আল্লাহর একত্ব সম্পর্কে যে ব্যক্তি আল্লাহতে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করে সে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করে না। যে ব্যক্তি তাঁর সাদৃশ্য দাঁড় করায় সে তাঁর বাস্তবতা উপলব্ধি করে না। যে ব্যক্তি উপমা দেয় সে তাঁকে বুঝে না। যে ব্যক্তি তাঁর অবস্থান নির্দেশ করে এবং তাকে কল্পনা করে, সে তাকে বুঝায় না। যত কিছু আকারআকৃতিতে জানা যায় তার সবই সৃষ্ট এবং যা কিছু অন্য কিছু দ্বারা অস্তিত্ববান তা হলো ওটার কারণ এবং আল্লাহ হলেন সকল কারণের কারণ। তিনি কাজ করেন। কিন্তু কোন হাতিয়ারের সাহায্যে নয়। তিনি সকল কিছুর সীমা নির্ধারণ করেন। কিন্তু চিন্তার সাহায্যে নয়। তিনি ধনবান কিন্তু সম্পদ সংগ্ৰহ করার মাধ্যমে নয় । তিনি সময়ের গন্ডিতে আবদ্ধ নন এবং পরিকল্পনার কোন প্রয়োজন তার হয় না। তার সত্তা কালের অতীত। তাঁর অস্তিত্ব সকল অনস্তিত্বের অতীত এবং তাঁর চিরন্তনতা প্রারম্ভের অতীত। ইন্দ্ৰিয়সমূহ সৃষ্টির মাধ্যমে জানা যায় যে, তাঁর কোন ইন্দ্ৰিয় নেই। বিভিন্ন বিষয়ের বিপরীতধর্ম বিষয় সৃষ্টির মাধ্যমে জানা যায় যে, তার বিপরীত কোন কিছু নেই এবং বস্তুর সামঞ্জস্য দ্বারা বুঝা যায় যে, তার কোন সামঞ্জস্য নেই। তিনি আলোর বিপরীতে অন্ধকার, ঔজ্জ্বল্যের বিপরীতে আচ্ছন্নতা, শুষ্কতার বিপরীতে আদ্রতা, উষ্ণতার বিপরীতে শীতলতা সৃষ্টি করেছেন। পরস্পর বিপরীতধর্ম বস্তুর মাঝে তিনি অনুরাগ সৃষ্টি করেছেন । তিনি বিভিন্ন বস্তুকে একীভূত করেন, একীভূত বস্তুকে আলাদা করেন এবং দূরবতীকে নিকটবতী ও নিকটবতীকে দূরবতী করেন। তিনি কোন প্রকার সীমার মধ্যে আবদ্ধ নন এবং সসংখ্যা দ্বারা গণনীয় নন। তিনি বস্তু নিরপেক্ষ। বস্তু শুধুমাত্র স্বগোত্রীয় জিনিসকে ঘিরে থাকতে পারে এবং দেহযন্ত্র শুধুমাত্র নিজের সদৃশ বস্তুকে নির্দেশ করতে পারে। মুনযু’ (অর্থাৎ থেকে বা হতে—ইংরেজী সিনস) শব্দ বস্তুর চিরন্তনতা মিথ্যা প্রমাণ করে, “কাদী’ (অর্থাৎ সংঘটিত হওয়ার কাল) শব্দ বস্তুর অনাদিত্বকে মিথ্যা প্রমাণ করে এবং ‘লাওয়ালা’ (অর্থাৎ যদি এমন হতো) শব্দ বস্তুর পূর্ণতা বা উৎকর্ষ অস্বীকার করে। বস্তুর মাধ্যমেই স্রষ্টা নিজেকে প্রকাশ করেন এবং বস্তুর মাধ্যমেই তিনি দৃষ্টির অন্তরালে সুরক্ষিত। স্থবিরতা ও গতি তাঁর মধ্যে সংঘটিত হয় না। তিনি যা প্রথমে সৃষ্টি করেছেন তা কী করে তাঁর মধ্যে সংঘটিত হতে পারে? তিনি প্রথমে যা সৃষ্টি করেছেন তা কী করে তাঁর দিকে ফিরে যেতে পারে (অর্থাৎ তাঁর সাদৃশ্য হতে পারে)? তিনি প্রথমে যা আকৃতি দান করেছেন কী করে তা তাঁর মাঝে উপস্থিত থাকতে পারে? যদি এমন হতো। তবে তাঁর সত্তা বিভিন্নতার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়তো। তাঁর সত্তা বিভিন্ন অংশে বিভক্ত হয়ে পড়তো এবং তিনি তাঁর চিরন্তনতা হারিয়ে ফেলতেন। যদি তাঁর সম্মুখভাগ থাকতো তাহলে অবশ্যই তাঁর পশ্চাদ্ভাগও থাকতো। যদি কোন কিছুতে তার কমতি থাকতো তবে পূর্ণতারও প্রশ্ন উঠতো। সেক্ষেত্রে সৃষ্টির আয়াত (নিদর্শন) তাঁর মাঝে ফুটে উঠতো এবং সৃষ্টি তাঁর আয়াত না হয়ে তিনি নিজেই একটা আয়াত হয়ে যেতেন। তাঁর নিরপেক্ষতার কুদরত দ্বারা তিনি বস্তুমোহের অতীত। কিন্তু বস্তু একে অপরের মুখাপেক্ষী । তিনি এমন যার কোন পরিবর্তন বা ধ্বংস নেই। অধিষ্ঠান প্রক্রিয়া তার বেলায় প্রযোজ্য নয়। তিনি কাউকে জন্ম দেন নি পাছে মনে করা হয় যে, তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি অন্য কোনভাবে আবির্ভূত হন নি যাতে তাকে সীমার অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি সন্তান উৎপাদন ও নারীর সধ্বংস্পর্শ থেকে অনেক অনেক পবিত্র । কল্পনাশক্তি তার কাছে পৌছায় না যাতে তার কোন পরিমাণ নির্ধারণ করা যায়। কোন বােধগম্যতা দ্বারা তাঁকে চিন্তা করা যায় না যাতে তাঁর কোন আকৃতি দেয়া যায়। ইন্দ্ৰিয়াশক্তি তাকে উপলব্ধি করতে পারে না যাতে তাকে অনুভব করা যায়। হাতে তাকে স্পর্শ করা যায় না যাতে তাকে মালিশ করা যায়। তিনি কোন অবস্থায় পরিবর্তিত হন না। তিনি কখনো এক অবস্থা অতিক্রম করে অন্য অবস্থায় যান না। দিবা-রাত্রির অতিক্রমণে তিনি বার্ধক্য প্রাপ্ত হন না। আলো ও অন্ধকার তার কোন পরিবর্তন আনতে পারে না। একথা বলা যাবে না যে, তার সীমা আছে, শেষ আছে, আদি আছে বা অন্ত আছে। তিনি কোন কিছুর নিয়ন্ত্রণাধীন নন। যাতে তাঁর উত্থান-পতন থাকতে পারে। কোন কিছুই তার ধারক ও বাহক নয় যা তাকে বক্র করতে বা সোজা রাখতে পারে। তিনি বস্তুর ভেতরেও নন বাইরেও নন। তিনি সংবাদ প্রেরণ করেন; কিন্তু জিহ্বা বা স্বরের সাহায্যে নয়। তিনি শোনেন কিন্তু কানের ছিদ্র বা শ্রবণেন্দ্ৰিয়ের সাহায্যে নয়। তিনি কথা বলেন। কিন্তু শব্দ উচ্চারণ করে নয়। তিনি স্মরণ করেন। কিন্তু মুখস্থ করে নয়। তিনি মনস্থ করেন। কিন্তু মনের সাহায্যে নয়। তিনি ভালোবাসেন ও অনুমোদন দান করেন। কিন্তু হৃদয়ের আবেগপ্রবণতা দ্বারা নয়। তিনি ঘূণা করেন এবং রাগান্বিত হন। কিন্তু কোন কষ্ট সহিষ্ণুতা দ্বারা নয়। যখন তিনি কোন কিছু সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন তখন তিনি বলেন ‘হও’; আর অমনি তা হয়ে যায়। কিন্তু তাঁর এই “হও” বলাও স্বরের সাহায্যে নয় যা কান শুনতে পাবে। তাঁর কথা বলাও একটা সৃষ্টিকর্ম। তাঁর মতো কোন কিছুর অস্তিত্ব কস্মিনকালেও ছিল না। যদি এমন কিছু থাকতো তাহলে অবশ্যই দ্বিতীয় খোদা Q<(\o একথা বলা যাবে না যে, অনস্তিত্ব থেকে তাঁর সত্তা অস্তিত্বে এসেছে। কারণ সেক্ষেত্রে সৃষ্ট বস্তুর গুণাবলী তাঁর ওপর আরোপ করা হবে এবং সৃষ্টি ও তার মধ্যে কোন ব্যবধান থাকে না এবং সৃষ্টির ওপর তাঁর কোন বিশিষ্টতা থাকে না। এতে স্রষ্টা ও সৃষ্টি সমপর্যায়ের হয়ে যায় এবং উদ্ভাবক ও উদ্ভাবিত একই স্তরের হয়ে পড়ে। অন্য কারো উপমা বা নমুনা অনুসরণ না করেই তিনি সমগ্র সৃষ্টিকে সৃষ্টিতে এনেছেন এবং এ সৃষ্টিকর্মে তিনি কারো সাহায্য গ্রহণ করেন নি। এ পৃথিবী ও নভোমন্ডল সৃষ্টি করতে এবং তাকে বিস্তৃত করতে তাঁর কোন ব্যস্ততার প্রয়োজন হয় নি। তিনি এটাকে কোন স্তম্ভের সাহায্যে দাড় করিয়ে রাখেন নি এবং এটাকে বেঁকে যাওয়া ও খন্ড বিখন্ড হয়ে যাওয়া থেকে সুরক্ষিত করেছেন। কর্তিত গাছের গোড়ার মতো তিনি পর্বতকে স্থাপন করেছেন, তার পাথরকে কঠিন করেছেন, স্রোতধারাকে প্রবাহিত করেছেন এবং উপত্যককে বিস্তৃত করেছেন। যা কিছু তিনি সৃষ্টি করেছেন তাতে কোন খুঁত নেই এবং যা কিছু তিনি শক্তিশালী করেছেন তাতে কোন দুর্বলতা নেই। তাঁর কর্তৃত্ব ও মহত্ত্ব দিয়ে পৃথিবীতে তিনি নিজকে প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর জ্ঞান ও বােধির মাধ্যমে এর অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে অবহিত আছেন। তাঁর মহিমা ও মর্যাদা বলে তিনি বিশ্বের সব কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। বিশ্বের কোন কিছুই তাঁকে অমান্য করতে পারে না এবং তাঁকে পরাভূত করার জন্য বিরোধিতা করতে পারে না। কোন দ্রুতপদ সম্পন্ন বান্দা তার কাছ থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারে না। যাতে তাঁকে ছাড়িয়ে যাওয়া যায়। পৃথিবীর কোন ধনবান ব্যক্তির তিনি মুখাপেক্ষী নন। তিনি পৃথিবীর কোন কিছুর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। সব কিছুই তার কাছে মাথা নত করে এবং তাঁর মহত্ত্বের কাছে নগণ্য। কোন কিছুই তাঁর কর্তৃত্ব থেকে পালিয়ে যেতে পারে না যাতে তাঁর ক্ষতি বা উপকার এড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, তাঁর সদৃশ কেউ নেই এবং তাঁর সমান কেউ নেই। তিনি পৃথিবীকে এমনভাবে ধ্বংস করবেন যাতে এর সব কিছুর বিলয় ঘটে। কিন্তু বিশ্বের এ ধ্বংস এর প্রথম সৃষ্টি ও আবিস্কার থেকে আশ্চর্যজনক নয়। আল্লাহর বান্দাদের সকল বুদ্ধিমত্তা খাটিয়েও একটা মশাকে অস্তিত্বে আনতে পারবে না। কী করে এটা সম্ভব হবে? সকল জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা একত্রিত করলেও একটা মশা সৃষ্টির উপায় বুঝতে পারবে না। একটা মশা সৃষ্টি করতে গেলে তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি স্থবির হয়ে পড়বে, সকল ক্ষমতা অসাড় হয়ে পড়বে এবং তারা ক্লান্ত ও হতাশ হয়ে অপারগতা স্বীকার করবে। নিশ্চয়ই, পৃথিবী বিলয় হওয়ার পরও মহিমান্বিত আল্লাহ্ বিরাজ করবেন এবং তাঁর পাশে কিছুই থাকবে না। পৃথিবী সৃষ্টির পূর্বে তিনি যেরূপ ছিলেন, পৃথিবীর বিলয়ের পরও তিনি অদ্রুপ থাকবেন। তাঁর বিরাজমানতায় কোন সময়, কাল, স্থান বা গতি নেই। সর্বশক্তিমান এক আল্লাহ ছাড়া আর কোন কিছুই থাকবে না। সকল কিছুরই প্রত্যাবর্তন তাঁর দিকে। সৃষ্টি করা যেমন কারো ক্ষমতাভুক্ত নয়, বিলয় ঠেকানোও তেমন কারো ক্ষমতাভুক্ত নয়। বিলয় ঠেকাতে পারলে পৃথিবী চিরস্থায়ী হতো। কিন্তু বাস্তবে, আল্লাহ ব্যতীত কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। এ বিশ্বজগতের কোন কিছুই তৈরি করতে তিনি কোন প্রকার অসুবিধার সন্মুখীন হন নি এবং এতকিছু সৃষ্টি করতে তিনি কোনরূপ শ্রান্তিবোধ করেন নি। এ বিশ্বচরাচর তিনি তাঁর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য সৃষ্টি করেন নি, বা কোন ক্ষতি ও লোকসানের ভয়ে সৃষ্টি করেন নি, বা কোন প্রতাপশালী শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য পাওয়ার আশায় সৃষ্টি করেন নি, বা প্রতিশোধের নেশায় মত্ত কোন বিরুদ্ধবাদীর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সৃষ্টি করেন নি, বা কোন দাম্ভিক অংশীদারের বিরুদ্ধে সৃষ্টি করেন নি, বা তিনি একাকীত্ব অনুভব করে সঙ্গ পাওয়ার জন্য সৃষ্টি করেন নি।
সৃষ্টির পর তিনি একে ধ্বংস করবেন, কিন্তু এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনায় উদ্বিগ্নতার কারণে নয়, বা কোন প্রকার আনন্দ উপভোগ করার কারণে নয়, বা তার ওপর কোন ঝামেলা-ঝঞাটের কারণে নয়। এর জীবনের দৈর্ঘ্য তাকে উদ্বিগ্ন করে না যে তিনি তাড়াতাড়ি তা ধ্বংস করতে চান। মহিমান্বিত আল্লাহ তাঁর দয়ায় একে রক্ষণাবেক্ষণ করছেন, তার আদেশ দ্বারা একে সঠিক রেখেছেন এবং তার কুদরাত দ্বারা একে পরিপূর্ণতা দান করেছেন। ধ্বংসের পর তিনি একে পুনরুজীবিত করবেন; কিন্তু তাঁর নিজের কোন প্রয়োজনে নয়, বা কোন কিছুর সহায়তা পাওয়ার জন্য নয়, বা একাকীত্ব দূরীভূত করার জন্য নয়, বা কোন কিছুর সঙ্গ পাওয়ার জন্য নয়, বা অজ্ঞতা ও অন্ধকার থেকে বের হয়ে জ্ঞান ও গবেষণার পথ পাওয়ার জন্য নয়, বা স্বল্পতা ও অভাবের কারণে প্রচুর ও পর্যাপ্তের জন্য নয়, বা অমর্যাদা ও হীন অবস্থার কারণে সম্মান ও ইজতের জন্য নয় ।