষ্ঠে কুঠারাঘাত করে এবং আল্লাহ ও ইসলামের দুশমনদেরকে ধরাশায়ী করে দেয়।

নিয়ত

নিয়তের অর্থ হলো উদ্দেশ্য, মনোযোগ এবং সংকল্প। নামাযের মধ্যে নিয়তের অর্থ হলো নামাযী ব্যক্তি আল্লাহর নির্দেশ পালনের সংকল্প রাখে এবং তার সন্তুষ্টি অর্জন ও প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে নামায পড়ে। শুধু তাঁরই নির্দেশ সম্পাদন ও কর্তব্য পালন করা ছাড়া আর কোন উদ্দেশ্য নেই।

একজন মুসলমানকে প্রত্যেক কাজের মধ্যে বিশেষ করে ইবাদতের ক্ষেত্রে তার নিয়তকে নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করতে হবে। অর্থাৎ আল্লাহর জন্য এবং তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য ইবাদত করবে। কপোটতা, ভন্ডামি, আত্মপ্রদর্শন কিংবা অন্য কোন উদ্দেশ্য নয়।

নিয়ত নামাযের মূল স্তম্ভসমূহের মধ্যে একটি। নামায পড়ার সময় শুরু থেকে শেষ অবধি নামাযীর মধ্যে এই মনোযোগ ও সচেতনতা বিদ্যমান থাকতে হবে। নিয়ত বিহীন আমলসমূহ কিংবা বস্তুগত ও অসৎ নিয়ত সম্পন্ন আমল মূল্যহীন। পবিত্র কোরআনে ফি সাবিলিল্লাহ’ তথা আল্লাহর রাস্তায়’ শিরোনামে একটি পরিভাষা রয়েছে। নামায, জিহাদ, দান-খয়রাত, হিজরত ইত্যাদি অনেকগুলো কাজের বেলায় এ পরিভাষাটি প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় এসব আমল সম্পাদন করতে হবে এবং আল্লাহর রঙে রঞ্জিত থাকতে হবে।

নিয়ত হলো আমল কবুল হওয়ার একটি শর্ত। আমরা যদি আমাদের ইবাদতসমূহে নিখাঁদ নিয়ত না রাখি তাহলে পুরস্কার প্রত্যাশা করা উচিত হবে না। মহান আল্লাহ কেবলমাত্র নির্ভেজাল আমলগুলোকেই গ্রহণ করবেন।

নিয়ত যদি নিখাঁদ ও খোদায়ী হয় তাহলে ছোট ও সামান্য কাজগুলোও অতীব মূল্যবান ও বড় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি খারাপ নিয়ত থাকে আর আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো উদ্দেশ্যে হয় তাহলে বেশী আমলও অনর্থক ও মূল্যহীন হয়ে পড়বে।

এ প্রসঙ্গে ইমাম সাদিক (আঃ) বলেন, যে ব্যক্তি স্বীয় স্বল্প আমল দ্বারা মহান আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তার কাজকে মানুষের চোখে অনেক হিসেবে প্রতিফলিত করবেন। আর যে ব্যক্তি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশ্যে অনেক কাজও সম্পাদন করে, মহান আল্লাহ সেগুলোকে মানুষের চোখে সামান্য হিসেবে প্রতিফলিত করবেন।

অতএব, আল্লাহর জন্যই কাজ করতে হবে এবং ইবাদত পালন করতে হবে। অন্তরসমূহ আল্লাহর হাতে রয়েছে। তিনিই মানুষকে মান-সম্মান, মূল্য ও জনপ্রিয়তা দান করে থাকেন। এটা নিশ্চিত যে, মহান আল্লাহ কখনোই তার যোগ্য ও খাঁটি বান্দাগণকে ভুলে যান না। তিনি তাদেরকে শ্রেষ্ঠত্ব, সুনাম ও জনপ্রিয়তা দান করেন।

সুতরাং আমাদের ইবাদত ও নামায আল্লাহর কারণে হওয়া আবশ্যক। অন্য লোকের কারণে নয়। আর আমাদের হৃদয়ের ঘরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ঢুকতে দেব না। আর আল্লাহর পছন্দ ও সন্তুষ্টিকে মানুষের পছন্দের উপরে প্রাধান্য দান করবো।

অবশ্য আমল ও নিয়তে একনিষ্ঠতা বজায় রাখা দুরূহ কাজ। শয়তান সর্বক্ষণ চেষ্টা করে যে কোন প্রতারণা ও প্রলোভনের মাধ্যমে আমাদের অন্তরে খোদা ভিন্ন অন্যের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করতে। তাই আমাদের উচিত শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের এবং নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের কর্মসূচীর আওতায় সকল কাজকে আল্লাহর জন্য সম্পাদন করা।

হযরত আলী (আঃ) বলেনঃ

اَخْلِصْللهعِلْمَكَوَعَمَلَكَوَبُغْضَكَوَاَخْذَكَوَتَرْكَكَوَكَلامَكَوَصَمْتَكَ

অর্থাৎ তোমার ইলম ও আমলকে, তোমার শত্র“তা ও গ্রহণ-প্রদানকে আর তোমার কথা বলা ও নীরব থাকাকে আল্লাহর জন্য নিখাঁদ করো। (ফেহরেস্তে গুরারুল হেকাম-ইখলাস অংশ)

মানুষ যদি তার সমস্ত কাজকে আল্লাহর রঙে রঙিন করে তাহলে এমনকি যা ইবাদত নয় এমন কাজও ইবাদতে পরিণত হয়। কেননা, তা একনিষ্ঠতা ও ঐশ্বরিক রঙ লাভ করে।

নিয়তের অর্থ হলো সকল নামায সর্বদা এবং সর্বত্র আল্লাহর জন্য হবে। অন্যথায় বাতিল হয়ে যাবে।

এমনকি যদি কেউ বিশেষ কোন স্থান বা সময়ে কিংবা বিশেষ কোন অবস্থায় নামায পড়ে তবে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো জন্যে, তাহলেও তা বাতিল কাজে পরিণত হবে। যেমন কেউ যদি আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারো জন্যে মসজিদে গিয়ে নামায পড়ে, কিংবা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে জামায়াতে নামায পড়ে অথবা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য রুকু ও সিজদাকে দীর্ঘায়িত করে তাহলে এ সমুদয় কাজই একনিষ্ঠ নিয়তের পরিপন্থী হবে।

যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাজ করে সে ক্লান্ত হয় না। নিরাশও হয় না। মানুষের অমনোযোগের কারণে সে ক্ষুব্ধ হয় না। অন্যের বাহবা না পেলেও সে যেমন বিমর্ষ হয় না তদ্রƒপ অন্যের উৎসাহ ও সাবাশী পেলেও তার কোন প্রভাব পড়ে না। একনিষ্ঠতা, মানুষের মধ্যে এমন শক্তির উদ্ভব ঘটায় যা সর্বত্র এবং সর্বক্ষণ তাকে ভালো কাজে অনুপ্রেরণা যোগায়। এক্ষেত্রে কোন নিরাশা, অবসাদ ও ক্লান্তির অবকাশ নেই। আলী (আঃ) বলেনঃ

اَلْعَمَلُكُلُّهُهَبَاءٌاِلاَّمَااُخْلِصَفِيه

অর্থাৎ সব কাজই বৃথা পর্যবসিত হবে কেবল যা একনিষ্ঠতা সহকারে করা হয় সেটা ব্যতিত। (ফেহরেস্তে গুরারুল হেকামঃ এখলাস অংশ)

দুটো কাজ যখন বাহ্য বিচারে এক ও অনুরূপ হয় তখন যেটার মধ্যে সঠিক নিয়ত যুক্ত ছিল সেটা বেশি মূল্যবান হবে। যেমন, ছুরি মারা ছিনতাইকারী আর চাকু দ্বারা অস্ত্রোপচারকারী। দু’জনই পেট কেটে ফেলে। কিন্তু প্রথম জনকে কারাগারে প্রেরণ করা হয় আর দ্বিতীয় জনকে টাকা প্রদান করা হয় এবং তাকে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। কারণ, প্রথম লোকটি চাকু চালায় শত্র“তার বশে এবং হত্যার উদ্দেশ্যে। আর দ্বিতীয় লোকটি চাকু চালায় প্রাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে। কাজেই নিয়ত হলো সকল ইবাদতের মূল নির্যাস। ইমাম আলী (আঃ) বলেনঃ

اَلنِّيَّةُاَسَاسُالْعَمَلِ

অর্থাৎ নিয়ত হলো কাজের ভিত্তি। (ফেহেরেস্তে গুরারুল হেকাম, নিয়ত অংশ)

দুইজন লোক যখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামায পড়ে তখন তাদের মধ্যে সেই লোকটির নামাযই গ্রহণীয় ও মূল্যবান হবে যার নিয়ত উত্তম হবে এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে হবে। যদিও বাহ্যিক বিচারে উভয়ের আমল একই রকম হয়।

কিভাবে খাঁটি হবো?

খাঁটিত্বে পৌঁছানোর জন্য দৃষ্টিভঙ্গী, ধ্যান-ধারণা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গীর ধরন প্রকৃতি মানুষের নিয়তে প্রভাব ফেলে। যদি আমাদের বিশ্বাস থাকে মানুষ সৃষ্টির সেরা এবং পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি। মানুষই অস্তিত্বের সার আর সৃষ্টির উদ্দেশ্য। আমাদের কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণ করবেন স্বয়ং আল্লাহ। তিনিই পুরস্কার দান করবেন। এমনকি ক্ষুদ্রতম কাজগুলোকেও পবিত্র নিয়তে যদি হয় তাহলে বৃহত্তম পুরস্কার দান করবেন।

আল্লাহর সূক্ষ্ম হিসাবের খাতা থেকে ছোটবড় কোন কাজই বাদ পড়ে না। মানুষ ইহকালে এবং পরকালে স্বীয় আমলের ফলাফলকে প্রত্যক্ষ করবে।

আল্লাহ আমাদের নষ্ট ও ত্র“টিপূর্ণ কাজগুলোকে ঢেকে দেন আর আমাদের ভালোগুলোকে প্রকাশ করে দেন।

মানুষের মূল্যমান হলো বেহেশত। তাই বেহেশতের চেয়ে কম কিছুর বিনিময়ে সে যদি নিজেকে বিক্রি করে দেয় তাহলে সে লোকসান করলো। মানুষ যদি দুনিয়াকে তার মূল্য হিসেবে ধার্য্য করে তাহলে বড় ঠকের হবে তার এ বাণিজ্য।

মানুষের কর্মসমূহের খরিদ্দার হলেন আল্লাহ। ইবাদতের মধ্যে মানুষ আল্লাহর সাথে লেনদেন সম্পন্ন করে আর তারই হিসাব নিকাশের প্রতিপক্ষ হয়।

আমাদের যা কিছু রয়েছে আল্লাহরই দান। তিনিই নেয়ামতের মালিক আর স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী, আমাদের দয়াময় প্রতিপালক তিনি।

মানুষের অন্তর একটি। সেই অন্তরে একই সাথে দুইটি বিপরীত জিনিসের ভালোবাসা থাকতে পারে না। (আহযাবঃ ৪) হয় আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা নতুবা দুনিয়াপ্রীতি। হয় আল্লাহ প্রেম না হয় দুনিয়াপ্রেম।

দুনিয়া হলো ক্ষণস্থায়ী একটি কুঁড়িসম। এটা এমন এক না ফোটা ফুলের কলি যা কারো জন্য প্রস্ফুটিত হয়নি। কারো প্রতি বিশ্বস্তও থাকেনি। মহান আল্লাহ দুনিয়াকে অহংকারের ইন্ধন আর তুচ্ছ পণ্য বলে অভিহিত করেছেন।

কিয়ামতের দিন সকল মাধ্যম ও শাফায়াতকারীরা বেকার হয়ে যাবে। শুধুমাত্র একনিষ্ঠতা, সৎকর্ম আর তাকওয়া ও ইখলাস সমৃদ্ধ ইবাদতই কাজে আসবে। সেদিন প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তায় ডুবে থাকবে। দুনিয়ায় আমরা যে এর-তার প্রতি ভরসা করে থাকি, কারো সেদিন কোন সাধ্য নেই। প্রত্যেক মানুষ কেবল স্বীয় কর্মের ফলাফলকেই দেখতে পাবে। নিজের রোপণ করা ফসলই সেদিন ঘরে তুলবে।

কপোটাচারীরা দুনিয়ায় যদি মানুষকে ধোঁকাও দিয়ে চলে, পরকালে পর্যুদস্ত হবে আর স্বীয় কর্মসমূহকে বৃথা ও ধ্বংস হতে দেখবে।

হ্যাঁ, যদি এইসব বিশ্বাস আমাদের বুকে বিদ্যমান থাকে তাহলে আমরা একনিষ্ঠতার নিকটবর্তী হতে পারবো এবং আল্লাহ ভিন্ন অন্যের জন্য আমাদের কর্মগুলো কমই পরিচালিত হবে। মানুষের পছন্দ ও মতামত আমাদের জন্য গুরুত্ব বহন করবে না। আল্লাহর চাওয়া, আল্লাহর পছন্দ আর আল্লাহর পুরস্কার এগুলোই হবে তখন আমাদের মূল অনুপ্রেরণার কারণ। আমরা যদি আল্লাহকে না দেখি, তিনি তো আমাদেরকে দেখতে পান।

যদি আযাবের কোন প্রসঙ্গ নাও থাকে তবুও তার নেয়ামতসমূহের কারণে হলেও তো তাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি এবং খাঁটি মনে তাঁর ইবাদত করতে পারি। আর তাঁর নির্দেশের অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকতে পারি।

জগত আল্লাহর সামনেই উপস্থিত।

তাই আল্লাহর সামনে পাপ করা উচিত নয়। জগতটা আল্লাহর নেয়ামতে ভরা বিস্তীর্ণ এক দস্তরখানা। অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়া, কপোটতা ও আত্মপ্রদর্শন করা আল্লাহর অশেষ সেই অনুগ্রহ ও নেয়ামতসমূহের প্রতি অকৃতজ্ঞতার শামিল। ইবাদত এমনকি বেহেশেতের লোভে কিংবা জাহান্নামের ভয়ে পালন করা উচিত নয়। বরং সেই আল্লাহর জন্যই সম্পাদন করতে হবে যিনি উপাসনার যোগ্য। এই ইবাদতই স্বাধীনদের ইবাদত। আমিরুল মুমিনীন আল্লাহর জন্য এমনই ইবাদত করতেন। সেই ব্যক্তিই একনিষ্ঠতার স্তরে পৌঁছতে পারে যে আগে ইয়াকীন তথা দৃঢ় আকীদা বিশ্বাসের অধিকারী থাকে। আর হযরত আলী (আঃ)-এর ভাষায় ইখলাস হলো ইয়াকীনের ফল।

اَلْاِخْلاَصُثمَرَةُالْعَمَلِ

(ফেহরেস্তে গুরারুল হেকামঃ ইখলাস অংশ)

আমাদের যদি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে আমরা আল্লাহর সামনেই উপস্থিত রয়েছি এবং তিনি আমাদের সকল কাজকে প্রত্যক্ষ করছেন, আমাদের অন্তরের নিয়তসমূহের খবরও তিনি অবগত আর সব ধরনের মান-অপমান তাঁরই হাতে, ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার চাইতে তাঁর সন্তুষ্টির মূল্য অনেক বেশি… তাহলে আমরা বেশি বেশি ও দ্রুততর ইখলাসে পৌঁছে যাব। তখন আর অন্যের কাছ থেকে প্রশংসা, গুণকীর্তন আর কৃতজ্ঞতা লাভের প্রত্যাশা করবো না।

যেমনভাবে আমিরুল মুমিনীন (আঃ)-এর পরিবার আল্লাহর জন্য তিন দিন ধরে স্বীয় ইফতারকে ইয়াতীম, বন্দী ও মিসকীনকে দান করেন, কোনো ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা পাওয়ার প্রত্যাশা না করেই। (ইনসানঃ ৯) মহান আল্লাহও তাদের একনিষ্ঠতাপূর্ণ এ আহার প্রদানের প্রতিদানে সূরা (হাল আতা…) খানি অবতীর্ণ করলেন এবং সে আহলে বাইত (আঃ) কে সম্মানিত করলেন।

নিষ্ঠাবান ব্যক্তি স্বীয় কর্তব্য পালনে লোকের প্রশংসা কিংবা সমালোচনায় উৎসাহী কিংবা ধীরগতি হয় না। মানুষের অবমূল্যায়নের কারণে তাকে ভালো কাজে উদ্যমহারা বা অনুতাপে নিমজ্জিত করতে পারে না। সে প্রত্যেক কাজকেই শরীয়তের বিধান পালনার্থে সম্পাদন করে। এর তার মতামতের কারণে অহরহ তার কর্মসূচীতে পরিবর্তন ঘটায় না। ধন-সম্পদ ও পদবী তাকে আল্লাহর নির্দেশ পালনে বাধাগ্রস্ত করে না। তার অন্তর ও বাহির এক ও অভিন্ন।

আল্লাহ এবং দ্বীনের পথে নানা ভর্ৎসনা ও নির্দয়তাকে সহ্য করে। বিদ্বেষ ও স্বার্থপরতা থেকে দূরে থাকে। ভ্রান্ত কাজগুলোর উপর পীঁড়াপীঁড়ি করে না এবং তা অব্যাহত রাখে না। সে তাকলীফ তথা দ্বীনি কর্তব্যের আনুগত্য করে, স্বীয় খায়েশ কিংবা লোকের পছন্দ বাস্তবায়ন করা তার কাজ নয়।

আল্লাহু আকবার (আল্লাহ সুমহান)

এবার আল্লাহর নাম, তাঁর স্মরণ এবং তাকবীর দ্বারা শুরু করবো।

নিয়তের পর ‘আল্লাহু আকবার’ বলার মাধ্যমে নামাযে প্রবেশ করবো আর আল্লাহ ব্যতিত সব কিছুকে অন্তর থেকে বের করে দিব। প্রতিপালক ছাড়া আর কারো প্রতি মনোনিবেশ করবো না। আর কেবল তাঁরই মহীমা, ক্ষমতা ও কৃপার বিষয় ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করবো না। কারণ, তিনি হলেন ‘আকবার’ সুমহান!

সব কিছুর চাইতে এবং সব ব্যক্তির চাইতে উর্ধ্বে তিনি, গুণ-বিশেষণেরও উর্ধ্বে।

তাঁর গুণ মহিমা বর্ণনা করা যায় না। যতই বলা হোক, শোনা হোক আর জানা হোক তবুও তিনি উর্ধ্বে।

তাঁর ক্ষমতা সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ষমতা

তাঁর সত্ত্বা চিরন্তন

তাঁর দয়া সীমাহীন

তাঁর নেয়ামত অগণিত

তাঁর জ্ঞান অসীম।

সমকক্ষহীন তিনি অংশীদার বিহীন, অবিনশ্বর তিনি অভাবহীন। ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থাৎ তাঁর শক্তির সম্মুখে কোন শক্তিকেই স্বীকৃতি দিই না। তাঁকে ছাড়া কাউকে ভয় করি না, তাঁকে ছাড়া কাউকে আনুগত্য করি না, তাঁর প্রতি ছাড়া কারো কাছে অন্তরকে সোপর্দ করি না। হৃদয়ের মধ্যে তাঁর জন্য ছাড়া অন্য কারো প্রেমভক্তি পোষণ করি না, কেবল তাঁরই দরবারে ছাড়া আর কারো সান্নিধ্যে বন্দেগীর প্রকাশ করি না। তাঁর নাম ছাড়া আর কোন নামে সূচনা করি না। কারণ, তিনি সব কিছুর চাইতে শ্রেষ্ঠতম, মহীয়ান। তাঁর উচ্চ মর্যাদাকে তুলে ধরার যোগ্য কোন বাক্য নেই।

‘…আল্লাহু আকবার’

আমরা আল্লাহর মহীমাকে যতবেশি অনুভব ও বিশ্বাস করবো ততই আল্লাহ ভিন্ন সব কিছু আমাদের চোখে নগন্য প্রতিপন্ন হবে। যেমনভাবে শূন্য আকাশে আমরা যতই উপরে উঠি, নিচের ঘরবাড়িগুলো আমাদের চোখে ছোট হতে থাকে। যে ব্যক্তি তাকবীরের মধ্যে আল্লাহর মহীমাকে বিশ্বাস করলো এবং জিহ্বা দ্বারা উচ্চারিত করলো, সে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কিছুকে আর বড় দেখে না। তাকবীর হলো আমাদের নামাযের শুরু আর নামাযের পরিসমাপ্তি।

প্রত্যেক রুকু ও সিজদার পূর্বে, নামাযের সর্বত্র এমনকি সালামের পরেও এই শ্লোগানকে জিহ্বায় উচ্চারণ করবো।

যে ব্যক্তি তার তাকবীর ধ্বনির মধ্যে ইবাদতের মজা ও মিষ্টি স্বাদ খুঁজে পায় তার জানতে হবে যে, তার নামায গ্রহণীয় হয়েছে।

আল্লাহু আকবার বলার সময় এবং কান অবধি হাতকে তোলার সময় আল্লাহর অভিমুখেই মুখ করতে হবে। আর যা কিছু আল্লাহ ছাড়া, তার প্রতি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করতে হবে। নামাযের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ অবস্থাকে উজ্জীবিত রাখতে হবে।

এটা কত বড় মিথ্যাচার যে, মানুষ মুখে ‘আল্লাহু আকবার’ বলবে কিন্তু অন্তরে অন্য কিছুকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও বড় বলে স্থান দিবে যেমন দুনিয়া, সম্পদ, খ্যাতি, পদবী, পেট, যৌনকামনা, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজন, পরিজন, বাড়ি, গাড়ি ইত্যাদি।

যে ব্যক্তি ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সে যেন আল্লাহ ভিন্ন সব কিছুকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকে, এমনকি তার প্রাণকেও।

সত্যিই, ‘আল্লাহু আকবার’ কথাটি অনেক বড়, অনেক গভীর ও বিস্তৃত। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেনঃ

اَللهُاَكْبَرُفَهِيَكَلِمَةٌلَيْسَاَعْلاَهَاكَلامٌوَاَحَبُّهَااِلَياللهِ

অর্থাৎ আল্লাহু আকবার এমনই একটি কথা যার থেকে শ্রেষ্ঠ কোন কথা নেই এবং আল্লাহর নিকটে তার চাইতে পছন্দনীয় কোন বাক্য নেই। (ইখতিসাস, শেখ মুফীদ, পৃ. ৩৪)

সূরা হামদ

তাকবীর বলার পর সূরা হামদ পাঠ এবং তারপরে আরেকটি সূরা যেমন ‘ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ পাঠ করার মাধ্যমে নামাযকে অব্যাহত রাখবো।

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম দ্বারা সূরা শুরু করতে হবে। করুণাময় অনন্তদাতা আল্লাহর নামসহকারে এই সূচনা করা হয়। বিসমিল্লাহ হলো আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশের এবং তাঁর নিকট থেকে সাহায্য চাওয়ার রহস্য কথা।

বিসমিল্লাহ হলো ফলপ্রসু প্রত্যেক কাজের শুরু।

বিসমিল্লাহ শয়তানকে বিতাড়িত করে, মনকে আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত করে। আল্লাহর প্রতি বান্দার নির্ভরতা আর তাঁর প্রতি প্রেম ও ভরসার প্রতীক হলো এই বিসমিল্লাহ।

অন্য যে কেউ তার কাজকর্মকে আর যে কারো নামে শুরু করলেও মুসলমান তার সব কাজকে বিশেষ করে নামাযকে আল্লাহর নাম দ্বারা শুরু করে থাকে, যে নাম সর্বোৎকৃষ্ট।

হে শুরুর বেলার সর্বোত্তম নাম, তুমি

তোমার নাম ছাড়া চিঠি কিভাবে খুলব আমি?

অতঃপর বলবো আল হামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন।

اَلْحَمْدُللهِرَبِّالْعَالَمِينَ

সকল প্রশংসা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। কারণ সকল নেয়ামত ও রহমত তারই দান।

তাঁর নেয়ামতরাজিকে কি গুণে শেষ করা সম্ভব? কখনোই না।

পবিত্র কোরআনে আমরা পড়িঃ

وَاِنْتَعُدُّوانِعْمَةَاللهِلاتُحْصُوهَا

অর্থাৎ, যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো তাহলে গুণে শেষ করতে পারবে না। (ইবরাহিমঃ ৩৪)

মাছ যেমন পানির ভেতরে থেকে পানির মূল্য বোঝে না, আমরাও তদ্রƒপ জন্মের সূচনালগ্ন থেকে শেষ মুহূর্তটি পর্যন্ত আল্লাহর নেয়ামতের মধ্যে ডুবে থাকি। কিন্তু আফসোস যে সেগুলোর ব্যাপারে উদাসীন।

যে বুদ্ধি ও প্রতিভা দ্বারা আমরা সমৃদ্ধ, সুস্থতা, সবলতা, আকল বিবেক সবই আমাদের দান করা হয়েছে।

পানি, গাছপালা, ফলমূল, পশু পাখি সব কিছুই আমাদের হাতে ন্যাস্ত করা হয়েছে। আকাশের মেঘ, বাতাস, চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ নক্ষত্র সবই মানুষের জন্য ধাবমান। দিবা রাত্রির আবর্তন, সমুদ্র তার সম্পদরাজিসহ, জমিন তার ফসলসহ, আকাশ তার গ্রহ-নক্ষত্রসহ, চোখ যা দিয়ে আমরা দেখি, জিহ্বা যা দ্বারা আমরা কথা বলি, কান যা দ্বারা আমরা শ্রবণ করি, মগজ যা দ্বারা আমরা স্মৃতিকে ধরে রাখি, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যকার অদ্ভুত সমন্বয় …ইত্যাদি শত সহস্র নেয়ামত যা সত্যিই গণনার অতীত। এসবই আমাদেরকে ঘিরে রয়েছে। আমাদের জীবনও তার উপর নির্ভরশীল।

হাত আর জিহ্বার সাধ্য কি

তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের

অতএব, তাঁকেই প্রশংসা জানাই। আর সকল প্রশংসা তাঁরই প্রাপ্য এবং তাঁরই জন্য নির্ধারিত বলে জানিঃ

اَلْحَمْدُللهِرَبِّالْعَالَمِينَ

তিনি বিশ্ব জাহানের প্রতিপালক, দানশীল ও দয়াময়। তিনিই রুযী দান করেন আর কিয়ামতের দিনের কর্তা তিনি।

তাঁর কাছেই হেদায়েত প্রার্থনা করি যেন আমাদেরকে সরল সোজা পথে পরিচালিত করেন।

সরল পথ হলো আল্লাহ ও দ্বীনের পথ।

আম্বিয়াগণ, ইমামগণ এবং পুণ্যবানদের পথ।

শহীদগণ ও আল্লাহর ওলীগণের পথ।

তাকওয়া, পবিত্রতা, ন্যায়পরায়ণতা, পুণ্য, বন্দেগী, সত্যের উপাসনা, আল্লাহর আনুগত্য পাপ থেকে বিরত থাকা এবং দোযখের থেকে ভয় করার পথ।

আমরা তাঁর কাছে প্রার্থনা জানাই যেন আমাদেরকে সৎ ও পুণ্যবানদের পথে পরিচালিত করেন যা ভ্রান্তি, বিচ্যুতি, পাপ, রিপু তাড়না, অনাচার আর ধ্বংসযজ্ঞ থেকে মুক্ত। আর সে পথে যেন আমাদের দৃঢ়পদ রাখেন।

সূরা তাওহীদের মধ্যেও আমরা আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয়, নিরভাবী, সমকক্ষহীন ও সন্তানবিহীন বলে গুণ প্রশংসা জ্ঞাপন করি।

রুকু ও সিজদার মধ্যে আল্লাহর প্রশংসা জ্ঞাপনের পাশাপাশি তাঁকে সব ধরনের ত্র“টি, অসম্পূর্ণতা, অন্যায়, অধিকারহরণ, বৈষম্য, মুর্খতাসহ সর্বপ্রকার বস্তুগত ও মানবীয় এবং সীমাবদ্ধতা সূচক দোষ থেকে পবিত্র ও মুক্ত বলে ঘোষণা করে থাকি।

আমাদের তসবীহ হলো আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণার শ্লোগান।

(سُبْحَانَرَبِّيَالْعَظِيمِوَبِحَمْدِهِ) (سُبْحَانَرَبِّيَالاَعْلَيوَبِحَمْدِهِ)

অর্থাৎ আমার মহান প্রতিপালক পবিত্র এবং তাঁর প্রশংসা জানাই। আর আমার মহান প্রতিপালক সর্বোচ্চ সুমহান, তাঁর প্রশংসা জানাই।

হে দয়ালু দাতা আল্লাহ

হে সৃষ্টিকর্তা!

তোমাকে ধন্যবাদ জানাই আমাদেরকে সুপথে পরিচালিত করার জন্য।

তুমি আমাদেরকে আক্ল তথা বুদ্ধি দান করেছ।

আমাদেরকে সরল পথে চালনার জন্য নবীদেরকে প্রেরণ করেছ।

বস্তুগত ও আত্মিক, ছোট-বড়, প্রকাশ্য গোপন সকল নেয়ামতই অকুণ্ঠভাবে আমাদেরকে দান করেছ।

তোমার সম্মুখে আমাদের রুকু হলো তোমার প্রতি আমাদের বিনয়ের পরিচয়।

আমরা কোন শক্তি ও পরাশক্তির সামনেই নত হই না এবং মাথা নিচু করি না, আমাদের উন্নত শির অবস্থাকে বিসর্জন দিই না। কিন্তু তোমার সামনে আমরা অবনত শির। কারণ তুমিই পরম পূর্ণতার আঁধার আর অসীম শক্তির মালিক। তোমার সামনেই গলা বাড়িয়ে দিয়ে আমরা সিজদায় লুটিয়ে পড়ি, মাটিতে কপাল রাখি, তোমারই তসবীহ পাঠ করি এবং তোমারই প্রশংসায় জিহ্বার দ্বারা উচ্চারণ করি ঃ

سُبْحَانَرَبِّيَالاَعْلَيوَبِحَمْدِهِ

অর্থাৎ আমার সুমহান প্রতিপালকের পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তাঁর প্রশংসা জ্ঞাপন করছি।

হে আল্লাহ! তুমিই আমাদের পাপগুলোকে ক্ষমা করে দিতে পারো।

যদি তুমি মাফ না করো তাহলে কাল কিয়ামতে আমরা পর্যুদস্ত হবো। যদি তুমি হেদায়েত না করো তাহলে আমরা বিপথগামী হয়ে যাব।

যদি তুমি আমাদের প্রতি সাহায্যের হাত প্রসারিত না করো তাহলে শয়তানের হাতে এবং নফসের প্রলোভনে আমরা বন্দী হয়ে পড়বো।

যদি তুমি আনুগত্য ও বন্দেগীর তৌফিক না দাও তাহলে আমরা তোমার থেকে দূরে সরে যাব। আর তোমার থেকে দূরে সরে যাওয়ার অর্থ হলো সত্য ও পবিত্রতা থেকে দূরে চলে যাওয়া, আর যারা সত্য, ভালো ও পবিত্রতা থেকে দূরে চলে যায় তারা তো দোযখের দিকে ধাবিত হয়।

হে আল্লাহ!

তুমি আমাদের ভুল ত্র“টির ক্ষমাকারী। আমাদের কুনুতের মধ্যে তোমার কাছে আমরা ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তোমার অনুগ্রহ কামনা করি।

তুমি পাপসমূহ মার্জনাকারী। আর তোমার অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হওয়া নিজেই একটি পাপ কাজ। (যুমারঃ ৫৩)

তুমি এতো বেশি দয়ালু দাতা যে আমাদের মন্দ কাজগুলোকেও তুমি সৎ গুণে রূপান্তরিত করে থাকো। (ফুরকানঃ ৭০)

আমাদের প্রতি দয়া করা যেন আমরা পাপের কবলে না পড়ি, আমাদের রিপুর খায়েশ যেন আমাদেরকে প্রতারিত না করে। আর বস্তুমোহ এবং যৌন তাড়না যেন আমাদেরকে বন্দী করে না ফেলে।

শুধুই তোমারই বান্দা আমরা, কেবল তোমার কাছেই আমাদের মনোবাঞ্ছা ও প্রার্থনার হাত তুলিঃ

اِيَّاكَنَعْبُدُوَاِيَّاكَنَسْتَعِينُ

আমরা কি চাই যা তোমার নেই?

আমাদের প্রয়োজনও বা কি ছিল যা তুমি দাওনি?

কোন্ ক্ষতি, আর কোন্ বিপদের ফাঁদ ছিল যে, সম্পর্কে তুমি আমাদেরকে সতর্ক করে দাওনি?

কোন সুপথ আর মুক্তি ও কল্যাণের পথ ছিল যে সম্পর্কে তুমি আমাদেরকে আহ্বান জানাওনি?

হে সমস্ত মঙ্গলের আঁধার।

হে সমস্ত পবিত্রতার উৎস?

আমাদেরকে তৌফিক দান করো যাতে তোমার উপযুক্ত বান্দা হতে পারি। কেননা, তুমি তো সবচেয়ে উপযুক্ত, সমকক্ষহীন। আর পাপ ও প্রলোভনের পথ থেকে যাতে দূরে থাকতে পারি। কেননা, আসলে সেটাই বিভ্রান্তির পথ।

হে আল্লাহ!

যখন আমরা তোমার সামনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি এর অর্থ হলো আমরা মাটি থেকেই তৈরি এবং মাটিতেই মিশে যাব। আর যখন সিজদা থেকে মাথা তুলি এর অর্থ হলো মৃত্যুর পর আমরা পুনরায় জীবিত হবো যাতে আমাদের কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে পারি।

সিজদা আমাদের বিনয় ও বন্দেগীর চিত্তকে আমাদের মধ্যে উজ্জীবিত করে। এটা এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থা যাকে তুমি অন্য যে কোনো অবস্থার তুলনায় বেশি পছন্দ করো। তুমি চাও যে আমাদের মতো পাপী বান্দারা মাটিতে মুখ রাখি এবং তোমাকে ইয়া রব্ব, ইয়া রব্ব বলে ডাকি। আর তুমি আমাদের ডাকে সাড়া দিবে এবং আমাদেরকে ক্ষমা করবে।

আমাদের তাশাহুদ পাঠ করার অর্থ হলো আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসূলের রেসালাতের প্রতি সাক্ষ্য প্রদান করা।

আর নামাযের শেষে আমাদের সালাম পাঠ করার অর্থ হলো রাসূলুল্লাহ (সাঃ)সহ সকল সৎকর্মী, পুণ্যবান, ফেরেশতাকুল ও মুমিনদের প্রতি দরুদ প্রেরণ করা।

হে আল্লাহ!

হে দয়াময় খোদা! আমাদের নামাযকে তুমি কবুল করে নাও। আর আমাদেরকে এমন বান্দা হওয়ার তৌফিক দাও যাতে তোমার অধিকারকে অবগত হতে পারি এবং তোমার নির্দেশ পালনে সচেষ্ট থাকতে পারি।

মনোসংযোগ নামাযের প্রাণ

প্রত্যেক জিনিসের একটি দেহ থাকে আরেকটি আত্মা বা প্রাণ থাকে।

নামাযের প্রাণ হলো মনো সংযোগ। অমনোযোগের নামায হলো নিছক কিছু শব্দ ও বাক্যের খেলা আর কিছু দৈহিক কসরত।

মনোসংযোগ বলতে বুঝায় মানুষ নামাযের মধ্যে আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি মনোনিবেশ করবে, তাঁর স্মরণ থেকে উদাসীন হবে না। প্রত্যেকটি মুহূর্তে মুখের শব্দাবলী আর দৈহিক ওঠা বসার মধ্যে সে জানবে যে কি বলছে আর কি চাচ্ছে। তার এসব কথা ও কাজের অর্থই বা কি। কার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছে, তার ক্বিবলাহ কোথায়, কেন সে নামায পড়ছে, আর কোন মহান আল্লাহর সম্মুখে সে দোয়া প্রার্থনা ও হামদ ও ছানা এবং ইবাদতে মশগুল হয়েছে।

মানুষের মন যদি অন্য কোনো বিষয়ে ব্যস্ত থাকে, তার চিন্তা যদি এদিক ওদিকে ঘুরে বেড়ায়, যদি সকল শব্দ, দৃশ্য, আসা-যাওয়া, হস্তলিখন, ছবি ইত্যাদি তার মনকে ব্যস্ত রাখে আর সে যদি আদতেই ভুলে যায় যে নামায পড়ছে, কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, কি উচ্চারণ করছে তাহলে এর অর্থ হলো সে নামাযে মনোসংযোগে ব্যর্থ।

তাই নামাযে মনোসংযোগ অর্জন করার একটি উপায় হলো নামাযের অর্থ জানা এবং নামাযের মধ্যে মানুষ যা পড়ে সেগুলোর অনুবাদকে দৃষ্টিতে আনা।

আরেকটি উপায় হলো নামাযের জন্য এমন স্থান বেছে নেয়া যেখানে বাইরের শব্দ, কথাবার্তার আওয়াজ, ছবি, সাইনবোর্ড ইত্যাদি নামাযীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারে।

অপর আরেকটি উপায় হলো নামাযের পূর্বে এবং নামাযের সময়ে সে সব মুস্তাহাব কাজগুলো পালন করা যেগুলো নামাযীকে অধিকতর নামাযের প্রতি মনোনিবেশ করতে সহায়ক হয় এবং তাকে আল্লাহর স্মরণে ও স্বীয় বন্দেগীর প্রতি নিমগ্ন করে।

আপনি যখন কোনো নামজাদা ব্যক্তির সাক্ষাতে যান তখন সুন্দরতম কাপড়টি পরিধান করেন, আদবের সাথে তার সামনে দাঁড়ান, কিংবা বসেন, তাছাড়া আদবের বাইরে যে কোনো ক্ষুদ্রতম কাজ করা থেকেও নিজেকে বিরত রাখেন, তার কথাগুলো কান পেতে শুনেন। মোট কথা সাক্ষাতকালের পুরো সময়টায় ঐ ব্যক্তির প্রতি আপনার দৃষ্টি থাকে।

আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ অস্তিত্বসত্ত্বা। সকল সৃষ্টির অস্তিত্ব তাঁর উপর নির্ভরশীল।

আমরা অভাবী অক্ষম বান্দা। তাঁর নেয়ামত লাভ করেই অমরা ধন্য। তাঁর এসব নেয়ামতের কারণে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ আমরা ইবাদত করি ও নামায পড়ি।

আল্লাহর সামনে আমাদের যে স্থান, সেদিকে লক্ষ্য করলে মনে কোমলতা এনে দেয় ভক্তি, বিনয় ও শ্রদ্ধায় দেহমন ভরে তোলে।

নামায হলো আল্লাহর যিক্র বা স্মরণ। তাই যতবেশি আমাদের মনোসংযোগ থাকবে এবং আমাদের অন্তর আল্লাহর মহীমার প্রতি আর আমাদের নিজেদের অভাবের প্রতি মনোযোগী থাকবে, ততই আমাদের নামায আত্মগঠনে ভূমিকা রাখবে।

স্মরণ রাখতে হবে যে, রুকু হলো স্রষ্টার মহীমার সম্মুখে অবনত হওয়া। আর আমাদের সিজদা হলো বিশ্বচরাচরের সাথে একাত্মতা প্রকাশ যারা আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পিত, বিনত এবং আনুগত্যশীল।

আমাদের তসবিহ হলো জগতের অণু-পরমাণুর সাথে কণ্ঠ মিলানো যারা অহরহ আল্লাহর তসবিহ পাঠ করে এবং সিজদা করে।

তাঁর তসবিহ পাঠ শুধু আদম সন্তানের কাজ নয়,

ঐ বুলবুলও যে তসবিহ পড়ে বসে গাছের শাখায়

শুধু কেবল আমরা নই, গোটা জগত স্বীয় বিশেষ ভাষায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করে। তাদের প্রত্যেকেরই অস্তিত্বই সেই মহান আল্লাহর একত্ব, প্রজ্ঞা এবং শক্তির পরিচায়ক।

প্রত্যেক চারা গাছটি যে মাটিতে গজায়

মেতে ওঠে ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহুর ঘোষণায়।

মনোসংযোগই হলো নামাযের প্রাণ

আমাদের চেষ্টা করতে হবে আমাদের ইবাদতের মধ্যে বিশেষ করে নামাযে আল্লাহ ভিন্ন অন্য কিছুর প্রতি চিন্তা না করি, আমাদের চিন্তা, মন ও অন্তরকে অন্যত্র নিয়ে না যাই। একদিকে যেমন তাঁর কৃপার প্রতিও আশাবাদী থাকবে। অপরদিকে তেমনি তাঁর শাস্তির ভয়ে ভীত থাকবো। এই ভয় ও আশার মধ্যবর্তী অবস্থায় বিরাজ করবো।

আল্লাহর ওলী আউলিয়াগণের নামায

আমাদের জীবনে, চলাফেরায়, জিহাদে, ইবাদতে প্রভৃতি ক্ষেত্রে মাসুম ইমামগণই আমাদের আদর্শ। তাঁদের নামাযও আমাদের জন্য আদর্শ।

মানুষ আল্লাহকে যতই চিনতে সক্ষম হবে তার ইবাদতও তত গভীরতা লাভ করবে এবং আরো বেশী প্রেমভক্তি পূর্ণ ও আধ্যাত্মিক ধ্যানসম্পন্ন হবে।

আল্লাহর আম্বিয়া ও আউলিয়াগণ যে অকৃত্রিম ভালবাসা লালন করতেন আল্লাহর প্রতি সে কারণে সকলের চেয়ে তারা বেশি ইবাদত করতেন। সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিয়োজিত থাকতেন। দীর্ঘ সিজদা, অব্যাহত রুকু, কান্না বিজড়িত তাহাজ্জুদের নামায আর অন্তর থেকে উৎসারিত দোয়া ছিল তাদের পরিচয়।

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যে “আল্লাহর বন্ধু” কে পরিণত হন এবং ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধি লাভ করেন তার কারণ ছিল দীর্ঘ সিজদা। (মুস্তাদরাকুলওসায়েল, খ:১, পৃ: ৩২৯)

হযরত মুসা (আঃ) প্রত্যেক নামায অন্তে স্বীয় মুখমন্ডলের ডান ও বাম পাশকে মাটিতে রাখতেন। (কিসারুল জুমাল)

ইমাম কাযিম (আঃ) ফজরের নামায শেষে সিজদায় মাথা রাখতেন এবং দিনের কিয়দাংশ সিজদা অবস্থায় থাকতেন। (কিসারুল জুমাল)

ইমাম যয়নুল আবেদীন (আঃ) আল্লাহর নামকে এতবেশি পুণরাবৃত্তি করতেন এবং সিজদাকে দীর্ঘায়িত করতেন যে, যখন মাথা তুলতেন তখন ঘামে তাঁর শরীর ভিজে থাকতো। (বিহারুল আনোয়ার, খ: ৮২, পৃ: ১৩)

তাঁকে এ কারণে “সাজ্জাদ” বলা হয় যে, তিনি দীর্ঘ সিজদা করতেন আর সিজদার চিহ্ন তাঁর কপাল ও সিজদার অঙ্গসমূহে প্রকাশমান হয়ে পড়তো। (ওসায়িলুশ শিয়া, খ: ৪, পৃ: ৯৭৭)

হযরত আলী (আঃ) এমন দীর্ঘ রুকু করতেন যে ঘাম তার পদযুগল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত। (বিহারুল আনোয়ার, খ: ৭, পৃ: ৮২)

মহানবী (সাঃ) এমন দীর্ঘ রুকু করতেন যে ঘাম তার পদযুগল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত। (বিহারুল আনোয়ার, খ: ৭, পৃ: ৮২)

মহানবী (সাঃ) নামাযে আসক্ত ছিলেন। এমনভাবে তিনি নামাযের প্রতি টান অনুভব করতেন যে নামাযের ওয়াক্ত উপস্থিত হওয়ার জন্যে ক্ষণ গণনা করতেন, আর যখন ওয়াক্ত উপস্থিত হতো তখন এমন হয়ে যেতেন যেন কাউকে চেনে না। (সুনানুন্নবী, পৃ: ২৫১)

তিনি (সাঃ) বলতেনঃ

আল্লাহ আমার চোখের জ্যোতিকে নামাযের মধ্যে নিহিত রেখেছেন এবং আমার দৃষ্টিতে তাকে প্রিয় করে দিয়েছেন। ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত মানুষ যখন দানা পানি খায় তৃপ্ত এবং পরিতৃপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু আমি কখনো নামায থেকে পরিতৃপ্ত হয়ে যাই না। (সুনানুন্নবী, পৃ: ২৬৯)

যখন তিনি (সাঃ) নামায পড়তেন, তাঁর অন্তর কম্পিত ও সন্ত্রস্ত থাকতেন। আল্লাহর ভয়ে কাঁপতেন। (সুনানুন্নবী, পৃ: ২৬৯)

রসুলুল্লাহ (সাঃ) রাতের একটি বৃহত্তর অংশকে ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। হযরত আলী (আঃ) নামাযের মধ্যে বেহাল হয়ে পড়তেন। তাঁর মুখের রঙ বিবর্ণ হয়ে যেত।

মহানবী (সাঃ) বলতেন, আমি তোমাদের জন্যে বেহেশতের নিশ্চয়তা প্রদান করব। তবে শর্ত হলো তোমরা দীর্ঘায়িত সিজদার মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করবেন। (মুস্তাদরাত-এ ওসায়িল, খ: ১, পৃ: ৩২৯)

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সহচরদের পরিচয় বর্ণনায় পবিত্র কোরআনে এসেছেঃ

تَرَاهُمْرُكَّعاًسُجَّداًيَبْتَغُونَفَضْلاًمِنَاللهِوَرِضْوَاناً

سِيمَاهُمْفِيوُجُوهِهِمْمِنْاَثَرِالسُّجُودِ

অর্থাৎ তাদেরকে দেখবে রুকু ও সিজদা অবস্থায় আল্লাহর নিকট থেকে অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি অন্বেষন করে তাদের পরিচয় হলো তাদের মুখমন্ডলে সিজদার চিহ্ন বিদ্যমান। (ফাত্হ ২৯)

ইমাম সাদিক (আঃ) ইমাম হুসাইন (আঃ) এর মাযারের মাটির উপরে ছাড়া সিজদা করতেন না। তিনি বলতেন হুসাইন (আঃ) এর মাটিতে সিজদায় এমন এক জ্যোতিময়তা নিহিত রয়েছে যা সকল পর্দাকে বিদীর্ণ করে। (বিহারুল আনোয়ার, খ: ১০৩, পৃ: ১৩৫)

বলা বাহুল্য সাইয়্যেদুশ শুহাদা ইমাম হুসাইন (আঃ) এর মাটির উপর সিজদা করা দ্বীনের রাস্তায় আত্মোৎসর্গ এবং আল্লাহর রাহে জিহাদ ও শাহাদাতের শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করে। আর নামাযী ব্যক্তিদেরকে কারবালায় চিত্রায়িত শাহাদাত ও লড়াইয়ের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করে দেয়।

আল্লাহর ওলী-আউলিয়াগণ এবং মহামানবদের নামায সম্পর্কে অগণিত দৃষ্টান্ত বিদ্যমান রয়েছে যা এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়।

আশা করা যায় ঐ মহান ইমামগণের (আঃ) আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার দৃষ্টান্তুগুলো আমাদের জন্যে আদর্শ হবে।

নামাযের পরিসমাপ্তি

নামাযের উপর দ্রুততার সাথে একটি পুণরালোচনা তুলে ধরার পর আমরা এবার তার শেষ পর্যায়ে উপনীত হয়েছি।

সর্বশেষ সিজদার পর দু’হাটু পেতে বসে তাশাহুদের মাধ্যমে রসুলের (সাঃ) রেসালাত এবং ইবাদতের প্রতি আর আল্লাহর একত্বের প্রতি সাক্ষ্য প্রদান করি। তাঁর (সাঃ) উপর দরুদ ও সালাম প্রেরণ করি।

সালাম হোক আল্লাহর সৎ ও উপযুক্ত বান্দাদের প্রতি, আল্লাহর ফেরেশাতকুলের প্রতি আর যারা সালামের উপযুক্ত পাত্র তাদের প্রতি।

আমাদের নামাযের মধ্যে সালাম সমূহ রসূলে খোদা (সাঃ) ও প্রকৃত মুমিনদের সাথে বন্ধনের যোগসূত্র। এ বন্ধন হলো পবিত্র ও সত্যতার সাথে আর পবিত্রগণ ও সত্যবানদের সাথে।

আমরা রসুলুল্লাহ (সাঃ) এবং তাঁর পবিত্র বংশের সাথে আমাদের বন্ধনকে বারংবার পুণরাবৃত্তি করি এমনকি নামাযের তাশাহুদের মধ্যেও। আহলে বাইত (আঃ) এর সাথে সম্পর্ক ব্যতিত দ্বীন অসম্পূর্ণ। আর তাঁদের উপর দরুদ প্রেরণ ব্যতিত নামায বাতিল। এ অধিকতর গুরুত্বারোপ মূলত সঠিক পথ-প্রদর্শকের কথাই তুলে ধরে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর রেসালতের প্রতি আমাদের সাক্ষ্য প্রদান এবং তাঁর আহলে বাইতের (আঃ) ইমামগণের প্রতি দরুদ প্রেরণ প্রকারান্তে আল্লাহ এবং কোরআনে পথে সঠিক পথ প্রদর্শকের সাথে বাইয়াত করারই নামান্তর।

রসুলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের সালাম কে শুনে থাকেন এবং উত্তর দেন। যদিও আমরা তা আঁচ করি না। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কি হতে পারে যে, আমরা জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটির উপর অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উপর সালাম প্রেরণ করবো আর তিনি আমাদের সালামের উত্তর দিবেন।

আমাদের নামাযের সালাম হলো হযরতের দরবারে আমাদের আদবের প্রকাশ এবং তাঁর সেই অপরিসীম পরিশ্রমের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন যা তিনি আমাদের হেদায়েতের জন্যে বরণ করেছেন।

নামায পরবর্তী দোয়া ও আমল

নামায শেষ হওয়ার পর নামাযীর জন্য উত্তম হলো দোয়া, মোনাজাত ও অন্যান্য আমল করা যা নামাযের পরিপূরক হয়। তড়িঘড়ি উঠে পড়া এবং নামাযকে ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। নামায পরবর্তী এসব মুস্তাহাব দোয়া-মোনাজাত এবং আমল সমূহকে ‘তাকিবাত’ বলা হয়।

দোয়ার কিতাবগুলোতে প্রত্যেক নামাযের জন্যে বিশেষ বিশেষ দোয়া এবং তাকিবাত বর্ণিত হয়েছে। তদ্রুপ কিছু অভিন্ন তাকিবাতও বর্ণিত রয়েছে যেগুলো সব নামাযের পর পালন করা যায়। (মাফাতিহুল গ্রন্থে দেখুন)

নামাযের পর কোরআন পড়া, ক্ষমা প্রার্থনা করা, দরুদ পাঠ করা, বিভিন্ন দোয়া পড়া, আল্লাহর কাছ থেকে মনোবাঞ্ছা প্রার্থনা করা, হযরত যাহরা (সাঃ আঃ)র তসবীহ পাঠ করা, শুকরিয়ার সিজদা করা.. ইত্যাদি ‘তাকিবাতের’ মধ্যে পরিগণিত হয়।

হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃ আঃ) তাসবীহ যে ব্যাপারে অধিকতর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে তা হলো প্রত্যেক নামাযের পরে ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, ৩৩ বার আল-হামদুল্লিাহ এবং ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ বলতে হবে। এ আমলটি রসুলে খোদা (সাঃ) তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা হযরত ফাতেমা যাহরা (সাঃ আঃ) কে শিক্ষা দেন যার সওয়াব অপরিসীম। আর একারণে এটা তাসবীহাতে যাহরা নামে বিখ্যাত।

যে ব্যক্তি নামাযের প্রতি আসক্ত এবং আল্লাহর ভক্ত হয় সে নামাযের পরে এ সম্পর্ককে শীঘ্রই বিচ্ছিন্ন করে না। বরং দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে তা অব্যাহত রাখে।

এসব ‘তাকিবাতের’ মধ্যে আরেকটি অন্যতম আমল হলো শুকরিয়া সিজদা। সিজদায় মাটিতে মাথা রাখা, আল-হামদুল্লিাহ ও শুকরানলিল্লাহ বলা, আল-আফ বলা, ইয়া রব্ব-ইয়ারব্ব বলা, আল্লাহর কাছে মার্জনা চাওয়া, তাঁর নেয়ামত সমূহের কৃতজ্ঞতা জানানো এটাও নামাযীর আদব ও জ্ঞান-গভীরতার পরিচায়ক।

অবশ্য, শুকরিয়ার সিজদা নেয়ামত সমূহের কৃতজ্ঞতার একটি দৃষ্টান্ত। নতুনা বিভিন্ন রূপে আল্লাহর নেয়ামত রাজির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায়। পাপ থেকে দূরে থাকা কৃতজ্ঞতার সর্বোৎকৃষ্ট একটি দৃষ্টান্ত।

জুমআ এবং জামাআতের নামায

মূল নামায হলো ওয়াজিব। আর তা জামাআতের সাথে পড়া মুস্তাহাব। এ ব্যাপারে সবিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত ওয়াজিব নামায ছাড়াও মুস্তাহাব নামায সমূহ ও রয়েছে যা দিনে এবং রাত্রে পড়া হয়। এগুলো ‘নফল’ নামায হিসেবে প্রসিদ্ধ। এছাড়াও বিভিন্ন বিশেষ বিশেষ দিবস ও উপলক্ষে আরো কিছু মুস্তাহাব নামায রয়েছে যা পালনে জোরারোপ করা হয়েছে।

ইবাদতের প্রতি প্রেম, একজন আল্লাহ ভক্ত একত্ববাদী মানুষকে মুস্তাহাব, নফল এবং তাহাজ্জুদের নামাযসহ সকল নামাযের প্রতি টেনে নিয়ে যাওয়া বাঞ্ছনীয়। কেবল ওয়াজিব নামাযই সীমাবদ্ধ থাকলে যথেষ্ট নয়।

জামাআতে নামায পড়ার যে পুরস্কার নির্ধারিত রয়েছে তা বর্ণনার অতীত। কারণ স্বয়ং আল্লাহর ঘরে মুসলমানদের সমাবেশে উপস্থিত হয়েই এ জামাআতের নামায পড়া হয়।

আর জুমআর নামায যা সপ্তাহে একবার অনুষ্ঠিত হয় তা ইবাদত ও উপাসনার দিক ছাড়াও সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক দিয়েও তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে মুসলমানদের ঐক্য দৃঢ় হয় এবং বিভেদ সৃষ্টিকারীদের ষড়যন্ত্রসমূহ নিস্ফল হয়ে যায়। আর শত্র“দের অপপ্রচারকে ব্যর্থ করে দেয়।

জুমআ ও জামাআতের নামায হলো মুসলমানদের জৌলুস ও মহত্বের পরিচায়ক। জামাআতের নামায মানুষে মানুষে পরিচিতি এবং পারস্পরিক অভাব অভিযোগ ও সমস্যাগুলো উদঘাটন করে মুসলমানদের সমস্যা সমাধানে একে অপরের সাথে সহযোগিতা বাড়াতে সহায়তা করে।

জামাআতের নামায যদি সংক্ষেপে এবং বিলম্ব করেও পড়া হয় তবুও তা একাকী নামায পড়ার তুলনায় বহুগুণে মূল্যবান এবং বেশি সওয়াবের। এমনকি সে যদি দীর্ঘ করে এবং ওয়াক্তের প্রথমেই তা পড়ে তবুও। জুমআ এবং জামাআতের সারিতে সকলে এক মনে সমন্বিতভাবে পাশাপাশি ঐক্যবদ্ধ দাঁড়ায়। তখন স্বার্থপরতা এবং আত্মকেন্দ্রিকতা সমষ্টির মাঝে পড়ে গলে পানি হয়ে যায়।

আর আল্লাহর অনুগ্রহও সমষ্টির প্রতি বেশি বর্ষিত হয়।

একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ

যে ব্যক্তি জামাআতের নামাযের আহ্বান শুনতে পায় কিন্তু কর্ণপাত করে না তার নামায মূল্যহীন। (ওসায়িলুশ শিয়া, খ: ৫, পৃ: ৩৭৫)

নিয়মিতভাবে জামাআতের নামাযে শরীক হলে মনোফেকী এবং কপোট অভ্যাস থেকে স্থায়ীভাবে রক্ষা পাওয়া যায়। (মান লা ইয়াহ দুরুহুল ফাকীহ খ: ১, পৃ: ৩৭৭)

শেষ কথা

পুস্তিকাটির শেষে পৌঁছে গেছি।

কিন্তু পথের শুরুতে আমরা।

এ পথ হলো মানুষ হওয়ার পথ, পূর্ণতা অর্জনের পথ, বন্দেগী করা, মুসলমান হয়ে বেঁচে থাকার আল্লাহকে নিজের অভিভাবক ও ক্ষমতাবান জানা এবং তাঁকে একনিষ্ঠভাবে উপাসনা করার পথ। নামায হলো আমাদের প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাৎ স্থাপনের মাধ্যম। এটাকে যেন অবহেলা না করি।

নামায হলো স্রষ্টার সাথে বান্দার কথা বলার মাধ্যম। এটাকে যেন ভালবাসি। নামায হলো আমাদের আত্মার খোরাক। এটাকে যেন ভুলে না যাই।

মনোসংযোগ এবং মনোনিবেশ হলো নামাযের প্রাণ। নামাযের মধ্যে যেন আল্লাহকে স্মরণে রাখি। নামায অশ্লীলতা ও মন্দকর্ম থেকে বিরতকারী। তাই এ থেকে বেশি বেশি উপকার গ্রহণ করবো।

নামায হলো শ্রেষ্ঠ ইবাদত, গুরুত্বপূর্ণ ফরয কাজ আর প্রেমপূর্ণ মিনতি ও একজন মানুষের কর্তৃক স্বীয় মাবুদের উপাসনা। এটাকে আমাদের নিজেদের মৌলিক কাজ সমূহের মধ্যে গণ্য করবো।

নামায ছাড়া আত্মা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আশাগুলো দুর্বল হয়ে যায় আর মানুষ মন ও প্রাণ উৎফুল্লহীনতা এবং বিকারগ্রন্ত হয়ে পড়ে।

… যদি ইতিপূর্বে নামাযের ব্যাপারে ত্র“টি এবং অবহেলা প্রদর্শন করে থাকি তাহলে অনুতাপ আর অনুশোচনার দরজা খোলা রয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো “মোহাম্মদী উম্মত”, “আলীর শিয়া”, “হুসাইনের অনুসারী” আর “ইমামে জামানার প্রতীক্ষাকারী” হওয়ার জন্য। এসকল নেতাবর্গ এবং তাঁদের রেসালাত, জিহাদ, শাহাদাত এবং গাযরাত দ্বীনকে পুনরুজ্জীবিত করা আর আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কের বন্ধনকে জোরালো করার জন্যেই।

আমরা সবাই নামাযকে গুরুত্ব দিব

-ইনশাআল্লাহ

সেলাহ রাহেম (আত্মীয়তার বন্ধন)

ওলামায়ে ইসলাম দ্বীনকে তিনভাগে ভাগ করেছেন।

(১) আকাইদঃ যা হলো “তা আককোলি” কিন্তু ওহীর সাহায্যে, সেটাতে কোন তাকলিদ জায়জ নয়।

(২) আহ্কামঃ এহ্কাম হলো ‘তাআববোদ’ সেটাতে চুনও চেরা নয়, যেভাবে আদেশ দেয়া আমল তেমনি ভাবে পালন করতে হবে। অর্থাৎ হয়ত কোন মোজতাহেদের তাকলিদ করতে হবে, অথবা এহতেয়াতের উপর আমল করতে হবে।

(৩) আখলাকঃ যেটা মানুষের চরিত্রকে বুঝায় সেটা ভালো অথবা মন্দ হতে পারে। রাসূল (সাঃ) পাঠানোর উদ্দেশ্য হল নবী করীম (সাঃ) নিজের এক বাণীতে এরশাদ করলেন “বো এসতো উতাম মিমাম লি মাকারিমাল আখলাক।”

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাকে উত্তম চরিত্রের শিক্ষা দেওয়ার জন্য মাবুস করলেন বা পাঠালেন।

এখানে রাসূল (সাঃ) এর হাদীস থেকে বুঝতে পারি আখলাক হল “উত্তম চরিত্র”।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রাসুলে পাক (সাঃ) পাঠালেন যাতে করে মানুষের বদআখলাক থেকে রক্ষা করে সুন্দর আখলাকের দিকে ধাবিত করেন। কোরআন শরীফে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এরশাদ করেন ঃ

ويخرجهممنالظلماتاليالنورباذنه (সূরা মায়েদা, আয়াত-১৬)

তোমাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ধাবিত করার জন্য আমি রাসূল (সাঃ) কে প্রেরণ করেছি। “মাকারামে আখলাক” উত্তম চরিত্রের জন্য যা দুনিয়া আখেরাতে লাভবান ও সাফল্য অর্জনের কারণ হয়ে দাড়ায়। আর “বদ আখলাক” মানুষকে মানুষত্ব থেকে থামিয়ে চতুষ্পদ ও তার চেয়েও নিকৃষ্ট করে দেয়। এরজন্য রাসূলে পাক (সাঃ) বার বার বললেতন, “আলাইকুম বি মাকারিমেল আখলাক, ফা ইন্নাল লাহা ইবআসুনি বিহা।”

“তোমাদের উপর উত্তম চরিত্রকে ফরজ করা হল এবং আমাকে এই উত্তম আখলাকের জন্য মাবুস করা হল।”

ইমাম মুসা কাজেম (আঃ) থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, “সেই শিক্ষাকে অর্জন কর যেটা তোমাকে সংশোধন ও রক্ষা করবে। ফাসাদ ও গুনাহ থেকে রক্ষা করবে।”

অতএব ইলমে আখলাক ভালো চরিত্রের শিক্ষা অর্জন করা অতি জরুরী। আর এই শিক্ষা আমরা পবিত্র কোরআন ও আহলে বায়েত (আঃ) এর শিক্ষা থেকে অর্জন করতে পারি।

একটি মাকারামে আখলাকের মধ্যে থেকে একটি আখলাক হল “সেলাহ্রেহম”। (আত্মীয়তার বন্ধন)

তারা সুসম্মানিত যারা একে অপরের সাথে ভালো ব্যবহর ও সম্পর্ক রাখে। যেমনভাবে একটি ফুল গাছের মধ্যে ফুল থাকলে তার সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। যখনই সেই ফুলকে তার ডাল থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় তখন তার সৌন্দর্য্য হানী ঘটে।

তেমনিভাবে মানুষ যখন একে অপরের সাথে মিলে মিশে থাকে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে তখন তার সম্মান, মর্যাদা ও শক্তি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যখনই একে অপরের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখনই তাদের উপর অসুস্থতার রোগ দেখা দেয়। যেটা পরিণামকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

ইমাম আলী (আঃ) এরশাদ করলেন, “সেলাতুল রাহ্মে তুযিবুল মুহাব্বাতা।

“আত্মীয়তার বন্ধন।”

(গুরাতুরুল হেকাম) এই সম্পর্কে বিচ্ছিন্ন করলে মনের মধ্যে হিংসা, বিচ্ছিন্নতা, অহংকার, কুটলতা, গীবত বৃদ্ধি পায়।

“সেলা রেহম” নিজের আত্মীয় স্বজনদের সাথে বিশেষ করে করার জন্য রেওয়াতে বলা হল ঃ

“দ্বীনের বিশেষ তাকিদ হল যারা তোমাদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছে তাদের সাথেও “সেলারেহম” করার জন্য অনুরোধ করা হল।

ইমাম ছাদেক (আঃ) এরশাদ করেছেন,

‘সেলাহ রাহে মাকা ওয়ালাও বি শারবাতি মিনাল মায়্”

এক গ্লাস পানি দ্বারা নিজের সম্পর্কে ও সেলারেহমের মাধ্যমে বৃদ্ধি কর।”

সেলারাহমে প্রভাব ও পরিণতিঃ “সেলা রাহমে প্রভাব দুনিয়াও আখেরাতের দিক থেকে প্রচুর এবং রেওয়াতে এই বিষয়ে অনেক তাগিদ করা হল।

ইমাম মোঃ বাকার (আঃ) এরশাদ করেছেন, “সেলাহরেহেম আমলকে পাক-পবিত্র ও ধন-সম্পদকে বৃদ্ধি করে দেয়। বালা-মুসিবতকে দুর করে হিসাবকে সহজ করে দেয় এবং মৃত্যুকে দেরী করে দেয়।( ওসুলে ক্বাফী)

অন্য এক হাদিসে ইমাম জাফার সাদেক (আঃ) এরশাদ করলেন, “সেলারেহম চরিত্রকে সুন্দর দানশীলতাকে বৃদ্ধি করে, অন্তরকে পরিতৃপ্ত করে, রিজকে বৃদ্ধিকরে। মৃত্যুকে দেরী করে দেয়।

সেলাহরেহমে সীমারেখাঃ সমাজ ব্যবস্তা বলা হয় ‘সেলা রেহম’ শুধু নেক তাকওয়া ও পাক পবিত্র পরিবারের লোকদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। বরং যদি কোন গুনাহগার বান্দা ও আত্মীয় স্বজন হয়ে থাকে তাদের জন্য সেলাহ রেহম করতে তাগিদ করা হল। হয়ত এই সেলাহ রেহম কারণে গুনাহকে ছেড়ে দিতে পারে।

ইমাম সাদেকের (আঃ)-এর অনুসারীরা ইমাম থেকে জিজ্ঞাসা করেন, “আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন রয়েছে যাদের চিন্তা-ভাবনা অন্য ধরনের (অন্য ধর্মের) তারা কি আমাদের উপর হক্ব রাখে, ইমাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই তাদের আত্মীয়তার বন্ধন কখনও বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। যদি একই বিশ্বাসের অনুসারী হয়ে থাকে তাহলে তোমার উপর দুটি হক্ব রাখে।

(১) আত্মীয়তার (২) মুসলিম ও একই বিশ্বাসীর হয়ে। তবু আত্মীয়তা বিচ্ছিন্নতা করতে নিষেধ করা হয়েছে।

একজন লোক রাসূল (সাঃ)-এর কাছে আসলো এবং বলল ইয়া রাসুল আমার কিছু আত্মীয় আছে। তাদের সাথে আমি আত্মীয়তা রাখতে চাই কিন্তু তারা আমাকে কষ্ট দেয়। সিদ্ধান্ত নিলাম আত্মীয়তা বিচ্ছিন্ন করে দিবো। রাসূল (সাঃ) তাকে বলেন,তুমি যদি আত্মীয়তা বিচ্ছিন্ন কর আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাদর সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তাহলে এখন কি করব? যারা তোমাকে বঞ্চিত করল তাদেরকে দান কর। যারা তোমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেছে তাদের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় কর। কেউ যদি তোমার উপরে অত্যাচার করেছে তাকে ক্ষমা করে দাও। যদি এমন কর, তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তোমাকে অবশ্যই সাহায্য ও সহায়তা করবেন।১ (বিহারুল আনওয়ার : খন্ড: ৭১)

কিন্তু কাতে রেহমকে (আত্মীয়তার বন্ধন বিচ্ছিন্ন করা) “গুনাহে ক্বারিয়া” বলা হল শহীদ দাসত্বে গাইব (রাঃ) উনার বই গুনাহে কাবিরাতে ইমাম সাদেক (আঃ) ইমাম কাজেম (আঃ) থেকে রেওয়াত ও আয়াত দ্বারা প্রমান করেছেন যারা “কাতে রেহম” করে তাদের উপরের আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের লানত।

“কাত রেহম আল্লাহর নিকটে নিকৃষ্ট আমাল”

একজন লোক রাসূল (সাঃ) কে প্রশ্ন করল মানুষের কোন আমাল আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে নিকৃষ্ট?

রাসূল (সাঃ) উত্তরে বলেন আর সেটা হল শেরক তারপর কি? (সাঃ) বললেন “কাতে রেহম” আত্মীয়তার বন্ধনকে বিছিন্ন করা তারপর কি? আমর বিল মারুফ নাহি আনিল মুনকার ভালো না করা।

“কাতয়ে রেহম মৃত্যুকে নিকটবর্তী করে দেয়”

হযরত আলী (আঃ) নিজের খুদবায় এরশাদ করেন, আল্লাহর নিকট রক্ষা চাই যে, গুনাহ মৃত্যুকে নিকট করে দেয়, একজন বলল, এমনও গুনাহ আছে, যেটা মৃত্যুকে নিকট তিনি (আঃ) বললেন, হাঁ করে দেয়। সেটা হল “কাতে রেহম। অবশ্যই যখন একটি পরিবার একত্রিত হয় এবং আলোচনা করে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের রিজকে বৃদ্ধি করে দেন।

যখন একটি পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাদের রোজগারকে কম করে দেয় এবং তাদের আয়ুকে নামিয়ে আনে।

যত বড় পরহেজগার হয়ে থাকুক না কেন?২ (ওসুলে কাফি)।